মানুষ সামাজিক জীব, আর সামাজিকতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হল— পারস্পরিক স্বীকৃতি। শৈশবের প্রথম হামাগুড়ি থেকে শুরু করে কর্মজীবনের জটিল সমীকরণ— প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষ অবচেতন ভাবেই খোঁজে একটু প্রশংসা, সামান্য একটু বাহবা। মনস্তত্ত্বের ভাষায়, এই প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা কেবল অহংকার কিংবা সাময়িক আনন্দের খোরাক নয়, বরং এটি মানুষের আত্মমর্যাদা (Self-esteem) ও অস্তিত্বের এক মৌলিক মানসিক চাহিদা। কিন্তু এই চিরন্তন প্রত্যাশা যখন দীর্ঘ সময় ধরে উপেক্ষিত থাকে, তখন মনের অজান্তেই তৈরি হয় এক নীরব ক্ষত। বাহ্যিক চকমকে সাফল্যের আড়ালে তখন বাসা বাঁধে এক তীব্র একাকিত্ব ও শূন্যতা, যাকে মনস্তত্ত্ববিদরা ‘সুপ্ত অবসাদ’ বা ‘Silent Depression' বলে আখ্যায়িত করেন৷ এই অবসাদ হুট করে প্রকাশ পায় না, বরং এটি মানুষের আত্মবিশ্বাসকে ভিতর থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করতে থাকে। যখন একজন ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রম ও সৃজনশীল প্রয়াস বারবার মূল্যায়নের অভাবে হারিয়ে যায়, তখন সে নিজের যোগ্যতা নিয়েই সংশয়ে পড়ে যায়। মূল্যায়নের অভাব কীভাবে একজন সুস্থ মানুষকেও হতাশার চোরাবালিতে তলিয়ে দেয়, বর্তমান মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাসে তা এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি পর্যালোচনার বিষয়।
স্বীকৃতির মনস্তত্ত্ব
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর পরমাকে একটু মনমরা লাগছিল। সে অন্যদিনের মতো হাসিখুশি ছিল না। তাই তার মেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে মা? আজ অফিসে কিছু হয়েছে নাকি?' পরমা মৃদুস্বরে উত্তর দিল, 'না, কিছুই হয়নি।' তখন তার মেয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে তোমার মুখটা শুকনো দেখতে লাগছে কেন?' পরমা তখন মেয়েকে জানালেন, 'আসলে, আজ অফিসে আমার একটা মিটিং ছিল। আমাকে একজন বাইরের ক্লায়েন্টের কাছে একটা প্রেজেন্টেশন দিতে হয়েছিল। আমি এর জন্য খুব ভালো ভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বরাবরের মতোই আজও আমার প্রেজেন্টেশনটা চমৎকার ছিল। ক্লায়েন্ট ভদ্রলোক খুব প্রশংসা করলেন, কিন্তু অফিসের কেউ আমার প্রশংসা করল না। বল তো, আমার সহকর্মীদের কি আমার প্রশংসা করা উচিত ছিল না? আমার প্রেজেন্টেশনটা কি ভালো ছিল না? আমি ঠিক করেছি, আর কখনও প্রেজেন্টেশন দেব না।'





