প্রশাসন ও পুলিশমহল এবার একটু নড়েচড়ে বসল। সামান্য হলেও মদন ও তার বন্ধুরা বিপাকে পড়েছে। মনে হচ্ছে এবার স্থানীয় প্রশাসন ও থানা একটা কঠিন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। হয়তো নিরুপায় হয়ে মদন ও তার চ্যালা চামুণ্ডাদের গ্রেপ্তার করবে। সে কথা মদনরাও টের পেয়ে গেল। ধরা পড়লে ওদের অপরাধ প্রমাণ হতে সময় লাগবে না। কারণ প্রমাণ করার জন্য যে সমস্ত ডাক্তারি রিপোর্টের সহায়তা প্রয়োজন, সেসব রুমকি ইতিমধ্যেই করিয়ে রেখেছে। তাই একবার ওরা গ্রেফতার হলে, ওদের কপালে দুঃখ আছে, সেটা ওরা ভালো করেই বুঝে গিয়েছিল। ফাঁসির দড়ি না হলেও, দীর্ঘদিন জেলের ঘানি টানা যে কপালে অবধারিত, তা সহজেই অনুমেয়।

আসলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নেতার কথায় ওঠাবসা করলেও, তারা তো আসল ব্যাপারটা খুব ভালোই বোঝে। যতই হোক একটা চাপা রাগ তো আছে তাদের রাজনৈতিক নেতাদের উপর। রাগের প্রধান কারণ একটাই, শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রমাণ করে চাকরি পাওয়ার পর বাধ্য হয় তারা মূর্খ নেতাদের তোষামোদ করে চলতে। ফলে তারাও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কোনও ভাবে একবার বাগে আনার ফাঁদ হাতে পেয়ে গেলে, তার অপব্যবহার করতে তারা ছাড়ে না। এক্ষেত্রেও তাই হল।

তবে মদনরাও বিপদে পড়ার আগে শেষবারের মতো একটা মরণ কামড় দিতে চাইল। তাদের তোলা রুমকির শরীরের সেই নোংরা ভিডিওটা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করে দেওয়া হল। হাতে হাতে ঘুরতে লাগল সেই হাতে গরম নীল ছবি। মানুষের তো আসলে মুখে প্রতিবাদ, চোখে খিদে। সবচেয়ে বেশি চর্চা হতে লাগল পাড়ায়। কারণ চেনা মানুষের অশ্লীলতা দেখার একটা আদিম নেশা চিরকালই মনের কোণে প্রচ্ছন্ন থাকে। পরিচিত মহলে সবাই কঠোর সমালোচনা করলেও, লুকিয়ে কিন্তু সকলেই একবার সেই আদিরসাত্মক আনন্দ উপভোগ করে নিতে লাগল। সেটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আইন ওদের শাস্তি দিতে চাইলেও, রুমকির এই চারিত্রিক কলঙ্ক ঢাকার লজ্জাবস্ত্র আইনের হাতে নেই।

মাঝেমধ্যে ভাবি, এর একটা প্রতিবাদ করব। চরম প্রতিবাদ। আমার ভয় কীসের! সর্বোচ্চ বিপদ কী হতে পারে! মৃত্যু! কিন্তু তাতে আমার ক্ষতি কী! আমার তো সাতকুলে কেউ নেই। ভয় কীসের! তবুও একটা ব্যাপার ইদানীং দেখে, আমি আর কোনও উৎসাহ পাচ্ছি না প্রতিবাদ করার। আমাকে অবাক করছে মানুষের চরিত্র। এই মানবচরিত্র বড়ই বিচিত্র! কথাটা বলতে বাধ্য হচ্ছি বিজনকে দেখে। বিজনকে মনে আছে তো! সেই বিজন। যে ওই বেধড়ক মার খেয়েছিল মদনের বন্ধুদের হাতে। সে এখন ওই একই রাজনৈতিক দলের খাতাতেই নাম লিখিয়েছে। ক’দিন হল দেখছি ওদের সব মিটিং-মিছিলেই যায়। সেসব দেখে নিজের মনের ভিতরের আগুনটাই নিভে গেল।

কীসের তাগিদে বিজন এরকম বশ্যতা স্বীকার করল। কোনও কিছুর অর্থলোভে নাকি শুধুই প্রাণভয়ে? তাই আমি আর সেই ভয়ে বেশি এগোলাম না। নয়তো দেখা গেল, আমি প্রতিবাদ করে মরলাম, আর ওদিকে হয়তো রুমকি নিজেই মদনকে বিয়ে করে নিল। মাঝখান থেকে প্রতিবাদ করাটাই হাস্যাস্পদ হয়ে উঠবে। আমি একটু হতাশ হয়েই পড়লাম বিষয়টা নিয়ে। কিন্তু আমাকে হঠাৎ নাড়িয়ে দিয়ে গেল একটা অপ্রত্যাশিত সংবাদ। শুনি, রুমকি হঠাৎ একদিন আত্মহত্যা করেছে। লড়াইটা একা বেশ ভালো ভাবেই লড়ছিল। কিন্তু মাসখানেক ধরে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ওই ভিডিওটা ওকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছিল। লজ্জায় পাড়ায় মুখ দেখানো ক্রমশ দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। সমাজ বাধ্য করল ওকে এই পথ বেছে নিতে। এ লজ্জা আমাদের সকলের।

সময় তো মানুষকে সব কিছুই ভুলিয়ে দেয়। আমিও ভুলে যেতে লাগলাম সব। বছরটা কোন ফাঁকে যে গড়িয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। হঠাৎ দেখি আমার বাড়িতে এক ছোটো নেতা একদিন সকালে এসে হাজির। হাতে একটা নিমন্ত্রণপত্র। কলিং বেল বাজাতেই আমি দরজা খুলে প্রথমেই প্রশ্ন করলাম, ‘কী ব্যাপার?”

—আজ্ঞে, সাধনদা পাঠাল। আগামী বুধবার আমাদের রবীন্দ্র নজরুল সন্ধ্যা। আপনাকে এই বছর প্রধান অতিথি হিসেবে দয়া করে উপস্থিত থাকতে হবে। দাদা বিশেষ করে বলে পাঠিয়েছেন।

বুঝলাম ‘দাদা’ মানে বিধায়ক সাধন দত্ত। আমি আর কথা বাড়ালাম না। আলতো করে ঘাড় নেড়ে ছোট্ট করেই উত্তর দিলাম, “আচ্ছা যাব।’

তার আমন্ত্রণ মানে তো আদেশ, মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই যেতে বাধ্য। গেলাম-ও তাই। গিয়ে দেখি, যা আশা করেছিলাম তার অন্যথা কিছু নয়। মোটামুটি গত বছরের অ্যাকশন রিপ্লেই শুরু হল। সেই অসহ্য সংস্কৃতির বিশদ বর্ণনা এখানে আবার করতে আমার রুচিতে বাধছে। তবে একটা ব্যাপার আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল। সেটা হল গতবারের ওই ঘটনার পর, আবার-ও স্টেজে বিজনকে দেখে। গতবছর ওইরকম অসহ্য শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের পরেও শুধু সামান্য ক’টা পয়সার জন্য মানুষ এত নীচে নামতে পারে! বিজন কী করে পারল আবার ওদের দলে মিশে যেতে। কয়েকটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক মিটিং অথবা রক্তদান, দুর্গাপুজো, এই সবের শব্দ, আলোর কাজ পাবে বলে! মানুষের কি মনুষ্যত্ব বলে আর বিন্দুমাত্র কিছু অবশিষ্ট নেই? সত্যি কথা বলতে কী, আমার এখন মদনদের থেকেও বিজনের উপর যেন বেশি রাগ হচ্ছে। মদন তো চেনা শত্রু, বিজন তো দেখছি অচেনা গিরগিটি! আরও ভয়ংকর!

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...