এখানে শুধু ভাগ্যের খেলা নয়, এখানে জমা হয় মানুষের গল্প। কেউ জয়ের আনন্দে হেসে উঠছে, কেউ আবার পরের রাউন্ডেই সব পালটে যাবে এই আশায় চুপচাপ বসে আছে। অচেনা মুখগুলোও কয়েক মিনিটেই পরিচিত হয়ে যায়। সমুদ্রের মাঝখানে এটা যেন এক রাতের শহর— যেখানে আলো, শব্দ আর উত্তেজনা একসঙ্গে মিশে সময়কে ভুলিয়ে দেয়।
এর ঠিক উপরের তলায়, ডেক চার-এ, অপেক্ষা করছে আনন্দের আরেক আহ্বান — রয়্যাল এসপ্ল্যানেড আর রয়্যাল থিয়েটার। একে নিঃসন্দেহে জাহাজের হৃদয় বলা যায়। এখানে দিন আর রাত, দুটোই সমান ভাবে জীবন্ত।
এখানে এলে মনে হয়, এক আধুনিক শহরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি। দুই পাশে সারি সারি দোকান, ক্যাফে, বার, আর লাউঞ্জ। কোথাও ভেসে আসে কফির গন্ধ, কোথাও ককটেলের গেলাসে টুংটাং শব্দ, কোথাও আবার লাইট মিউজিক। প্রতিটি কোণে যেন আলাদা আলাদা গল্প অপেক্ষা করে আছে।

জাহাজের এক ডেক থেকে আরেক ডেকে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, টেরই পাইনি। এর মধ্যেই জাহাজ চলতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সিডনি হারবার ছাড়িয়ে তাসমান সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ‘ভাসমান শহর।
সারাদিনের উত্তেজনায় খাওয়ার কথা মনেই পড়েনি। শেষমেশ আমরা পা বাড়ালাম উইন্ডজ্যামার ফুড কোর্টের দিকে। উইন্ডজ্যামার হল জাহাজের সবচেয়ে প্রাণবস্তু আর জনপ্রিয় খাবারের ঠিকানা। এখানে ঢুকলেই বোঝা যায়— এটা শুধু একটা বাফে নয়, বরং পৃথিবীর নানা স্বাদের এক মিলনমেলা। বিশাল ডাইনিং স্পেসে সারি সারি খাবারের কাউন্টার। কোথাও ইউরোপীয় স্বাদ, কোথাও এশীয় ঝোঁক, কোথাও আবার পশ্চিমী বা মধ্যপ্রাচ্যের গন্ধ।
ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে লাঞ্চ কিংবা ডিনার, প্রতিটি সময়েই এখানে আলাদা আলাদা মেনু অপেক্ষা করে থাকে। যাত্রীরা নিজের পছন্দমতো খাবার বেছে নেয়। কেউ হালকা সালাদে থামে, কেউ গরম গ্রিল করা খাবারে মন দেয়। জানলার ধারে বসলে প্লেটের সঙ্গে সঙ্গে চোখও ভরে ওঠে নীল সমুদ্রের বিস্তারে।
প্রতিদিনের বাফেতে সাধারণত থাকে এক বা একাধিক ভারতীয় নিরামিষ ও আমিষ পদ। মেনু বদলালেও প্রায়ই দেখা যায় ডাল, সবজি, বিরিয়ানি, চিকেন কারি, বাটার চিকেন, নান ব্রেড। এমনকী গুলাব জামুন বা সুজির হালুয়ার মতো মিষ্টিও জায়গা করে নেয়। মশলার ঝাঁজ খুব তীব্র নয়, কিন্তু স্বাদটা পরিষ্কার ভাবে ভারতীয়। তবে, এমন ভাবে রান্না, যাতে আন্তর্জাতিক অতিথিরাও স্বচ্ছন্দে খেতে পারেন।
দেখতে দেখতে সমুদ্র সফরের তিনদিন কেটে গেল। সময় যেন ঢেউয়ের মতো চোখের সামনে এসে মিলিয়ে যায়, রেখে যায় শুধু স্মৃতির ফেনা।
আজ ভোরেই আমরা এসে পৌঁছেছি নিউ ক্যালেডোনিয়ার রাজধানী নুমেয়াতে। সূর্য ওঠার আগেই জাহাজ নোঙর গেড়েছে বন্দরে। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তার মধ্যেই শহরটাকে যতটা সম্ভব ছুঁয়ে দেখতে হবে। নিউ ক্যালেডোনিয়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা এক ফরাসি উপনিবেশ, কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টি। প্রায় তিন হাজার বছর আগে কানাক জাতির মানুষেরা এখানে বসতি গড়েছিল। তারপর একে একে এসেছে ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা। ১৮৫৩ সালে ফরাসি সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে এই দ্বীপ দখল করে নেয়। রাজনৈতিক বন্দি আর অপরাধীদের নির্বাসনের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই ভূমি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিউ ক্যালেডোনিয়া পরিচিতি পায় খনিজ সম্পদ আর বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে।
নুমেয়ায় পা দিয়েই মনে হল যেন কোনও ফরাসি শহরে এসে পড়েছি। আজকের নুমেয়া আধুনিক, পরিপাটি— যেখানে ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, প্রশান্ত মহাসাগরের নীল বিস্তার আর কানাক সংস্কৃতি পাশাপাশি সহাবস্থান করছে। শহরের কেন্দ্রস্থলের পরিচ্ছন্ন রাস্তা, কাঠ আর পাথরের পুরোনো ফরাসি বাড়ি, তার ফাঁকেই আধুনিক শপিং সেন্টার, কফি শপ আর ছোটো ছোটো বুটিক – সব মিলিয়ে পরিবেশটা বেশ মনোরম।
পর্যটকদের জন্য এখানে বিশেষ বাস আর ট্রেনের ব্যবস্থা আছে। ‘হপ-অন হপ-অফ’ বাস, একটি টিকিটে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যতবার খুশি ওঠা-নামা করা যায়।
(ক্রমশ…)





