বিমলদা গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল, ‘দ-শ-হাজার বিয়ে? ভাবতে পারো ভায়া? কী কাণ্ড! আমার হয়েছে বিপদ। অর্ধেক বলেকয়ে ছুটি নিয়েছে, বাকিদের বেশিরভাগ না জানিয়ে ডুব মেরেছে। আর যে গুটিকয় দয়া করে এসেছে, আমায় ধন্য করতে, তারাও বলছে লাঞ্চের পরে তাদের ছেড়ে দিতে হবে। বলো দেখি, কী কাণ্ড! আরে এটা অফিস, না থেটার?’
বিমল মুখোটি উত্তেজনায় হাত পাকিয়ে টেবিলে ঘুসি মারল। মেরে নিজেই মুখ বেঁকিয়ে ফেলল ব্যথায়।
মিলন তখনও যায়নি। সব শুনে পাশ থেকে ফোড়ন কাটল, ‘সেই দলে তো আপনিও পড়েন বিমলবাবু!’
‘কি, আমি পড়ি? মানে কী ?’
‘মানে, আপনারও ছুটি চাই লাঞ্চের পর। বউদিকে ফোনে বলছিলেন, তৈরি হয়ে থাকতে, শুনিনি ভাবছেন? ফিসফিস করে বললেই কি সব কথা চাপা দেওয়া যায়?’
বিমলদা খেপে গিয়ে বলল, ‘দূর হ। দূর হ হতচ্ছাড়া। বিমল মুখোটির পিছনে লাগতে এসেছে? জানে না….!’
মিলন মুচকি হেসে পালাল।
বিমল মুখোটি গলা বাড়িয়ে চাপা স্বরে শুধাল, ‘কী কাণ্ড! কী করি বলুন তো মশাই? ম্যানেজমেন্ট কাগজেকলমে ছুটি দেবে না। এদিকে সকলেরই নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার আছে। সেনসিটিভ ইস্যু। কাউকে বাধা দেওয়াও যাবে না। আপনারও আছে নাকি নিমন্ত্রণ?’
বেলার সকালবেলার হুমকি মনে পড়ে গেল৷ আঁতকে উঠে বললাম, ‘আছে বইকি! আমাকেও, মানে একটু তাড়াতাড়ি ছাড়তে হবে বিমলদা!’
‘আরে ছিঃ ছিঃ, এটা কোনও কথা হল নাকি একটা?’ বিমল মুখোটি বিগলিত ভঙ্গিতে বলে, “সবাই যাচ্ছে, আমি-আপনিও যাচ্ছি। ম্যানেজমেন্টকে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝবে। আমার ছেলেটা ছোটোবেলায় কী দুষ্টু আর দুরন্ত ছিল জানেন? কিন্তু ওই… বুঝিয়ে বললে, কী কাণ্ড, একেবারে শান্ত!’
‘কিন্তু বিমলদা, একটা সন্দেহ কিন্তু আমার রয়েই যাচ্ছে!’ —রহস্যভেদীর দৃষ্টিতে চোখ সরু করে বললাম।
‘কী সন্দেহ, আবিরবাবু?’
‘এই যে বিয়েবাড়ি যাবে বলে অফিস ফাঁকা করে সকলে চলে যাচ্ছে, এরা সবাই কি বিয়েবাড়িই যাচ্ছে? নাকি একদিন এই ছুতোয় একটা ছুটি নিয়ে নিচ্ছে?’
বিমল মুখোটি খপ করে আমার হাতটা ধরে বলল, ‘আপনি আমার মনের কথাটা বলেছেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই যে, কাউকে আপনি সন্দেহ করতে পারবেন না। দশ হাজার বিয়ে। তার মানে প্রত্যেক বিয়েতে যদি গড়ে তিনশো লোক যায়, তাহলে তিনশো ইন্টু দশ হাজার। ভাবতে পারছি না মশাই। এত লোক আছে শহরে?’
‘তা কেন! এক-একজনের দু-তিনটে করে নিমন্ত্রণও থাকতে পারে’, বিজ্ঞের মতো বললাম।
বিমল মুখোটি বলল, ‘আপনারও তো বিকেলে নিমন্ত্রণ!’
‘হ্যাঁ! আমাকেও বের হতে হবে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, যেতে ইচ্ছে করছে না বিমলদা। বউ বলছে যেতে। তাই যাব। নাহলে তো গৃহশান্তি নষ্ট হবে।’
‘কী কাণ্ড! যেতে ইচ্ছে করছে না কেন? বউদির বাপের বাড়ি যাবেন তো! তাহলে তো স্পেশাল আদর… মানে ইয়ে… সমাদর। স্পেশাল সমাদর পাবেন!’ বিমলদা চোখ টিপে রসিকতা করে।
‘আরে না, শ্বশুরবাড়ির অনুষ্ঠান এটা নয়। আমাদের উপরের ফ্ল্যাটে রতনবাবু থাকেন। ওরই ছেলের বিয়ে। বরযাত্রী যেতেই হবে, খুব করে ধরেছে। আর সে বিয়ে কোথায় হচ্ছে জানেন?’
বিমলদা দু-পাশে ঘাড় নাড়ে।
‘আমিও জানি না দাদা। তবে শুনেছি কমপক্ষে দু-ঘণ্টা লাগবে শুধু সেখানে পৌঁছাতে!’
বিমল মুখোটি অবশ্য আর কথা বাড়াতে চাইল না। ভেবেছিল আমার কাঁধে বন্দুক রেখে, অফিসটাকে খোলা রেখে ম্যানেজমেন্টকে খুশি করবে। কিন্তু সেটি না হওয়ায় বেশ দমে গেছেন ভদ্রলোক। মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে আমি কাজে মন দিলাম।
বিকেলে ঠিক পাঁচটায় জামার পকেটে ফোনটা নড়েচড়ে উঠল। বেলা তাগাদা দিল, ‘কই গো, কখন বের হবে! বললাম, ‘এই তো এক্ষুনি…!’
তমালও কেবিনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আবিরদা, গোটা অফিস খালি হয়ে গেছে। এখন আপনি এগোলে, আমিও বের হতে পারি।’
বললাম, ‘হ্যাঁ, এই তো হয়ে গেছে…!’
যৌথ তাগাদায় শেষপর্যন্ত ফাইলপত্র বন্ধ করে উঠতেই হল। গুনগুন করে একটা সুর ভাঁজতে ভাঁজতে অফিসের বাইরে এসে স্কুটারে সওয়ার হলাম। ফেরার সময় রোজই ট্র্যাফিক জ্যামে আটকাতে হয়। অফিস থেকে বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু পৌঁছাতে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়। অথচ আজ এই পড়ন্ত বিকেলে রাস্তাঘাট আশ্চর্যরকম ফাঁকা। বোধহয় সকলেই বাড়িতে বসে নিজেদের সন্ধ্যার প্রদর্শনীর জন্য প্রস্তুত করছে। হয়তো একটু পরেই সুন্দর ও সুন্দরীরা শহর জুড়ে ক্যাটওয়াকে বেরোবেন।
বাড়ি গিয়ে দেখলাম বেলা খুব ব্যস্ত। এককাপ চা আর বিস্কুটের গোটা কৌটোটাই আমার সামনে ধপ করে বসিয়ে হুড়মুড়িয়ে চলে যেতে যেতে বলল, ‘ঝট করে তৈরি হয়ে নাও। সোসাইটির সকলেই কিন্তু একসঙ্গে যাবে বলে ঠিক করেছে। সময়ের মধ্যে বের হতে হবে!’
আমি শেষবারের মতো মরিয়া গলায় বলি, “বেলা, যাওয়াটা সত্যিই কি খুব জরুরি? তুমি তো জানো ভিড় আমার ভালো লাগে না!’
(ক্রমশ…)





