সোলফ্লাওয়ার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও নাতাশা তুলি একটি সুপরিচিত নাম। তিনি মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের বিরুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি, নিজের কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। এখন তিনি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যেখানে তাঁর কোম্পানির হেয়ার অ্যান্ড স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টস ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তিনি ২০০১ সালে ‘সোলফ্লাওয়ার’ প্রতিষ্ঠা করেন। সোলফ্লাওয়ার-এ ১০০ জনেরও বেশি কর্মী আছেন, যাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ নারী।

৭০টিরও বেশি হেয়ার অ্যান্ড স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টস প্রস্তুতকারী কোম্পানির সিইও নাতাশা নানারকম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কখনও হাল ছাড়েননি। ইতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং কঠোর পরিশ্রমকে মাধ্যম করে তিনি সাফল্য পেয়েছেন।

নাতাশা-র পরিবার মূলত পাকিস্তানের শিয়ালকোটের বাসিন্দা। দেশভাগের পর সবাই দিল্লিতে চলে আসেন, পরে মুম্বইয়ে। তাঁর পরিবার মূলত চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত। তাঁর বাবা বীরেন্দ্র কুমার একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং তাঁর কাকা রাজেন্দ্র কুমার একজন বিখ্যাত অভিনেতা ছিলেন। কুমার গৌরব তাঁর কাকা-র ছেলে। তাঁর অন্য এক খুড়তুতো ভাই বিক্রম তুলি, যিনি অ্যামাজনের ‘ব্রিদ’ সিরিজ-এর চিত্রনাট্যকার।

মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের বিরুদ্ধে লড়াই

নাতাশা জানিয়েছেন, ‘২০১৫ সালে আমার ব্রেইন হেমারেজ হয়েছিল। আমি আসলে একজন ম্যারাথন রানার। এক দৌড় প্রতিযোগিতার সময় আমি আহত হই। মস্তিষ্কে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, কিন্তু আমি তা বুঝতে পারিনি। আমার শুধু মাথাব্যথা করছিল। এক মাস ধরে আমি কিছুই জানতাম না। তারপর একদিন আমার শরীরের একটা দিক অবশ হয়ে যায়। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে লীলাবতী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমি অচেতন অবস্থায় ছিলাম। এই ঘটনায় আমার পরিবারের সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

অপারেশনটা প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা ধরে চলেছিল। মাথায় একটা ছিদ্র করে রক্ত বের করে দেওয়া হয়েছিল। মাসটা ছিল সেপ্টেম্বর। আমাকে ৩- ৪ দিন আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। তারপর হাসপাতালে ১৫ দিন থেকে আমি বাড়ি ফিরে আসি। আমার বামদিকে রক্তক্ষরণ হয়েছিল। তার কারণে আমি কিছুটা স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলি। কিন্তু আমি স্বাভাবিক জীবনে ফেরার তাগিদে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাই এবং ৪ মাস পর আবার ম্যারাথন-এ অংশগ্রহণ করি। এটি ছিল ২১ কিলোমিটারের দৌড় এবং আমি তাতে জয়ী হই। বিভিন্ন সংবাদপত্রে আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল এবং ‘আনস্টপেবল’ নামে একটি বইয়ে ১০জন অনুপ্রেরণাদায়ী ভারতীয় দৌড়বিদের একজন হিসেবে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে, পুরোপুরি সেরে উঠতে আমার দুই বছর সময় লেগেছে। কিছু অভ্যন্তরীণ মানসিক চাপ ছিল, যা আমি ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আমি বাড়িতে থাকার পরিবর্তে অফিসে যেতে শুরু করি। প্রথমদিকে, আমি এক ঘণ্টাতেই ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। তারপর ধীরে ধীরে আমি সময় বাড়াতে থাকি। আমার সার্জন ছিলেন লীলাবতী হাসপাতালের ডা. রাজন শাহ। তিনি খুব পজিটিভ ছিলেন এবং সম্ভবত সেই কারণেই আমি এত দ্রুত সেরে উঠতে পেরেছি।

সোলফ্লাওয়ার-এর সূচনা পর্ব

নাতাশা পেশায় একজন আর্কিটেক্ট এবং ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার স্পেশালিস্ট। সেইসঙ্গে তিনি আয়ুর্বেদের বিষয়েও জ্ঞান অর্জন করেছেন। এভাবেই একদিন ‘সোলফ্লাওয়ার’-এর সূচনা হয়।

প্রসঙ্গত নাতাশা জানিয়েছেন যে, ‘সেই সময়ে বিদেশি পণ্য খুব জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু প্রাকৃতিক উপাদান খুব কমই ব্যবহৃত হতো। তখন আমি ভাবলাম, যেহেতু আমাদের দেশে এমন অনেক প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যা নানা ধরনের উপকারে লাগতে পারে। তাই, রাসায়নিক ব্যবহার না করে, মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারে এমন একটি প্রাকৃতিক উপায়ে চুল গজানোর ব্র্যান্ড তৈরি করার উদ্যোগ নিই। আমাদের নিজস্ব ল্যাব আছে এবং বিজ্ঞানী, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ ও প্রযুক্তিবিদরা আমাদের সঙ্গে কাজ করেন। এছাড়াও, আমি আমার ঠাকুমা এবং পরিবারের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখেছি। আর আমি এই বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম। এই বিষয়ে যেহেতু আমার পড়াশোনাও ছিল, তাই ‘সোলফ্লাওয়ার’ ব্র্যান্ড তৈরি করতে সুবিধে হয়েছে।’

‘পুরো কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করতে ছয় মাস সময় লেগেছিল। কোম্পানিটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমাদের পণ্য ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন, নাইকা এবং ফার্মেসি আউটলেটে বিক্রি হয়। এছাড়াও আপনি আমাদের ওয়েবসাইট, soulflower.in-এর মাধ্যমে অনলাইনে আমাদের পণ্য কিনতে পারেন। মুম্বইতে আমাদের একটি অফিস এবং রাজস্থানে একটি ফার্ম হাউস আছে, যেখানে আমাদের পণ্য তৈরি করা হয়। আমাদের কর্মীরা গ্রামীণ এলাকার মহিলা।’

প্যাকেজিংয়ের কাজ মূলত মুম্বইতে করা হয়। কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা অমিত সারদা ব্যবসায়িক দিকটা সামলান। প্রোডাক্টস এবং বাকি সমস্ত বিষয় আমি দেখি। কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত সবার মানসিকতা একইরকম হলে অংশীদারিত্ব খুব ভালো হয়। একটি সাপোর্ট সিস্টেম থাকা অপরিহার্য। আমার সাপোর্ট সিস্টেম হল আমার সোলফ্লাওয়ার পরিবার। আমাদের কর্মীরা পরিবারের সদস্যদের মতোই। আমি সর্বদা তাদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিই এবং আমার সংস্থার কর্মীরাও সততার এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...