আবার চলেছি হিমালয়ে। হাওড়া থেকে উপাসনা মেলে আমরা সাতজন চেপে বসেছি হরিদ্বারের উদ্দেশে। জঙ্গল, ঝরনা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে হারিয়ে যেতে চাই। গাড়োয়াল হিমালয়ের ‘মায়ালি গিরিপথের (১৭,৫৪৯ ফুট) মধ্যে দিয়ে কেদারনাথে পৌঁছাতে হবে। কেদারনাথে পৌঁছানোর বেশ কয়েকটি পথ রয়েছে। প্রথমত: মায়ালি গিরিপথ— যে পথে আমরা চলেছি, দ্বিতীয়ত: অডেন্স কল হয়ে কেদারনাথ। তৃতীয়ত: ত্রিযুগীনারায়ণ-পঁওলিকাঁটা হয়ে, চতুর্থত: প্রচলিত পথ গৌরীকুণ্ড হয়ে। আরও পথ রয়েছে।

দেখতে দেখতে উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষ্মণাবতী পৌঁছে গেলাম। ঘড়ির কাঁটাতে সকাল সাড়ে সাতটা। এখনও হরিদ্বার ৯ ঘণ্টার পথ। আমাদের অভিযানের লক্ষ্য ঘুট্টু হয়ে মাশারতাল-মায়ালি গিরিপথ-বাসুকিতাল হয়ে কেদারনাথে৷ কেদারনাথ যাওয়ার যতগুলি পথ আছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম ও সকল অভিযাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয়। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই পথে অভিযান হয়। প্রাক বর্ষায় পথের অধিকাংশ স্থান বরফে ঢাকা থাকে। সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে স্টেশনে নামার অপেক্ষায়। চলে এল হরিদ্বার।

স্টেশনে নেমে অটো রিকশা করে চললাম হৃষিকেশের উদ্দেশে। চারিদিকে অস্বাভাবিক ভিড়। পুণ্যলাভের আশায় দলে দলে মানুষ এসেছে পুণ্যভূমি হরিদ্বারে। এখন চারধাম যাত্রা চলছে, গঙ্গোত্রী-যমুনোত্রী-কেদার-বদ্রী। সারা উত্তরাখণ্ড রাজ্যজুড়ে অসংখ্য দেবদেবীর মন্দির। হরিদ্বার হল প্রবেশপথ। চারদিক কংক্রিটের জঙ্গলে ভরে উঠেছে, অপরিচ্ছন্ন মলিন পথঘাট, ইট-পাথরের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছি আধুনিক সভ্যতা থেকে সাময়িক মুক্তির আশায়।

রাতে ঠাঁই হল পূর্ব পরিচিত হোটেলে। দশদিন হাঁটার রসদ এখান থেকেই সংগ্রহ করে নিয়ে যাব। হৃষীকেশ বাজারের কাছে হোটেলটিতে ব্যাগ গুছিয়ে রাখার আগেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হল। মাথায় হাত! আজ রাতের মধ্যেই সব রেশন কিনে নিতে হবে, করতে হবে ঘুট্টু যাওয়ার গাড়ির ব্যবস্থা। কী করে সম্ভব! ঝোড়ো হাওয়া আর মুষলধারায় বৃষ্টি হয়েই চলছে।

বৃষ্টি ধরে এলে রেনকোট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, সঙ্গে টর্চ। সৌভাগ্যক্রমে পাশেই ভালো একটা মুদির দোকান ছিল, তাই তালিকা দেখে রসদ সংগ্রহ করলাম। সকালে তুলে নেব গাড়িতে। গাড়ির কী হবে? পাশেই একটা ট্রাভেল কোম্পানি আছে বটে, কিন্তু গাড়ির ভাড়া যা চাইছে, তা আমাদের বাজেটের বাইরে। প্রকৃতি বিরূপ, গাড়ির জন্য স্ট্যান্ডে যেতে পারছি না। রাতে খাওয়ার জন্য অটো করে ৪ কিলোমিটার দূরে নটরাজচকে গেলাম। হোটেলে ফিরে পরের দিনের ভাবনা ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ হয়ে এল।

রোদ ঝলমলে সকাল, তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। কারণ গাড়ি বুক করতে হবে। দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম গাড়ির খোঁজে। অবশেষে নটরাজচকের স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি পেয়ে গেলাম। গাড়ি নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। এরপর হৃষীকেশ ছেড়ে ঘুট্টুর উদ্দেশ্য রওনা দিলাম৷ সময় সকাল ৮.৪৫ মিনিট।

রাজেশ, আমাদের বোলেরোর সারথি। হৃষীকেশের ছেলে, অভিজ্ঞ ও দক্ষ চালক। কিছু সময় চলার পর পৌঁছে গেলাম সেই বিতর্কিত তেহেরী জলাধারে। সুন্দরলাল বহুগুনার আন্দোলন বাঁচাতে পারেনি নিম্ন তেহেরীর গরিব মানুষদের। বাঁধের কাছে পুলিশের বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ উপেক্ষা করে ক্যামেরাবন্দি জলাধার। চাম্বা, তেহেরী, অতিক্রম করে পৌঁছালাম ঘনশালীতে। চা পানের বিরতি। চালক রাজেশ এক দুঃসংবাদ বয়ে আনল —সাব, আগে নেহি যা পায়েঙ্গে। বিনা মেঘে বজ্রপাত!

—কেন! কী হল?

দোকানদার জানাল, কাল সন্ধ্যায় এখানে মেঘভাঙা বৃষ্টি (cloud burst) হয়েছে। মানুষ মারা যায়নি ঠিকই, কিন্তু কিছু গোরু, মোষ, বাড়ি, রাস্তা জলের তোড়ে ভেসে গেছে। কর্তব্যরত পুলিশের কাছে ছুটে গেলাম শেষ খবরটা কী? কোনও আশা আছে কিনা, রাস্তার কী অবস্থা?

বাঁচলাম! পুলিশ জানাল, রাস্তা প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। ঘনশালীর এক কিলোমিটার পর রাস্তা মেরামতির কাজ চলছে। গাড়ি নিয়ে চলে এলাম ধসের কাছে। জলের তোড়ে রাস্তা ভেসে গেছে। দুটো যন্ত্রদানবের নিরন্তর প্রচেষ্টায় অপেক্ষার অবসান ঘটল। কিছু সময় পর এগিয়ে চললাম ঘুট্টর উদ্দেশে। এবার আস্তে আস্তে সবুজের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। দুপাশের সবুজ অরণ্যের মধ্যে দিয়ে কালো সর্পিল রাস্তা ধরে ছুটে চলেছি। পথের পাশেই পাথর বুকে নিয়ে ছুটে চলেছে স্রোতস্বিনী ভিলাঙ্গানা নদী। পৌঁছে গেলাম ছবির মতো সুন্দর গ্রাম ঘুট্টু-তে। ভিলাঙ্গানা নদীর ডান তীরে ছোট্ট টিলার উপরে আমাদের দুর্দিনের আশ্রয়স্থল গাড়োয়াল নিগমের বাংলো। এখান থেকে শুরু হবে আমাদের হাঁটার পথ।

সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। দক্ষিণের আকাশে কালো মেঘ। ভিলাঙ্গানার কলধ্বনি ছাপিয়ে গর্জে উঠছে মেঘ। চায়ে চুমুক আর বিদ্যুৎ ঝলকানির মধ্যেই শুভানুধ্যায়ীদের পরপর ফোন। সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে কথা দিলাম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নেব না! পরিবার-বন্ধু সবার জন্য, নিজেদের জন্য পরিষ্কার আবহাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

দুপুর একটা নাগাদ আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। মনের কোণে অজানা আশঙ্কা, গাইড ও কুলি এখনও এসে পৌঁছাল না। সকাল থেকে বারবার ফোনে যোগাযোগ করছি কতদূর এল। বাসের সমস্যার জন্য আসতে দেরি হবে। দুপুরের আহারের ব্যবস্থা নিকটবর্তী ছোট্ট এক হোটেলে। অবশেষে গাইড রঘুবীর সিং সাতজন কুলি, এক জন রাঁধুনি নিয়ে হাজির। একটা চিন্তার অবসান হল। নিগমের একটা হল ঘরে সবার থাকার বন্দোবস্ত করে বেরিয়ে পড়লাম বাজারে সবজি আনতে। বাকি সমস্ত রসদ সংগ্রহ করতে করতেই রাতের খাবারের সময় হয়ে গেল।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...