মহিলাটির কথাবার্তা শুনে, চিত্রার ভালোই মনে হল। তবে কয়েকটা প্রশ্ন আগে থেকে জিজ্ঞেস করে নেওয়াটা উচিত মনে হল চিত্রার। জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি জানো, এখানে সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে থাকতে হলে, তোমাকে কম টাকায় বাড়ির কাজ করতে হবে? তাহলে তোমার মাসে চলবে কী করে?

—সে চিন্তা নেই ম্যাডাম। ছয় মাস বাদে বাদে গ্রাম থেকে আমার চাল, ডাল, গম সব আসে। গ্রামে আমাদের কিছু জমিজমা আছে। এছাড়া আমার দুই জামাইও খুব ভালো। টাকাপয়সা দিয়ে ওরা সবসময় আমাকে সাহায্য করে। আমার শুধু থাকার জন্য ঘরের খুব দরকার। —ঠিক আছে, তুমি কবে থেকে আসতে পারবে? চিত্রা জিজ্ঞেস করল।

—ম্যাডাম, কাল বাদে পরশু সকালেই আমি জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসব, বলে শ্যামলী চলে গেল। চিত্রাও দরজা বন্ধ করে ভিতরে আসতে আসতে অনেকটা হালকা বোধ করল। মহিলাটি একাই থাকবে, সুতরাং ওর নিজের ঝামেলা খুব একটা থাকবে না। ফলে চিত্রার সংসারে ও ভালোমতোই সময় দিতে পারবে। শুভংকরকে ফোন করে সুখবরটা দিতে হবে ভেবে চিত্রা মুঠোফোনটা হাতে তুলে নিল।

একদিন পরই শ্যামলী নিজের জিনিসপত্র নিয়ে চিত্রার কাছে হাজির হল। চিত্রা সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের চাবি খুলে দিয়ে শ্যামলীর হাতে চাবিটা ধরিয়ে দিল। হাতমুখ ধুয়ে জিনিসপত্র রেখে শ্যামলী চিত্রার ফ্ল্যাটে চলে এল এবং বাড়ির সব কাজ বুঝে নিল। শ্যামলীর গোছালো কাজ দেখে চিত্রা নিশ্চিন্ত বোধ করল এবং নিজের চাকরির জন্য খোঁজখবর নিতে শুরু করে দিল। দেখতে দেখতে একটা মাসের মধ্যে তিনটে ইন্টারভিউ দেওয়া হয়ে গেল চিত্রার। মাস কাটতেই হঠাৎই শ্যামলীর ব্যবহারে কিছু অসংগতি চিত্রার চোখে ধরা পড়তে আরম্ভ করল।

গ্রাম থেকে চাল, ডাল, গম আসে, শ্যামলীর কাছে এই গল্প প্রথমে বিশ্বাসই করেছিল চিত্রা। কিন্তু রোজ রোজ যখন জিনিস চাওয়া আরম্ভ করল শ্যামলী, তখনই চিত্রার সন্দেহ হওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে সাহস বাড়তে থাকে শ্যামলীর। চিত্রাকে কিছু না জানিয়েই রান্নাঘর থেকে চাল, আটা, ডাল, ফ্রিজ থেকে দুধ, সবজি নিয়ে যেতে আরম্ভ করল ও।

একদিন চিত্রা এই নিয়ে একটু চ্যাঁচামেচি করতেই শ্যামলীও চোপড়া করল, ‘আমি কি চুরি করেছি নাকি? আপনার সামনেই তো বার করেছি। এখানে কাজ করছি আর গ্রাম থেকেও এখনও কেউ চাল, ডাল দিতে আসেনি। এই অবস্থায় আপনার থেকে নেব না তো আর কোথায় যাব?’

চিত্রা রাগের মাথায় আর কিছু না বলে চুপ করে গেল।

কিন্তু ধীরে ধীরে শ্যামলীর চাহিদা বাড়তে আরম্ভ করল। কখনও বিছানায় পাতার জন্য চাদর চেয়ে বসে, আবার কখনও কোথাও যাওয়ার দরকার হলে চিত্রার থেকে শাড়ি চেয়ে বসে। শুধু চাওয়া নয়, প্রতিটা কথায় চিত্রার আচার আচরণ নিয়ে টিটকিরি দেওয়া শুরু করে দিল। কখনও চিত্রা সিঁদুর পরে না বলে কথা শোনাত, আবার কখনও বাড়িতে পুজোপাঠ করে না বলে তাচ্ছিল্য করা শুরু করে দিল। অথচ কাজের কথা চিত্রা কিছু বললে, না-শোনার ভান করত। টাকাপয়সাও মাঝেমধ্যেই চাওয়া শুরু করল। চিত্রা দিতে না চাইলে মেজাজ দেখিয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যেত শ্যামলী। চিত্রার কাছে সব শুনে শুভংকর ওকে ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা বললেও, চিত্রা কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিল না শ্যামলীকে নিয়ে ও কী করবে।

একদিন ফোনে যখন ব্যস্ত চিত্রা, ডোরবেল বেজে ওঠে। শ্যামলীকে ডেকে দরজাটা খুলে কে এসেছে দেখতে বলে চিত্রা। ঝনঝন করে রান্নাঘর থেকে বাসন পড়ার শব্দ পায়। চিত্রা বুঝতে পারে দরজা খুলতে বলায় শ্যামলী রেগে বেসিনে বাসন ছুঁড়ে দিয়ে দরজা খুলতে গেছে। বিরক্ত বোধ করে চিত্রা। সঙ্গে সঙ্গেই একটা প্যাকেট হাতে করে নিয়ে উপস্থিত হয় শ্যামলী।

—নিন, ধরুন, দরজাটা আপনিও তো খুলে দিতে পারতেন। এই ভাবে কাজই তো শেষ করতে পারব না! সারাদিনটা কি এখানেই কাটাব আমি?

রাগ সামলে প্যাকেট খোলায় মন দেয় চিত্রা। অনলাইনে বুক করা নতুন জুতোটা পাঠিয়েছে। প্যাকেট খুলতেই নতুন জুতো দেখে শ্যামলী চুপ থাকতে পারে না, “বাবাঃ, শু-র‍্যাকটা তো আগে থেকেই উপচে পড়ছে, আবার একটা জুতো কিনলেন? একেবারে বাজে খরচা। এর জন্য আপনাদের কাছে টাকা রয়েছে আর আমরা গরিব মানুষরা একটা জিনিস নিলেই আপনাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়।’

শ্যামলীর স্পর্ধা দেখে চিত্রা অবাক হয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যে শ্যামলীর চরিত্রের এই পরিবর্তন চিত্রার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে চিত্রা শ্যামলীকে কাজ থেকে বরখাস্ত করে দিল আর চার ঘণ্টা সময় দিল কোয়ার্টার ছেড়ে দেওয়ার জন্য।

শ্যামলীও রাগ দেখাতে ছাড়ল না, ‘দরকার নেই আমার এরকম কাজের। আমি মেয়ে-জামাইয়ের কাছে আরামে থাকব। লোক রেখে দেখুনই না বুঝতে পারবেন, বলে দুড়দাড় করে কোয়ার্টারে ঢুকে গেল। খানি কক্ষণ পরেই মেয়ে, জামাই এসে শ্যামলীকে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় চিত্রা, কোয়ার্টারের চাবিটা ওদের কাছ থেকে চেয়ে নিল।

রাগের মাথায় শ্যামলীকে ছাড়িয়ে দিয়ে আর এতগুলো কথা বলে বড়ো ক্লান্ত অনুভব করছিল চিত্রা। বাড়ির পড়ে থাকা সমস্ত কাজ সেরে চিত্রা একটু গড়িয়ে নিতে বিছানায় এসে বসে। ক্লান্ত শরীরে কখন যে চোখ বুজে এসেছিল সে নিজেও বুঝতে পারেনি। দরজায় ধাক্কা শুনে ঘুমটা ভাঙে ওর। বাইরেটা বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। শুভংকরের ফেরার সময় তো এখনও হয়নি। তবে কে এল এই অসময়ে? উঠতে ইচ্ছে করছিল না, জোর করে উঠল।

দরজা খুলে দেখল তেইশ-চব্বিশ বছরের একজন যুবতি মেয়ে। দেখে মনে হচ্ছিল নতুন বিয়ে হয়েছে, বেশ হাসি মুখ। পাশেই দাঁড়িয়ে একটি যুবক। চিত্রার মনে হল মেয়েটির স্বামী নিশ্চয়ই।

—দিদি, আমার নাম রিমা। এ হল রানা। আমার… আমি কাজের জন্য এসেছি।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...