‘অবশ্যই জরুরি’, বেলা আড়াল থেকে জবাব দেয়। ‘একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকি, দুবেলা দেখা হয়– যাব না? তা ছাড়া সীমাদি, মানে রতনবাবুর বউ আমাদের কিটি পার্টি গ্রুপের মেম্বার! না গেলে আস্ত রাখবে?’
‘ধুর! এত ভয় পাও কেন?’
মিহি হেসে বললাম, ‘বলে দিলেই হবে, আমি অসুস্থ ছিলাম। ওরা কি সেটা সরেজমিনে দেখতে পুলিশকুকুর পাঠাবে নাকি?’
‘ভয় কে পাচ্ছে?’ বেলা এবার অন্তরাল থেকে মুখ বাড়াল। বলা ভালো, মুখোশ বাড়াল। সারা মুখে নানা রঙের কী সব মেখেছে, দেখাচ্ছে ঠিক টিভি সিরিয়ালের খল চরিত্রের মতো। সহসা বেলাকে চিনতে না পেরে আঁ-আঁ করে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম। তারপর চেনা গলা শুনে ধাতস্থ হলাম।
বেলা বলল, ‘সীমাদি বড্ড বড়ো বড়ো কথা বলে। আমরা কিটি পার্টির বাকি মেম্বাররা ঠিক করেছি, বিয়েতে গিয়ে চারদিকে কড়া নজর রাখব। সেইজন্যেই যাওয়াটা জরুরি। বুঝলে?’
নিজেকে সশব্দে সোফায় ছুঁড়ে ফেলে জানতে চাইলাম, ‘ছেলেমেয়ে তাহলে একাই থাকবে বাড়িতে? শুধু আমরা দু’জন যাব?’ বেলা কোনও উত্তর দিল না। তবে মৌনং সম্মতি লক্ষণম্।
অন্তরাল থেকে বেলা এরপর লাজুক মুখে যখন সামনে এসে দাঁড়াল, সত্যিই চোখ ফেরাতে পারলাম না। এই রূপ ও কোথায় লুকিয়ে রাখে অন্য আর পাঁচটা সাধারণ দিনে? যখন মুখ ঝামটা দেয়, গলগল করে ঘামতে ঘামতে ব্যাগে ভরে দেয় আমার লাঞ্চ বক্স, তখন সৌন্দর্যের এই ব্যাখ্যাতীত বিচ্ছুরণ ও কী দিয়ে ঢেকে রাখে?
অস্ফুটে, সেই আগের মতো, প্রেমিক-প্রেমিক গলায় বলে উঠলাম, ‘অপূর্ব দেখাচ্ছে। আজ বিয়েবাড়িতে সকলের নজর তোমার উপরই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। বিয়ের কনেও পাত্তা পাবে না।’
বেলা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ছাড়ো। আদিখ্যেতা!’
বরযাত্রী যাওয়ার জন্য রতনবাবু একটি বেশ বড়োসড়ো বাসের বন্দোবস্ত করেছেন। বেলা জানলার পাশের একটি সিট পেয়ে গেল। আমিও গুটিগুটি পায়ে তার পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। ভালোই হল। অনেকদিন দু’জনে মিলে এরকম সান্ধ্যভ্রমণ হয় না। আলো ঝলমলে শহরটার মধ্য দিয়ে হাওয়া আর যানজট কেটে এগিয়ে যেতে থাকল আমাদের বাসটা।
বেলাকে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার কি সত্যিই মনে হয়, আজ শহরে দশহাজার বিয়ে হচ্ছে?’ বেলা পালটা জবাব দিল, ‘এমন ভাবে জিজ্ঞেস করছ যেন আমি পুরোহিত বা রাশিবিজ্ঞানী! আমি কী করে জানব?’
তার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে আমি বললাম, ‘আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, একটু বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। খুব বেশি হলে ৩-৪ হাজার বিয়ে হচ্ছে হয়তো! দশ হাজার কি মুখের কথা?’
বাসের মধ্যে তারস্বরে রেডিয়ো চলছে। আজ সন্ধেয় সবাই রাস্তার যানজট নিয়ে চিন্তিত। থেকে থেকেই ট্র্যাফিকের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে— অমুক রাস্তা ধরে যাবেন না। তমুক রাস্তা এখন এড়ানোই ভালো। ইত্যাদি ইত্যাদি।
যান-ঝঞ্ঝাটে বিরক্ত ড্রাইভার নিজের মনেই গরগর করে বলে উঠলেন, ‘স্টুডিয়োয় বসে এসব কথা বলা খুব সোজা। রাস্তায় নেমে দ্যাখো একবার!’
চালক যেন বাকযুদ্ধের আহ্বান জানাচ্ছেন বেচারা ঘোষকদের। তখনই পাশের একটি গাড়ি থেকে চালক মুখ বের করে আমাদের গাড়ির চালককে প্রায় হুমকির সুরে বললেন, ‘দাদা গাড়িটা একটু পিছনে নিয়ে যান তো! সাইড দিয়ে বেরিয়ে যাব। রেডিয়োয় বলছে, মোড়ে বহুত জ্যাম! রাস্তা বন্ধ!’
সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাসের যাত্রীরাও হইহই করে উঠলেন। সমস্বরে চালকের উদ্দেশ্যে, ‘দাদু, ঘুরিয়ে নিন, গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। অন্য রাস্তা ধরে চলুন!’ অবস্থার চাপে সকলের শরিফ মেজাজও উচ্চণ্ড হয়ে গেছে।
চালকও খেপে গিয়ে বললেন, ‘কী বলছেন? এই গাড়িগুলো এলোমেলো লেনে ঢুকে গিয়ে, জ্যামটাকে আরও পাকিয়ে তুলবে, এটা বুঝতে পারছেন না? ‘
চালক এরপর প্রস্তাব দিলেন, সুবেশ যাত্রীদের মধ্যে কাউকে স্টিয়ারিং-এ এসে বসতে। তাতে মোক্ষম কাজ হল। হইহইটা স্তিমিত হয়ে গেল। তবে, বেলা তখনও ফিসফিস করে খুব উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘লোকটা এমন বিশ্রী ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে কেন বলো তো? কখন পৌঁছাবে কে জানে! আর, কী গরম পড়েছে, তাই না!’
‘হ্যাঁ, খুব গরম পড়েছে। তোমার মেক-আপ তো গলতে শুরু করেছে!’
আমার মন্তব্য বেলার অন্তরাত্মা পর্যন্ত উষ্ণ করে তোলে। মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘যাও, যাও, তোমাকে দেখতে হবে না।’ বলে সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্যাবলি দেখতে থাকে।
ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে আসতে আড়াই ঘণ্টা লেগে গেল। বাস থেকে যখন নামা হল, প্রত্যেকের পোশাক ঘামে গায়ের সঙ্গে লেপটে বসেছে। ছোটো ছোটো মেয়েরা রাংতায় মোড়া গোলাপফুল হাতে তুলে দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। মৃদু ভলিউমে সানাই বাজছে। নানারকম পারফিউমের গন্ধ হাওয়ায় কোলাকুলি করছে। অনেক পুরোনো একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যেতে মনটা খুশি হয়ে উঠল। লাজুক চোখে বেলার দিকে তাকালাম। সে অবশ্য ততক্ষণে অ্যাপার্টমেন্টের অন্যান্য লাবণ্যময়ীদের দলে ভিড়ে গেছে।
পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস গুপ্ত যেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ‘আরে বেলা, কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে! বাঃ, গলার নেকলেসটাও তো দারুণ। কবে বানালে গো?’
(ক্রমশ…)





