—তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি নষ্ট করছি! করছি না। আমি ঘোরতর ভাবে বাঁচছি।

মনোনীতা অনেক পুরোনো বন্ধু। কলেজ দিনের। হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করে। স্বামী আর দুই কন্যা নিয়ে ঘোরতর সংসারী। কিন্তু আইজ্যাকের সঙ্গে যোগাযোগটা একেবারে ছিন্ন করে দেয়নি। ও মাঝে মাঝে এই কফিশপে বিকেলে বসে। একটু কফি খায়, গল্প করে।

—ছাই বাঁচছ। একজন মেয়ে তোমার জীবনে না ঢুকলে বা একজন মেয়ের জীবনে তুমি না ঢুকলে জানবে কী করে জীবন কী। অর্ধেক তো অজানা থেকে গেল!

আইজ্যাক চোখের চশমার কোণে পিটপিটে এক হাসি তুলে নিয়ে বলে, “তোমায় কে বলল, আমি তোমাদের সংসারী বাঁচা জানি না! তোমাদের থেকে ঢের ভালো বাঁচা আমি জানি। জানো তো, ছোটোবেলায় সুকুমার রায়ের খুড়োর কল পড়েছিলাম, ছবি দেখেছিলাম। তখন তেমন করে মানে বুঝিনি। এখন খুড়োর কলকে আমি দিব্য ব্যবহার করি।”

মুখ থেকে কফির কাপ নামিয়ে রেখে মনোনীতা বলল, ‘ইন্টারেস্টিং! বলো তো একটু শুনি।”

জানো মনোনীতা, ওই বিয়েটিয়ে, তোমরা যা না করলে জীবন অসম্পূর্ণ ভাবো, আমি তা ভাবি না। আমি বরং ভাবি, বিয়ে হছে জীবনের একটি নিশ্চিত পরাজয়।

—পরাজয় বলা যাবে না। তবে বলতে পারো বিয়ের পর ছেলে ও মেয়েটির স্বাধীনতা ধ্বংস হয়ে যায়।

—আরও একটা জিনিস ধ্বংস হয়, তা হল বাঁচার আগ্রহ। আইজ্যাক সটান বলে দিল।

ভ্রূ পাকায় মনোনীতা।

—এই যে দ্যাখো কফির কাপে তোমার শেষ চুমুক দেওয়া হয়ে গেছে। আর পড়ে নেই। আর এক কাপ তুমি খাবেও না। মানে তোমার আর তেষ্টা নেই। মানে যদি ধরো তেষ্টাই তোমাকে হাইকোর্ট থেকে ছুটিয়ে এনে এই শ্যামবাজারে ফেলেছে, তা এখন আর নেই। মানে এখন আর তোমার ভিতর ছোটার এনার্জি নেই। এখন তুমি তোমার শরীরটা কোনওমতে বয়ে নিয়ে বাড়িতে ফেলবে। তোমার মনোজগতেরও কোনও এলিভেশন থাকবে না। এই বাঁচাটা আমার পছন্দ নয়।

—তার মানে তুমি বিয়ের বিরোধী নও। কিন্তু বিয়ে করার পর বাঁচার মোটিভেশন হারিয়ে ফেলার ভয়ে তুমি বিয়ে করছ না।

—গ্রেট ইউ আর। এই জন্যই তো জাঁদরেল এই আইন ব্যাবসায়ীকে আমার পছন্দ। মনোনীতা, আমি আরও খোলসা করি। বিয়ে করা মানে সম্পর্ক টম্পর্ক চুলোয় যাক, পুরুষ ও নারীর শারীরিক একটা সুখের জগত চেখে দেখা। কিন্তু দেখো, সঙ্গম শেষ হলেই অনেক সিনেমায় দেখেছি নায়িকার পাশে কেতরে শুয়ে পড়ে নায়ক। মরার মতো শুয়ে থাকে। তার সমস্ত ঈপ্সা মুহূর্তে ব্লটিং পেপার দিয়ে কেউ শুষে নিয়ে যায়। এই ঈপ্সা শেষ মানে জীবন শেষ। আমি চাই খুড়োর কলের মতো ওই ঈপ্সা, মানে সঙ্গমের ইচ্ছা আমাকে গোটা জীবন মোটিভেট করতে থাকুক বাঁচায়। আমার ঈপ্সা যেন ফুরিয়ে না যায়। যেন অনন্ত হয়। তাই তো গোড়াতেই আমি শত্রু নিধন করে বিয়েকে বা বলা যায় মিলনের একটি ইন্সট্রুমেন্টকে দূরে ঠেলে দিয়ে শুধু বাঁচায় বাঁচি। আমার ভিতর যে সঙ্গম ইচ্ছা তা প্রতিদিন আমার বাঁচার ফুয়েল। বিয়ে করে তাকে নষ্ট করব কেন!

চা-এ একটামাত্র চুমুক দিয়ে আইজ্যাক আগের ভাবনায় চলে গিয়েছিল। কয়েক মুহূর্ত সে ভাবনার বয়স। মানে দুটি চুমুকের মধ্যবর্তী সময়ে আইজ্যাক মনোনীতার সঙ্গে কফিশপে ঘুরে এল। দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে ব্যাপারটা বুঝে ফেলতেই আইজ্যাক ফিক করে একটু হেসে নিল। সকাল থেকে যে ভারী আবহাওয়ার ভিতর আছে, তা থেকে এক টুকরো রিলিফ। আইজ্যাক এমনি চিলতে চিলতে ঘুমিয়ে নিতেও পারে। সবচেয়ে ভালো একটা ঘুম মনে পড়ল এখন, ট্রামে উঠে বসার সিট পেয়ে মৌজ করে বসতে না বসতেই কন্ডাক্টর টিকিট নিতে এসেছে। তাকে টিকিটের দাম দিতে দশ টাকা ধরিয়ে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল আইজ্যাক। তারপর ‘ও দাদা টিকিট নিন’, ডাকে ঘুম ভাঙা। এই সময়ের ভিতর আইজ্যাক প্রায় একরাতের ঘুম ঘুমিয়ে নিয়েছিল।

অফিসে না গিয়ে আইজ্যাক হানা দিয়েছে আজ একটি মলে। সাড়ে বারোটা থেকে এসে বসেছে। চারতলার ফুড কোর্ট-এ চেয়ার পাতা আছে রেলিং-এর পাশে। সেখানে বসে মূল গেটের আসা যাওয়ার লোকজন দেখা যায় একটু দূরে। আর একদম কাছেই চোখের উপর রয়েছে একটা এস্কালেটর।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...