সত্যিটা হল এই যে, ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের জন্য আমি আমার বাবার কাছ থেকে কখনওই কোনও সাপোর্ট পাইনি। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য আমার হাতে ছয় মাস সময় ছিল। কারণ আমি যদি তাঁকে আমার স্বপ্নের কথা বলতাম, তাহলে নিশ্চিত গালে আরও একটা চড় খেতাম। যাই হোক, ঠিক তখনই আমার সাফল্যের সফর শুরু হয়েছিল, যা আমি চুপচাপ নিজের ঘরে বসেই শুরু করেছিলাম।
স্বাধীন হওয়া এবং খ্যাতি ও অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে আমি ২০১৭ সালে আমার প্রথম ছোটো ব্যাবসা শুরু করি। সেই সময়, আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করার জন্য আমি কী করতে পারি, এই চিন্তাটা আমার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরপাক খেত। তখন আমি বেশিরভাগ সময় আমার ঘরেই থাকতাম এবং ভাবতাম কীভাবে নতুন কিছু শুরু করা যায়। সেই সময়েই আমি আমার মোবাইল ফোনে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করা শুরু করি এবং ইউটিউবের মাধ্যমে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করি।
নিজে নিজে শিখে আমি ইনস্টাগ্রামে নিজের একটি পেজ তৈরি করি এবং কার্ড, প্রেমিক-প্রেমিকার কার্ড ও বন্ধুত্বের কার্ড বানানো শুরু করি। আমি ৫০ টাকা খরচ করে কার্ড বানিয়ে ১০০ টাকায় বিক্রি করতাম। আমার ছোটো ভাই আমাকে এতে অনেক সাহায্য করেছে। ও আমার চেয়ে তিন বছরের ছোটো। একটা সময় ছিল যখন আমি ঠিকমতো ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে জানতাম না। আমি ৫০০ টাকায় হাতে তৈরি প্রেমের কার্ড এবং গিফট হ্যাম্পার বিক্রি করা শুরু করি, যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
কিন্তু আমার কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে গোয়ালিয়র ছাড়তে হতো, আর তার জন্য আমি আকাঙ্ক্ষা নামের এক বন্ধুর সাহায্য নিই। আমি সকালে গোয়ালিয়র থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিতাম, সেখানকার সদর বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতাম এবং কার্ড বানানোর সমস্ত সরঞ্জাম আমার কলেজের ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে সন্ধের ট্রেনে ফিরে আসতাম। তারপর, সেই সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করে আমি গিফট কার্ড তৈরি করতাম এবং ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করতাম।

ইংরেজি শিক্ষা
আমি ৫০০ টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাবসা শুরু করেছিলাম। এটি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু একই সঙ্গে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, ব্যাবসার উন্নতির জন্য ইংরেজি বলা এবং বোঝা খুব জরুরি। তাই, আমি ইংরেজি শিখতে শুরু করি, যে ব্যাপারে আমার এক বোন এবং ইউটিউব আমাকে সাহায্য করেছিল।
ডিজাইনার শাড়ির ব্যাবসা
আমি নিজে ডিজাইনার শাড়ি পরতাম এবং সেগুলোর ভিডিও বানিয়ে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করতাম। যখন ধীরে ধীরে শাড়ির অর্ডার পেতে শুরু করি, তখন মা-কে বাড়িতে একজন দর্জি রাখতে বলি এবং তার মাধ্যমে ডিজাইনার শাড়ি ও ব্লাউজ বানিয়ে অনলাইনে বিক্রি করতে শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার কাজ এতটাই ভালো হতে লাগল যে, ২০২০ সালে আমি দিনে ১-২ লক্ষ টাকা আয় করতে শুরু করি। এরপর, আমার আর্থিক সচ্ছলতা আসে এবং আমার আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে।
নিজেকে আরও সুন্দর করে তোলার চেষ্টা
আর্থিক সচ্ছলতা শুধু আত্মবিশ্বাসই বাড়ায় না, নিজেকে সুন্দর দেখানোর ইচ্ছাকেও তীব্র করে তোলে। আমার এখনও মনে আছে, যখন আমি ব্যাবসার কাজে দিল্লির বাজারে যেতাম, তখন আমি আধুনিক ও স্মার্ট মেয়েদের দেখতাম মনোযোগ দিয়ে। আর আমারও ইচ্ছে হতো, আমিও যদি তাদের মতো সুন্দর হতে পারতাম। সেই সময় আমি বেশ মোটা, শ্যামবর্ণ এবং দেখতেও ভালো ছিলাম না। তাই যে ছেলেটিকে আমি খুব ভালোবাসতাম, সে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
আমাকে প্রত্যাখ্যান করার পিছনে তার একমাত্র কারণ ছিল যে, আমি সুন্দরী ছিলাম না। সেই সময় আমি উপলব্ধি করলাম যে, মনটা যতই ভালো হোক না কেন, একটা সুন্দর চেহারা থাকা প্রয়োজন। তাই, ব্যাবসায় উন্নতি করার পর আমি সুন্দরী হওয়ার চেষ্টা শুরু করলাম। এর জন্য আমি কঠোর ডায়েট মেনে চলতাম, সৌন্দর্য বাড়াতে বিভিন্ন ফেসিয়াল ব্লিচ ও বিউটি ক্রিম ব্যবহার করতাম এবং ১৫ থেকে ২০ কিলোগ্রাম ওজন কমিয়ে আমার ফিগারকে নিখুঁত করে তুলেছিলাম।
মিস এশিয়া ট্যুরিজম ইউনিভার্স খেতাব
আমি ২০১৮ সালে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার জগতে প্রবেশ করি এবং আন্তর্জাতিক ভাবে ভারতের জন্য গৌরব বয়ে এনে ‘মিস এশিয়া ট্যুরিজম” এবং “মিস এশিয়া ট্যুরিজম ইউনিভার্স’ খেতাব জয় করি। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার এই পথচলা আমার জন্য সহজ ছিল না। শুরুতে আমি যা-ই করার চেষ্টা করতাম, সবাই তার বিরোধিতা করত। তাই আমি কাউকে কিছু না বলেই সবকিছু করতাম। তবে আমার মামা এবং আমার ছোটো ভাই আমাকে সবসময় উৎসাহিত করেছে।
যখন আমার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল, তখন বিগ বাজারের একটি হল-এ অডিশন হয়েছিল। যেখানে অংশগ্রহণকারীদের একটি সাদা গেঞ্জি ও সাদা শর্টস পরতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি, কারণ বাবা জানতে পারলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতেন। তাই, সেখানে অডিশন না দিয়ে, আমি সরাসরি বিদেশের প্রতিযোগিতায় আবেদন করেছিলাম।
আমার প্রত্যাশার বাইরেই বলা যায়, প্লেনের টিকিট আর সিলেকশন লেটার পাওয়ার পর আমি বাবাকে শেষ দিনে বলেছিলাম। মাকে বলেছিলাম দুদিন আগেই। তারপরেও বাবা আমাকে একই কথা বলেছিলেন, “এখান থেকে গেলে দূরে থাকিস! আমাদের এখানে মেয়েরা এসব করে না।’ সেই সময় আমি বাবার উপদেশ অগ্রাহ্য করেছিলাম। আমি আমার লক্ষ্যে মনোনিবেশ করেছিলাম। লেবাননে প্রতিযোগিতাটি ১২ দিন ধরে চলেছিল এবং আমি ১৬টি রাউন্ড পেরিয়ে ও ৩১টি দেশের মডেলদের পরাজিত করে ‘মিস ট্যুরিজম এশিয়া’ খেতাবটি জয় করি। এই খেতাব জয় আমার জীবনে এক বড়ো পরিবর্তন এনেছিল।
আমার সবচেয়ে বড়ো প্রেরণা
ছোটোবেলা থেকে আজ পর্যন্ত আমার মামা, মামী এবং দিদিমা আমার ইংরেজির খেয়াল রেখেছেন। রাগিনী মামী এবং প্রিন্সি দিদি আমাকে ইংরেজি বলতে সাহায্য করেছেন। আমার মোট ১৪ জন কাজিন। বাবার দিকের আত্মীয়দের সঙ্গে আমার তেমন যোগাযোগ ছিল না, কিন্তু মায়ের দিকের আত্মীয়রা আমাকে অনেক স্নেহ ও সমর্থন করেছেন। কুম্ভমেলায় আটকে পড়া বহু মানুষের জীবন বাঁচানোর পর আমি ‘বিগ বস-১৯’ শো-তে সুযোগ পাই।
মৌনী অমাবস্যার দিন কুম্ভমেলায় পদপিষ্ট হওয়ার দুটি ঘটনা ঘটেছিল। তার মধ্যে আমি একটিতে আটকা পড়েছিলাম। আমি দেখলাম এক মহিলার হাত থেকে একটি শিশু পড়ে গেল এবং আমি সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে ছুটে গেলাম। সেই সময়ের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আমি ও আমার নিরাপত্তারক্ষীরা মিলে প্রায় ৮০-৯০ জনের জীবন বাঁচিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার এটা স্বীকার করতে রাজি হয়নি। আমিও হাল ছাড়তে রাজি ছিলাম না এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই সময়ে আমার লক্ষ্য ছিল মানুষের জীবন বাঁচানো। তাই সরকার কী বলছে বা না বলছে, তা আমার কাছে কোনও গুরুত্ব পায়নি। আমার এই সাহস এবং সাহায্য করার প্রচেষ্টা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপরে বিগ বসের কর্তারা আমাকে বিগ বস শো-তে যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং কোনও অডিশন ছাড়াই আমি বিগ বস-এ অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়ে যাই।
সমালোচনা সত্ত্বেও সাফল্যলাভ
বিগ বসে আমার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের অভিজ্ঞতাই হয়েছিল। তবে, এর ভালো দিকটা ছিল এই যে, বিগ বস হাউসে কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, দর্শকরা আমাকে ভালোবাসতেন এবং সলমান খান থেকে শুরু করে একতা কপূর, সবাই আমার প্রশংসা করেছিলেন। বিগ বসে আমার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য ছিল যখন ‘টিভি কুইন’ একতা কপূর তাঁর শো-তে ঘোষণা করেন যে, তিনি আমাকে তাঁর সিরিয়ালের নায়িকা বানাবেন।
বিগ বস ছাড়ার পর আমার জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আমি অসংখ্য মিউজিক অ্যালবাম, টিভি সিরিয়াল এবং বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব পেয়েছিলাম, যার মধ্যে কয়েকটিতে আমি চুক্তিবদ্ধও হয়েছিলাম। কিন্তু সত্যিটা হল, আমার লক্ষ্য শুধু অভিনয় নয়। আমি যে কাজই করি না কেন, বেছে বেছেই করব। কারণ বিগ বসে ঢোকার আগে আমি একজন ব্যবসায়ীও ছিলাম এবং আমাকে সেদিকেও মনোযোগ দিতে হয়। আমি বলতে চাইছি যে, আমি অভিনয় করতে চাই। কিন্তু এমন কাজ করতে চাই, যা আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করবে না এবং যা আমাকে সম্মান ও জনপ্রিয়তা এনে দেবে।
‘গৃহশোভা’-র পাঠকদের জন্য বিশেষ বার্তা
‘গৃহশোভা’ ম্যাগাজিন-এর পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, আমি যদি একটি ছোটো শহর থেকে সাফল্য অর্জন করতে পারি, তাহলে আপনারাও যদি চান, আমার মতো সাফল্য অর্জন করতে পারবেন। আর নিজেকে ছোটো করে দেখবেন না। কারণ, কেউই নিখুঁত নয়। আপনার কাজই হবে আপনার পরিচয়। একবার অর্থ উপার্জন করতে পারলে, মানুষ আপনাকে সম্মান করবে। জীবনে সম্মান পেতে হলে আত্মনির্ভর হওয়া অপরিহার্য এবং আর্থিক শক্তি তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি কেবল নিজের কাজে মনোনিবেশ করেন, তবে পুরো বিশ্ব আপনার হাতের মুঠোয় চলে আসবে।
(সমাপ্ত)





