একদা গোপালবাবুর কাছে তিনিই মুখ ফুটে বলেছিলেন চাকরির কথাটা। কারণ পেনশনের টাকায় সংসার পরিচালনা করে ভবিষ্যতে বাকি সদস্যদের জন্য উদ্বৃত্ত কিছুই রেখে যেতে পারবেন না, সেটা তার অজানা ছিল না। গোপালবাবু কথা রেখেছিলেন বন্ধুর। তার অপার করুণাবশত বন্ধুর জন্যে রোজগারের উপায় করে দিয়েছিলেন নিজের ছেলের ওষুধের দোকানে। অভাবগ্রস্ত অসহায় রায়বাবু দক্ষ গোলকিপারের ন্যায় প্রস্তাবটা দু’হাতে লুফে নিয়েছিলেন। রায়বাবু দোকানের হিসেবরক্ষক পদে নতুন চাকরিতে বহাল হয়েছিলেন এই ভেবে যে, তার সংসার খরচের টাকাটা অন্তত জুটে যাবে।

কিন্তু ছেলেটির চরিত্রে ঔদ্ধত্যের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আচরণে ভদ্রতার লেশমাত্র ছিল না। বয়সে তিনি পুত্রতুল্য, অথচ বড়োদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে জানত না। তবু রায়বাবুকে পরিবারের মুখ চেয়ে নিরুপায় হয়ে সবকিছু সহ্য করতে হয়। এমন প্রতিকূল অবস্থায় যে পড়তে হবে সে আন্দাজ করতে পারেননি কখনও। চাকরির প্রথম দিবসেই প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেতে হয়েছিল। ছেলেটি গম্ভীর স্বরে জানিয়েছিল— অফিস আওয়ারে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরে আমাকে কখনওই সম্বোধন করবেন না। আপনি আমাকে স্যার বলে সম্বোধন করবেন, বাকিরা যেমন করে। রায়বাবু শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন, মুখে তার কথা ছিল না। অনেক শর্তের মধ্যে তার আরও একটি শর্ত ছিল— ছুটি হয়ে গেলে বিনা অনুমতিতে বাড়ি যাবেন না।

রায়বাবু অকৃতজ্ঞ নন। অদৃশ্য বিধাতা পুরুষের পাদপদ্মে ছেলেটির নির্মম আচরণ সত্ত্বেও তিনি কায়মনোবাক্যে তার উদ্দেশ্যে পরমায়ু প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে, ছেলেটি আর যাই হোক, পিতার একান্ত অনুগত। অন্যথায় চাকরিটা তিনি পেতেন কিনা সন্দেহ ছিল। অবশ্য এই আচরণের ভিত্তিতে ছেলেটিকে পুরোপুরি দোষারোপ করা সমীচীন নয়। তার মতে, এর নেপথ্যে একটি বিশেষ কারণ নিহিত ছিল। বড়ো মেয়েটির প্রতি ছেলেটির এক সময় প্রগাঢ় দুর্বলতা ছিল, রায়বাবু সেটা জানতেন।

এককালে ঘনিষ্ঠ মেলামেশাও ছিল দু’জনের মধ্যে। বাড়িতে ছিল অবাধ আসা-যাওয়া। অবশ্য এই ব্যাপারে তিনি কোনওদিন আপত্তি করেননি, বরং মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন। কারণ ঘর পরিবার ভালো, বিয়ে হলে মেয়েটি সুখী হতে পারবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। যদিও সেটা আদৌ সম্ভব হয়নি। চাকরি পাওয়ার পরে মেয়েটি তার পছন্দ করা অফিসের একটি ছেলেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিল। রায়বাবুর প্রতি ছেলেটির আক্রোশের একমাত্র কারণ ছেলেটির ব্যর্থ প্রেম।

তখন গভীর রাত। আজ ক’দিন যাবৎ এমন বৃষ্টি শুরু হয়েছে যে, একবারের জন্যেও বিরতি নেই। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এমন বৃষ্টি কেউ দেখেছে কিনা সন্দেহ। বহু বছরের জমানো আক্রোশ না থাকলে প্রকৃতি এমন প্রতিশোধ নিতে পারে না। স্রোতের মুখে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত। দিন-রাত মিলেমিশে প্রায় একাকার হয়ে গিয়েছে।

বৃষ্টির সাথে বুকের সাঁই সাঁই শব্দটাও বেড়ে চলেছে। হাপরের মতো বুকটা উঠছে নামছে। পাঁজরের হাড়ে অসহ্য ব্যথা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেও তিনি অপারগ। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা, চোখে এক ফোঁটাও ঘুম নেই। মাথার দিকের জানালাটা খোলা।

দরজা-জানালা বন্ধ করে তিনি শুতে পারেন না কোনওদিন। তার শ্বাসকষ্ট হয়। বৃষ্টি ভেজা বাতাস এসে লাগছিল তার গায়ে। জানালাটা বন্ধ করার ইচ্ছে থাকলেও ওঠার ক্ষমতা ছিল না। রায়বাবু নীরবে বালিশে মাথা রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের অদৃষ্টের কথা ভাবছিলেন— বলতেই হবে ছেলেটি তার জীবনদান করেছে। নইলে সামান্য পেনশনের টাকায় তার পক্ষে জীবনধারণ করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াত। তিনি ছাড়া সংসারে যে আরও তিনটি প্রাণী। ওরা সকলেই তার মুখাপেক্ষী হয়ে দিনযাপন করে চলেছে। ওদের বাঁচিয়ে রাখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব যে তারই কাঁধে।

স্মৃতি রোমন্থনের মাঝখানে হঠাৎ একটি অস্ফুট কণ্ঠস্বর শুনতে পান— কে-দা-র।

বৃষ্টি-বাদলের দিনে এই অন্তরঙ্গ ডাকের যে কী অর্থ, তা হৃদয়ঙ্গম করতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না। শ্বাসকষ্টের কারণে তিনি নিজেই পর্যুদস্ত। তাই উঠতে ইচ্ছে না করলেও তবু বাধ্য হয়ে উঠতে হয়। নইলে এই ডাক তাকে বারংবার বিদ্ধ করবে। সংসারে মেয়ে-জামাই ব্যতীত বৃদ্ধার আপন বলতে কেউ নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি মেয়ের বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে আছেন। বিগত ছয়বছর যাবৎ শয্যাশায়ী। বিছানা নোংরা হয়ে গেলে বুঝতে পারেন, আর তখনই ডাক পড়ে কে-দা-র। দিনেরবেলায় যৎ সামান্য চোখে দেখেন আর রাতে প্রায় অন্ধ৷

অতঃপর স্ত্রীর অনুরোধ রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে রায়বাবুকে শাশুড়ি-র কাছে এগিয়ে যেতে হয়। ঘরের মধ্যে ঢুকতেই দুর্গন্ধে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার উপক্রম। চিড়িয়াখানার পুতি দুর্গন্ধময় খাঁচার চেয়েও ভয়ঙ্কর সেই গন্ধ। অথচ সেই কবে থেকে তিনি নিয়মিত কর্তব্যপালন করে আসছেন! একদিনের জন্যেও রেহাই নেই। জীবন একেবারে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কে বলতে পারে আরও কতদিন দুর্ভোগ লেখা আছে তার কপালে!

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...