আমি অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম।
—দেখুন দাদা, ঝেড়ে কাশুন তো। খোলসা করুন সব। এমনিতেই আমার অনেক কাজ বাকি ছিল। তার মধ্যে এই সব। এবার মুখটা বেশ কাচুমাচু করে ফেলল লোকটা।
—মুশকিল হচ্ছে আপনাকে এখন আমরা যমলোকে নিয়ে যেতে পারছি না।
—কেন?
—প্রথম কথা, আপনি মরেছেন অপঘাতে। নিয়ম অনুযায়ী এমনিতেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যেতে আপনার অনেক সময় লাগবে। আর দ্বিতীয় কথা, আপনার এখন মরার কথা ছিল না। আপনি মরেছেন আমাদের একটা হিসেবের ভুলে।
—তাহলে?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যমদূতটা।
—আপনাকে এখন এই পৃথিবীর বুকেই কিছুদিন থাকতে হবে। আপনাদের হিসেবে তা প্রায় একশো বছর তো কম করে। এই এতখানি সময় দেহ ছাড়া থাকতে আপনার কিন্তু খুব কষ্ট হবে। তাই আমাদের ক্ষমা করবেন দয়া করে।
এই বলে মিলিয়ে গেল যমদূতটা। আমি হাঁ হাঁ করে ওঠার আগেই সে বেপাত্তা।
যাইহোক, এই মুহূর্তে আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার শোওয়ার ঘরের দেয়ালের গা ঘেঁষে। উঠোনে শোয়ানো রয়েছে আমার দেহটা। নাকের দুই ফুটোয় গোঁজা রয়েছে তুলো। আছাড়ি পিছাড়ি কান্নাকাটি চলছে। এতক্ষণ আমার কোনও দুঃখ হচ্ছিল না। কারণ আমি তো এখন আত্মা। আত্মার কোনও সুখ দুঃখ বোধ থাকে না। কিন্তু বাড়িসুদ্ধ সকলের এই বুকফাটা কান্না কেন জানি না আমার ভালো লাগছে না। বেঁচে থাকতে কখনও বুঝিনি আমার বাড়ির লোকেরা আমাকে এত ভালোবাসে। বিশেষত আমার মা। যেভাবে আছাড়ি- পিছাড়ি করে সে কাঁদতে শুরু করেছে, এখানে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব।
তাছাড়া শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে বেশ। যমদূতটা বোধহয় এই কষ্টের কথাই বলেছিল। এখন একশো বছর কীভাবে কাটাব কে জানে! কান্নাকাটি সহ্য করতে না পেরে ওখান থেকে সরে এলাম একসময়। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ঘুরে বেড়ালাম কিছুক্ষণ। কিন্তু এ এক মহা জ্বালা হল। কিছুই করার নেই। একঘেয়ে লাগছে বড়ো। কী যে করি কিছুই বুঝতে পারছি না।
বাড়ি থেকে ততক্ষণে অনেক দূরে চলে এসেছিলাম। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। হঠাৎ অনেকখানি ফাঁকা জায়গায় দেখলাম একটা বাড়ি। চারদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা অনেকখানি জায়গা সমেত একটা একতলা বাড়ি। বাড়িটার একটা জানলা দিয়ে আলো বেরোচ্ছে। টুক করে ঢুকে পড়লাম বাড়িটার ভিতরে। ঢুকে দেখি একটা ঘর। সেখানে একটা বিরাট বড়ো টেবিল। আর তাতে শুয়ে আছে একটা অদ্ভুত প্রাণী। না কুকুর না খরগোশ। হঠাৎ দেখলে স্প্যানিয়েল বলে ভুল হতে পারে। আবার খরগোশ মনে হওয়াও বিচিত্র নয়।





