বেলার নেকলেসটা দু-আঙুলে অল্প তুলে ধরে মিসেস গুপ্ত নিশ্চয়ই তার দামটাও মেপে নিতে চাইলেন।
পাশ থেকে মিসেস দত্তও ঝুঁকে পড়লেন, ‘সত্যি তো!’
দেখতে দেখতে নেকলেসের উপর ঝুঁকে পড়া মাথার সংখ্যা বাড়তে থাকল। ক্রমশ বেলাই হারিয়ে গেল ওকে ঘিরে থাকা ভিড়ের মধ্যে। ক্ষুণ্ণ মনে সেটাই দেখতে থাকি। এক-এর বি-এর অর্ণব মজুমদার আমাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল। সকালে প্রায় একই সময়ে আমরা অফিসের উদ্দেশ্যে বের হই। তখন দেখা আর কথা হয় অল্পস্বল্প। তাতেই সে আমাকে বন্ধু ঠাউরে নিয়েছে। দিব্যি কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আরে আবিরদা! এখানে এই মহিলাদের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছ? ওদিকে চলো। ছেলেদের আলাদা আড্ডা বসেছে ও ঘরে। তোমাকে সবাই ডাকছে।’ অগত্যা অর্ণবের সঙ্গে মি: দত্ত, মি: গুপ্ত এবং মি: দত্তগুপ্তদের আড্ডায় এসে ভিড়লাম।
মি: দত্ত চারপাশে তাকিয়ে, তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে বললেন, ‘ভাই, রতনবাবু কিন্তু বেশ সরেস বেয়াইবাড়ি জুটিয়েছেন, যাই বলুন। যথেষ্ট খরচাপাতি করেছে। মনও খুবও ভালো। বন্দোবস্ত দেখেছেন?’
অর্ণব বলল, ‘আপনিও যেমন দত্তদা! ভিতরের কথা বলছি, আমার কাছে শুনুন। রতনবাবুকে জোটাতে হয়নি, পাত্র নিজেই জুটিয়েছেন। এই মেয়েটার সঙ্গে রতনবাবুর ছেলেকে আমি অনেকদিন দেখেছি লাভার্স পার্কের ওখানে!’
মি: দত্তগুপ্ত মুখটা বড়ো করে হাঁ করে বললেন, ‘তুমি ওখানে কী করতে গেছিলে হে?’ অর্ণব থমকে গিয়ে ঢোঁক গিলে বলল, “আরে কী আশ্চর্য! পার্কের কাছেই তো আমার অফিস!’
মি: দত্তগুপ্ত চোখ মটকে বললেন, ‘অফিসটাও বেছে বেছে খুব ভালো জায়গায় জুটিয়েছ দেখছি।’
মি: দত্ত তাকে থামিয়ে দিয়ে বললন, ‘আহা ওকে বলতেই দিন না! ঝেড়ে কাশো দেখি অর্ণব। পরচর্চা বেশ ভালোই লাগে৷ একথা বউদের আবার যেন বোলো না!’
অর্ণব গলা নামিয়ে বলল, ‘দু’জনে একই কলেজে, একই ক্লাসে পড়ত।’
তারপরই অর্ণবের চোখ পড়ল আমার দিকে। সে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘আবিরদা মিটমিট করে হাসছে। কী আবিরদা, হাসছেন যে বড়ো!’
আমি গলাটা কেশে সাফ করে নিয়ে বললাম, ‘আমি ভাবছিলাম, সবই যখন ঠিকঠাক হয়েই ছিল, তখন এত খরচা করার দরকার কী ছিল! এত বড়ো বাড়ি ভাড়া নেওয়া, এত এলাহি খাওয়াদাওয়ার আয়োজন, সাজগোজ, গয়নাগাটি — এসব ফালতু খরচ না?’ মি: দত্তগুপ্ত চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, “আসলে কী জানেন আবিরবাবু, মেয়েপক্ষের টাকাপয়সার কোনও শেষ নেই। বিরাট সমুদ্র থেকে দু-এক ঘটি জল তুলে নিলে সমুদ্রের কি কোনও ক্ষতি হয়?’
আমি ক্ষুগ্ধ মুখে বললাম, ‘তা বলেই কি জলের মতো টাকাপয়সা খরচ করা উচিত?’
হাতে ধরা ঠান্ডা পানীয়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে অন্য এক কোণ থেকে তেতলার মনোজ ঘোষ কথা বলে উঠল এবার, ‘এই আবিরবাবুটা না কেমন যেন… বেশ মজা করছিলুম! দিল মুডটা খারাপ করে !’
আমি খানিকক্ষণ ব্যাজার মুখ করে বসে রইলাম। তারপর গুটিগুটি পায়ে সরে এলাম মশগুল ভিড় থেকে।
নিমন্ত্রিতদের ভিড়টা ক্রমশ বাড়ছে। অনেকটা ঘুরে শেষপর্যন্ত বেলাকে পাওয়া গেল। ফুচকার কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে মহানন্দে মুখে পুরছে। কাছে গিয়ে কানেকানে বলি, ‘রাত হচ্ছে। এবার খেয়ে নিলে হয় না? বাস কখন ছাড়বে জানি না। দেরি হলে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব। তুমি কী বলো?’
বেলা এমন চোখে তাকাল, মনে হল যেন, আমি গর্হিত কথা বলে ফেলেছি। বলল, ‘এত তাড়ার কী আছে? এখনও কেউ চলে গেছে কি?
‘না, বলছিলাম কী, সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে তো অফিসে। তারপর এই ভয়ানক যানজট পার হওয়া। বাড়ি পৌঁছাতেও ঘণ্টা দুয়েক লাগবে।’
‘বাচ্চাদের মতো কথা বোলো না তো! এসে থেকে খালি খাই খাই আর যাই-যাই!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘বেশ, তাহলে আমি ওই সোফাটায় বসে আছি কেমন? তোমাদের খাওয়ার সময় হলে ডেকো!’
মুখ না ফিরিয়েই বেলা বলল, ‘আচ্ছা!’
(ক্রমশ…)





