শুধু উৎসবের দিনগুলিতেই নয়, যে-যার মতো জীবনে সাফল্য পেয়ে আনন্দে থাকতে চান প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে। তাই, ভালোলাগার বিষয় যাইহোক, প্রতিটি মুহূর্তে উপলক্ষ্য হোক একটাই— সাফল্য ও আনন্দলাভ। কিন্তু কীভাবে?
সংকল্প– ০১
পরিশ্রমের সংকল্প: আসলে আমরা বেশিটাই বাঁচি মনে-মনে। অতএব, জীবনের সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে, মানসিক শান্তি এবং আনন্দলাভের চেষ্টা করতেই হবে। আর এরজন্য ভাগ্য নয়, কর্মকে প্রাধান্য দিতে হবে। মনে রাখবেন, সফল ব্যক্তি ভাগ্যে বিশ্বাস করেন না, কর্মময় জীবনযাপন করেন। তাই সুযোগ পাওয়ার জন্য বসে থাকবেন না, সুযোগ করে নেবেন। ‘কাল করব’ বলে কাজ ফেলে রাখলে, মহাকাল পার হয়ে গেলেও সে কাজ আর হবে না। অতএব, কাজ শুরু করুন এখনই এবং কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করুন। সাময়িক বাধা এলেও নিরাশ হবেন না, অপেক্ষা করুন, বাধা কাটবেই। কারণ, ঝড় ওঠে, আবার থেমেও যায়। তাই, সাময়িক বাধা অতিক্রম করতে পারলেই জয় সুনিশ্চিত। শারদোৎসবকে উপলক্ষ্য করে আর কী কী করবেন জেনে নিন বিস্তারিত ভাবে।
সংকল্প–০২
স্থির সিদ্ধান্ত নিন: নিজে কী করতে চান, সেটা আপনাকেই স্থির করতে হবে। অন্য কেউ কিছু করছে বলেই যে আপনাকে তার অনুকরণ করতে হবে, তেমন নয়। আপনার বিশেষ গুণগুলিকে আগে চিহ্নিত করুন। আপনার ইন্টারেস্ট- এর বিষয়গুলিতে জোর দিন। অপূর্ণ ইচ্ছাপূরণের জন্য কিন্তু প্রভূত মানসিক শক্তি লাগে। সেই শক্তি আগে মনে মনে সঞ্চয় করুন। তারপর যা সংকল্প করছেন, সেদিকে পা বাড়ান৷
সংকল্প–০৩
আত্মবিশ্বাস জোরদার করুন: যে-কোনও বিষয়ে নিজেকে আপগ্রেড করার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। ইন্টারনেট-এর সাহায্য নিন। দ্বিধা কাটিয়ে তারপর ফিল্ড-এ নামুন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হাতেকলমে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার মূল্য আছে। এর ফলে যে-কোনও বিষয়ে ভালো-মন্দ সম্পর্কে আপনার সম্যক জ্ঞান লাভ হবে। আপনার আগে যারা কোনও কাজে উদ্যোগ নিয়েছেন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর দ্বারা তাদের সঙ্গে পরিচিত হোন। এতে আপনার যোগাযোগের পরিধিটাও বাড়বে। কীভাবে আপনি এগোবেন, তাদের পরামর্শ নিয়ে এরপর নিজের কাজের একটি রূপরেখা তৈরি করুন। যেমন— – যদি ব্যাংক লোন নেওয়ার প্রয়োজন হয়, নিজের প্রোজেক্ট-টি গুছিয়ে লিখে ব্যাংক ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাঁর সাহায্য চান আর্থিক সহায়তার জন্য।
মনে রাখবেন, যে-কোনও কাজের শুরুতে অনেক বাধা, অনেক প্রতিবন্ধকতা আসে। ভয় পেয়ে বা হতাশ হয়ে হাল ছাড়লে চলবে না। অনেকেই আছেন যারা অর্থের অভাবে বিউটি পার্লার খুলতে না পারলেও, বাড়ি থেকে বিজনেস কনট্যাক্ট তৈরি করে কনে সাজানোর অর্ডার নেন। এভাবেও কিন্তু শুরু করা যায় মূলধন না থাকলেও।
সংকল্প–০৪
সংকোচ দূরে রাখুন: মনে রাখবেন কোনও কিছু শুরু করতে গেলে বয়সটা কিন্তু আদৌ কোনও ফ্যাক্টর নয়। লোকলজ্জার ভয়ে পিছিয়ে আসবেন না। আত্মবিশ্বাসই হল সাফল্যের মন্ত্র। আপনি চাইলে
যে-কোনও বয়সেই আপনার পছন্দের কাজ শুরু করতে পারেন। আপনার অধরা স্বপ্নকে ছোঁওয়া সত্যিই অসম্ভব নয়। মনের জোরে মানুষ কী না পারে! ঝুঁকি সব কাজে থাকে। যদি বিফলও হন প্রাথমিক ভাবে, তাহলেও ভেঙে পড়লে চলবে না। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিন। দেখবেন পরেরবার সাফল্যের সোপান স্পর্শ করা আর ততটা অসম্ভব মনে হবে না।
চারপাশে চোখ রাখলেই জানতে পারবেন এমন কত শত মানুষের কথা। কেউ বিকলাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও এভারেস্ট জয় করেছেন। কেউ ক্যানসারের মতো মারণ ব্যাধি জয় করেও চালিয়ে যাচ্ছেন সাফল্যের জয়যাত্রা। কেউ দৃষ্টিহীন হয়ে থেমে থাকেননি, বড়ো পদে বহাল হয়ে প্রমাণ করেছেন— জীবনে কিছুই অসম্ভব নয়।
স্বপ্ন দেখলে তা সফল করার তাগিদও অনুভব করতে হবে। থেমে যেতে যেতে একবার যদি ঘুরে দাঁড়ান, নতুন করে পথ চলা শুরু করুন, দেখবেন স্বপ্ন আপনার হাতের মুঠোয় ধরা দেবে।
সংকল্প–০৫
সঠিক পরিকল্পনা করুন: প্রথমে আপনার পরিকল্পনাগুলি নথিভুক্ত করুন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সুষ্ঠু ভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে। আর পরিকল্পনামাফিক উপকরণ এবং সময় বরাদ্দ করুন। কর্মসাফল্য পেতে অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, তাই আগে থেকেই মজুত করুন অর্থ। কোনও কাজ নিশ্চিন্তে সম্পূর্ণ করতে হলে, পরিকল্পনামাফিক যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়ে কাজ শুরু করা উচিত।
সংকল্প–০৬
দোষত্রুটি কাটিয়ে উঠুন: কী কী দোষগুণ আছে তা বিচার-বিশ্লেষণের জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন নিজেকে। দোষগুলিকে কাটানোর চেষ্টা করুন এবং গুণগুলির কথা ভেবে আত্মবিশ্বাস বাড়ান। প্রয়োজনে অন্যদের (শুভাকাঙ্ক্ষী) থেকে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন আপনার কী কী দোষগুণ আছে। কারণ, নেগেটিভ পয়েন্টস না কাটালে, পজিটিভ কাজ আটকে যেতে পারে। অতএব, নিজেই নিজের সমালোচনা করুন এবং অন্যের থেকে সমালোচনা শুনে নিজেকে শুধরে নিন।
সংকল্প–০৭
মেলামেশা বাড়ান: টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের সামনে অহেতুক দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন। যত মানুষের সঙ্গে মিশবেন, ততই আপনি জ্ঞানবুদ্ধিতে সমৃদ্ধ হবেন, উপকার পাবেন। শুধু তাই নয়, অন্যের গুণগুলি নিতে পারলে আপনি আরও গুণী এবং স্মার্ট হয়ে উঠবেন। মনে রাখবেন, কূপমণ্ডূকরা কল্পনার জগতে বাস করে, কিন্তু সামাজিকতা বাস্তবের মুখোমুখি করে।
সংকল্প–০৮
কাজের সঠিক গুরুত্ব: কাজের তালিকা তৈরি করুন গুরুত্ব অনুযায়ী। কারণ, সঠিক গুরুত্ব মানেই সঠিক সাফল্য। এতে বাজে কাজে সময় নষ্ট হবে না। আপনার জীবনের উপযোগী এবং লাভজনক কাজগুলিকে তালিকার শীর্ষে রাখুন। ঠান্ডা মাথায় নিজের কাজের গুরুত্ব নিজেই বিচার করুন।
সংকল্প–০৯
শরীরচর্চা করুন: স্বাস্থ্যই সম্পদ। শরীর-স্বাস্থ্যের যত্ন না নিলে, একসময় সব ধনসম্পদ হারাতে হতে পারে। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরচর্চা করুন। খাদ্যতালিকায় রাখুন শাক-সবজি এবং ফল। পান করুন পর্যাপ্ত জল। আর ফার্স্ট ফুড থেকে সরিয়ে রাখুন নিজেকে। আনন্দে থাকুন। নিজেকে গুটিয়ে রাখবেন না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দে থাকুন সর্বদা। সময় পেলেই আড্ডা-গল্পে মেতে থাকুন। বছরে অন্তত দু’বার বেড়াতে যান পরিবারের সবাইকে নিয়ে। তাই, টাকা জমাতে থাকুন।
সংকল্প–১০
আর্থিক সুরক্ষা: একটা খাতা কিংবা ডায়ারি হাতে নিন। প্রথমে আপনার বাৎসরিক আনুমানিক আয়ের পরিমাণ লিখুন। এবার প্রতি মাসের খরচ লিখুন। যেমন সংসার খরচ, সন্তানের শিক্ষাখাতে খরচ, জামাকাপড় কেনার খরচ, ঋণ শোধের ব্যাপার থাকলে তার খরচ (ইএমআই), যাতায়াতের খরচ, অতিথি আপ্যায়নের খরচ, বিমার খরচ, উৎসব-অনুষ্ঠান প্রভৃতির খরচ হিসাব করুন। এরপর সারা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব কষে দেখুন আর কত টাকা আপনার হাতে থাকছে। এবার সেই মতো ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য টাকা জমান এবং কিছু টাকা রাখুন শখ-আহ্লাদ পূরণের জন্য। এটুকু করতে পারলে আপনি থাকবেন মানসিক চাপমুক্ত এবং জীবনযাপন করতে পারবেন নিশ্চিন্তে।
সংকল্প–১১
বন্ধু হয়ে উঠুন: এক নারী অপর এক নারীর বড়ো শত্রু, একথা সেই আদিকাল থেকে শাশ্বত সত্য। সাধারণত বোন- বোন, বউমা-শাশুড়ি, ননদ-ভাইয়ের বউ— এ ধরনের সম্পর্কের মধ্যে একটা ঠান্ডা লড়াই থাকে। যে মেয়েটি যত কৌশলে সংসার চালাতে পারবে, জিত তারই। অতএব, শাশুড়ি-বউমার সম্পর্কে বন্ধুত্বের সূত্রপাত করতে, বিউটি পার্লারে একসঙ্গে যাওয়া এক সুন্দর সম্পর্কের দৃষ্টান্ত হতে পারে। ছেলের বউ এবং ছেলের মায়ের মধ্যে এক প্রজন্মের তফাত। মানসিকতাও আলাদা। তবুও যদি দু’জনের সখ্যতা বা অ্যাডজাস্টমেন্ট না তৈরি হয়, তাহলে সংসার হয়ে পড়ে অশান্তির পীঠস্থান। এ এক ঠান্ডা লড়াই। শাশুড়ি-মা কিন্তু কখনওই ভাবেন না তিনিও একদিন সুন্দরী বউ হয়ে এসেছিলেন নতুন সংসারে। লজ্জাবনত মুখে তিনিও শুনেছিলেন প্রশংসা ‘কী সুন্দর টুকটুকে বউ।’ আজ নিজে শাশুড়ির পদে উত্তীর্ণ হয়ে কোথায় গেল জেল্লা! স্বামী সংসার নিয়েই তিনি মত্ত। নিজের দিকে তাকাবার সময় কোথায়? বউমা যদি কান্ডারি হয়ে শাশুড়িকে বিউটি পার্লারে নিয়ে যায়, তাহলে সহজ-মধুর সম্পর্কের গুণে সংসার হয়ে উঠবে হাসিখুশিতে ভরা।
সংকল্প–১২
নিজেকে ভালোবাসুন: ‘বয়স হয়ে গেছে, আর কী হবে’, এই বাহানায় কখনও নিজের প্রতি অবহেলা করবেন না। শরীরের অবসাদ-ক্লান্তি দূর করতে কিংবা চাকচিক্য বজায় রাখতে হলে যা যা করা দরকার, তা করতে হবে নিয়মিত। সংসারের প্রতি সব দায়িত্ব পালন করার পর নিজের জন্যও কিছুটা সময় রাখতে হবে এর জন্য। তাই, ঠিক সময়ে হেয়ার ট্রিটমেন্ট, পেডিকিওর, ম্যানিকিওর, বডি স্ক্রাবিং ইত্যাদি করা জরুরি। মনে রাখবেন, নিজেকে দেখতে তরতাজা লাগলে, মনও উৎফুল্ল হয়ে ওঠবে, কাজে উৎসাহ বাড়বে এবং চট করে বয়সের ছাপ চোখে মুখে ফুটে ওঠবে না।





