এইতো সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অলকানন্দা, তার গান শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে গেলাম আমরা। তারপর পায়ে হেঁটে একে একে দেখে নিলাম ব্যাসগুহা, গণেশগুহা। ব্যাসগুহায় বসে মুনি বেদব্যাস চতুর্বেদ রচনা করেছিলেন। আর গণেশগুহায় রচিত হয়েছিল মহাকাব্য মহাভারত। ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম, পথের দু’ধারে কয়েকটা রেস্তোরাঁ আর সারি সারি দোকান। দোকানি বসে সযত্নে বানাচ্ছে উলেন গারমেন্টস। চোখে মুখে আশা, তাদের হাতের তৈরি জিনিস বিক্রি হবে এই পথেই। আরেকটু এগোলে পথের ডানদিকে মা সরস্বতীর মন্দির। পাশেই দুরন্ত, দুর্নিবার, দুগ্ধকায়া সরস্বতী নদী। উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ের বান্দরপুছ ম্যাসিফ-এর সরস্বতী-রুপিন গ্লেসিয়ার থেকে এই সরস্বতী নদীর উৎপত্তি। মহাভারত এবং ঋকবেদে এই নদীর উল্লেখ আছে। এই পথ মহাপ্রস্থানের পথ।

কথিত আছে, এই পথ দিয়েই পঞ্চপাণ্ডব স্বর্গারোহণ করেছিলেন। তাই এই পথের নাম স্বর্গারোহিণী মার্গ। দ্রৌপদী এই পথে সরস্বতী নদী পার হতে পারছিলেন না। তখন বাহুবলী ভীম একটি বিশালকার পাথর দিয়ে নদীর উপর সেতু বানিয়ে দেন। সেই পাথর আজও বিদ্যমান এবং এই প্রাকৃতিক সেতুটি ভীমপুল নামে পরিচিত। গর্জনশীলা এই নদী মানাগ্রামের বুকেই মিশে যায় অলকানন্দার সাথে, যে স্থান কেশবপ্রয়াগ নামে খ্যাত। আমরা প্রাণভরে প্রকৃতির এই অনাবিল ঐশ্বর্য অনুভব করতে করতে এগিয়ে গেলাম স্বর্গারোহিণীর পথে। ফটক পেরিয়ে বেশ কিছুটা পথ বাঁধানো। তাই চড়াই থাকলেও বিশেষ সমস্যা ছিল না। কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। কিছুটা যাওয়ার পর শুধু নুড়ি, পাথর, বোল্ডার আর গ্লেসিয়ার-গলা জল। জীবনের প্রথম ট্রেক যথেষ্ট দুরূহ ছিল আমাদের জন্য।

ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর বসতেই হল আমাদের। তখন দেখলাম আমাদের পিছনে প্রবল পৌরুষে সিংহাসন পেতে দাঁড়িয়ে আছে তুষারশুভ্র নরপর্বত। যাত্রাপথের বাঁদিকে কৃশকায়া অলকানন্দা, ওপারে শেষনাগের মতো পঞ্চফণা সাজিয়ে বিষ্ণু পাদপদ্মের আকারে বিশালকায় নারায়ণপর্বত, যার এপারে সতোপন্থ হিমবাহ আর অন্য পারে গোমুখ হিমবাহ। এই নারায়ণ পর্বত বা শেষনাগ পর্বতের গা বেয়ে নেমে আসছে শ্বেতশুভ্র শেষধারা। এ পথের প্রতিটি বোল্ডারে পড়ে রয়েছে আমাদের আদি-অনাদি মহাকাব্যের স্মৃতি। পাথরে, পাহাড়ি বুগিয়ালে লাল, হলুদ, বেগুনি, গোলাপি, সাদা ফুলের সমারোহ। এসব ফুলের ঢেউ খেলানো হাসি দেখতে দেখতে আমাদের পথের ক্লান্তি গেল কেটে।

যাত্রাপথ বেশ ফাঁকা। অতি আধুনিক সভ্যতা এখনও এই যাত্রার বিশেষ নাগাল পায় না। তাই প্রকৃতি এখানে উজাড় করে মেলে ধরেছে তার রত্নখচিত সৌন্দর্য। বিপদসঙ্কুল এই পথের পরিক্রমা তাই চ্যালেঞ্জের দাবি রাখে। উচ্চতার সঙ্গে প্রবল ঠান্ডা হাওয়ার এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব এখানে। শীর্ণ পাথুরে পথ ধরে সেই হাওয়ার সাথে যুদ্ধ করে আমরা হাঁটতে থাকলাম বসুধারার জলপ্রপাতের উদ্দেশে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা হয়ে ওঠে খাড়াই, দুর্গম। একটার পর একটা পাহাড় পেরিয়ে যেতে থাকি আমরা।

দূর থেকে উঁকি দিচ্ছে পাওয়েগড় পিক। আর সোজাসুজি দূরে দেখা যাচ্ছে বালাকুন। আমরা যেন তার দিকেই হেঁটে চলেছি। পাহাড়িয়া রাস্তার কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছে বিশ্রামভূমি। ডানদিকে দুটো পাহাড়ের মাঝখানে আরওয়া স্পায়ারকে (Awra Spire) তখন চিনতে পারিনি। শুধু তার সৌন্দর্যকে ক্যামেরাবন্দি করেছিলাম তখন। সেসব অনির্বচনীয় দৃশ্য উপভোগ করে পেরিয়ে ঘণ্টাদুয়েক হাঁটার পর ট্রেকিংয়ের আসল অ্যাডভেঞ্চার বুঝতে পারলাম।

দুটো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে আসছে পাহাড়ি খরস্রোতা নদী। জল তার স্বচ্ছ। সেই জল বয়ে যেতে যেতে প্রবল শৈত্যপ্রবাহে হিমবাহের আকার ধারণ করে মিশে গেছে অলকানন্দার বুকে। পায়ে হেঁটে এবড়োখেবড়ো, ছোটোবড়ো পাথরের উপর দিয়ে পেরিয়ে যেতে হবে সেই জলপথ। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। সে জলতরঙ্গ পেরোনোর পর রাস্তা তখন এক্কেবারে খাড়া। এ রাস্তায় কর্পূর আর কোকা 30, যেন সবথেকে বড়ো বন্ধু হয়ে উঠল। ততক্ষণে আমাদের তিনজনের বোতলেরই জল প্রায় শেষ। এভাবে উপরে ওঠা শুধু অসম্ভবই নয়, বিপদজনকও বটে। এই এত দূরের রাস্তায় কোথাও একটু জল পাওয়ার জো নেই। কিন্তু ডাক পেয়েছি তাঁর, তাই তিনি সব ব্যবস্থা করে দিলেন। তিনজন ট্রেকারের একটা দল ঠিক সেই সময়ে বসুধারা দর্শন করে নীচের দিকে নেমে আসছিলেন। তারা তাদের বোতলে বসুধারা জলপ্রপাতের থেকে জল ভরে এনেছিলেন। একটু জল চাইতে প্রায় এক বোতল জল আমাদের দিয়ে দিলেন। এভাবেই এই বিপদসঙ্কুল পথে ঈশ্বর তাঁর ভক্তের কাছে বারবার পৌঁছে যান।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...