তবে এইসব কিছুর থেকেও বেশি মন টানল চু চু ট্রেন। সবুজ-সাদা রঙের ছোট্ট ট্রেনটার সামনে দাঁড়িয়েই বোঝা যায় এটা কোনও তাড়াহুড়োর বাহন নয়। ইঞ্জিনে চাপ পড়তেই নরম একটা শব্দ চু-চু, আর সেই শব্দেই যেন লুকিয়ে আছে তার নামের রহস্য। বগিতে বসতেই প্রথম যে জিনিসটা টের পাওয়া যায়, তা হল বাতাস। জানলা নেই, দেয়াল নেই। ট্রেন ধীরে চলতে শুরু করতেই আনস ভাতা বিচের নীল জল চোখে পড়ে। এখানে ঢেউ গর্জন করে না, এরা যেন কানে কানে কথা বলে। সমুদ্র এখানে শান্ত, সংযত। ট্রেনটা রাস্তার ধার দিয়ে চলে। ক্যাফের সামনে মানুষ কফিতে চুমুক দেয়, কেউ ট্রেনের দিকে তাকিয়ে হাসে, কেউ হাত নাড়ে। শিশুরা সবচেয়ে খুশি, ওদের কাছে এই চু-চু ট্রেন এক চলন্ত খেলনা।

গাইডের কণ্ঠে ভেসে আসে নুমেয়ার গল্প, ফরাসি প্রভাব, কানাক ইতিহাস। কিন্তু কথার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ে হাওয়ার শব্দ, সমুদ্রের গন্ধ আর রোদের উষ্ণতা। এখানে সব অনুভূতিগুলো মিলেমিশে থাকে।

বেই দে সিত্র সৈকতের গা ঘেঁষে যখন ট্রেনটা হালকা গতিতে এগিয়ে চলে, তখন আর নামতে ইচ্ছে করে না। এই ট্রেনের আসল আনন্দ ওঠা-নামায় নয়, বরং নিঃশব্দে বসে সময়টুকু উপভোগ করায়।

দু’ঘণ্টা ধীর গতিতে নুমেয়া শহর পরিক্রমা করে আবার ফিরে এলাম জাহাজে। সঙ্গে করে নিয়ে এলাম ভালো লাগার ছোটো ছোটো কিছু মুহূর্ত, যেগুলো ব্যাগে রাখা যায় না, কিন্তু মনে জমা থাকে।

আজ আমাদের দ্বিতীয় পোর্ট ডে। সকালে উঠে ব্যালকনিতে বেরিয়ে দেখি, জাহাজ ধীরে ধীরে ঢুকছে পোর্ট ভিলার বন্দরে। চারদিকে সবুজ পাহাড়, নীল জল, আর ফাঁকে ফাঁকে কাঠের ঘর।

পোর্ট ভিলা ভানুয়াটুর রাজধানী। কিন্তু ‘রাজধানী’ শব্দটা এখানে এসে খানিক বেমানান লাগে। কোনও তাড়া নেই, নেই শহুরে ব্যস্ততার হাঁপানি। সময় এখানে প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউয়ের মতো— ধীর, গভীর, নিশ্চিন্ত।

ব্রেকফাস্ট সেরে সারাদিনের জন্য ব্যাগ গুছিয়ে জাহাজ থেকে নামতেই চোখে পড়ল ছোট্ট, পরিপাটি বন্দর এলাকা। হাসিমুখ মানুষ, রঙিন জামাকাপড়, আর চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই ডাক— ‘হ্যালো, মাই ফ্রেন্ড! ‘

এই ‘বন্ধু’ ডাকটা একেবারেই কৃত্রিম নয়। পোর্ট ভিলার মানুষের হাসিতে রয়েছে সহজ আন্তরিকতা৷

শহরের রাস্তা সরু। এখানে বাস মানে ছোটো ভ্যান। নির্দিষ্ট কোনও স্টপ নেই, হাত তুললেই থামে। রাস্তার দু’পাশে ছোটো ছোটো দোকান, হাতে বানানো গয়না, রঙিন সারং আর শেল-জুয়েলারি বিক্রি করছে। শহরটা আকারে ছোটো, কিন্তু চরিত্রে ভরপুর।

আমাদের হাতে মাত্র চার ঘণ্টা সময়। হেঁটে অথবা বাসে করে ঘোরা সম্ভব নয়, তাই পোর্ট থেকেই একটা গাড়ি ভাড়া করলাম। ড্রাইভারের নাম অ্যান্টনি, ভীষণ হাসিখুশি মানুষ।

অ্যান্টনি প্রথমেই নিয়ে গেল পোর্ট ভিলা মার্কেটে, যা দেখে মনে হল যেন শহরের হৃদপিণ্ড। কাঁচা আম, পেঁপে, কলা, নারকেল, নানা রকমের মাছ— সবকিছুই টাটকা, মাটির গন্ধ মাখা। মহিলারা মাটিতে বসে জিনিস বিক্রি করছে, কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে। এখানে কেনাবেচার চেয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের আলাপটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গাড়িতে বসেই শুরু হল ভানুয়াটুর ইতিহাসের গল্প।

ভানুয়াটু পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে একসময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স যৌথভাবে শাসন করত। যার ফল ছিল স্থানীয় জনগণের জীবনে চরম জটিলতা আর বৈষম্য।

প্রায় তিন হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা লাপিতা জনগোষ্ঠী এই দ্বীপপুঞ্জে বসতি স্থাপন করে। তারাই ভানুয়াটুর আদিবাসী সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তোলে।

১৬০৬ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী পেদ্রো ফার্নান্দেজ দে কুইরোস প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে এখানে পৌঁছান। পরে ১৭৭৪ সালে জেমস কুক এসে দ্বীপগুলোর নাম দেন ‘নিউ হেব্রাইডস’। ধীরে ধীরে শুরু হয় ইউরোপীয় প্রভাব আর উপনিবেশ স্থাপনের ইতিহাস। হঠাৎ অ্যান্টনি জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, ব্ল্যাকবার্ডিং কি জানেন?”

অস্ট্রেলিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের ইতিহাস পড়িয়েছি, শব্দটার মানে আমার অজানা নয়। তবু ভানুয়াটুতে বসে শব্দটা শুনে অদ্ভুত অস্বস্তি হল। মনে হল, যেন আমি নিজেই কোনও অপরাধের অংশ।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...