কিডনির অসুখের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হল প্রোটিনুরিয়া (Proteinuria) এবং এর কারণ নির্ধারণ ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। এটি উপেক্ষা করা উচিত নয়, কারণ চিকিৎসা না করা প্রোটিনুরিয়া কিডনির ক্ষতি করতে পারে এবং শরীরে আরও অনেক জটলতা তৈরি করতে পারে। তবে, মাঝেমধ্যে কিছু চাপের কারণে হালকা প্রোটিনুরিয়া পাওয়া যেতে পারে প্রস্রাবে। কিন্তু প্রোটিনুরিয়ার মাত্রা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ইউরিন টেস্ট করা প্রয়োজন।

প্রোটিনুরিয়া বলতে কী বোঝায়?

প্রোটিনুরিয়া হল মূত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা অ্যালবুমিন নির্গত হওয়া, যা সাধারণত কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস কিংবা ড্যামেজ করতে পারে। আমাদের শরীরের সুস্থ-স্বাভাবিক কিডনি প্রোটিন ফিল্টার করে শরীরে রেখে দেয়, কিন্তু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা কিডনির রোগে তা প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। ফেনাযুক্ত প্রস্রাব এবং মুখ, হাত এবং পা ফুলে যেতে পারে প্রোটিনুরিয়ার কারণে। দৈনিক ১৫০ মিলিগ্রামের বেশি প্রোটিন প্রস্রাবে নির্গত হলে, তা প্রোটিনুরিয়া বা অ্যালবুমিনুরিয়ার লক্ষণ।

আসলে, কিডনি শরীরের জন্য প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। রক্ত থেকে বর্জ্য এবং অতিরিক্ত তরল অপসারণ করে এবং প্রোটিন-সহ প্রয়োজনীয় পদার্থগুলিকে আয়ত্তে রাখে। আমাদের শরীরের সুস্থ-স্বাভাবিক কিডনি খুব কম পরিমাণে প্রোটিন প্রস্রাবে নির্গত হতে দেয়৷

যখন কিডনিতে চাপ বা ক্ষতি হয়, তখন তাদের ফিল্টারিং সিস্টেম কম কার্যকর হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, আরও প্রোটিন প্রস্রাবে প্রবেশ করে। যার ফলে প্রোটিনুরিয়ার সমস্যা দেখা দেয়৷

কখন এটি উদ্বেগের কারণ নয়?

প্রস্রাবে প্রোটিন সবসময় রোগের লক্ষণ নয়। জ্বর, মানসিক চাপ, তীব্র শারীরিক পরিশ্রম কিংবা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে প্রোটিনুরিয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, শরীর সুস্থ হয়ে উঠলে প্রস্রাবে প্রোটিন সাধারণত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু যখন প্রস্রাবে বারবার প্রোটিন পাওয়া যায় এবং প্রচুর পরিমাণে প্রোটিনুরিয়া থাকে, তখন তা স্বাস্থ্য- সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে। এটি একটি অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, তাই দ্রুত সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসার প্রয়োজন।

সাধারণ কারণ

প্রস্রাবে প্রোটিনের সবচেয়ে সাধারণ দীর্ঘমেয়াদী কারণগুলি হল ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ। উভয় অবস্থাই ধীরে ধীরে কিডনির ছোটো ছোটো রক্তনালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এমন একটা সময় আসে, যখন কিডনির ছোটো ছোটো রক্তনালীগুলি ফুটো হয়ে যায়।

অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে কিডনির প্রদাহজনক রোগ, লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগ, বংশগত ভাবে কিডনি-র সমস্যা এবং ভাইরাল সংক্রমণ।

গর্ভাবস্থায়, প্রস্রাবে প্রোটিন প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার সংকেত দিতে পারে। এটি এমন একটি অবস্থা, যার জন্য দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

সাধারণ কিছু লক্ষণ

বেশিরভাগ মানুষের প্রস্রাবে প্রোটিন থাকার কোনও লক্ষণ থাকে না। তাই, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন প্রোটিনের ক্ষয় বেশি হয়, তখন কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন— ফেনাযুক্ত বা বুদবুদযুক্ত প্রস্রাব প্রায়ই প্রথম লক্ষণীয় পরিবর্তন। শরীরে অ্যালবুমিনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে চোখ, পা, গোড়ালি বা হাতের চারপাশে ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত জল পান করলে ক্লান্তি কিংবা হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি অনুভব করতে পারেন।

সঠিক রোগনির্ণয়

প্রস্রাবে প্রোটিন সাধারণত ইউরিন টেস্ট-এর মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। যদি অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, তাহলে চিকিৎসকরা পরীক্ষাটি আবার করাতে পারেন অথবা কতটা প্রোটিন নষ্ট হচ্ছে, তা নির্ধারণের জন্য আরও সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিতে পারেন।

প্রস্রাবের প্রোটিন লিকেজ: প্রস্রাবের নমুনায় ক্রিয়েটিনিন অনুপাত দ্বারা পরিমাপ করা হয়। মাঝেমধ্যে প্রস্রাবে প্রোটিনের পরিমাণ পরিমাপ করার জন্য ২৪ ঘণ্টায় একাধিকবার প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয় এবং যদি ফলাফলে অসঙ্গতি থাকে, তাহলে দু-একদিন বাদে আবার ইউরিন টেস্ট করার প্রয়োজন হয়৷

কারণ মূল্যায়নের জন্য রক্ত পরীক্ষা এবং ইমেজিং করা হয়। যদি কারণ স্পষ্ট না হয়, তবে কিডনি বায়োপসির প্রয়োজন হতে পারে। কিডনি বায়োপসি হল USG বা CT নির্দেশিকা অনুসারে করা একটি নিরাপদ পদ্ধতি। আসলে, এই সমস্ত টেস্ট-এর উপর ভিত্তি করে চিকিৎসার ধরন পরিবর্তন করা হয়, যা কিডনিকে রক্ষা করে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

প্রস্রাবে প্রোটিনের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সংকট হিসাবে বিবেচনা করা হয়। প্রস্রাবে প্রোটিনের উচ্চ মাত্রা কিডনির দ্রুত ক্ষতি, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে, বিশেষকরে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা এই ঝুঁকিগুলি উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস করতে পারে এবং কিডনি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। চিকিৎসা

রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রক্তচাপের মাত্রা বজায় রাখা সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলির মধ্যে একটি। কিছু ওষুধ, যেমন ACE ইনহিবিটর এবং ARB ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়। কারণ এইসব ওষুধ কিডনির ফিল্টারিং ইউনিটগুলিকে রক্ষা করে এবং প্রোটিন লিকেজ কমায়।

SGLT2 ইনহিবিটর এবং নন-স্টেরয়েডাল মিনারেলোকোটিকয়েড অ্যান্টাগোনিস্ট-সহ নতুন ওষুধগুলিও কিডনির ক্ষতি কমায়। কিছু ক্ষেত্রে, কিডনির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সঠিক রাখতে এবং প্রোটিনুরিয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কমাতে, মাইকোফেনোলেট মোফেটিল এবং রিটুক্সিমাবের মতো ইমিউনোসপ্রেসিভ ওষুধের প্রয়োজন হয়। এগুলো কিডনি বায়োপসির ফলাফলের উপর নির্ভর করে, তাই উপযুক্ত পরীক্ষা অপরিহার্য।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

কিডনির স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সহজ জীবনধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লবণ গ্রহণ কমিয়ে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। রোগীর ক্লিনিক্যাল অবস্থার উপর ভিত্তি করে জল গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা, অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত করা কিংবা বন্ধ করা এবং অকারণে পেইনকিলার মেডিসিন গ্রহণ না করা ইত্যাদির মাধ্যমে কিডনি-র স্বাস্থ্য রক্ষা করা যায়।

বারবার পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর, প্রোটিনুরিয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় এবং সেইমতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। তাই, কিডনির স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা অপরিহার্য।

প্রস্রাবে প্রোটিন উপেক্ষা করা উচিত নয়, এমনকী যখন কোনও লক্ষণ নাও থাকে, তখনও মাঝেমধ্যে ইউরিন টেস্ট করানো উচিত। কারণ, প্রাথমিক পরীক্ষায় সমস্যার কারণ চিহ্নিত করতে পারলে, চিকিৎসকরা পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা করতে পারেন।

ডা. রিতেশ কাউন্তিয়া, অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর, নেফ্রোলজি বিভাগ, ফর্টিস হাসপাতাল, আনন্দপুর, কলকাতা।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...