হেলিপ্যাড থেকে মিনিট দশেক হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম মন্দিরের সামনে। বছরের মাত্র ছ’মাস তার অধিষ্ঠান এই মন্দিরে। বাকি সময় প্রবল শৈত্যের কারণে ভক্তদের দর্শন দিতে তিনি নেমে আসেন উখিমঠের ওমকারেশ্বর মন্দিরে। প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ায় ডোলিযাত্রা শুরু হয়। ভক্তের ভগবান ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে যান কেদারনাথের এই মন্দিরে। নেমে আসেন ভাতৃদ্বিতীয়ার পর। একবার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হল— জয় শ্রী…, কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরল না। পূজারিকে ফোন করতে উনি আমাদের পথ দেখিয়ে হোটেলে নিয়ে গেলেন।

রাজস্থান ভবন আগে থেকেই বুক করা ছিল। মন্দিরের চাতালের উপরে ডানদিকে আমাদের হোটেল। বাকি চাতালের উপরে যেন সাজিয়ে রাখা আছে আরও অনেক হোটেল, টেন্ট, ডরমেটরি হোমস্টে। আমাদের হোটেলের সামনে ব্যালকনি, চেয়ারে বসে দুচোখ ভরে দেখা যায় কেদারনাথ মন্দির। আধঘণ্টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম দর্শন আর পুজোর উদ্দেশ্যে। পরচি উনি নিজেই করিয়ে রেখেছিলেন। তাই ভিড় কাটিয়ে সোজা ঢুকে গেলাম মন্দিরের গর্ভগৃহে।

মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে মন্দির প্রাঙ্গণ ঘুরে নিলাম। মন্দিরের উত্তরে ঈশাণেশ্বরের মন্দির, পিছনে ভীমশিলা। ২০১৩ সালের বিধ্বংসী বন্যায় এই ভীমশিলাটি মন্দিরের ঠিক পিছনে ত্রাতার মতো দাঁড়িয়ে যায়।

ম্যাগি দিয়ে লাঞ্চ সেরে হাঁটতে শুরু করলাম ভৈরবনাথ মন্দিরের দিকে। মন্দাকিনী ব্রিজ পেরিয়ে কেদারনাথ মন্দির থেকে প্রায় এক কিলোমিটার চড়াই পেরিয়ে ভৈরবনাথ মন্দিরে পৌঁছালাম। দুচোখের ড্রোন ক্যামেরায় দেখে নিলাম কেদারনাথের অনন্য সৌন্দর্য। মন্দিরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দেখলাম ডানদিকের বিশাল হিমালয়ের বুক থেকে অঝোর ধারায় নেমে আসছে মধুগঙ্গা আর দুধগঙ্গা আর মিশে যাচ্ছে মন্দাকিনীর স্রোতে। নামার সময় সামনের শৃঙ্গগুলো মেঘের আড়াল থেকে আমাদের দেখে হাসছিল। তারপর নিমেষে মেঘ কেটে গিয়ে একেবারে মুখোমুখি। চোখের সামনে কেদারনাথ মন্দিরকে ঘিরে পাহারায় স্বয়ং খরচাকুণ্ড, জানহুকুট, মহল্যা পর্বত, ভৃগুপন্থ, কেদারনাথ পিক, কেদার ডোম, ভার্তেকুট, মেরু ও সুমেরু পর্বত। কী অসামান্য তার রূপ!

সুমেরু পর্বতের পিছন দিয়ে নেমে আসছে চোরাবারি গ্লেসিয়ার। মন্দাকিনী প্রবাহিত হচ্ছে সেই গ্লেসিয়ার থেকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম মন্দাকিনী ব্রিজের উপরে। অটল অনন্ত তার স্রোত। পাশ দিয়ে রাস্তা উঠে গেছে, সেখানে শংকরাচার্যের মূর্তি। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মন্দিরের সামনে গিয়ে বসলাম। এবার অপেক্ষা সন্ধ্যা আরতির। তখন মন্দিরের চাতালে ভক্তদের বিশাল ঢল নেমেছে তাদের আরাধ্য দর্শনের জন্য। শুরু হল সন্ধ্যাসাজ, শৃঙ্গার আর তারপর আরতি। আমার পাশে দাঁড়িয়ে মৌনীবাবা রুদ্রডমরু বাজিয়ে চলেছেন। বেজে চলেছে ঘণ্টা। মন্দিরের আলোয় উদ্ভাসিত কেদারনাথ মন্দিরের চাতাল। স্বয়ং হিমালয় এই ডমরুর আওয়াজে বিহ্বল। কী যেন এক ঘোরের মধ্যে সময় কাটছিল। ঘোর কেটে গেলে বুঝলাম আরতি শেষ হয়েছে। এবার হোটেলের উদ্দেশ্যে ফেরার পালা।

টিপটিপ শুরু হয়েছে বৃষ্টিও। আর ঠান্ডার কথা নাইবা বললাম। হোটেলে ফিরে এসে রুটি, সবজি সহযোগে ডিনার শেষ করে ফিরে এলাম রুমে। সব গুছিয়ে নিয়ে আরেকবার এসে বসলাম হোটেলের ব্যালকনিতে, চোখের সামনে আমার আরাধ্যের বাসভবন। এই স্বর্গীয় প্রকৃতি ছেড়ে আমাদের ফিরে যেতে হবে আগামীকাল ভোরবেলা। সারারাত জেগেই কেটে গেল। ভোরবেলা সাড়ে চারটের সময় নেমে এলাম আবার মন্দিরের চাতালে। পুণ্যার্থীদের দর্শনের আকাঙ্ক্ষা আর আমাদের ফিরে যাওয়ার মনখারাপ। এই দুই ভিন্ন ছায়া গিয়ে পড়ল হিমালয়ের গায়ে। কেদারনাথকে প্রণাম জানিয়ে ধীর পায়ে এগোলাম হেলিপ্যাড-এর দিকে।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপের মতো জ্বলে উঠেছিল কেদারনাথের শৃঙ্গগুলো। প্রথমে লাল, তারপর কমলা, হলুদ আর সবশেষে রুপোলি শুভ্রতা। কেদারডোমের মাথায় এসে বসল একফালি মেঘ। ব্যস অমনি তার রাগ। আগ্নেয়গিরির মতো উছলে উঠল আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে। এসব আলোর জাদু দেখতে দেখতেই আমরা পৌঁছে গেলাম হেলিপ্যাডে। আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা। উড়ে আসবে রথ। আমাদের পৌঁছে দেবে ওপারে সেরসীতে। প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে এ তল্লাটের প্রাণবায়ু ভরে নিচ্ছিলাম নিজের মধ্যে। ওই দেখা যায় মন্দির। ‘আলোয় আলো আকাশ, দেখো আকাশ আলোয় ভরা।’ এই নশ্বর জীবনকে অবিনশ্বরের হাতে সমর্পণ করে ফিরে যাচ্ছি জাগতিক পৃথিবীতে।

বদ্রিনাথ

আকাশে উড়লাম আমরা। চোখে কেদারনাথ, মনে মন্দির। পাহাড়ের অলিগলি বেয়ে তুষারশুভ্র শৃঙ্গকে প্রণাম জানিয়ে আমরা এসে পৌঁছালাম সেরসীতে। আমাদের সেরসীর হোটেলকে অনুরোধ করে দুশো টাকা দিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য একটা রুম পেয়ে গেলাম। স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল তুঙ্গনাথ-চন্দ্রশিলা। সেখানে হোটেলও বুক করা ছিল। কিন্তু আবহাওয়া তখন আমাদের বিপক্ষে। আর রাস্তার অবস্থাও বিশেষ সুবিধাজনক না থাকায় প্ল্যান চেঞ্জ হল। সকাল আটটার মধ্যে সেরসী ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম বদ্রিনাথের উদ্দেশে। চোপ্তার রাস্তায় সমস্যা থাকায় রুদ্রপ্রয়াগের রাস্তা নিলাম আমরা।

আমরা একে একে পেরিয়ে গেলাম কর্ণপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, গোপেশ্বর, পিপলকোটি, হেলং উর্গাম, যোশীমঠ, বিষ্ণুপ্রয়াগ। পিন্ডারি হিমবাহ থেকে পিন্দর গঙ্গা বয়ে এসে এই কর্ণপ্রয়াগেই মিশে যায় অলকানন্দার সঙ্গে। এরপর আরও কিছুটা এগিয়ে নন্দপ্রয়াগে মন্দাকিনী এসে মেশে সেই অলকানন্দায়।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...