চারিদিকে প্রচুর মানুষের জমায়েত। কেউ কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে না। সব মেরুদণ্ডহীন। নির্বাক দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে। আমি আর থাকতে পারলাম না। বাধ্য হয়ে এগিয়ে গেলাম। হয়তো যেতে পারলাম, আমার আগে পিছে কেউ নেই বলে। বাধ্য হয়ে আমি ওদের বাধা দিয়ে বলে উঠলাম, ‘একটা চরম দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেছে, তাই বলে মানুষটাকে জনসমক্ষে পাড়ার মোড়ে রাস্তায় তোমরা পিটিয়ে মেরে ফেলবে?”

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন সমাজবিরোধী, হ্যাঁ ওদের জন্য এর থেকে ভালো শব্দবন্ধ আমি আর খুঁজে পেলাম না। আমাকে বলে উঠল, ‘কাকু… ভালো চান তো আপনি এখান থেকে কেটে পড়ুন। মদনদার অবস্থা হেব্বি সিরিয়াস, হয়তো বাঁচবে না। আমরা রক্তের বদলে রক্ত বুঝি, প্রাণের বদলে প্রাণ।’

লেখালেখির সুবাদে কিছু প্রখ্যাত সংবাদ মাধ্যমে আমার সামান্য হলেও একটু খাতির আছে। দু’একজন ঘনিষ্ঠ জানাশোনাও আছে। বাধ্য হয়ে ফোন করলাম। ওরা বোঝেনি। ভাবছে থানায় ফোন করছি। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে লাগল। কারণ ওরা ভালো করেই জানে, থানা ওদের পকেটে। আমি ওদের সঙ্গে কোনও লাভ হবে না জেনেও, ইচ্ছাকৃত তর্ক জুড়ে দিলাম। ওরা অনবরত আমাকে শাসাতে লাগল। আসলে আমার প্রধান গোপন উদ্দেশ্য, সেই তর্কের ফাঁকে যাতে বিজনকে পেটানোটা একটু কমে। কারণ সংবাদমাধ্যম আসার আগে যদি বিজন মরেই যায়, তাহলে আর লাভ কী?

তবে, সেদিন আমার এবং বিজনের দু’জনের কপালই ভালো বলতে হবে, মিডিয়া খুব তাড়াতাড়ি চলে এল। আমি তো ফোন করেছিলাম একজনকে। এখন দেখি চার-চারটি সংবাদমাধ্যম এসে হাজির ওখানে। অবস্থা বেগতিক দেখে ওরা কেটে পড়ল। তবে যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে গেল। তাতে লাভ নেই কোনও। বাঁদরের ভ্যাংচানিতে আমি কোনওদিনই ভয় পাওয়ার মানুষ নই। আমরা কয়েকজন মিলে একটা ট্যাক্সি ডেকে বিজনকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম।

সুস্থ হতে বিজনের প্রায় মাসখানেক লেগে গেল। সেটা সুসংবাদ। আর একটা দুঃসংবাদ হল, মদন এই যাত্রায় বেঁচে গেল। সে-ও হয়তো কারও সন্তান। তবুও আমি সর্বসমক্ষে বলতে না পারলেও, আপনাদের গোপনে বলছি, আমি মনে মনে চাইছিলাম, ও ব্যাটা মরে গেলেই ভালো হতো। আসলে তো এরা একটা সমাজের কীট।

তবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে এবার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে শুরু করল মদন। আগে শুধু সন্ধে হলে নেশাভাঙ করত বা মেয়েদের বিরক্ত করত। এখন সেটা গিয়ে পৌঁছাল চরমে। কথাটা আমার কানে এসেছে বটে, তবে আমি চোখে কোনওদিন দেখিনি। নিজের কাজ নিয়ে একটু আড়ালে থাকতেই পছন্দ করি। শুনেছি, এখন নাকি ব্যাপারটা সরাসরি শারীরিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ক্লাবঘরে প্রায়ই মেয়ে নিয়ে আসা হয় রাতের দিকে, কখনও তা অর্থের বিনিময়ে আবার কখনও বলপূর্বক। যদিও পরবর্তীকালে সেইসব মেয়েরা বা তাদের বাবা-মায়েরা কোনও প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। কারণ জানে তাতে বিশেষ কিছু লাভ হবে না। যেহেতু পুলিশ আইন সবই এখন ওদের ইশারায় নাচে।

আসলে সাধারণ মানুষ ভয় পায় পাপ করতে, আর নেতাদের পাপ তো থাকে বাপের পোকাতেই। তবুও মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম ঘটেই যায়। ঠিক সেরকমই আবার ঘটল রুমকির বেলায়। আগের ঘটনার পরেও আমি বেশ কয়েকবার অফিস টাইমে রুমকিকে দেখেছি কলেজ যেতে। কথা হয়নি, তবে দেখে যেটুকু মনে হয়েছে, বেশ ভালো ভদ্র মেয়ে। উঠতি বয়সের চেহারায় একটা বাড়তি আকর্ষণ আছে। সেটা ওর সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য, তা আমার জানা নেই। হয়তো সেই কারণেই ঘটে গিয়েছিল সেদিনের ওই নিন্দনীয় ঘটনাটা।

বলছি— আমি যেটুকু লোকমুখে শুনেছি তারই হুবহু বর্ণনা দিচ্ছি। রুমকি কলেজ শেষ করে টিউশনি পড়াতে যায়। তাতে ওর নিজেরও ভালো লাগে আর কিছু হাতখরচের পয়সাও জুটে যায়। সেদিন ফিরতে একটু বেশিই রাত হয়েছিল রুমকির। শনি মন্দির পেরিয়ে জলের ট্যাঙ্কের পরেই ডানদিকে ঘুরে বাজারের রাস্তা ধরেছিল। সকালের দিকে বাজার যতটা জমজমাট থাকে, রাতে ঠিক ততটাই ফাঁকা। হঠাৎ যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছিল দুটো বাইক। একটু আগেও আশপাশে কেউ ছিল না। একটা বাইক রুমকির পথ আগলে দাঁড়াল। আর একটা বাইক পিছনে একদম গা ঘেঁষে। দ্বিতীয় বাইকটা থেকে পিছনের ছেলেটা অতর্কিতে নেমে এসে রুমকির মুখটা একটা সুগন্ধী রুমাল দিয়ে চেপে ধরল। দূরে চায়ের দোকানের গণশা সবটাই দেখছিল। কিন্তু টিপটিপ বৃষ্টির রাতে চারদিক শুনশান। তাই গণশার একার পক্ষে প্রতিবাদ করার মুরোদ নেই। কারণ ছেলেগুলো সবই মদনের স্যাঙাৎ।

রুমকির শরীরটা যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নেতিয়ে গেল। রুমকিকে পাঁজাকোলা করে বসাল সামনের বাইকটার দুটো ছেলের মাঝখানে। রুমকি মোটামুটি অচৈতন্য। বাইক দুটো হাওয়ার মতো বাজারের উলটোদিকে কৈখালির রাস্তা ধরল। শুধু যাওয়ার সময় গণশার একটা কথাই কানে এল, ‘আজ বস হেব্বি খুশ হয়ে যাবে, একদম হাতে গরম পদ্মার ইলিশ!’ শোনা যায়, রুমকিকে নিয়ে গিয়ে নাকি একটা নির্মীয়মাণ বহুতলে তুলেছিল। সেখানে নিয়ে গিয়ে মদন আর তার বন্ধুরা কী করেছিল, তার কাল্পনিক পুঙ্খানুপুঙ্খ অশ্লীল বর্ণনা দিতে চাই না। কারণ, এই ঘটনাটা আমি লোকমুখে শুনেছি। তবে অপরাধ সেদিন শুধু শারীরিক ভোগে থেমে থাকেনি, তার মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল আরও ঘৃণ্য পথে। সে বর্ণনায় বরং আসছি।

প্রথমে মদন এবং পরে তার চার বন্ধু মিলে সেদিন যে পাশবিক কায়দায় রুমকির শরীর ভোগ করেছিল, সেই ব্যাপারে পাঠকেরা নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে আন্দাজ করে নিয়েছেন। তবে যেটা তাদের কল্পনার বাইরে তা হল, সেই পুরো জঘণ্য কর্মকাণ্ডটি সম্পূর্ণ ভিডিও করে রাখা হয়। যাতে করে রুমকি যেন পরবর্তীকালে কোথাও কোনও নালিশ জানাতে না পারে। এই ভিডিওটাই থাকল আজীবন রুমকিকে ভয় দেখানোর তুরুপের তাস।

তারপর সারা এলাকাতেই একটা থমথমে ভাব। আমি পাড়ায় সাধারণত কমই থাকি। প্রায় কারওর সঙ্গেই সেরকম মিশি না। নিজের কাজ নিয়েই ডুবে থাকি। শুধু সময় পেলে যা একটু ওই গণেশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসি। সেখান থেকেই কানে এল যে, রুমকি নাকি লোকাল থানার উপর ভরসা না রেখে, উপরতলার রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের বড়কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। যদি তাতে কোনও ভাবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া যায়।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...