আজকের দ্রুতগতির মুঠোফোন-নির্ভর পৃথিবীতে, মনোযোগ সহকারে সবকিছু শোনার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমছে। কিন্তু, বুদ্ধিমত্তা, সুস্থ সম্পর্ক, শিক্ষাগত সাফল্য এবং কার্যকর যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শোনার বিষয়টি। একজন ভালো বক্তা প্রথমে একজন ভালো শ্রোতা হওয়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। যে শিশুরা ভালো ভাবে শুনতে শেখে, তাদের ধৈর্য বেড়ে যায়। সেইসঙ্গে, প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং দক্ষতা বেড়ে যায়, যা তাদের সারাজীবন কাজে লাগে।
মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, কৌতূহল এবং অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য ভালো শ্রোতা হওয়া চাই ছোটো থেকেই। এই গুণাবলী স্বয়ংক্রিয় ভাবে বিকশিত হয় না। এগুলি পারিবারিক শিক্ষা, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এবং অভ্যাসের মাধ্যমে শিখতে হয়। ছোটো থেকেই এই ক্ষমতা লালন করার ক্ষেত্রে বাবা-মা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ভালো শ্রোতা হওয়া আবশ্যক। কারণ, এটি বুদ্ধির বিকাশে সহায়তা করে। যারা ভালো ভাবে শোনে, তারা শিক্ষা-ক্ষেত্রে আরও ভালো ফললাভও করে। কারণ, তারা নির্দেশাবলী অনুসরণ করতে পারে, তথ্য নিখুঁত ভাবে সংগ্রহ করতে পারে এবং প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সামাজিক ভাবেও তারা গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারে। কারণ অন্যরা তাদের উপস্থিতিকে মূল্যবান মনে করে। ভালো ভাবে শোনার বিষয়টি অন্যদের অনুভূতি বোঝার মাধ্যমে নিজস্ব অনুভূতি উপলব্ধি করতে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে শিশুদের। এটি ধৈর্যও তৈরি করে। আবেগপ্রবণ ভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে, অপেক্ষা করার এবং সঠিক ভাবে কথা বলতে সাহায্য করে।
শিশুরা যখন শুনতে শেখে, তখন তারা আরও ভালো বক্তা হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে কীভাবে কথোপকথন চালিয়ে যেতে হয়, কীভাবে ধারণা বিনিময় হয় এবং কীভাবে সম্মানজনক যোগাযোগ কাজ করে। তাই, ভালো ভাবে শোনার বিষয়টি অর্থপূর্ণ যোগাযোগের ভিত প্রতিষ্ঠা করে।
ভালো শ্রোতা হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ
শিশুরা তখনই ভালো ভাবে শোনে, যখন তাদের কথাও মনোযোগ দিয়ে বড়োরা শোনেন। অতএব, সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলির মধ্যে একটি হল উভয়ের কথা ভালো ভাবে শোনা। যখন বাবা-মায়েরা তাদের বাচ্চাদের কথা সঠিক অর্থে শোনেন, বাধা না দিয়ে, সংশোধন না করে বা তাড়াহুড়ো না করে শোনেন, তখন তারা একটি অমূল্য শিক্ষা দেন— তুমি যা বলছ, তা গুরুত্বপূর্ণ। শোনার এই অনুভূতি শিশুদের ভালো শ্রোতা তৈরি করতে সাহায্য করে।
যখন আপনার সন্তান তাদের বন্ধুদের কথা বলে, উদ্বেগ বা তাদের উত্তেজনা সম্পর্কে কথা বলে, তখন পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করুন। আপনার মুঠোফোনটি তখন দূরে রাখুন এবং চোখের যোগাযোগ বজায় রেখে সন্তানের কথায় ভালো ভাবে সাড়া দিন। এটি কেবল পিতামাতা-সন্তানের বন্ধনকে শক্তিশালী করে না, বরং ভালো শ্রোতা হওয়ার আনন্দও দেয়।
ভালো আবহ তৈরি করুন
একটি বিশৃঙ্খল বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ কথা শুনতে অসুবিধার সৃষ্টি করে, বিশেষকরে শিশুদের জন্য। যখন পারিবারিক কথোপকথন শান্ত পরিবেশে হয়, রাতের খাবারের টেবিলে, শোওয়ার সময় অথবা একসঙ্গে হাঁটার সময়, তখন শিশুরা ভালো শ্রোতা হয়ে ওঠে।
ঘরের মধ্যে চিৎকার করা কিংবা একে অপরের কথার পিঠে কথা বলা এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে, সন্তানের কথা শোনা শেষ হলে আপনি কথা বলুন। এই আবহ আপনার সন্তানকে ভালো শ্রোতা তৈরি করে তুলবেই।
ধৈর্য বাড়িয়ে তুলুন
শোনার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন হয় এবং শিশুরা যখন অপেক্ষা করার অভ্যাস করে, তখন ধৈর্য বৃদ্ধি পায়। বাচ্চাদের বাধা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের কথা বলা শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। শিশুরা যদি আপনার কথা বলার সময় বাধা দেয়, তাহলে তখন তাদেরও মিষ্টি হেসে মনে করিয়ে দিন, ‘আমাকে শেষ করতে দাও, তারপর তুমি ভালো ভাবে বলবে।’
ধৈর্য নিয়ে ভালো ভাবে শোনার জন্য বোর্ড গেম, গল্প বলা এবং অনেকে মিলে আলোচনা চমৎকার হাতিয়ার। যখন শিশুরা নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করে, নিয়ম মেনে চলে এবং অন্যদের কথা ভালো ভাবে শোনে, তখন তারা শান্ত ভাবে তাদের শ্রবণ পেশিগুলিকে শক্তিশালী করে।
স্ক্রিন টাইম কমান
আজকের শিশুরা মোবাইল ফোনের স্ক্রিন দ্বারা বেষ্টিত থাকে, এর ফলে গভীর ভাবে শোনার বিষয়টি নষ্ট হয়। ভিডিও, গেম এবং শর্ট-কনটেন্ট-এর ভিডিও প্রভৃতির সংস্পর্শে থাকার ফলে মনোযোগের সময় কমে যেতে পারে এবং মানুষের কণ্ঠস্বরের উপর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
যখন পরিবারের সদস্যরা কথা বলেন, পড়েন অথবা একসঙ্গে বসে আলোচনা করেন, তখন ‘স্ক্রিন-মুক্ত’ থাকুন নিজে এবং সন্তানকেও ওই সময়টুকু স্ক্রিন থেকে দূরে থাকতে শেখান৷ এই মুহূর্তগুলিতে শিশুরা স্বাভাবিক ভাবেই শোনার এবং বাস্তব কথোপকথনের অনুশীলন করে, যা ডিজিটাল শব্দের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ।
আরও উৎসাহিত করুন
বাচ্চারা যখন অন্যদের সম্পর্কে কৌতূহলী হয়, তখন তারা আরও ভালো ভাবে শোনে। তাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে এবং লোকেরা কী বলছে তাতে আগ্রহ দেখাতে উৎসাহিত করুন। যদি কোনও ভাইবোন কিংবা বন্ধু কথা বলে, তখন আপনার সন্তানকে মনোযোগের সঙ্গে কথা শুনতে শেখান এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে নির্দেশ দিন।
প্রশংসা করুন
যখন আপনি লক্ষ্য করেন যে, আপনার সন্তান ধৈর্য ধরে শুনছে কিংবা আপনার নির্দেশ ভালো ভাবে অনুসরণ করছে, তখন তা স্বীকার করুন এবং প্রশংসা করুন৷ বলুন— তুমি এখন যেভাবে শুনছ মনোযোগ দিয়ে, এটা দারুণ! এভাবেই কথা শোনার সময় মনোযোগ বজায় রাখবে আপনার সন্তান।
বিরতি নিতে শেখান
ভালো ভাবে শোনা কেবল অন্যদের কথা শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মধ্যে নিজের চিন্তাভাবনা এবং আবেগও অন্তর্ভুক্ত। কথা বলার কিংবা প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে শিশুদের বিরতি নিতে উৎসাহিত করুন। মাইন্ডফুলনেস ব্যায়াম, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, অথবা নীরব থাকার সময় শিশুদের অভ্যন্তরীণ জগৎ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে এমন ভাবে সাহায্য করে, যা তাদের সামগ্রিক মনোযোগ এবং মানসিক ভারসাম্য উন্নত করে।
তিরস্কার নয়
লেখাপড়া কিংবা সাইকেল চালানোর মতোই, মনোযোগ সহকারে শোনার বিষয়টিও ধীরে ধীরে উন্নত হয়। তাই, কথা না শুনলে, তিরস্কার করার পরিবর্তে, তাদের বন্ধুর মতো বুঝিয়ে বলুন সমস্যার বিষয়টি। কারণ, অভিভাবকদের বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে, বদভ্যাস দূর হবে ওদের। অতএব, আগে বন্ধুর মতো সুশিক্ষক হয়ে উঠুন আপনার সন্তানের এবং তারপর তাকে ভালো শ্রোতা তৈরি করুন।





