গতকাল রাতে গৌরবের গান আর ভিলাঙ্গানার কলকল জলোচ্ছ্বাস শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে গেল সেই ভিলাঙ্গানার গর্জনে। গতকালের পরিকল্পনা অনুযায়ী সকাল সাড়ে সাতটায় হাঁটা শুরু করার কথা। আজ দীর্ঘ ১৩ কিমি পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে তাম্বাকুণ্ডে। জয় কেদারনাথ ধ্বনি দিয়ে দ্রুত পায়ে শুরু পথ চলা। সামান্য চড়াই ভেঙে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা মনে পড়ে গেল। কিছুদিন আগে প্রায় তিন হাজার হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। পদতলে প্রায় ছয় ইঞ্চি শুকনো পাতার আস্তরণ। সহজেই অনুমেয়, আগুন লাগলে কী হতে পারে। পাতার কারণে পথের চিহ্ন প্রায় নেই, গাইড রঘুবীরকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলি।

বারংবার গাইড রঘুবীরকে প্রশ্ন, খারসোলি আর কতদূর? অবশেষে সাড়ে এগারোটায় পৌঁছালাম খারসোলিতে। খারসোলি ঝোরা পেরিয়ে অপর পারে যেতে হবে! যথেষ্ট খরস্রোতা।

—রাজেশ ওয়েট কর! বলতে বলতেই পাথরে খরস্রোতা নদীতে টলমল করতে করতে জুতো প্যান্ট ভিজিয়ে প্রায় উলটাতে উলটাতে ওপারে পৌঁছাল। বাকিরা গাইড ও কুলির সাহায্য নিয়ে জুতো খুলে খারসোলি ঝোরা পেরিয়ে এলাম খারসোলি বুগিয়ালে। কীর্তমের বয়ে আনা খাবারে লাঞ্চ সারলাম। আবার হাঁটা শুরু করলাম তাহ্মাকুণ্ডের উদ্দেশে।

ধসে যাওয়া পথ ও চড়াই আমাদের গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। অনেক পথ এখনও বাকি। পাহাড়ের উপর কালো মেঘের চোখ রাঙানি। দ্রুত পা চালিয়ে পৌঁছে গেলাম সুন্দর একটা বুগিয়ালে। গাইড নাম বলতে পারল না, ম্যাপে বলছে ভূমিকা। অসংখ্য ভেড়া ও ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বুগিয়াল ছেড়ে এগিয়ে চললাম, এমন সময় দূর থেকে শিস দিয়ে গাইড দাঁড়াতে বলল। বলল, ‘মাটন চাহিয়ে? এই বুগিয়ালে কম দামে পাওয়া যাবে!”

সবার মুখ দেখে মনে হল, এ সুযোগ হারানো ঠিক হবে না। অগত্যা ২০০০ টাকা দিয়ে প্রায় ১৫ কেজি ওজনের বকরি কেনা হল। সবাই খুব খুশি। এদিকে আকাশ কালো হয়ে আসছে। বলতে বলতেই বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি এসে গেল। মন উৎকণ্ঠায় ভরে গেল। খাড়া, সরু বৃষ্টি ভেজা পথে বাকি পথটুকু হাঁটাও বিপজ্জনক। তাঁবু টাঙানোও মুশকিল। গাইডকে নিকটবর্তী বুগিয়ালে ভেলবাগীতে থামার পরামর্শ দিয়ে এগিয়ে যেতে বলা হল।

বৃষ্টির মধ্যে দিয়েই চলেছি। দুপুর ৩.১৫ মিনিটে পৌঁছালাম ভেলবাগী। টেন্ট রেডি। আকাশ পরিষ্কার। অপূর্ব জায়গা! কোনও আপশোশ হচ্ছে না এগিয়ে যেতে না পারার জন্য। কার্পেট বিছানো সবুজ বুলিয়াল, ২০০ ফিট নীচে প্রবল গতির ভিলাঙ্গানা। অপর পারে পাহাড় থেকে নেমে আসা উচ্ছল ঝরনা। প্রায় ৫০০ ফিট উপর থেকে ধাপে ধাপে লাফিয়ে নামছে।

ভালু, ভালু— গাইডের প্রবল চিৎকারে তাকিয়ে দেখি ঝরনার পাশ দিয়ে বিশাল আকারের একটি ভল্লুক অবলীলায় খাড়া পাহাড়ে চড়ছে। দ্রুত গতিতে ক্যামেরাবন্দি করলাম। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম ভেলবাগীতে আমাদের আটকে রাখার জন্য। ভল্লুক চিড়িয়াখানাতে দেখেছি। প্রকৃতির কোলে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে দেখা সৌভাগ্যের ব্যাপার।

ভল্লুকের রাজ্য ভেলবাগী থেকে সকাল ৮.২০ মিনিটে যাত্রা শুরু করলাম তাম্বাকুণ্ডের উদ্দেশে। ১০২০০ ফিট উচ্চতা থেকে খাড়া পথ বেয়ে ২ ঘণ্টায় ১১০০০ ফিট উচ্চতায় তাম্বাকুণ্ডে এসে পৌঁছালাম। অরণ্যসংকুল ও খাড়া পাথুরে এই পথ গতকাল অতিক্রম করতে হলে শেষ বিকেলে অশেষ কষ্টের সম্মুখীন হতে হতো। তাম্বাকুণ্ডে তাঁবু ফেলার জায়গাও সীমিত। বৃক্ষরাজির সংখ্যা ক্রমশ বিলীয়মান। উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গাছের দৈহিক আকৃতি ক্রমাগত খর্ব হয়ে চলেছে।

সাময়িক বিরতি নিয়ে এগিয়ে চললাম চৌকির উদ্দেশে। কাঁটা ঝোপঝাড় ভেঙে এগিয়ে চলি। নিজের বুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এবার অনেকটা নীচে নেমে ভিলাঙ্গানা অতিক্রম করে অপর পারে যেতে হবে। গাইড দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে নীচে নেমে গেল স্নো ব্রিজের কাছে। কিছু সময় পরে দ্রুত পায়ে রঘুবীর উপরে উঠে এল। কী ব্যাপার? হ্যাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছে বলল, ‘সাব লকড়ি কা ব্রিজ বহে গয়া, আগে সে চলনা পড়েগা।”

পাথরের মধ্যে পিঠে ১৫ কেজি ওজনের বোঝা নিয়ে একবার পিছলে গেলেই সর্বনাশ! সাবধানে ছোটো ছোটো গাছগুলোকে আশ্রয় করে নড়বড়ে পায়ে সবাই নীচে নেমে এলাম। গাইড ও কুলিরা রোপ ফিক্স করে বসে আছে। রুদ্রমূর্তির ভিলাঙ্গানার উপর সরু গাছের গুঁড়ি ফেলা আছে। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে সাক্ষাৎ মৃত্যুর পরোয়ানা তীব্র গতির ভিলাঙ্গানা। কোমরে দড়ি বেঁধে একে একে সবাই পেরিয়ে এলাম। এসে গিয়েছি ফুলের রাজ্যে। ছোটো ছোটো গাছে জুনিপার, রোডোডেনড্রন ফুল ফুটে রয়েছে। শরীরটাকে কোনওক্রমে বয়ে নিয়ে চললাম আরও একটু। এসে পড়লাম দ্বিতীয় নদী দুধগঙ্গার কাছে। জলের পরিমাণ ও তোড় দেখে গাইড বলল, এখন নদী পেরোনো সম্ভব নয়। দুর্বার গতিতে প্রবহমান দুধগঙ্গা। এপারেই কোনও স্থানে ক্যাম্প করতে হবে। আরও এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় চৌকির উলটোদিকে পাতা হল তাঁবু। ভয়ংকর সুন্দর জায়গাটি। চারিদিকে সুবিশাল তীক্ষ্ণ ঢালযুক্ত পর্বতগুলির মাঝে ছোটো একটু জায়গা। মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বুকে নিয়ে অবস্থান করছে এই চৌকি।

( ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...