চা, চা, উঠিয়ে— কীর্তমের ডাক শুনে ঘুম ভেঙে গেল। টর্চের আলোয় ঘড়ি দেখলাম, ঠিক ৪.৩০ মিনিট। ঠান্ডায় স্লিপিং ব্যাগের ভিতর থেকে শরীর বেরোতে চাইছে না। মনের ক্লান্তি দূর করে উঠে বসলাম। সারা রাত্রি চাপা টেনশন আর উচ্চতাজনিত কারণে ভালো ঘুম হয়নি। আকাশ একদম পরিষ্কার। চটপট প্রস্তুত হয়ে স্বরূপ আর আমি রঘুবীরের সঙ্গে মাশারতালে পুজো দিতে চললাম। মাত্র ১৫ মিনিটের পথ, অক্সিজেনের অভাবে হাঁপিয়ে উঠছি। বরফ ও বোল্ডার পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছে গেলাম অনিন্দ্যসুন্দর লেক মাশারতালে। চারিদিকে উঁচু পাহাড়ের মাঝে অর্ধেক জমে থাকা চক্ষু আকৃতির লেকটি নজর কেড়ে নেয়।
রঘুবীর ভক্তিভরে পুজো করে চলেছে আর আমরা ছবি তোলাতে ব্যস্ত। রঘুবীরের মৃদু ধমকে প্রার্থনায় বসলাম। পুজো সাঙ্গ করে ফিরে এলাম। প্রাতরাশ সেরে শুরু হল যাত্রা। মাশারতাল থেকে ১০০০ ফিট উচ্চতা জয় করে পৌঁছাতে হবে মাশার টপে। রঘুবীরের কেটে দেওয়া বরফের স্টেপে সাবধানে পা ফেলে উঠে চলেছি। বারংবার পিছলে যাচ্ছে পা, দু ঘণ্টার কষ্টসাধ্য চেষ্টায় পৌঁছে গেলাম মাশার টপে। উচ্চতা ১৬০০০ ফিটের বেশি। চারিদিকে অগুনতি তুষারাবৃত শৃঙ্গরাজি। মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে চললাম মায়ালি গিরিবর্তের দিকে।

গতকাল, রাওয়াতকে সঙ্গে নিয়ে প্রবল তুষারপাত উপেক্ষা করে রাস্তা পর্যবেক্ষণ করতে বেরিয়েছিল রঘুবীর। ফিরতে পারেনি, আর্টকে ছিল বহু সময়। পাথরের আড়ালে থেকে তুষারঝড়ের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে। যত দূর চোখ যায় শুধুই বরফের হাতছানি। চলতে চলতে রঘুবীর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল গভীর খাদের কিনারে। আমি পা চালিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কই তকলিফ?’ রঘুবীর বলল— শেষবার যে রাস্তায় গিয়েছিল, সেই রাস্তা অসংখ্য ফাটল অর্থাৎ ক্রেভাসপূর্ণ। অতএব বিকল্প পথের অনুসন্ধান। ডানদিকের খাড়া ধসযুক্ত পাথুরে ঢাল ধরে এগিয়ে চলার নির্দেশ দিল। নড়বড়ে পাথরের মধ্যে দিয়ে টলমল করতে করতে এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় পৌঁছে গেলাম মায়ালির পাদদেশের বরফ প্রান্তরে। কচ্ছপের পিঠের অংশ পেরিয়ে শুরু হবে মায়ালি গিরিপথের খাড়া চড়াই।
একে একে সবাই পায়ে পরে নিলাম গেইটার। রঘুবীর, কীর্তন, রাওয়াত দ্রুততার সঙ্গে সবাইকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিল। ১৫০ ফিটের দড়িতে প্রথমে রঘুবীর এবং শেষ কীর্তম। মাঝে আমরা। প্রাথমিক পরামর্শ দিয়ে শুরু হল দড়ি বাঁধা অবস্থায় হাঁটা। ২০-২৫ পা হাঁটছি আবার দাঁড়িয়ে পড়ছি।

হঠাৎ করে চারিদিক সাদা মেঘে ঢেকে গেল। একেই নাকি বলে হোয়াইট আউট। ১৫ ফিট দূরের মানুষকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপে পা মেলাচ্ছি। দড়ি ধরে টান মেরে জানাচ্ছি থামার সংকেত। আগে তবুও অনুমান করতে পারছিলাম কতদূর এসেছি! পায়ের নীচে মৃত্যু ফাঁদ, ক্রিভাস। প্রকৃতি বিরূপ, ভয়ংকর তুষারপাতের আশঙ্কা। প্রাণপণে হেঁটেই চলেছি। বাতাসে অক্সিজেনের অভাব, জল খেতেও পারছি না। হৃৎপিণ্ড ফেটে যেতে চাইছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। রঘুবীর বলে চলেছে, থোড়াসা বাকি, চলিয়ে চলিয়ে, রুকিয়েগা মৎ। মনের সমস্ত বল, জেদ এক করে অবশেষে পৌঁছে গেলাম আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘মায়ালি গিরিবর্তে”।
সবাই আনন্দে আত্মহারা, আন্দদাশ্রু চোখ দিয়ে বয়ে চলেছে। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে শুরু হল শুভেচ্ছা বিনিময়। আকাশ পরিষ্কার। রঘুবীর শুরু করল পুজো। পুজোর প্রসাদ ও চকোলেট খেয়ে উদযাপন করলাম আমাদের সাফল্য। স্মৃতি হিসাবে ক্যামেরাবন্দি হল অসংখ্য ছবি।
বাসুকিতাল। গতকাল মায়ালি পাস অতিক্রম করার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি, গাইড রাঘুবীরের তাড়ায়। প্রথম ঘণ্টায় পিচ্ছিল বরফে আছাড় খেতে খেতে পৌঁছে গিয়েছিলাম পুঁইয়াতালে। ছোটো একটা সরোবর। বরফের রাজ্য শেষে শুরু হয়েছিল বোল্ডারের রাজত্ব, সঙ্গে হাঁটু ভাঙা উতরাই। দীর্ঘ এবড়ো খেবড়ো পথ আর পরিশ্রান্ত শরীর টানতে টানতে ৩.২০-তে অর্থাৎ সাড়ে ৭ ঘণ্টার যাত্রা শেষ হয়েছিল বাসুকিতালের ৩০০ মিটার আগে।
আজ আমাদের ট্রেকিং-এর শেষ দিন, যদিও কেদারনাথ থেকে গৌরীকুণ্ড ১৬ কিমি হেঁটেই ফিরতে হবে। প্রচলিত বাঁধানো পথ বলে আমাদের কাছে গুরুত্ব কম। সকাল থেকেই নানা ভাবনা মনের মধ্যে ভিড় করছে। অনেক দিন হয়ে গেল বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। কেদারনাথে মোবাইল নেটওয়ার্ক আছে।
কেমন দেখতে হয়েছে বর্তমান কেদারনাথ? আজকের আবহাওয়ার পূর্বাভাসও ভালো নয়। গতকাল রাতের তুষারপাতের কারণে তাঁবু এখনও ভিজে, অপেক্ষা সূর্যের আলোর। মেঘলা আকাশে সূর্যের খোঁজ না করে ভেজা তাঁবু গুটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ১৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম বাসুকিতালে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জল। বেশ বড়ো লেকটি। শিবের ত্রিশূল আর নুড়ি-পাথরে সিঁদুরের ছোপ দেখে বুঝলাম, এখানেও মহাদেবের আরাধনা হয়। মালবাহকদের কাছে জানতে পারলাম, কিছু উৎসাহী পুণ্যার্থী কেদারনাথ থেকে এখানে আসে পুজো দিতে। অবশ্য এই সময় নয়। সরোবর প্রান্ত থেকে একটি পথ সোজা উঠে গেছে বাসুকি টপের দিকে। কিছুক্ষণ পরেই বাঁধানো পথ হারিয়ে গেল বরফ তলে। সঙ্গে সংযোজিত হল ঝিরিঝিরি তুষারপাত। এ পথের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যপট রয়েছে এই বাসুকিটপে। এই অঞ্চলের সমস্ত শৃঙ্গরাজি পটে আঁকা ছবির মতোই দৃশ্যমান হয়। মেঘলা আকাশে কিছুই দৃষ্টিগোচর হবে না।
(ক্রমশ…)





