রাতের গভীরতা যখন মানুষের চোখের পাতায় নেমে আসে, তখন এক রহস্যময় জগতে প্রবেশ করে অবচেতন মন। সেই আদিম ও অদ্ভুত ঘোরের নাম— ‘সোমনাম্বুলিজম’ বা ঘুমের মধ্যে হেঁটে চলা বা স্লিপওয়াকিং। যেখানে শরীর জেগে ওঠে, কিন্তু চেতনা থাকে সুপ্ত। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবদীপ রায় চৌধুরী।
যুগে যুগে এই ঘুমের ঘোরে হাঁটার ঘটনা মানুষকে যেমন বিস্মিত করেছে, তেমনই জাগিয়েছে এক অদ্ভুত ভয় ও কৌতূহল। একদিকে এটি যেমন এক অলৌকিক কাব্যের মতো রহস্যময়, অন্যদিকে এটি জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা ও ঝুঁকির বিষয়। তাই, বলা যায়, বিজ্ঞান ও মননের সেই মোহনাতেই লুকিয়ে আছে ‘সোমনাম্বুলিজম’-এর প্রকৃত স্বরূপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মস্তিষ্ক এখনও এক বিশাল অনাবিষ্কৃত মহাবিশ্ব, যার গভীরতা পরিমাপ করা আজও আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে এক পরম বিস্ময়।
স্লিপওয়াকিং বা ঘুমের ঘোরে হেঁটে চলা হল— শরীরের উপর মনের এক অদ্ভুত একাধিপত্যের গল্প। বিজ্ঞান বলে, এটি মস্তিষ্কের ‘নন-রেম’ (Non-REM) পর্যায়ের এক ধরনের বিভ্রাট। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক ভাবে, এটি যেন মানুষের অবদমিত ইচ্ছের, কান্নার কিংবা না-বলা কোনও গল্পের শারীরিক বহিঃপ্রকাশ। যে কথা বা যে বেদনা মানুষ দিনের আলোয় প্রকাশ করতে পারে না, রাতের নির্জনতায় তার শরীর যেন সেই না-বলা কথারই রূপান্তর ঘটায় অবচেতন পদচারণায়। এটি যেন এক জীবন্ত স্বপ্ন, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের স্বপ্নের প্রধান চরিত্র হয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে ঘুরে বেড়ায়।
ঘুমের মধ্যে হাঁটা আসলে কী?
আসলে, ঘুমের মধ্যে হাঁটা বা ‘সোমনাম্বুলিজম’ (Somnambulism) এমন একটি সমস্যা, এর প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেন অনেকে। এটি স্নায়ুবিজ্ঞান (Neurology) এবং মনোবিজ্ঞানের (Psychology) এক অস্বস্তিকর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করে। এক্ষেত্রে শরীর সচল থাকে, অথচ মন তখনও ঘুমের ঘোরেই আচ্ছন্ন থাকে। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অফ মেন্টাল ডিসঅর্ডারস-এর (ফিফথ এডিশন) টেক্সট রিভিশন-এ (DSM-5-TR) ঘুমের মধ্যে হাঁটাকে ‘NREM স্লিপ অ্যারোেজাল ডিসঅর্ডারস’-এর অধীনে ‘স্লিপ টেরর’-এর সঙ্গে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, উভয়ই নন র্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) ঘুম, বিশেষত গভীর ধীর-তরঙ্গ পর্যায় থেকে উদ্ভূত হয়।
সমস্যার লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যসমূহ
এই সমস্যার লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো বেশ স্বতন্ত্র। এতে ঘুমের মধ্যে বারবার আংশিক জেগে ওঠার ঘটনা ঘটে। সাধারণত রাতের প্রথম ভাগে, যখন ব্যক্তিটি বিছানা থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করতে থাকেন। এই সময় ব্যক্তির দৃষ্টি থাকে শূন্য ও স্থির। জেগে ওঠার পর সাধারণত ঘটনার কথা তাদের খুব কমই মনে থাকে বা আদৌ মনে থাকে না।
আচরণগত দিক থেকে ঘুমের মধ্যে হাঁটার (সোমনাম্বুলিজম) ঘটনাটি বিছানায় উঠে বসা থেকে শুরু করে জটিল ও উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে হওয়া বিভিন্ন কাজ পর্যন্ত হতে পারে। যেমন— দরজা খোলা, আসবাবপত্র সরানো, পোশাক পরা, খাওয়া-দাওয়া করা কিংবা আরও বিরল ও উদ্বেগজনক ক্ষেত্রে গাড়ি চালানো বা আইনি ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন কোনও কাজে লিপ্ত হওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ঘুমের মধ্যে হাঁটা ব্যক্তিরা প্রায়ই পরিচিত পরিবেশে আশ্চর্যজনক সাবলীলতার সঙ্গে চলাফেরা করতে পারেন।
কারা বেশি এই সমস্যার শিকার হন?
ঘুমের মধ্যে হাঁটা বা ‘স্লিপওয়াকিং” মূলত শৈশবের একটি ঘটনা। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১০ থেকে ৩০ শতাংশ শিশু অন্তত একবার ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। তবে এদের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে কম সংখ্যক শিশু প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ নিয়মিত ভাবে এমনটা করে থাকে। সাধারণত চার থেকে আট বছর বয়সের মধ্যে এই আচরণের সূত্রপাত ঘটে এবং আর্ট থেকে বারো বছর বয়সে এর প্রবণতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পরবর্তীতে স্নায়ুতন্ত্রের পরিপক্বতা লাভ এবং ‘স্লো-ওয়েভ স্লিপ’ বা গভীর ঘুমের ধরন স্থিতিশীল হলেই এই সমস্যাটি কমে আসে। অধিকাংশ শিশুই বড়ো হয়ে এই সমস্যাটি কাটিয়ে ওঠে।
প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ঘুমের ঘোরে হাঁটার ঘটনা তুলনামূলক ভাবে কম দেখা গেলেও, তা মোটেও বিরল নয়। শৈশবে মেয়েদের মধ্যেও ঘুমের ঘোরে হাঁটার (স্লিপওয়াকিং) প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পুরুষদের মধ্যে এটি বেশি পরিলক্ষিত হয়। এর বিপরীতে, ঘুমের ঘোরে হাঁটার সময় খাবার খাওয়ার বিষয়টি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। চিকিৎসাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সমস্যার কারণ কী?
নিদ্রাভ্রমণের (sleepwalking) কোনও একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই, বরং এটি জৈবিক প্রবণতা এবং পরিস্থিতিজনিত কারণে উদ্ভূত হয়। এটি আসলে “ভালনারেবিলিটি-স্ট্রেস মডেল’ (vulnerability-stress model) বা ‘সংবেদনশীলতা-মানসিক চাপ বিষয়ক মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জিনগত এবং স্নায়বিক দুর্বলতা
যে-কোনও প্যারাসোমনিয়ার মধ্যে ঘুমের ঘোরে হাঁটার ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রবণতা সবচেয়ে শক্তিশালী দেখা যায়। নিকটাত্মীয়ের ঘুমের মধ্যে হাঁটা বা ঘুমের মধ্যে আতঙ্ক থাকার কারণে, এই রোগের ঝুঁকি দশগুন পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং যমজ ভাইবোনের তুলনায় অভিন্ন যমজদের মধ্যে এই মিল উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনগত প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করে। নিউরোইমেজিং ব্যবহার করে করা গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ‘শরীর জাগ্রত, মন ঘুমন্ত’– এমন অবস্থার মধ্যে যে অসামঞ্জস্য দেখা যায়, তা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট থ্যালামো-সিংগুলেট পথগুলোর সক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যার পাশাপাশি পূর্ণ চেতনার জন্য দায়ী বৃহত্তর কর্টিক্যাল অ্যারোেজাল নেটওয়ার্কের ক্রমাগত নিষ্ক্রিয়তাও কাজ করে। জিনগত গবেষণায় NREM প্যারাসোমনিয়া এবং একটি নির্দিষ্ট হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে সংযোগও চিহ্নিত করা হয়েছে, যা এর জৈবিক ভিত্তিকে আরও নিশ্চিত করে।
সমস্যার তীব্রতা বৃদ্ধিকারী কারণসমূহ
যাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার প্রবণতা তীব্র, তাদের ক্ষেত্রেও সাধারণত এমন কিছু বিষয় এই পর্বগুলোকে (episodes) উসকে দেয় বা আরও গুরুতর করে তোলে, যা ‘স্লো-ওয়েভ স্লিপ’ বা গভীর ঘুমের পর্যায়কে দীর্ঘায়িত কিংবা খণ্ডিত করে। এসব কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – – ঘুমের অভাব ও অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি, জ্বর ও অসুস্থতা, মদ্যপান, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ, অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এমন অন্যান্য শারীরিক অবস্থা এবং মানসিক চাপ বা উদ্বেগ।
ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন
যখন কোনও ব্যক্তি অথবা কোনও উদ্বিগ্ন অভিভাবক নিদ্রাভ্রমণ বা ঘুমের মধ্যে হাঁটার সমস্যা নিয়ে আসেন, তখন সাধারণত একটি মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— সমস্যাটির মেয়াদ ও ঘটনার পুনরাবৃত্তির হার, ঘুমের মধ্যে হাঁটার সময়কার সাধারণ আচরণের বিবরণ (যা এমন কোনও সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যের দ্বারা নিশ্চিত হওয়া বাঞ্ছনীয়, যিনি ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন), আঘাত পাওয়া, বাড়ির বাইরে চলে যাওয়া বা সম্ভাব্য বিপজ্জনক কোনও আচরণের ইতিহাস। প্যারাসোমনিয়া বা ঘুমের অস্বাভাবিক আচরণের পারিবারিক ইতিহাস, বর্তমান ঘুমের অভ্যাস (sleep hygiene ), ঘুমের সময়কাল এবং সাম্প্রতিক সময়ে ঘুমের ঘাটতি, অ্যালকোহল-সহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার, বর্তমান মানসিক চাপের মাত্রা এবং ঘুমের অন্যান্য ব্যাধির লক্ষণ— যেমন নাক ডাকা বা ‘অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’-র ইঙ্গিতবাহী শ্বাস-প্রশ্বাস সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা
চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত সমস্যার তীব্রতা, পুনরাবৃত্তির হার এবং ঝুঁকির মাত্রার উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। যেসব শিশুর ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা খুব কম ঘটে এবং তা কোনও গুরুতর শারীরিক সমস্যার লক্ষণ নয়, তাদের জন্য সরাসরি চিকিৎসার পরিবর্তে আশ্বস্ত করা এবং পারিপার্শ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের বোঝানো হয় যে, শিশু বড়ো হওয়ার পর সাধারণত এই আচরণটি আর থাকবে না। তাই, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত— আচরণটি বন্ধ করার চেয়ে বরং আঘাত বা দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা।
এছাড়া, নির্ধারিত সময়ে জাগানো অন্যতম সুপ্রতিষ্ঠিত একটি আচরণগত কৌশল, যা বিশেষত তখন কার্যকর হয়, যখন প্রতি রাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই সমস্যাটি দেখা দেয়। এই পদ্ধতিতে, ব্যক্তিকে তার সমস্যাটি দেখা দেওয়ার সাধারণ সময়ের প্রায় পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট আগে জাগিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ‘গভীর ধীর-তরঙ্গ’ টেকনিক ঘুমের সেই পর্যায়টিকে বন্ধ করে। যদিও এর কার্যকারিতার প্রমাণ মূলত বড়ো আকারের র্যান্ডমাইজড ট্রায়ালের পরিবর্তে কেস সিরিজের উপর ভিত্তি করে গঠিত, তবে ক্লিনিক্যাল রিপোর্টগুলোতে এই পদ্ধতির মাধ্যমে সমস্যার পুনরাবৃত্তির হার উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
সাধারণত যেসব পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে— দরজা ও জানলা সুরক্ষিত করা, শোওয়ার ঘর ও চলাচলের পথ থেকে হোঁচট খাওয়ার মতো বস্তু বা অগোছালো জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলা। সেইসঙ্গে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাড়ির নীচতলায় ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— ঘুমের ঘোরে হাঁটা কোনও ব্যক্তিকে জোর করে জাগানোর চেষ্টা করা সাধারণত অনুচিত। কারণ, হঠাৎ জেগে উঠলে তাদের বিভ্রান্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে কিংবা খুব বিরল ক্ষেত্রে তারা উত্তেজিত বা আক্রমণাত্মক আচরণ করে বসতে পারে। তাই যখন হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়, তখন সবচেয়ে ভালো উপায় হল— তাদের সঙ্গে কথা বলার বা পুরোপুরি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা না করে, শান্ত ভাবে তাদের পুনরায় বিছানায় নিয়ে যাওয়া। মনস্তাত্ত্বিক দিক
নিছক ঘুমের মধ্যে হাঁটার ঘটনাগুলোর বাইরেও এর সঙ্গে গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ জড়িয়ে থাকতে পারে। যেমন লজ্জা বা বিব্রতবোধ, ভ্রমণ বা অন্যের সঙ্গে থাকার বিষয়ে দুশ্চিন্তা, সঙ্গীর ঘুম বারবার ভেঙে যাওয়া বা তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়ায় সম্পর্কের উপর চাপ সৃষ্টি হওয়া।
একজন মনোবিদের কাজের একটি অংশ হল— এই অভিজ্ঞতাকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা, ভুল ধারণাগুলো সংশোধন করা এবং পরিবারগুলোকে এমন শান্ত ও সুশৃঙ্খল রুটিন তৈরিতে সহায়তা করা, যার মাধ্যমে ভয় বা সামাজিক অসম্মানের (stigma) সৃষ্টি না করেই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।
আসলে, বিজ্ঞান ও জীবনবোধের মেলবন্ধনে এই অস্থির পদচারণাকে শান্ত করার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের মাঝেই। মনের ভিতরের ঝড় যখন শান্ত হয়, রাতের ঘুমও তখন তার চেনা ছন্দ ফিরে পায়।





