প্রতিদিনের মতোন ভাঙা লজঝড়ে সাইকেলটা মদনা বিশুর চায়ের দোকানের মুখে দাঁড় করায়, তারপর বলে, 'খবর ভালো নয় গো কাকা।'
‘কেন, কী হল আবার?' সিগারেটে জোরে টান মেরে তাকায় রাঘব জানা। বিরক্তিতে কুঁচকে ওঠে লোমশ ভ্রূজোড়া। ‘এবার তোমার বিরুদ্ধে সুবিমল মাস্টার দাঁড়াচ্ছে, টিকিট পেয়ে গেছে। গাঁয়ের জায়গায় জায়গায় ঘোঁট পাকাচ্ছে মানুষেরা। জল্পনা- কল্পনা করছে, মনে হচ্ছে হাওয়া সুবিধের নয়। সক্কলে তোমার বিরুদ্ধে কথা বলছে।' এক নিঃশ্বাসে বলে যায় মদনা।
ছ'ফুট উচ্চতার রাঘব জানা তার হাতির মতোন শরীর কাঁপিয়ে বেশ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, 'শালার মাস্টার বড়ো বাড় বেড়েছে। ব্যাটাকে সাইজ করতে হবে। এত সাহস! চমকাইতলায় বাস করে আমার বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়ায়। গত পনেরো বছরে যে কাজ কারও সাহসে কুলোয়নি। বজ্জাতটাকে ধুনে শেষ করে দেব।'
'আঃ! তুমি বড্ড তাড়াতাড়ি মাথা গরম করে ফেল রাঘব। নিচু, নিচু স্বরে কথা বলতে শেখো। রাজনীতি করতে এসেছ, অথচ ঘটে বিন্দুমাত্র বুদ্ধি নেই,' বলে ওঠেন অমলবাবু। ভদ্রলোক পাকা মাথার প্রবীণ মানুষ। অনেক উত্থান-পতন জীবনে দেখেছেন। এই লোকটিকে সমীহ করে রাঘব জানা।
'এই হরেন, তোকে যে কাজটা বলেছিলাম তার কদ্দূর এগোল?' তিনি প্রশ্ন করেন, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে দোকানদারকে বলেন, 'একটা লিকার চা দে না বাপ।'
পিচ রাস্তার দুধার ঘেঁষে গোটা পঞ্চাশেক হলুদ বাল্ব ততক্ষণে সবে জ্বলে উঠেছে। গ্রামের ছেলে-মেয়ে-বুড়ো-জোয়ান, সকলে মাঠের কাজ সেরে যাবতীয় টুকিটাকি কেনাকাটা সারছে। কাঁচা আনাজ নিয়ে বসেছে গুটিকয় বিক্রেতা। সপ্তাহে একদিন হাট বসে রায়দিঘির মাঠে। আসল কেনাকাটি যা কিছু সব ওখানেই হয়। আর পাঁচটা হাটের প্রথামাফিক এখানেও হাটকে কেন্দ্র করে বসে জুয়ার ঠেক। লুকিয়ে বিক্রি হয় বাংলা, চোলাই। দুর্জনেরা বলে, এ সবের পিছনেই নাকি রাঘব জানার পরোক্ষ মদত আছে। হরেন বলে, ‘কাজ এগোচ্ছে অমলদা। মনে হচ্ছে মাছ টোপ গিলবে এবার।'
চা খেতে খেতে অমলদা বলেন, ‘নেয়ামতকে ব্যাপারটা বোঝাবার চেষ্টা কর। আমাদের সঙ্গে থাকলে আখেরে ওরই লাভ। আর না থাকলে বিপদ। এ ব্যাপারটায় ও যদি আমাদের সঙ্গে একটু সহযোগিতা করে চলে, তা হলে সুবিমলের কোমর আমরা চিরকালের মতোন ভেঙে দিতে পারব। জীবনে আর ও উঠে দাঁড়াতে পারবে না।'





