ছোট্ট একটা রাজ্য সিকিম। পূর্ব হিমালয়ের কোলে শুয়ে থাকা এই শান্ত রাজ্যের চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা উষ্ণতার হাতছানি। কাঞ্চনজঙ্ঘা, চা-বাগান, মনাস্ট্রি, রঙিন পাখি, নদী, ঝরনা, ফুল, ফল— সব মিলে প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্য, মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ছোটো রাজ্য হলেও এখানে দেখার জায়গা প্রচুর। কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড বা হিমাচলের থেকে এর সৌন্দর্য কোনও অংশে কম নয়। পাহাড়ের কোলে থাকা ছবির মতো সাজানো গ্রামগুলোকে ইউরোপের যে-কোনও বিলাসবহুল ট্র্যাভেল ডেস্টিনেশনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পাহাড়ি রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ নেমে আসা খাদ দেখে শরীরে শিহরন জাগে। আবার এই পাহাড়ি রাস্তার আঁকেবাঁকেই হঠাৎ করে দেখা হয়ে যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা ও তার বন্ধুদের সঙ্গে। সিকিমের সৌন্দর্য এক এক অঞ্চলে এক একরকম। একঘেয়ে জীবন থেকে কয়েকটা দিন মুক্তি পেতে এবং জীবনের ছকটাকে বদলে দিতে এবার বেরিয়ে পড়েছিলাম দক্ষিণ সিকিমের দিকে। এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা রাবাংলা। এই ছোট্ট শহর প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাসের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। এখানে প্রতিটি দর্শনীয় স্থান আলাদা আলাদা গল্প শোনায়।

পাহাড়ের মায়াবৃত্ত: ‘পাহাড়’ শব্দের মধ্যেই এমন এক জাদু লুকিয়ে আছে, যা শুনে মনের মধ্যে চমৎকার এক সুরের অনুরণন তোলে। রাবাংলা যেন তারই প্রতিধ্বনি। এই নামের মধ্যেই রয়েছে রঙের আভাস — ‘রাবাং” শব্দের অর্থ ‘রঙিন’, আর ‘লা” মানে পাহাড়ি পথ। মেঘেরা এখানে হাতের মুঠোয় চলে আসে। কুয়াশার পর্দা সরিয়ে সূর্যের প্রথম কিরণ কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে বর্ণিল আঁকিবুকি কাটার খেলা শেষ করে পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধের পদস্পর্শ করে প্রণাম জানায়। পাখির ডাক আর দূরের ঘণ্টাধ্বনি মিলে প্রার্থনার মাধ্যমে এখানে সকাল শুরু হয়। সেই আলোয় দেখা যায় শহরের উচ্চ স্থানে থাকা বিশাল তাম্রবর্ণের বুদ্ধমূর্তি আকাশের সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন। কখনও সে আবার মেঘের অন্তরালে চলে যায়। মেঘ আর মূর্তির এই নিরন্তর লুকোচুরি খেলা এখানকার অভিনব বিষয়।

প্রার্থনার ভোর: রাবাংলার মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বুদ্ধ পার্ক। এর আরেক নাম তথাগত সাল। ২০১৭ সালে সিকিমের ৩৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে, রাজকীয় ঐতিহ্যকে স্মরণ করে নির্মিত তাম্রবর্ণের বুদ্ধমূর্তি ঘিরে অপূর্বসুন্দর পার্কটি গড়ে উঠেছে, যার ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছে দিগন্তবিস্তৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার গিরিশৃঙ্গ। পার্ক খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। পার্শ্ববর্তী বেশ কিছু জায়গা রাবাংলা বাজার এলাকা বলে পরিচিত। কোলাহলে পূর্ণ এই অঞ্চল পেরিয়ে পার্কের ভিতরে প্রবেশ করলেই এক ভিন্ন জগতের সন্ধান পাওয়া যায়। বহুবার এলেও প্রতিবারই এখানকার বুদ্ধমূর্তির স্থাপত্য দেখে চমকিত হই।

মূর্তিটি তিব্বতি ও আধুনিক স্থাপত্যের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। বেশ কিছুটা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয়। মূল মূর্তির পিছনে রয়েছে প্রার্থনা কক্ষ। এখানে ধর্মীয় চিত্রকলার প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। চতুর্দিকে আছে পরিক্রমা পথ, যেখানে ভক্তরা মন্ত্রপাঠ করে প্রদক্ষিণ করেন। চারিদিকের বিস্ময়কর প্রকৃতির কমনীয়তা ও ঐশ্বরিক ভূমির মধ্যে তথাগতর দেবদূতোপম মূর্তির সামনে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করি শান্তির বারি সেচন করিতে এসেছিলে ধরাধামে, হে তথাগত দাও গো শরণ তোমার ওই পদতলে। বুদ্ধের দুটি অর্ধনিমীলিত চোখের দিকে তাকিয়ে সব অপূর্ণতা, অপ্রাপ্তির হাহাকার এক নিমেষে মিলিয়ে যায়। চারদিকে রঙিন প্রার্থনা পতাকায় লেখা মন্ত্ৰ হাওয়ায় উড়তে থাকে। তাঁর শান্তসমাহিত পবিত্র রূপমাধুর্য মনের গভীরে বিরাজ করে।

সন্ধে নামতে না নামতেই চারিদিকের আলোয় বুদ্ধ পার্ক যেন ধীরে ধীরে নিজেকে অন্য এক স্তরে নিয়ে যায়। পর্যটকের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে আসতে থাকে। বুদ্ধমূর্তিটি তখন আর শুধুমাত্র স্থাপত্য নয়, পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব প্রহরী। অস্তগামী সূর্যের শেষ রং যখন তার সোনালি আভায় মিশে যায়, তখন মূর্তির চোখও আরও গভীর হয়ে ওঠে। সাজানো পার্কের ছিমছাম পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে শোনা যায় প্রার্থনার মৃদু সুর। সন্ধ্যার আলোয় বুদ্ধ পার্ক কেবল দর্শনীয় স্থান নয়, এ এক অন্তর্যাত্রার প্রারম্ভ। দিনের ব্যস্ততা কমে এলে নিজের সঙ্গে একটু কথা বলা যায়। পাহাড়ের নীরবতা আর বুদ্ধের স্থির দৃষ্টি মিলিয়ে দেয় মানুষ আর প্রকৃতির সীমারেখা। রাবাংলার এই সন্ধ্যা তাই শুধু চোখে দেখার জন্য নয়, মনের জন্যও এক নরম আলোকস্নান- যেখানে শব্দ কম, কিন্তু অনুভব বড়ো হয়ে ওঠে।

মনাস্ট্রির নীরবতা: রাবাংলা থেকে প্রায় ১৩ কিমি দূরে অবস্থিত এডি কাণ্ড্য বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মনাস্ট্রি, স্থানীয়দের কাছে যা ‘রালং মনাস্ট্রি’ নামে পরিচিত। আঁকাবাঁকা রাস্তা, পাশে গিরিখাত, হঠাৎ করে বাউন্ডুলে মেঘের দলের গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে হামলে পড়া দেখতে দেখতে এগিয়ে চলি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির কণায় জানলার কাচ ভিজিয়ে আবার তারা উধাও হয়ে যায়। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘেদের ফাঁকফোকর গলে রোদ্দুরের ঝিলিকে পালাবদল ঘটে। মেঘ-কুয়াশা-রোদ-বৃষ্টির চিরন্তন খুনসুটির এই পাহাড়িয়া ম্যাজিক দেখতে দেখতেই পৌঁছে যাই মনাস্ট্রির সামনে। প্রবেশপথে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ রঙের অলংকরণের তিব্বতি শিল্পকলা চোখে পড়ে। দেয়ালে এঁকে রাখা প্রতিটি রেখা যেন এক একটি উপাখ্যান।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...