খবর চাপা থাকে না। তা পৌঁছে যায় অন্যের কানেও। অনেক ভাবনাচিন্তা করে গ্রামের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাঘব জানা তার লোকজন নিয়ে সক্কাল সক্কাল এসে উপস্থিত হয়েছে সুবিমল মাস্টারের বাড়ি।
খুব ব্যস্ত ভাবে সুবিমল বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে বলেন, ব্যাপার কী অমলদা? আজ হঠাৎ গরিবের বাড়ি কী মনে করে? কোনও বিশেষ দরকার বুঝি?”
‘হ্যাঁ, ওই আর কী। বসতে বলবে না বুঝি? না কি দল ছেড়েছ বলে মানুষ হিসাবেও আমাদের ভুলে যেতে চাইছ?’ কাষ্ঠ হাসি ও মাখন কণ্ঠস্বরে তীক্ষ্ণ ঝাঁঝ অমলবাবুর ধারালো শব্দে।
‘কী যে বলেন, আসুন আসুন, ভিতরে এসে বসুন সবাই,’ বলে ঘরে ঢুকতে ইঙ্গিত করেন তিনি।
একটি কাঠের চৌকি, বেশ কিছু কাঠ ও বেতের চেয়ার সব সময়ই পাতা থাকে সুবিমলের বারান্দায়। জনা পাঁচেক লোক বসে।
সুবিমল নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে খানিক উঁচু স্বরে বলেন, ‘এই অরু, তোর জেঠিমাকে চা করতে বল।”
‘আবার চা কেন? না না, পরিবারকে মিছিমিছি কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়।’ বিগলিত জাহ্নবী যমুনা বয়ে যায় অমলবাবুর কণ্ঠে! “ও ঠিক আছে। এবার বলুন দাদা, এই অধম আপনাদের কী সেবা করতে পারে?’ বলেন সুবিমল মিত্তির।
‘আরে কী যে বলো! এক সময় তুমি ছিলে আমাদের পার্টির গর্ব, একজন ডেডিকেটেড ওয়ার্কার। তারপর কোথা দিয়ে যে কী হল, যাক গে ওসব, যে জন্য আসা আরকি।’ মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন অমলবাবু।
‘হ্যাঁ বলুন,’ সুবিমলের কণ্ঠে উদ্বেগ ধরা পড়ে। নাকের উপর নেমে আসা চশমার উপর দিয়ে দৃষ্টি অসম্ভব তীক্ষ্ণতায় আছড়ে পড়ে বিপরীত চশমায়।
‘তোমার নামে একটা গুরুতর অভিযোগ আছে সুবিমল! নেয়ামত পঞ্চায়েতে জানিয়েছে যে, প্রতিবার মিড-ডে মিল সাপ্লায়ের জন্য নগদ পাঁচ হাজার টাকা, দু-বস্তা চাল আর এক বস্তা ডাল— এসব ও নাকি আর তোমাকে দিতে পারবে না, তাতে ব্যাবসা ছেড়ে দিতে হয় দেবে!’ কথাটা শেষ করেই বারান্দার এক কোনায় রাখা তিনটে বস্তার দিকে একবার অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখ রাখেন সুবিমলের প্রতি। সম্ভবত তার প্রতিক্রিয়াটা বোঝার চেষ্টা করে।
মুহূর্তের জন্য সুবিমলের পায়ের তলা থেকে মাটি বুঝি সরে যায়। তিনি এবার বুঝতে পারেন গতকাল নেয়ামত স্কুলের একটি ঘরে ছ’মাসের চাল-ডাল রাখার সময় অতিরিক্ত তিনটি বস্তা তার বাড়িতে রাখার জন্য কেন বারবার অত জোর করছিল।
সুবিমল নিজের বাড়িতে স্কুলের জিনিসপত্র রাখতে চাইছিলেন না। কিন্তু মাল নামিয়ে দিয়ে লরি চলে গেছে, বেলাও পড়ে এসেছে। এখন এই অতিরিক্ত তিনটি বস্তা ফেরত নিয়ে যাওয়া অসুবিধাজনক এবং পরে ওগুলি সময় মতোন ভ্যানরিক্সায় চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, এই অজুহাতে বস্তাগুলি পাঠিয়ে দেয় নেয়ামত। ব্যাপারটা সহজভাবেই নিয়েছিলেন তিনি। ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি তার জন্য সুপরিকল্পিত ভাবে চক্রান্তের একটা জাল বিছানো হচ্ছে।
কোনও মতে সুবিমল বললেন, ‘নেয়ামত নিজে বলেছে এ কথা?”
‘বলেছে মানে? লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে। এই দ্যাখো তার লেখা অভিযোগপত্র। একটি হাতে লেখা কাগজ এগিয়ে দেন অমল। সুবিমল এটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন না। কারণ তিনি এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে, এরা যখন এসেছে, আটঘাট ভালোভাবে বেঁধেই এসেছে।
পাশ থেকে একজন বলল, “শুধু তাই নয়, গতবারের বেশ কিছু মালের চালানেরও গণ্ডগোল আছে বলে জানিয়েছে নেয়ামত। বলেছে, প্রয়োজনে থানা-পুলিশ-কোর্ট-কাছারি— যদ্দুর যেতে হয় যাবে, কিন্তু ঘুষ হিসাবে তোমাকে ও আর একটি টাকাও দেবে না।’
দরজার পাশ থেকে এ সময় একটি কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘জেঠু চা এনেছি।” সংবিৎ ফিরে পান সুবিমল, বলেন, ‘হ্যাঁ অরু, এনাদের সবাইকে চা দে।”
বছর আঠারোর অরুণাংশ চায়ের ট্রে নিয়ে এগিয়ে আসে বেশ সাবধানী পদক্ষেপে।
সুবিমল নিজেও একটি কাপ তুলে নেন ট্রে থেকে। চা পান করতে করতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন- • নেয়ামত এতটা নীচে নামতে পারল! মানুষটা স্কুলে মিড-ডে মিল সাপ্লায়ের অর্ডার পাওয়ার জন্য আমার কাছে এসে তিন বছর আগে প্রায় পায়ে পড়ে গেছিল। ওর জন্য বিডিও, স্কুল কর্তৃপক্ষ, ডিআই— কাকে না বলেছি। আর ও কিনা শেষ পর্যন্ত আমার পিঠেই ছুরি বসাল।
অমল বোধহয় থট রিডিং জানে। তিনি বললেন, “আসলে কী জানো সুবিমল, কন্ট্রাক্টটা ওকে পাইয়ে দেওয়ার জন্য তুমি যেভাবে চাপাচাপি করেছিলে, তখনই সকলের চোখে লেগেছিল ব্যাপারটা।”
চা পরিবেশন করে ফিরে যাচ্ছিল অরুণাংশু। আচমকা রাঘব জানা বলে উঠল, “বাহ, চা-টা তো বেশ।’ অরুণাংশু একবার ফিরে তাকাল, তারপর ভিতরে চলে গেল। অতিথিদের মধ্যে দু’জন মুখ টিপে সামান্য হাসল। বিষয়টা গায়ে মাখলেন না সুবিমল। তার মন তখন অন্য চিন্তায় বিভোর, মানে নেয়ামতকে এরা হাতে নিয়ে নিয়েছে।
অসংখ্য চালানের মধ্যে বেশ কয়েকটিতে নিশ্চয়ই কিছু জালিয়াতি করে রেখেছে আমাকে ফাঁসানোর জন্য। যাক গে, দেখা যাক এদের আসল উদ্দেশ্য কী?
ধুরন্ধর অমল বুঝি এবারও বুঝে ফেললেন সুবিমলের মনের কথা। তিনি বলে উঠলেন, ‘না না, তুমি একদম ঘাবড়িও না সুবিমল। তোমায় কথা দিচ্ছি নেয়ামতকে আমি ওসব করতে দেব না। সব কাগজপত্র আমার কাছেই থাকবে, ব্যাপারটা হবে না। কেবল তুমি যদি একটু…’
(ক্রমশ… )





