ছেলেটি হাতজোড় করে চিত্রাকে নমস্কার জানাল। দু’জনের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে চিত্রা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী করে জানলে আমি কাজের জন্য লোক খুঁজছি? আমার লোক তো আজ সকালেই ছেড়ে গেছে। আমি তো এখনও কাউকে কিছু জানাইনি পর্যন্ত”, কথা শেষ করে চিত্রা দু’জনকে ভিতরে এসে কথা বলার জন্য ইশারা করল। দু’জনে ভিতরে এসে দরজার গা ঘেঁষে দাঁড়াল।

—দিদি, আপনার কাছে আমার পিসি এতদিন কাজ করছিল। আজকে রেগে গিয়ে আপনাকে কী বলেছে জানি না, কিন্তু বাড়ি গিয়ে নিজেকেই দোষারোপ করছিল। পিসি খুব ভালো করেই জানে ওকে আপনি আর কাজে নেবেন না। তাই আমাকে এখানে কাজের কথা বলল। চিত্রার উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল রিমা।

—ও… তাই বলো! তোমাকে তাহলে শ্যামলী আমার কাছে পাঠিয়েছে? তুমি পারবে সব কাজকর্ম ঠিক করে করতে? মেয়েটির ব্যবহার চিত্রার ঠিকই মনে হল। অগত্যা মেয়েটিকে কাজে বহাল করার কথা ঠিক করে নিল চিত্রা।

—দিদি, আমি এই হাউজিং-এ আমার ভাসুর-জায়ের সঙ্গে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে থাকি, বাইরের একটা কাজও করি। কিন্তু দিদি থাকার খুব অসুবিধে হচ্ছে। আমার জায়ের দুটো বাচ্চা সঙ্গে আবার আমরা দু’জন। একটা ঘরে গাদাগাদি করে কোনওমতে থাকা। এখানে আপনার কাছে কাজ করলে থাকার অসুবিধে থাকবে না। এবার যদি আপনি আমাকে রাখেন।

রিমাকে রাখার সিদ্ধান্ত আগেই মনে মনে নিয়ে নিয়েছিল চিত্রা। সুতরাং মুখে বলল ‘ঠিক আছে, তোমরা তাহলে চলে এসো। যখন আসবে চাবিটা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিও।”

রাত্তিরেই একটা খাট আর কিছু জামাকাপড় নিয়ে রিমা, রানার সঙ্গে চিত্রার সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে চলে এল।

পরেরদিন সকালেই রানা নিজের কাজে চলে গেলে রিমা চিত্রাদের ফ্ল্যাটে চলে এল। চিত্রার কাছ থেকে সব কাজ বুঝে নিয়ে চিত্রাকে জোর করে বসিয়ে দিল, “দিদি, আপনি বসে থাকুন, আমি সব কাজ করে দেব। যদি মনে হয় কাজটা ঠিকমতো হয়নি, তাহলে আমাকে ডেকে শুধু বলে দেবেন।”

রবিবার হাফ বেলা কাজ করত রিমা। দুপুরে কাজ সেরে বরের সঙ্গে কোথাও না কোথাও বেরোত। কখনও সিনেমা দেখতে, কখনও এমনি ঘুরতে অথবা আত্মীয়স্বজনদের বাড়িও যেত ওরা। কখনও কখনও বেরোত যখন, চিত্রার চোখেও পড়ত। রিমার সাজগোজ দেখে চিত্রার একটু অবাকই লাগত। কারণ ইমিটেশন গয়না থেকে মেক-আপ,

পোশাক- আশাক কিছুতেই কোনও খামতি ওর চোখে পড়ত না। এত সব করার টাকা কোথা থেকে আসে বুঝতে পারত না চিত্রা।

চিত্রা যখনই এ বিষয়ে রিমার সঙ্গে কথা বলত, একই উত্তর শুনত, “দিদি, আমাদের নতুন বিয়ে হয়েছে। ও সেজেগুজে থাকা খুব পছন্দ করে। সাজগোজের বেশিরভাগ জিনিসই তো ওই কিনে আনে।”

বেশি মাথা ঘামায়নি চিত্রা এই নিয়ে। এটা ওদের ব্যক্তিগত জীবন। যতক্ষণ বাড়ির কাজ ঠিকমতো হয়ে যাচ্ছে, এইসব ব্যাপারে মাথা ঘামাবার কোনও কারণ নেই চিত্রার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চাকরি খুঁজে জয়েন করাটাই চিত্রার লক্ষ্য। এই নিয়েই আপাতত ও ব্যস্ত থাকতে চায়।

ল্যাপটপ-টা খুলে মেলগুলো চেক করতে বসে চিত্রা। হতাশ হয়, কোনও মেল ঢোকেনি দেখে। কী করবে ভেবে না পেয়ে অনলাইন শপিং সাইটগুলো একটার পর একটা দেখতে শুরু করে। অবসাদ কাটাবার একমাত্র উপায় শপিং। সুতরাং তাতেই মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে সে। হঠাৎ চোখ আটকায় একটা কুর্তা দেখে। কিনলে বেশ খানিকটা রিবেট পাওয়া যাবে দেখে প্লাস্টিক কার্ডটা নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। মনে করার চেষ্টা করে পার্সটা কোথায় রেখেছে। খেয়াল হয় কাল থেকে ড্রয়িংরুমের টিভির পাশেই পড়ে রয়েছে পাসটা। তাড়াতাড়ি ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু ঘরে ঢুকেই যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে চিত্রা। রিমা সোফায় গা এলিয়ে বসে চিত্রার পার্সটা নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করছে। রিমার পিঠ চিত্রার দিকে থাকায়, ও চিত্রাকে দেখতে পায়নি। চিত্রা সোফা পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে রিমা পার্স থেকে টাকা বার করে ব্লাউজের ভিতর ঢুকিয়ে নেয়। চিত্রাও বিন্দুমাত্র শব্দ না করে পিছন থেকে রিমার হাতটা ধরে ফেলে। চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়াতে রিমা ঘাবড়ে যায়।

—দিদি, তুমি! চিত্রার মুখ-চোখ দেখে রিমা তোতলাতে থাকে, “আমা…কে ক্ষমা করে দাও। আমি কখনও চুরি করি না। আজ শরীরটা ঠিক নেই তাই ডাক্তার দেখাতে যাব, টাকার দরকার ছিল, তাই এই টাকাটা… আর কখনও হবে না দিদি।’ ব্লাউজের ভিতর থেকে পাঁচশোর নোটটা বার করতে করতে রিমা বলে।

—তোমার শরীর খারাপ? কিন্তু সকাল থেকে তো দেখে কিছু মনে হয়নি, বরং আনন্দেই আছো বলে মনে হচ্ছিল। এখন বুঝতে পারছি বাথরুম থেকে শ্যাম্পু, কন্ডিশনার কীভাবে এত তাড়াতাড়ি শেষ হচ্ছে? কয়েকটা লিপস্টিকও আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তারপর তো আরও আছে, মাঝেমধ্যেই কাজ করতে করতে কোয়ার্টারে চলে যাও। এখন বুঝতে পারছি যাওয়ার কারণটা! আমি আর কিছু জানতে চাই না। তোমাকে আর কাজ করতে হবে না। যত তাড়াতাড়ি পারো কোয়ার্টার খালি করে দাও। রাগে আর কথা বলতে পারে না চিত্রা। ইচ্ছে হয় এখুনি পুলিশ ডেকে রিমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...