‘গীতা মা’-এর বিষয়টি যখন গুরুতর হয়ে উঠল, কেবল তখনই তা জনসমক্ষে এল। এরপর এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন এক মাত্রায় পৌঁছাল যে, আমি ‘সমগ্র ভারতের মা’ হয়ে উঠলাম। শুরুতে বিষয়টি আমি পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারিনি। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যে, এই তকমার সঙ্গে একটি দায়িত্বও জড়িয়ে আছে— আর সেই দায়িত্ব পালন করাই আমার কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল।

নতুনদের জন্য পরামর্শ

গীতা-র মতে, ‘নাচ-পরিকল্পনা বা কোরিওগ্রাফির ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া এখন আর কঠিন কোনও বিষয় নয়। আমি যখন শুরু করেছিলাম, তখন নাচকে পেশা হিসেবে খুব একটা গ্রহণযোগ্য মনে করা হতো না। সেই সময়ে মানুষকে এটা বোঝানো কঠিন ছিল যে, নাচকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব এবং এটি সত্যিই একটি পেশা হতে পারে। সেটাই ছিল একমাত্র বড়ো চ্যালেঞ্জ। তবে বর্তমানে, নাচে দক্ষতা থাকলে কোরিওগ্রাফার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। যারা কোরিওগ্রাফার হতে আগ্রহী, সেই মেয়েদের প্রতি আমার পরামর্শ হল— ভালো ভাবে নাচ শিখুন এবং এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো গভীর ভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। নিয়মিত অনুশীলন করুন এবং একজন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নাচের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আয়ত্ত করুন। নাচের ভিত যদি মজবুত না হয়, তবে এই ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী কেরিয়ার গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কোরিওগ্রাফি শেখানোর জন্য প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও, এটি মূলত অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শিখতে হয়।’

তিনি এও বলেন যে, ‘কারও অধীনে কাজ করলেই কেবল আমার মতো অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর ক্ষেত্রে কৌশল আয়ত্ত করা অপরিহার্য। চলচ্চিত্রের কোরিওগ্রাফি সাধারণ নৃত্য-কোরিওগ্রাফি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। চলচ্চিত্রে ক্যামেরার বিষয়ে কারিগরি দক্ষতা থাকা জরুরি— যেমন কোন শট ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে ফ্রেম সাজাতে হবে এবং কোন অ্যাঙ্গেল বা কোণ থেকে শিল্পীকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেখাবে, এসব বিষয় বুঝতে হয়।”

ভালো নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠার বিষয়ে গীতার বক্তব্য

গীতা মনে করেন, ‘সবার আগে, নাচের লয় বা ছন্দের বোধ থাকা অপরিহার্য। এর পাশাপাশি নাচের মধ্যে আবেগ থাকা জরুরি। কারণ, এটি হল ভারতীয়দের হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছানোর অন্যতম সহজ উপায়। তাছাড়া, একজন সত্যিকারের বড়ো মাপের নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠতে হলে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন আপনি আপনার নাচের মধ্যে নিজস্ব শৈলী ফুটিয়ে তোলেন অর্থাৎ অনন্য ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তা তৈরি করেন— তখনই আপনি বচ্চন সাহেব কিংবা রাজেশ খান্না-র মতো কিংবদন্তি হয়ে উঠতে পারেন। তাঁদের বৈশিষ্ট্য বা শৈলীই তাঁদের অনন্য পরিচয় এনে দিয়েছে। সর্বোপরি, নাচের প্রতি আপনার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও গভীর অনুরাগ থাকা চাই।”

শিশুদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন

গীতা জানিয়েছেন, ‘ইন্ডিয়াস বেস্ট ড্যান্সার’ শো-তে কোনও শিশু যখন বাদ পড়ে এবং কাঁদতে থাকে, তখন আমার মনে হয় – কান্নাকাটি করাটা স্বাভাবিক হলেও, পরাজয়ে খুব বেশি মন খারাপ করা উচিত নয়, কারণ এটি প্রতিযোগিতারই একটি অংশ। কেউ জেতে, কেউ হারে। তবে হার থেকে কী শিক্ষা পাওয়া গেল, সেটাই আসল। তবুও আমার মনে কষ্ট হয়, কারণ এতগুলো সপ্তাহ শিশুদের সঙ্গে কাটানোর ফলে তাদের সঙ্গে একটা গভীর বন্ধন গড়ে ওঠে। যখন কোনও শিশু বাদ যায়, তখন তা হৃদয় বিদারক মনে হয়। সবাই কতটা কঠোর পরিশ্রম করে তা বিবেচনা করলে মনে হয়, যেন তারা বাদ না পড়লেই ভালো হতো। আমাদের হাতে ক্ষমতা থাকলে আমরা সব শিশুকেই রেখে দিতাম এবং কাউকেই বাদ দিতাম না।”

এই বিষয়ে গীতা-র সংযোজন, ‘বহু বছর আগে, প্রথমবারের মতো, একটি বিশেষ শিশুর জন্য কিছু করার এবং তাকে সফল করে তোলার আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল। তার সঙ্গে আমার এক গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছিল। তার নাম ছিল ফয়সাল। সে সত্যিই খুব চমৎকার একটি শিশু ছিল। সে-ই আমাকে উপলব্ধি করিয়েছিল যে, আমার যদি কখনও সন্তান হয়, তবে আমি চাইব সে যেন ঠিক তার মতোই হয়। নতুবা সন্তান না নেওয়াই ভালো। সেটাই ছিল প্রথম ও শেষবার যখন আমি এমনটা অনুভব করেছিলাম। জানি না তার মধ্যে ঠিক কী এমন ছিল— সে ছিল অত্যন্ত শান্ত ও ধীরস্থির স্বভাবের, আর বয়সও ছিল বেশ কম, বছর দশ-বারো হবে। সে সত্যিই আমার হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল।’

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...