প্রাচী তেহলান এমন একটি নাম, যে নামের জনপ্রিয়তা খেলার মাঠ থেকে রুপোলি পর্দা পর্যন্ত ছড়িয়েছে। তাঁর সফর শুরু হয়েছিল ভারতীয় নেটবল দলের মাধ্যমে, যেখানে তিনি শুধু দেশের প্রতিনিধিত্বই করেননি, কমনওয়েলথ গেমসের মতো বিশাল মঞ্চেও নিজের প্রতিভা প্রদর্শন করেছিলেন। খেলাধুলা তাঁকে শুধু জিততেই শেখায়নি, বরং সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতেও শিখিয়েছে।
খেলাধুলার পর, সিনেমার হাত ধরে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। গত আট বছরে তিনি বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। একজন অভিনেত্রী হিসেবে, তিনি প্রতিটি চরিত্রে নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছেন, তা সে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কোনও চরিত্রই হোক, অ্যাকশনধর্মী চরিত্রই হোক কিংবা সাধারণ কোনও চরিত্র। এখন তাঁর লক্ষ্য- হলিউড। সেখানে তিনি তাঁর অভিনয়ের নতুন মাত্রা প্রদর্শন করতে পারবেন বলে মনে করছেন।
তাঁর গল্প এখানেই শেষ নয়। তিনি একজন সমাজ সেবিকাও। ‘প্রাচী তেহলান ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে তিনি কাজ করেন মেয়েদের শিক্ষা এবং সামগ্রিক ভাবে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য। এখন তিনি তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে তাঁর ফাউন্ডেশনে খেলাধুলার কার্যক্রম ও টুর্নামেন্ট অন্তর্ভুক্ত করতে চান।
চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর অনুরাগ আরও জোরদার করতে তিনি ‘Raystride Studios’ নামে নিজের একটি প্রযোজনা সংস্থাও চালু করেছেন।
তাঁর জীবনযাপন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করার একটি স্বতন্ত্র ধরন রয়েছে। তিনি বই পড়তে, নতুন জায়গা, বিশেষকরে পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে এবং বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে ভালোবাসেন।
খেলার জগৎ থেকে রুপোলি পর্দার সফর
এই গল্পটি ২০১৬ সালের। তখন তিনি অ্যাকসেঞ্চারে (Accenture) পরামর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। খেলার মাঠ থেকে কর্পোরেট জগতে তাঁর সফর জারি ছিল। এমন সময় হঠাৎ একদিন তাঁর ফেসবুক ফ্যান পেজে একটি বার্তা আসে, যেটি তাঁকে বিনোদন জগতে প্রবেশের দরজা খুলে দেয়।
বার্তাটি এসেছিল ‘দিয়া অউর বাতি হাম’ নামের একটি জনপ্রিয় টিভি শো থেকে। তারা আরজু রাঠির চরিত্রের জন্য প্রাচীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। শো-টিতে তাঁকে একটি সমান্তরাল প্রধান চরিত্রের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তার আগে পর্যন্ত প্রাচী কখনও কল্পনাও করেননি যে, তিনি কখনও ক্যামেরার সামনে আসবেন। কিন্তু চিত্রনাট্য পড়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল, এই চরিত্রটি তাঁর ভিতরের একটি নতুন সত্তাকে প্রকাশ করার অন্যতম উপায় হতে পারে। এরপর যা ঘটল তা হল, তিনি অ্যাকসেঞ্চারের আরামদায়ক চাকরি ছেড়ে নিজের স্বপ্নের পিছনে ছোটার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং এভাবেই শুরু হল তাঁর অভিনয় জীবন। খেলার মাঠ থেকে রুপালি পর্দা পর্যন্ত এই সফর ছিল যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনই রোমাঞ্চকর।
এভাবেই তিনি স্টার প্লাসের দুটি প্রধান শো-তে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু করেন। প্রথমটি ছিল ‘দিয়া অউর বাতি হাম’ এবং দ্বিতীয়টি ‘ইক্যাওয়ান’, যেখানে তিনি সুশীলা পারেখের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এরপর তিনি পাঞ্জাবি সিনেমায় পা রাখেন। আর তাঁর অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয় ‘বাইলারাস’ এবং ‘আর্জান’ নামে দুটি ছবি।
এরপর তিনি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘মামাঙ্গাম’- এর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন, যেখানে তিনি মালয়ালম সুপারস্টার মামুট্টির বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রটি কেবল তাঁর কর্মজীবনের একটি মাইলফলকই ছিল না, বরং দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর মনে এক বিশেষ ভালোবাসা তৈরি করে দেয়। এরপর তিনি পর্যটন ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী সুরেশ গোপীর বিপরীতে একটি মালয়ালম চলচ্চিত্রে কাজ করেন। এই চলচ্চিত্রটি শীঘ্রই মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। অভিনেত্রী রাকুলপ্রীত সিং-এর ভাই আমনপ্রীতের বিপরীতে একটি তেলুগু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন প্রাচী।
প্রসঙ্গত তিনি জানিয়েছেন যে, প্রতিটি প্রজেক্টই তাঁকে নতুন কিছু শিখিয়েছে, কিন্তু সুপারস্টার মামুট্টির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং সুশীলা পারেখের চরিত্রে অভিনয়, তাঁর হৃদয়ে আজও অমলিন হয়ে আছে। এই দুটি প্রজেক্টই তাঁর কেরিয়ারের স্তম্ভ হয়ে ওঠে।
সাফল্যের রহস্য
সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাস এবং ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি হাইট প্রভৃতি বিশেষত্ব প্রাচী তেহলানের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাস্কেটবল ও নেটবল খেলা হোক কিংবা ‘দিয়া অউর বাতি হাম’-এ সুযোগ পাওয়া, এ সবই আত্মবিশ্বাস এবং উচ্চতার কারণে সুবিধে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ‘দিয়া অউর বাতি হাম’- এর জন্য একজন লম্বা তরুণীর প্রয়োজন ছিল। এটি ছিল অন্যতম একটি কারণ, যার জন্য তিনি সুযোগটি পেয়েছিলেন এবং অভিনেত্রী হয়েছিলেন।
(ক্রমশ… )





