এমন কিছু অসুস্থতা আছে, যা শুধু স্ক্যান-এ কিংবা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে। ফাইব্রোমায়ালজিয়ার মতো সমস্যাও ওইরকমই, অর্থাৎ যা খালি চোখে অদৃশ্য। যারা এই সমস্যা নিয়ে জীবনযাপন করেন, তাদের জন্য ফাইব্রোমায়ালজিয়া অনেক সময় তীব্র কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। চিকিৎসাগত মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, ফাইব্রোমায়ালজিয়া কেবল একটি শারীরিক অস্বস্তির অবস্থা নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবদীপ রায় চৌধুরী।

অবশ্য, ফাইব্রোমায়ালজিয়া বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় দুই থেকে চার শতাংশকে প্রভাবিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলিতে প্রায় চল্লিশ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক এই অবস্থা নিয়ে জীবনযাপন করছেন। মজার বিষয় হল, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এই রোগ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি নির্ণয় করা হয়, কখনও কখনও দুই থেকে নয় গুন বেশি। যদিও জানা গেছে যে, পুরুষদের মধ্যে এই রোগ সঠিক ভাবে নির্ণয় করা হয় না।

এটি সাধারণত মধ্যবয়সে দেখা দেয়। যদিও এটি জীবনের যে-কোনও পর্যায়ে ব্যক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ব্যাপকতা সত্ত্বেও, ফাইব্রোমায়ালজিয়াকে ঘিরে ভুল ধারণা রয়ে গেছে। কারণ এটি প্রচলিত অসুখগুলির মধ্যে পড়ে না। কিন্তু কী এই ফাইব্রোমায়ালজিয়া?

আসলে, ফাইব্রোমায়ালজিয়া (Fibromyalgia) হল একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি, যা শরীরে ব্যথা, চরম ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে ব্যথার সংকেত প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। যদিও এর কোনও স্থায়ী নিরাময় নেই, তবে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক চিকিৎসায় সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ট্রমা, সার্জারি কিংবা সংক্রমণের পর ফাইব্রোমায়ালজিয়া-র লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পরিবারে কারওর এই সমস্যা থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী সহস্রাধিক মানুষ এই রোগটিতে আক্রান্ত হন। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত এবং পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে ফাইব্রোমায়ালজিয়া-র হার প্রায় সাতগুন বেশি।

প্রচলিত তথ্য অনুসারে, একসময় এই সমস্যাকে বলা হতো— মাসক্যুলার রিউম্যাটিজম। ১৮২০ সালের দিকে স্কটল্যান্ডের একজন চিকিৎসক রোগটির বিষয়ে বিশদ তথ্য দেন। ১৯০৪ সালে গাওয়ার সর্বপ্রথম ‘ফাইব্রোসাইটিস’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে শব্দটি ‘ফাইব্রোমায়ালজিয়া’ শব্দে পরিবর্তিত হয়। শব্দটি ল্যাটিন শব্দাংশ ফাইব্রা (তন্তু), গ্রিক শব্দাংশ মায়োস (পেশি) এবং অ্যালগস- এর (ব্যথা) সমন্বয়ে গঠিত। ১৯৮৬ সালে গবেষকরা এই রোগে নরএপিনেফ্রিক এবং সেরোটোজেনিক ড্রাগস ব্যবহার করে সুফল পান।

গবেষকদের মতে, কিছু জিনের মিউটেশনের কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে৷ যদিও কোন কোন জিন এজন্য দায়ী, তা এখনও সুনির্দিষ্ট ভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, এই জিনগুলো শরীরের সেরাটোনিন, ডোপামিন এবং ক্যাটেচোলামিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা

ফাইব্রোমায়ালজিয়া-কে সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকা পেশী ও হাড়ের ব্যথা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। কিন্তু এর বাস্তব অভিজ্ঞতা এর চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। যেমন—

  • ক্রমাগত ক্লান্তি, যা বিশ্রামেও কমে না
  • অগভীর ঘুম
  • স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার কারণে গুছিয়ে কথা বলতে না পারা, যা ‘ফাইব্রো ফগ’ নামে পরিচিত
  • স্পর্শ, আলো কিংবা শব্দের প্রতি বর্ধিত সংবেদনশীলতা
  • মানসিক যন্ত্রণা, যার মধ্যে উদ্বেগ এবং মনমরা ভাব অন্তর্ভুক্ত।

ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক ব্যক্তি মনোযোগ দিতে অথবা বিস্তারিত তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে অসুবিধার কথা জানান। এই উপসর্গগুলো গৌণ নয়, এগুলোই এই রোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এর ফলে যা প্রকাশ পায়, তা কোনও একটি একক উপসর্গ নয়, বরং পরস্পর সংযুক্ত অভিজ্ঞতার এক জাল, যার প্রতিটি একে অপরকে প্রভাবিত করে।

তীব্রতা বৃদ্ধি

আধুনিক বিজ্ঞান ফাইব্রোমায়ালজিয়া-কে পেশী বা জয়েন্টের রোগ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসেছে। এর পরিবর্তে, মনোযোগ এখন মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের দিকে সরে গেছে।

বর্তমান উপলব্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেন্ট্রাল সেনসিটাইজেশন-এর ধারণা। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে মস্তিষ্ক ব্যথার সংকেতের প্রতি অস্বাভাবিক ভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। সহজ কথায়, ব্যথার ‘তীব্রতার মাত্রা’ বেড়ে যায়।

এর মানে হল, যে অনুভূতিগুলো অন্যদের কাছে হালকা মনে হয়, সেগুলো ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে তীব্র এবং অসহনীয় মনে হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এর ফলে ব্যথার বাস্তবতা একটুও কমে যায় না। বরং, এই অভিজ্ঞতাটি কতটা বাস্তব এবং স্নায়ুগত ভাবে কতটা দৃঢ়, তা আরও স্পষ্ট করে তোলে।

ব্যথার মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে, ফাইব্রোমায়ালজিয়া ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার প্রতি তার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত।

আবেগের স্তর

দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা খুব কমই একা আসে। ফাইব্রোমায়ালজিয়া-র ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রায়ই বিষণ্ণতার সঙ্গে বহমান এবং গবেষণায় দেখা গেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় আক্রান্ত প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যক্তি উল্লেখযোগ্য মানসিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হন। কারণ—

  • ব্যথা মানসিক চাপ বাড়ায়
  • মানসিক চাপ ব্যথার অনুভূতিকে তীব্র করে তোলে।

ফাইব্রোমায়ালজিয়া-য় আক্রান্ত অনেক ব্যক্তি ব্যথার ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। অর্থাৎ সবচেয়ে খারাপটা আশা করার কিংবা উপসর্গের কারণে তীব্র ভয়বোধ করার প্রবণতা দেখা যায়। এর পাশাপাশি, শারীরিক সংবেদনশীলতার প্রতি মনোযোগ বেড়ে যেতে পারে, যেখানে সামান্য পরিবর্তনও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়।

মানসিক চাপ এবং মানসিক আঘাতের ট্রমা

ফাইব্রোমায়ালজিয়া-য় আক্রান্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কিংবা শৈশবের প্রতিকূলতার ইতিহাস জানান। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাকে, বিশেষকরে হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রিনাল (HPA) গ্রন্থিকে অনিয়ন্ত্রিত করে তুলতে পারে। এই অনিয়ন্ত্রণ সহজে চলে যায় না। বরং, এটি স্নায়ুতন্ত্রকে আরও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল, আরও বেশি সংবেদনশীল এবং আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। অর্থাৎ, শরীর কেবল শারীরিক ধকলই বহন করে না, বরং অতীতের অভিজ্ঞতার ছাপও বহন করে এক্ষেত্রে।

অদৃশ্য অসুস্থতা এবং এর সামাজিক প্রভাব

ফাইব্রোমায়ালজিয়া-র সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর মধ্যে একটি হল এটি প্রায়ই অদৃশ্য থাকে। এতে কোনও স্পষ্ট বাহ্যিক লক্ষণ থাকে না। ফলে, অনেক ব্যক্তি অন্যদের কাছ থেকে, এমনকী কখনও কখনও নিজের কাছেও সন্দেহের সম্মুখীন হন। এর ফলে, এটি আত্ম-সন্দেহ, বিচ্ছিন্নতা এবং নিজেকে মূল্যহীন মনে করার দিকে নিয়ে যেতে পারে। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সামাজিক প্রতিক্রিয়াটি রোগের লক্ষণগুলোর মতোই প্রভাবশালী হতে পারে।

সাধারণত, ফিজিওথেরাপি, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম (যেমন হাঁটা, সাঁতার), সুষম খাদ্য এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে ফাইব্রোমায়ালজিয়া-র সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আসলে, ফাইব্রোমায়ালজিয়া-র কোনও স্থায়ী নিরাময় সম্ভব নয়। বরং, এর কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য বহুমাত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন, যার মধ্যে চিকিৎসাগত এবং মনস্তাত্ত্বিক উভয় যত্নই অন্তর্ভুক্ত।

কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)

CBT ব্যক্তিদের ক্ষতিকর চিন্তার ধরন শনাক্ত করতে এবং সেগুলোকে নতুন রূপ দিতে সাহায্য করে। এটি ব্যথা পুরোপুরি দূর করে না। কিন্তু এরসঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক যন্ত্রণা এবং অসহায়ত্ব কমিয়ে সার্বিক কার্যকারিতা উন্নত করে।

মাইন্ডফুলনেস এবং সচেতনতা

মাইন্ডফুলনেস চর্চা ব্যক্তিদের কোনওরকম বিচার-বিবেচনা ছাড়াই তাদের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করতে উৎসাহিত করে। এটি ব্যথার মানসিক তীব্রতা কমাতে পারে এবং অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

অ্যাকসেপ্টেন্স অ্যান্ড কমিটমেন্ট থেরাপি (ACT)

ACT যন্ত্রণা দূর করার পরিবর্তে তার সঙ্গে অর্থপূর্ণ ভাবে জীবনযাপনের উপর মনোযোগ দেয়। এটি ব্যক্তিকে অস্বস্তির মধ্যেও মূল্যবান কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে।

কাজের গতি নিয়ন্ত্রণ

কাজ এবং বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখা, অর্থাৎ যাকে প্রায় কাজের গতি নিয়ন্ত্রণই বলা হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। অন্যদিকে, কাজকর্ম অতিরিক্ত এড়িয়ে চলার প্রবণতা জীবনের মান কমিয়ে দিতে পারে। লক্ষ্য হল একটি টেকসই মধ্যপন্থা অবলম্বন করা।

সঠিক ভাবনা

ফাইব্রোমায়ালজিয়া এমন একটি সমস্যা, যার দ্বারা আমরা যন্ত্রণার মানবিক অভিজ্ঞতাকে আরও ভালো ভাবে বুঝতে পারি। এটি কোনও দুর্বলতা নয়। এটি কোনও অতিরঞ্জনও নয়। এটি একটি বাস্তব, জীবন্ত এবং অত্যন্ত জটিল বিষয়। তাই, ‘আপনার কী হয়েছে?’ এই প্রশ্নটি না করে, বরং ‘আপনার অভিজ্ঞতা কী এবং আমরা কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ এই প্রশ্নটি করা উচিত ফাইব্রোমায়ালজিয়া-য় আক্রান্ত ব্যক্তিদের।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...