—এসব কী কথা বলতে লেগেছে বাবা!

বড়ো মেয়ের চোখ তো বইয়ের পাতা থেকে ঠিকরে পড়েছে বাবার মুখের উপরে। জাঁদরেল আমলা বাবার মুখে কেমন যেন ফিচেল ভাষা! সবচেয়ে অবাক হলেন মিসেস সিংহরায়। তিনি যেখানে ছেলেটিকে প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছেন, সেখানে তাঁর কত্তা যে মেয়ের দুর্নাম করতে লেগেছে। মেয়ের সুন্দর মুখে কলঙ্কের দাগ ছড়িয়ে দিচ্ছেন যেন! এর পর আর কি তাঁর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশে যাবার মন করবে! দিল, দিল তো পাকা গুটি কাঁচিয়ে!

মিসেস সিংহরায় কাঁপা কাঁপা স্বরে বলতে পারলেন শুধু, ‘কী আবোল-তাবোল বকছ!”

উপেন্দ্র সিংহরায়, হাত তুলে স্ত্রীকে থামালেন। তিনি যেন তাঁর সেরা সময়ের আমলা। ক্যাবিনেট মিনিস্টারদের সঙ্গে মিটিং-এ বসেছেন। সেখানে যেমন দখলদারি থাকত, এখানেও তেমন। তিনি জানতেন এসব মন্ত্রীরা কাজের দুনিয়ায় ক’অক্ষর গোমাংস। রাজনীতি করে বলে মাথার উপরে বসেছে। কিন্তু বিভাগীয় কাজকর্ম, আইনকানুনে চুঁ চুঁ। তিনি যা বলবেন, তাতেই স্বাক্ষর করতে হবে মন্ত্রীকে।

উপেন্দ্র সিংহরায় স্ত্রীকে হাতের ইশারায় থামিয়ে মাস্টারের দিকে চেয়ে বললেন, ‘মাস্টারমশাই, অংকটা হল যে, আমার বড়ো মেয়ে ধরুন প্রেম করেছে। আমাদের অর্থ, প্রতিপত্তির তুলনায় সে ছেলে কিছু কমা বলে তাকে সামনে আনছে না মেয়ে, হতে পারে। কিন্তু আর দুটো মেয়ের কী কেস! তাদেরও তো বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায় যায়!”

৩২ দেখল এসময় কথা না বললে, সে সাবজেক্ট হতে চলেছে। মাস্টারমশাই এবার তাকে নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করতে পারে। মাস্টারমশাইয়ের মুখে আজ যা বাচাল সরস্বতী ভর করেছে, বলে বসতে পারে মাস্টারমশাইয়ের প্রতি তার যে দুর্বলতা আছে, তা।

৩২ বলল, ‘বাবা, তোমরা তখন থেকে দিদির পিছনে লেগেছ। আমি কলেজে পড়াই, আর ছেলে-মেয়েদের স্বাধীন ভাবনা উসকে তোলার পাঠ দিই। স্বাধীন ভাবে না ভাবতে পারলে বিজ্ঞানের জয়রথ যে থেমে যায়, বলি। কিন্তু আমার বাড়িতেই দেখছি পরাধীন করে দেওয়ার জন্য কী সাংঘাতিক ষড়যন্ত্র বয়ন করে চলেছে বাবা-মা। সঙ্গে আবার আমাদের স্যার। খুব হতাশ হয়েছি আমি।’

বড়ো মেয়ে ভ্রূ কোঁচকায় মেজোর দিকে। মেজোর মাস্টারি এবার শুরু হল বলে। রোজ এই গার্জিয়ানসুলভ মেজোমি তাকে সহ্য করতে হয়। সে তো নিজেদের ভিতর হয়। আজ আবার বাইরের লোকের সামনে যে মেজো জ্ঞান দেওয়া শুরু করেছে!

৩২ দিদির ওইসব বাঁকা ভ্রূর খেলাকে আমল না দিয়ে বলল, ‘আজকাল কোথায় দেখেছ তোমাদের মতো ব্যাকডেটেড গার্জিয়ান! ছেলে-মেয়েরা বিদেশে হরবখত স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাচ্ছে। বাবা-মা কি সঙ্গে যাচ্ছে! দিদির ক্ষেত্রে আলাদা যেটা, দিদি চাকরি করতে যাচ্ছে। তা দিদির কোম্পানি তো তাকে বিদেশে সমুদ্রের জলে ফেলে দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে না। তাদের উপর ভরসা না করে পাড়ার স্যারকে সঙ্গে জুড়ে দিতে চাইছ! দিদি এখন যথেষ্ট বড়ো। দিদি নিজেকে ঠিক ম্যানেজ করে নিতে পারবে।’

৩৪, মানে বড়ো মেয়ের অপছন্দ নয় তাদের মাস্টারমশাইকে। আর সত্যি বিদেশে পাশে একজন পুরুষ থাকলে বেশ স্বচ্ছন্দ লাগবে। এই দুই বছর পাড়ার রোনাল্ডো যদি সঙ্গে থাকে তবে বিদেশ আর বিদেশ মনে হবে না। ঘরের চেনা পরিবেশই মনে হবে। অফিসের পরে হাত-পা মেলে অচেনা জায়গাটা চেনা যাবে। আর সেই স্কুল বয়স থেকেই ৩৪ এই অংকের স্যারের প্রতি একটু দুর্বল। পাড়ার মোড় থেকে দিনে দিনে গাড়ি নিয়ে ফেরার সময় ঠিক চায়ের দোকানের দিকে চোখ চলে যায়। সেখানে যে এই স্যার অরিত্র মৌলিক আড্ডা মারে।

অরিত্র মৌলিক সময় নষ্ট করতে চায় না। অযাচিত ভাবে তার সামনে সুযোগ এসে গেছে। এই মেয়েদের রূপের আর কর্মের অহংকারে পাড়ায় পা পড়ে না। আজ একটু বেলুন চুপসে দিতে হবে। সে বলল, “মেসোমশাই, আপনার পয়েন্ট কিন্তু একেবারে চোস্ত আমলার মতোই। মানে রিটায়ার করলেও আপনার ব্রেন কিন্তু সাধারণ মানুষের মতো বুড়িয়ে যায়নি। মানে ভাবনা-চিন্তা বিসর্জন দিয়ে ঝুপ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েনি। একদম তুখোড় রয়েছে। মানে দুদে আইনজীবীর মতোই আপনি সওয়াল ফেলেছেন। এর থেকে নিস্তার নেই। আছে নাকি আপনার মেয়েদের কাছে এর উত্তর! আমার মনে হয় তো নেই।’

—কী তখন থেকে মানে মানে করছেন!

একটু যেন দাবড়ানো স্বর। এই স্বর উপেন্দ্র আমলার স্বাভাবিক স্বর। কিন্তু অরিত্র মৌলিক ভয় পেল। কৌতূহল আর প্রতিশোধ স্পৃহায় একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না তো! সিংহের গলার ভিতর ঠোঁট ঢুকিয়ে কাঁটা তোলার দুঃসাহস যেন এই মুহূর্তে একটু ধাক্কা খায়। অরিত্র মৌলিক তো তো করে।

উপেন্দ্র সিংহরায় বললেন, ‘আমার মেয়েরা উত্তর দেবে কেন! আপনি আমার মেয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন। আপনি এক সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়েকে তার বাবা-মায়ের সামনে ছোটো করতে চাইছেন। তার বাবা-মায়ের মনের ভিতর সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছেন, আপনাকেই জাস্টিফাই করতে হবে আপনার কথাকে।’

মোক্ষম প্যাঁচ। কথার প্যাঁচে কত ঘোড়েল মন্ত্রীকে তিনি পথে এনেছেন। নিজের আস্থার উপর থেকে কখনও হাত তুলে নেননি বলে দাপটের সঙ্গে চাকরি করে গিয়েছেন। এখনকার আমলাদের অবস্থা দেখে তো তিনি ভয় পান। কখনও রাগে গা জ্বলে ওঠে। প্রকাশ্যে, সাধারণ মানুষের সামনে আমলাদের কুকুর-ছাগলের মতো ট্রিট করেন মন্ত্রীমশাইরা।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...