কিংবদন্তি অনুসারে অষ্টাদশ শতকে চোগিয়াল গুরমেন নামগ্যালের সময় তিব্বত থেকে আনা পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ও বস্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে রালং মনাষ্টির সূচনা করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে রালং এলাকাটি সিকিম ও তিব্বতের ধর্মীয় সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করত। এই মনাস্ট্রি দুটি ভাগে বিভক্ত— পুরাতন রালং ও নতুন রালং। পুরোনো গুম্ফার ঐতিহ্য অটুট রেখে ১৯৯৫ সালে নতুন ভবনটি নির্মিত হয়। নতুন মনাস্ট্রির পোশাকি নাম ‘পালনে চোলিং’। এখানে বজ্রযান ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন প্রতীক আর লাল, হলুদ ও নীল রঙের উজ্জ্বল ব্যবহার বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়।

প্রার্থনা হলে বিশালাকার সব থাংকা আর নানা চিত্রের সমাহারে বোধিসত্ত্ব ও ধর্মরক্ষকদের প্রতিমূর্তির অর্থ ব্যাখ্যা করা আছে। মনাস্ট্রির ছাদের কারুকাজ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে আঁকা ড্রাগন আর পৌরাণিক প্রতীকগুলো শক্তি ও সুরক্ষার চিহ্ন। দেয়ালে আঁকা বোধিসত্ত্ব, রক্ষাকর্তা দেবতাদের চোখে আছে এক অদ্ভুত রহস্যময় তীক্ষ্ণতা।

প্রার্থনা চক্রের প্রতিটি ঘূর্ণনে, মনাস্ট্রির অন্দরমহলে ‘ওঁ মনি পদ্মে হুম’ মন্ত্রের প্রতিধ্বনিতে চারিদিকে ঐশ্বরিক পরিবেশের আবহ তৈরি হয়েছে। পুরাতন রালং মনাস্ট্রির কাঠের কাজ তুলনামূলক ভাবে বেশি ঐতিহ্যবাহী, কিন্তু নতুন ভবনে আধুনিক স্থাপত্যের প্রভাব সুস্পষ্ট। পুরোনো রালং মনাস্ট্রিকে দেখে মনে হয়— সে যেন এখনও ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিচিহ্ন বুকে আগলে রেখে পাহাড়ের কোলে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।

বাইরের চত্বরে রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগে লিখিত বাণী বাতাসে ভেসে বেড়ায়। প্রার্থনাকক্ষের ভিতরে মাখনের প্রদীপের গন্ধ, নানা প্রকার বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে পরিবেশ গম্ভীর। তরুণ লামা সন্ন্যাসীরা মন্ত্রপাঠে মগ্ন, কয়েকজন প্রবীণ সন্ন্যাসী জপমন্ত্র ঘোরাতে নিমগ্ন। বসে পড়লাম এক কোণে। পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে গিয়ে পবিত্র মন্ত্রধ্বনি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে শব্দেরা বাঙ্ময় হয়ে উঠছে। ঢেউয়ের মতো ওঠানামায় তাঁদের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ধ্বনি অন্তরের অস্থিরতাকে প্রশমিত করে। এক অদ্ভুত প্রশান্তির মধ্যে মনে হয় জীবনের যে অস্থিরতা, তা আসলে সাময়িক।

পাহাড় যেমন স্থির, তেমনই হাজার প্রতিকূলতার বিরুদ্ধেও অবিচল হয়ে স্থির থাকার শিক্ষা দেয় এই ধর্মীয় স্থান। এখানে প্রায় ৫০০ জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বসবাস করতে পারেন। দোতলা সমান এই বুদ্ধমূর্তির মাথার পিছন দিক থেকে একপ্রকার নীলাভ আলোর জ্যোতি এখানকার পরিবেশকে অন্যরকম করে তুলেছে। রালং মনাস্ট্রির আরেকটি অনন্য আকর্ষণ হল এর বার্ষিক ছাম নৃত্য— মাস্ক পরা লামা সন্ন্যাসীদের নৃত্য, যেখানে শুভ-অশুভের লীলাখেলা রঙিন মুখোশে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কয়েকদিন আগে সম্পন্ন হওয়া সেই উৎসবের রেশ রয়ে গেছে। প্রাঙ্গণের প্রতিটি ইট যেন তার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলে পাহাড়ের ছায়া লম্বা হয়। দূরে কুয়াশার চাদরে ধীরে ধীরে ঢেকে যায় তার শিখরগুলো। ফিরে তাকাই মনাস্ট্রির চূড়ায়। শেষ বিকেলের সোনালি রং সেই চূড়ার উপর পড়েছে। তার অপার্থিব রূপ মনের মধ্যে এক অনির্বচনীয় সুখানুভূতির সৃষ্টি করে। ফিরতি পথে গাড়ি যখন নামছিল, তখন মনে হচ্ছিল— রালং মনাস্ট্রির ভাবগম্ভীর পরিবেশ আমাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিল। মনের একটু স্থিরতাও প্রার্থনার মতোই নীরব একটি শক্তি বহন করে। পাহাড় ছেড়ে শহরে ফিরলেও সেই নীরবতা দীর্ঘদিন ধরে মনের ভিতরে জাগরূক থাকে। এই ভ্রমণ কেবল একটি স্থান-দর্শন নয়, আত্ম-দর্শনও। রাবাংলার নীরব সকাল আর রালং মনাস্ট্রির ধূপের সুগন্ধ মিলে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে দেয়।

শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এসে বুঝতে পারলাম— নীরবতার মধ্যেও থাকে এক পূর্ণতা। রাবাংলা যদি নীরবতার সৌন্দর্য, প্রকৃতির ধ্যানমগ্ন কবিতা হয়, তাহলে রালং মনাস্ট্রিকে বলা যায় আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসগ্রন্থ, যেখানে রয়েছে ভক্তির গভীরতা। একদিকে রাবাংলার অনিশ্চিত প্রকৃতির মহিমা, অন্যদিকে রালংয়ের মন্ত্র, থাংকার চিত্র আধ্যাত্মিকতার নিবিড় ছায়া— দুটি মিলেমিশে এক হয়ে থেকে যায় অনন্য অভিজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে।

দক্ষিণ সিকিমে এসে নামচি আর টেমি টি গার্ডেনে না গেলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই পরেরদিন আমাদের গম্ভব্য ছিল এই দুই জায়গা। প্রথমে গেলাম টেমি টি গার্ডেনে। এটাই সিকিমের একমাত্র চা-বাগান। একে দেশের জৈবসারে উৎপাদিত চায়ের বাগান ও বলা যেতে পারে। সূর্যের মায়াবী আলোয় পাহাড়ের ধাপে ধাপে বিস্তৃত ঘন সবুজ চা-বাগান তার সমস্ত সৌন্দর্যের ডালি উজাড় করেই আমাদের স্বাগত জানাল। এখানে বেশ ভালো মানের চা উৎপাদিত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারেও এর বেশ চাহিদা আছে। এখানে উৎপাদিত চায়ের মধ্যে গুণগত মানে সবচেয়ে ভালো চা ‘টেমি চা’ নামে পরিচিত। এছাড়াও আরও কয়েকটি নাম তালিকায় যুক্ত আছে। যেগুলি হল ‘সিকিম যোলজা’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা টি’ এবং ‘সিসটিক্’। চা-বাগানের পাশের কয়েকটি দোকানের কাউন্টারেই শোভা পাচ্ছে চায়ের মোড়কগুলি। এই চা-বাগানের মধ্যেই চা তৈরির কারখানাও আছে। এখানে যাওয়ার রাস্তাটিও খুব সুন্দর।

সবুজের ঢেউয়ে দুপুর: অর্গানিক চা চাষের জায়গাটিকে ‘স্বর্গের নন্দনকানন’ বললেও চলে। যত দূর চোখ যায় তত দূর দেখতে পাওয়া যায় ঢেউখেলানো চা গাছের উঁচু-নিচু সারি। দূরে যেখানে পাহাড় শেষ হয়েছে বলে মনে হয়, ঠিক সেখানেই যেন আকাশের সব নীল নেমে এসেছে সবুজের বুকে। আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো মেঘের দল। টিকিট কেটে বাগানে প্রবেশ করতেই সদ্য ধেয়ে আসা মেঘ যেন ঘিরে ধরল আমাদের। রোদ্দুরমাখা চা-বাগিচায় পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে সবুজ জেল্লা। টেনডং পাহাড়ের এক কোনায় সে রূপের ডালি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। যেদিকেই তাকাই সেদিকেই চা-গাছের সবুজ গালিচা। এই ঝোপের মধ্যে দিয়েই চলে গেছে পাকদণ্ডী পথ। পথ বেয়ে পিঠে টুকরি নিয়ে শুরু রয়েছে চা-বাগানের কর্মীদের আনাগোনা। শীতের স্তব্ধ সকালে এই পাহাড়ি চা-বাগানে তাদের হাতে ফুটে উঠতে থাকে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ির লাবণ্য। সমস্ত মুগ্ধতা জড়ো করে এনে দেখতে থাকি সেই দৃশ্য।

(ক্রমশ… )

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...