‘চিত্রা, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। এখুনি বেরোতে হবে। একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিল এজেন্ট। এখন না গেলে যার ফ্ল্যাট সে চলে যাবে’, শুভংকর তাড়া লাগাল বউকে।

আজ এক সপ্তাহ হল শুভংকর আর চিত্রা বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি এসে হোটেলে উঠেছে। শুভংকর বেঙ্গালুরুর চাকরি ছেড়ে আরও ভালো প্যাকেজ পেয়ে দিল্লি এসেছে। বরের সঙ্গে থাকবে বলে চিত্রা ওখানকার চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। ও জানে এখানে সেটল করে ঠিক একটা চাকরি ও জোগাড় করে নেবে। বেঙ্গালুরুর ফার্নিশড ফ্ল্যাটটাও ওরা আসার সময় ছেড়ে দিয়ে এসেছে। ওরা ঠিকই করে রেখেছে নিজস্ব ফ্ল্যাট না হওয়া পর্যন্ত ফার্নিশড ফ্ল্যাট-ই ভাড়া নিয়ে থাকবে। এতে সুবিধা হচ্ছে, গুচ্ছের জিনিসপত্র কিনে টানা হ্যাঁচড়ার কোনও প্রশ্ন নেই। শুধু নিজেদের ব্যবহার্য জামাকাপড় এবং দৈনন্দিন কিছু জিনিস ছাড়া, শিফটিংয়ের সময় গুচ্ছের জিনিস বইতে হয় না। সুতরাং দিল্লিতে আসা থেকে ওরা নতুন ফ্ল্যাটের সন্ধানে রয়েছে। কয়েকটা দেখেওছে, কিন্তু কোনওটাই ফার্নিশড ছিল না। হোটেলে থাকতেও ওদের আর ভালো লাগছিল না।

নতুন ফ্ল্যাটটা দেখে, দু’জনেরই পছন্দ হয়ে গেল। নতুন ফার্নিচারে সাজানো দুটো বেডরুম, ড্রয়িং কাম ডাইনিং, ঝকঝকে মডার্ন কিচেন, বাথরুম— সবই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু চিত্রার সবথেকে পছন্দ হল ফ্ল্যাটের সঙ্গে লাগোয়া সার্ভেন্ট কোয়ার্টারটা দেখে। বাড়িওয়ালা জানালেন, ওই সোসাইটিতে প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের সঙ্গে একটি করে সার্ভেন্ট কোয়ার্টার আছে। তাতে একটি রুম সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম এবং রান্নাঘর। কোয়ার্টারে ঢোকার রাস্তাও আলাদা।

ফ্ল্যাটে যে কাজ করবে সে পরিবারের সঙ্গে ওখানে থাকতে পারবে, পরিবর্তে কম টাকায় তাকে ওই ফ্ল্যাটের সব কাজ করতে হবে। এটাই ওই সোসাইটির নিয়ম। যারা এই শর্তে কাজ করতে ইচ্ছুক, তারা সিকিউরিটি গার্ডের কাছে নিজেদের মোবাইল নম্বর দিয়ে রেখেছে। সুতরাং যোগাযোগ করতে হলে সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

সব দেখেশুনে সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ করে দিল শুভংকর। চিত্রার মুখ দেখে বুঝতে পারছিল, ওরও খুব পছন্দ হয়েছে পুরো ব্যবস্থা। টাকা দিতে যাওয়ার একটা দিন ধার্য করে ওরা স্বামী-স্ত্রী বেরিয়ে এল সোসাইটি থেকে। চিত্রা আনন্দ চেপে রাখতে পারল না। বাইরে পা দিয়েই বলল, ‘আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে ফ্ল্যাটটা। বিশেষকরে সার্ভেন্ট কোয়ার্টার থাকায় চাকরি করাটা খুব সুবিধা হবে তাই না?”

ছোট্ট একটা ‘হ্যাঁ’ বলেই শুভংকর চুপ করল। এখানে শিফট করেই একজন কাজের লোক রেখে নেব। তাহলে অফিস জয়েন যখন করব, কোনও চিন্তা থাকবে না আর অফিস থেকে ফিরেও রান্না করার ঝামেলায় পড়তে হবে না। চিত্রা আনন্দ কিছুতেই চাপতে পারে না। তিনদিনের মাথায় শুভংকর আর চিত্রা নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করল। চিত্রা এসেই সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলে চার-পাঁচজন পরিচারিকার নম্বর নিজের মোবাইলে সেভ করে রাখল, সময় করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলে।

একটু গুছিয়ে বসতেই চিত্রা কাজের লোক খুঁজতে লেগে পড়ল। দুটো তিনটে ফোন করার পর একজনকে পছন্দ হল। কিন্তু তার এক মাসের বাচ্চা আছে শুনে পিছিয়ে গেল আবার। অতটুকু বাচ্চা নিয়ে পুরো বাড়ি কীভাবে মেয়েটি সামাল দেবে ভেবে পেল না চিত্রা। অগত্যা তাকে না করতে হল।

শুভংকর অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে দেখে, চিত্রা রান্নাঘরে ঢুকল। মনটা পড়ে রইল কাজের লোকের চিন্তায়। কী জানি ক’টা দিন আর অপেক্ষা করতে হবে? আনমনা হয়েই দরজা অবধি এগিয়ে গেল চিত্রা, শুভংকরকে সিঅফ করতে। দরজা বন্ধ করে সোফায় এসে বসল। এখনও ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়নি। মনে মনে কাজের একটা লিস্ট ছকে নেয় ও। সিকিউরিটি গার্ডের কাছ থেকে আরও ক’টা নম্বর জোগাড় করে নিয়ে আসতে হবে। সুতরাং দেরি না করে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে। তক্ষুনি ডোর বেলটা বেজে ওঠে। চিত্রা দরজার দিকে এগোয়। দরজা খুলতেই দ্যাখে সামনে দাঁড়িয়ে মাঝবয়সি একজন মহিলা। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সুতির ছাপা একটি শাড়ি পরনে। গায়ের রং শ্যামলা এবং ছিপছিপে শরীর।

চিত্রাকে দেখে মহিলাটি হাত তুলে নমস্কার জানাল। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই চিত্রার জিজ্ঞাসু এবং উৎসুক মুখ দেখে মহিলাটি বলল, “ম্যাডাম, আমার নাম শ্যামলী। থাকার জন্য আমার ঘরের খুব দরকার। আপনি লোক খুঁজছেন কাজের জন্য। আমি এখানে কাজ করতে রাজি আছি। আমার স্বামী তিনবছর আগে মারা গেছে, দুটো মেয়ে আছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। পাশেই বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। আগে অনেক বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কাজ করতাম, কিন্তু এখন আর পারি না। এখন একটা বাড়িতে থেকে সেখানেই রাত-দিনের কাজ করতে চাই। এটুকু বলতে পারি আমাকে নিয়ে বা আমার কাজ নিয়ে আপনাকে নালিশ করতে হবে না। সারাদিন পরিশ্রম করতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।’

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...