বলা হয় যে, প্রতি ৮ জন মহিলার মধ্যে মাত্র ১ জন মহিলা তাঁর অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন নিজে, বাকি ৭ জন মহিলা আর্থিক বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের জন্য পুরুষদের উপর নির্ভর করেন। যদিও সমীক্ষা থেকে এই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে, তবুও নারীরা পুরুষদের তুলনায় ভালো বিনিয়োগকারী বলা যায়। লুয়ান লটফন তাঁর ‘ওয়ারেন বাফেট ইনভেস্টস লাইক আ গার্ল’ বইতে লিখেছেন যে, মহিলারা ভালো বিনিয়োগকারী এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা বিনিয়োগের দিকেও মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন। এই কারণেই আগের তুলনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আধিপত্য বাড়ছে মহিলাদের।
২০১৬ সালে, ‘ইটি মানি’ ব্যবহারকারীদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ নারী ছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২৬ শতাংশ হয়েছে, যা অবশ্যই ভালো দিক। এর প্রধান কারণ হল, নারীরা এখন অনেকেই আর্থিক ভাবে স্বাধীন, যা তাদের একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সাহায্য করছে।
শেয়ার বাজারে শেয়ার বৃদ্ধি
এখন বিনিয়োগের মাধ্যমে নারীরা শেয়ার বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছেন। একটি প্রতিবেদন অনুসারে, নারী বিনিয়োগকারীদের AUM ২০১৯ সালে ৪.৫৯ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে 2024 সালে ১১.২৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিনিয়োগের জন্য উপার্জন অপরিহার্য
এক সংস্থার তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন যে, পুরুষরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিনিয়োগে এগিয়ে, যেখানে মহিলারা আগে কম বিনিয়োগ করতেন, কারণ তারা আয় করতেন না। কিন্তু আজকের মহিলারা স্বাবলম্বী এবং খুবই সচেতন এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে পারেন ভালো ভাবে। তারা হাজার হাজার টাকা থেকে শুরু করে লক্ষ লক্ষ, এমনকী কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। তবে আরও ভালো রিটার্ন পেতে হলে, এই বিষয়গুলিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন—
লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
প্রতিটি অবসরকালীন বিনিয়োগকারীর মনে রাখা উচিত যে, তাদের বিনিয়োগকে একটি লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। অনেক মহিলা তাদের স্বামীর থেকে নেওয়া টাকা ছুটির দিনে ঘুরে-বেড়িয়ে কিংবা রেস্তোরাঁয় সুস্বাদু খাবার খেয়ে অথবা বিশেষ কিছু কিনতে খরচ করে ফেলেন, যা পুরুষরা করতে চায় না। তাই, বিনোদনে খুব বেশি টাকা খরচ না করে বরং সেই টাকা বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করে উপভোগ করা উচিত।
ধৈর্য ধরা আবশ্যক
বেশিরভাগ মহিলাই বাজারের ওঠানামার মধ্যে তাড়াহুড়ো করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা পোষণ করেন, যা পুরুষরা করেন না। মহিলাদের ধৈর্য ধরতে শেখা উচিত। বাজারের ওঠানামার কারণে কখনও আতঙ্কিত হবেন না এবং তাড়াহুড়ো করে টাকা তুলে নেবেন না, কিংবা বিনিয়োগ করবেন না। বিনিয়োগ-বাজারে প্রবেশের অর্থ হল— আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং আপনার শেয়ারের উন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবেই আপনি মুনাফা অর্জন করতে পারবেন।
বিনিয়োগের আগে গবেষণা করা জরুরি
বিনিয়োগের আগে সঠিক গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি বাজারের ওঠানামা সম্পর্কে ভালো তথ্য পেতে পারেন। অবশ্য পুরুষদের তুলনায় মহিলারা দ্রুত বিনিয়োগ কম করেন এবং বিনিয়োগের আগে গবেষণা করেন। তারা তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া এড়িয়ে চলেন। যদি তারা বিভ্রান্ত বোধ করেন, তাহলে তারা অন্যদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে দ্বিধা করেন না, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এটি খুব কমই দেখা যায়। তবুও, মহিলাদের আরও সচেতনতা জরুরি।
রিস্ক ফ্যাক্টর
বেশিরভাগ মহিলা যদিও বিনিয়োগের ঝুঁকিগুলি সম্পূর্ণরূপে বোঝার পরেই বিনিয়োগ করেন, তবুও রিস্ক-এর ধরন যেহেতু বদলায়, তাই প্রতিদিন নিজেকে আরও আপডেট রাখতে হবে। যদি কোনও বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন, তাহলে তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা রাখুন। আজকের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রিপ্টোকারেন্সি-র ক্ষেত্রে, মাত্র ১৫ শতাংশ মহিলা বিনিয়োগ করেন, বাকি ৮৫ শতাংশ পুরুষ বিনিযোগকারী। এমনকী শেয়ার বাজারেও, খুব কম সংখ্যক মহিলাই বিনিয়োগকারী। তবে এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
বিনিয়োগের সময় যদি কোনও উদ্বেগ থাকে, বিশেষকরে যদি তারা বিনিয়োগে নতুন হন কিংবা জটিল বিনিয়োগ বিকল্পগুলির সঙ্গে অপরিচিত হন, তাহলে তাদের একজন আর্থিক উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করে বিনিযোগ করা উচিত।
বিনিয়োগ পর্যালোচনা করুন
বিনিয়োগের পর, মাঝেমধ্যে বিনিয়োগ পর্যালোচনা করা উচিত এবং নিজের আর্থিক লক্ষ্য অনুসারে পরিবর্তন করা উচিত। এছাড়াও, ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগকে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ বিকল্পে ভাগ করে নেওয়া আবশ্যক।
বিচক্ষণতা
বিচক্ষণতার মধ্যে রয়েছে আপনার আর্থিক লক্ষ্য স্থির করা, ঝুঁকি এড়ানো, সহনশীলতা এবং বিনিয়োগের বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিছু সাধারণ বিনিয়োগের বিকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে-
ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি)
এই টাকা একটি ব্যাংকে জমা করা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট সুদের হার পাওয়া যায়। মহিলা সম্মান সঞ্চয় সার্টিফিকেট, স্থায়ী আমানত, মিউচুয়াল ফান্ড, সোনা এবং সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার মতো বিনিয়োগের বিকল্পগুলির থেকে যে-কোনও স্কিম বেছে নিতে পারেন মহিলারা।
পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিপিএফ)
এটি একটি সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত।
মিউচুয়াল ফান্ড
এটি একটি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও, যা বিভিন্ন ধরনের সম্পদ যেমন শেয়ার, বন্ড ইত্যাদি নিয়ে গঠিত।
শেয়ার বাজার
আপনি কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারেন এবং তাদের মূল্য বৃদ্ধি থেকে লাভ করতে পারেন।
রিয়েল এস্টেট
এটি এমন একটি সম্পদ, যার মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ভাড়াও দেওয়া যেতে পারে।
সোনা
এটি একটি নিরাপদ বিনিয়োগ বিকল্প হিসাবে বিবেচিত হয় এবং দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।
জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা (NPS)
এটি একটি পেনশন প্রকল্প, যা অবসর গ্রহণের পর পরিবারকে নিয়মিত আয় প্রদান করে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়
আপনার আর্থিক লক্ষ্যগুলি সঠিক রাখতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে আপনি কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছেন, যেমন অবসর, শিক্ষা ইত্যাদি।
ঝুঁকির কারণ এবং আপনি কতটা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক তা প্রথমে ভেবে দেখুন, কারণ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিনিয়োগের সবদিক মূল্যায়ন করুন। উদাহরণস্বরূপ, পিপিএফ এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী ভাবে লাভজনক। এক আর্থিক উপদেষ্টা প্রসঙ্গত জানিয়েছেন যে, আপনি যদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন হন, তাহলে বিনিয়োগ শুরু করার আগে আপনি একজন রেজিস্টার আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নিন। কারণ, উপযুক্ত পরামর্শ আপনার লক্ষ্য এবং ঝুঁকির উপর ভিত্তি করে সবচেয়ে উপযুক্ত বিনিয়োগ বিকল্প বেছে নিতে সাহায্য করতে পারে।
যেমন, যদি একজন ব্যক্তি মিউচুয়াল এসআইপি-তে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা জমা করেন, তাহলে ১৫ বছর পর তিনি প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা পাবেন।
সুতরাং, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ভালো। তবে এর জন্য সঠিক তথ্য থাকা প্রয়োজন, যাতে আপনি কারও দ্বারা প্রতারণার শিকার না হন। আর এর জন্য প্রয়োজন সঠিক এবং স্বীকৃত আর্থিক উপদেষ্টা, যাকে অনলাইনে কিংবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে খুঁজে পেতে পারেন। যিনি আপনাকে সমস্ত বৈশিষ্ট্য এবং ঝুঁকির কারণগুলি জানিয়ে, প্রপার গাইড করতে পারবেন।
-সোমা ঘোষ





