উপলব্ধি (পর্ব-০২)

ঝরনা দু-কাপ কফি দিয়ে গেল। মালকিনের অনেক পরে ঘুম ভাঙে তার। প্রশ্রয়ও পায়। ছোটো থেকে এ বাড়িতে আছে। আমরা নীরবে কফি খেতে থাকি। কখনও কখনও অখণ্ড নীরবতাও এমন অনেক কথা বলে যায়, যা মুখে প্রকাশ করা অসম্ভব। আমাদের দু’জনের মধ্যেও সহানুভূতির মৌন আদানপ্রদান হতে থাকল।

সেই ভোরের পর থেকে, যাওয়া-আসার সময় মিতা প্রায়ই আমার পাশে লনে খনিকক্ষণ বসে যেত। নিজের গোপন কথাবার্তাও ভাগ করে নিত কখনও কখনও। অনর্থক কৌতূহল দেখানো রুচি বিগর্হিত কাজ। নিজেই বলত।

টুকরো টুকরো কথাগুলোকে জুড়ে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করলাম। মিতার সঙ্গে ওর স্বামী রণজিতের ডিভোর্স হয়নি ঠিক-ই, তবে এই শহরেই রণজিৎ আলাদা থাকে। আট বছর যখন বয়স তন্বীর, মিতা আর রণজিৎ আলাদা থাকতে শুরু করে। রণজিৎ-ই কার্যত মা-মেয়েকে ছেড়ে যায়। তারপর কোনওদিন এমুখো হয়নি। না, মেয়েকে দেখতেও নয়। স্ত্রী ও মেয়ের সব দায়িত্বও কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল সে।

তন্বীর বাড়তে থাকা উগ্র, উড়নচণ্ডী আচরণ মিতার দুশ্চিন্তা আর মানসিক উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলছিল। তন্বীর বন্ধুদের দিকে সরাসরি তাকনো যায় না। ভয় করে। মনে হয় এরা এই পৃথিবীর কেউ নয়। পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা সবই অদ্ভুত। দিনরাত মাল্টিপ্লেক্স আর নাইটক্লাবে ঘুরছে।

মিতাকে দেখে খারাপ লাগে এখন। বেচারি যেন মরমে মরে থাকে। সাজপোশাকের পারিপাট্যও গিয়েছে। চোখের নীচে একরাশ বিষণ্ণতা। অনেক চেষ্টার পরও তথীকে সে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, সেই ব্যথা যেন তার সর্বাঙ্গে ফুটে বের হয়। আমি যে ওকে কোনওরকম সাহায্যই করতে পারছি না, এতে কম কষ্ট পাচ্ছি না আমিও। উদ্ধৃত ওই মেয়েটিকে বাগে আনার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু মিতা তো নির্দোষ। সে চেষ্টাও চালিয়েছিল আপ্রাণ। তাকে কষ্ট পেতে দেখাটা খুব সুখকর বিষয় নয়। আমার কাছে।

একদিন সকাল থেকে লোডশেডিং। দুপুরের মধ্যে ট্যাংকের জল শেষ হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে অলস আঙুলে একটা পত্রিকার পাতা উলটোচ্ছি, দরজায় টোকা পড়ার শব্দ শুনে উঠতে হল। দরজা খুলে থমকে গেলাম। তন্বী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা জলের জগ। আমার কপালে দু-চারটে বিরক্তির রেখা ফুঠে ওঠার আগেই তন্বী বলে উঠল, ‘একটু জল হবে?’

বললাম, ‘হবে। আমি সবসময় বালতিতে জল ভরে রাখি। হঠাৎ বিপদের সময় কাজে লেগে যায়।”

জগ ভর্তি জল নিয়ে তন্বীর হাতে দিতে গিয়ে সহসা আমার চোখ গেল ওর টকটকে লাল দুটো চোখ আর অত্যধিক ঝুঁকে পড়া ক্লান্ত শরীরটার দিকে। জগটা নেওয়ার সময় আমার হাতে ওর আঙুলগুলো ছুঁয়ে যেতে চমকে উঠলাম। আঙুলগুলো থেকে যেন আগুনের তাপ বের হচ্ছে।

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “আরে, তোমার গায়ে তো ধুমজ্বর!” অজান্তেই আমার হাতটা তখন তার কপালে উঠে গেছে। তন্বী ছটফট করে উঠে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হল। বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না, আমি নিজের খেয়াল রাখতে পারি। আমার অভ্যাস আছে।” তারপর যেভাবে সে ধূমকেতুর মতো হাজির হয়েছিল, সেভাবেই দ্রুত পায়ে ফিরে গেল। যেন উবে গেল।

গায়ে এত জ্বর নিয়ে বাড়িতে একলা থাকা কতটা সংগত সেটা নিয়ে উচিত-অনুচিতের দ্বন্দ্বে পড়লাম। কিন্তু তন্বী যেভাবে তার উদ্ধত ভঙ্গিমা দেখিয়ে চলে গেল, তাতে মনটা যেন বিষিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ যাব কি যাব না-র অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মন সায় দিল না। তুলসীপাতা দিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলাম। দোতলার দরজা খোলাই ছিল। ওদের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি, মাথা পর্যন্ত চাদর টেনে শুয়ে আছে তন্বী। গোটা শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। অদ্ভুত একটা গোঙানির শব্দ উঠে আসছে।

বিছানার একধারে পড়ে থাকা কম্বলটা ভাঁজ খুলে তন্বীর গায়ে চাপা দিয়ে দিলাম। নাম ধরে ডাকতে সাড়া দিল। আমায় দেখে ভ্রূ কুঁচকে উঠল। কিন্তু সেই কুঞ্চন বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।

ওকে বললাম, “চা-টা খেয়ে নাও। দেখবে, শরীরটা ভালো লাগবে।’

কষ্ট করে আধশোয়া হল তন্বী। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ চলে এল। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বের করে ওর মাথায় জলপট্টি দিতে বসলাম। বেশ খানিকক্ষণ পরে মনে হল জ্বরটা নামছে। ওকে আগের চেয়ে অনেক সুস্থ দেখাচ্ছে। মিতাকে খবরটা দেওয়া উচিত ভেবে সামনে রাখা ফোনটা তুলে আমি মিতার মোবাইল নম্বর জানতে চাইলাম।

তন্বী কোনওমতে হাত দুটো বাড়িয়ে জোর করে রিসিভারটা কেড়ে নিল।

—না আপনি… আপনি ফোন করবেন না!

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলাম, “কেন?’

তন্বীর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তবু থেমে থেমে বলতে থাকে, ‘মানছি, আপনি আজ আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন। তবে, আপনার কাছে একটাই অনুরোধ। দয়া করে আমাদের ব্যাপারে থাকবেন না।”

তন্বীর সপাটে বলা কঠোর কথাগুলো মাথার মধ্যে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। উঠে দাঁড়িয়ে চলে যাব বলে পা বাড়ালাম। নীচে নেমে এসে এক কাপ কফি বানিয়ে চুমুক দিতে গিয়েই, বিছানায় টানটান তন্বীর কাঁপতে থাকা দুর্বল শরীরটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। হঠাৎ মনে পড়ল, ওকে তো জিজ্ঞেস করা হল না, সারাদিন মেয়েটার পেটে কিছু পড়েছে কিনা! যদি না খেয়ে থাকে! স্যুপ বানিয়ে আবার গেলাম ওর কাছে।

—আমি তোমার কাছে আসি এটা হয়তো তোমার পছন্দ নয়। তবু, এক বাটি গরম স্যুপ এনেছি। খেয়ে নাও। তন্বী অশক্ত শরীরটা তুলে ধরে বলল, ‘না, সেরকম নয়!”

আর কিছু না বলে আমার হাত থেকে স্যুপের বোলটা নিয়ে সে ধীরে ধীরে চুমুক দিতে শুরু করল। ওর চোখমুখে একটা তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠল। তলানিটুকু পর্যন্ত খেয়ে মুখ মুছে বলল, ‘থ্যাংকস মিসেস মজুমদার। খুব টেস্টি ছিল স্যুপটা।’ আমার আর সহ্য হল না। ঝাঁঝিয়ে উঠে বললাম, “মিসেস মজুমদার? আমার বয়স কত জানিস? তোর মা আমাকে মাসিমা বলে।”

তন্বীর শান্ত আর তৃপ্ত চোখে হঠাৎ-ই বিরক্তি চলকে পড়ল, ‘তাহলে কী বলব?’

—সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে? ঠাম্মা বলতে পারিস, অথবা দিদা…।’

তন্বী কেমন বাঁকা হেসে বলল, ‘আমি সম্পর্কে বিশ্বাস করি না। সেজন্যই কারও সঙ্গে আত্মীয়তা পাতাই না।’ তন্বীর ভিতর থেকে হঠাৎ যেন বয়সোচিত সারল্য উধাও। কিন্তু আমিও মরিয়া জবাব দিলাম, ‘সব কিছুকেই তোরা আজকের যুগের ছেলেমেয়েরা পাওনাগন্ডার হিসাবে দেখিস। তোরা কী করে জানবি মানুষের জীবনে সম্পর্কের গুরুত্ব কতটা! তাতে কত সুখ, তা তুই কী জানিস?’

(ক্রমশ…)

অবাক পৃথিবী (শেষ পর্ব)

যখন-তখন অনলাইনে জিনিস কেনা। কুঁড়ের বাদশা কোথাকার! ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। এরা কী ধরনের উটকো জীব!

—কথায় আছে নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে। এরা কি তবে পাগলের চেয়েও অধম? এমনকী, সামান্য পিঁপড়েটাও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন।

গৌরাঙ্গবাবু স্বীকার করেন যে, পরস্পর দুই প্রজন্মের মানুষের মধ্যে ব্যবধান থাকাটা অতি স্বাভাবিক এবং এটা সর্বকালের স্বীকৃত ঘটনা। তাই বলে এতটা?

—বাবুর জিরো ব্যালেন্স অ্যাকাউন্ট। সেই কারণে ন্যূনতম পুঁজিটুকুও রাখার প্রয়োজন মনে করে না। অর্থাৎ খাও-দাও আর বুঁদ হয়ে যাও। কোথাও কাঁচা টাকার লেনদেন নেই। সবই প্রিপেইড। প্লাসটিক কার্ড জিন্দাবাদ! বাবুগিরির চূড়ান্ত। সহ্য করা যায় না, পরাণ যায় জ্বলিয়া। অথচ মুখ ফুটে তাকে কোনও ভালো-মন্দ পরামর্শ দেওয়া যাবে না। ওটা তার নিজের উপার্জিত ধনলক্ষ্মী। বয়স হয়ে গেল চতুর্বিংশতি বৎসর, কিন্তু জীবন সম্পর্কে এখনও অচৈতন্য। অথচ এই বয়সে আমরা কত ম্যাচিওরড ছিলাম! ব্যাংক-এর পাশবুক-টা যে সময় করে কখনও কখনও আপ-টু-ডেট করানো উচিত, সেই ব্যাপারেও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।

–বাবু লাইনে দাঁড়াতে চান না। ঘোর অনীহা। তাঁর নাকি সময়ের অপচয় হয়। বাবু মুকুটহীন সম্রাট, তিনি যে কোন রাজ্য পরিচালনায় ব্যস্ত থাকেন কে জানে? ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, আমি নিধিরাম সর্দার! পাশবইটা হারিয়ে যাওয়ার ফলে যার সাহায্যে আবার নতুন করে তৈরি করে আনা হয়েছিল, ব্যাংক-এর নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত দেড়শো টাকার বিনিময়ে তিনি যে অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট করবেন সেই টাকাটা, তারও কোনও উপায় ছিল না। কারণ ভাঁড়ারঘর শূন্য।

ভদ্রলোকের মুখে কথাটা শোনার পরে সেদিন পকেট থেকে টাকাটা হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলে ভদ্রলোক তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ছিঃ কী লজ্জার কথা !

—মেয়ে হয়ে জন্মালে বিষয়টা বোধহয় এতটা দৃষ্টিকটূ লাগত না। কিন্তু ছেলেদের যে প্রসাধনের প্রতি কোনওরূপ দুর্বলতা থাকতে পারে, কথাটা ওকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ না করলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। নামী ব্র্যান্ডেড কোম্পানির পাউডার, ক্রিম, শ্যাম্পু, বডিলোশন আর সাবান ছাড়া তিনি ব্যবহার করতে পারেন না! এ এক অবিশ্বাস্য ঘটনা!

অথচ গৌরাঙ্গবাবুর স্পষ্ট মনে আছে, চাকরি জীবনে প্রথম ট্যুরে যাওয়ার সময় মাত্র দশ টাকার দশটি শ্যাম্পু পাউচ সঙ্গে নিয়ে তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন। তাতে দাড়ি কাটা, গায়ে মাখা, মাথায় দেওয়া থেকে শুরু করে কখনও কখনও বিশেষ প্রাকৃতিক ক্রিয়া শেষে বাঁ-হাতটাও ধৌত করতে হতো। হায়, একাল আর সেকালের মধ্যে জমিন আসমান ফারাক !

—দেড় লাখের উপর টাকা খরচ করে বাবু বুলেট গাড়ি কিনেছে অথচ একবারও ভেবে দেখল না যে, তাতে এক কিলো আলুও বহন করা যায় না। বেআক্কেল কোথাকার! একেবারেই আহাম্মক, মোটা মাথা যাকে বলে!

একদিন শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের উদাহরণ পেশ করতেই পুত্র জবাবদিহি করেছিল এই বলে— ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’। ওনার খালি পায়ে চলতে ভালো লাগত তাই চলতেন। ভালো লাগার বিষয়গুলো সবার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা। উনি যা করতে ভালোবাসতেন সেটা যে আমাকেও নকল করতে হবে, সেকথা কোথাও লেখা আছে নাকি? তাতে ফলটা কী হল? ইদানীংকালের লোকেরা কেউ তাঁকে চেনে? না কোনও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে তাঁর নাম খোদাই করা আছে?

ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কত শত বাঙালি ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ হারিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের ক’টা লোক হাতে গুনে তাঁদের নাম বলতে পারবেন? ক’জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মারক তৈরি হয়েছে বলতে পারো? তাই ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’। আমি ‘নতুন ছন্দে লিখব জীবন’।

—ওকে কতবার বলা হয়েছে, বালিশের তলায় মোবাইল ফোন রেখে যেন না ঘুমোয়। এখনও পর্যন্ত অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে মোবাইল ফোন ফেটে গিয়ে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? এরকম দুর্ঘটনা যে কারওর জীবনে আর কখনও ঘটবে না, তা কি কেউ বলতে পারে? যে-কোনও মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে এমন দুর্ঘটনা। এরা আবার নিজেদের শিক্ষিত বলে! যাদের চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানো সত্ত্বেও বোঝার চেষ্টা করে না, তারা এক কথায় নিরেট নির্বোধ।

—বছরে কতবার যে চাকরি ছাড়ে আর ধরে, তার কোনও হিসেব নেই। এরা নাকি কর্পোরেট সেক্টরের উৎসর্গীত কর্মচারী! মিথ্যে ঠাঁট-বাট আর কথায় ফুলঝুরি, এই হল তাদের একমাত্র যোগ্যতা। এরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে বার্তালাপ করে। এরা নাকি আমেরিকান ইংলিশ ফলোয়ার। অনেকটা হাঁটু ভাঙা দ’য়ের মতো অবস্থা। যার মধ্যে ভার্ব নেই, টেন্স নেই, মুড নেই— তবু ইংরেজি বলা চাই। অবশ্য কোনও বিষয়ে চিঠি লিখতে গেলে শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান ইংরেজি জানা বাপের কাছেই আবার ফিরে আসতে হয়। ইংরেজিতে শেক্সপিয়র বানানের শেষে আর (R) থাকে, নাকি ই (E) থাকে, তাও হলপ করে বলতে পারে না।

—আমার পুত্র কিনা আবার ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক! হাসি পায় কথা শুনলে! তিন বছরের মধ্যে সাহিত্যের একটি বইয়ের পাতাও খুলতে দেখিনি। বই পড়ার কথা বললে গায়ে জ্বর আসে অথচ সারাদিন মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে কোনও আলসেমি নেই। আমার বাবার সংগৃহীত বই থেকে মিখাইল শ্লোকোভ (Mikhail Sholokhov) রচিত চার খণ্ডে সমাপ্ত ‘অ্যান্ড কুইট ফ্লোজ দি ডন’ (And Quiet Flows The Don) বইটা ওকে অন্ততপক্ষে চারবার অনুরোধ করেছিলাম পড়ে দেখার জন্যে। প্রত্যেকবার একই উত্তর— রেখে দাও, পরে পড়ব। সেই থেকে বাবু এখনও পর্যন্ত পড়ে উঠতে পারলেন না বইখানা। অথচ ফুটপাত থেকে কিনে আনা চেতন ভগত রচিত ‘হাফ গার্ল ফ্রেন্ড’ বইটা দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

—বইটা পড়তে বলে আমি যে সেদিন কতটা ভুল করেছিলাম তা বুঝতে এখন একটুও অসুবিধে হয় না। আমি নিজে পড়ে যতটা তৃপ্ত হয়েছিলাম, আমি ওকেও সেই রস আস্বাদন করাতে চেষ্টা করেছিলাম। অর্থাৎ ‘আপনি আচরি ধর্ম” আমি অপরকে শেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। আমি হেরে গিয়েছিলাম নিজের কাছে। সেইদিনই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম, পাত্র বিশেষে জ্ঞানদান করা বিধেয়, অন্যথায় অপমানিত হতে হয়। এখন ইংরেজি স্কুলে পড়াবার ফল পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে। না শিখেছে বাংলা, না শিখল ইংরেজি! একেক সময় গৌরাঙ্গবাবু নিজের অজান্তে ভাবেন— কী দুর্ধর্ষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। পরের ছেলে নরেনকে নিজগুণে তিনি স্বামী বিবেকানন্দরূপে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভাবা যায় সেই কথা! অথচ কী আশ্চর্য! আমি নিজের ঔরসজাত পুত্রকে যেমনটি করতে চেয়েছিলাম, তেমন করে তৈরি করতে পারিনি। সবই কপাল! কথায় আছে— ম্যান প্রোপোজ গড ডিসপোজেস।

ঘণ্টাখানেক বাদে বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন, বিশাল বিপুল আকারের একটি পিসবোর্ডের তৈরি বাক্স পড়ে আছে মেঝেতে আর ইতস্তত ছড়ানো ছিটানো নানান প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিশেষ উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে তাঁর মন। মনে মনে ছেলের উপর একটু অসন্তুষ্ট হন।

—কী দরকার ছিল একসঙ্গে এতগুলো অর্থের অপচয় করার?

ভাগ্নি অতসী মামার মনের ভাবখানা বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে বলে, ‘মামা, এগুলো ভাইয়ের গিফ্ট এসেছে আমেরিকা থেকে। ভাই কোনও এক কোম্পানির প্রোডাক্টের উপর নিজের লেখা একটি ক্যাপশন পাঠিয়েছিল। ভাইয়ের লেখাটাকে তারা প্রথম স্থান দিয়েছে। তাই খুশি হয়ে এই উপহারগুলো ভাইকে পাঠিয়েছে। এতে আঠারোটি আইটেম আছে আর দু’হাজার ডলারের একটি অ্যাকাউন্ট চেক পাঠিয়েছে। ওটা ভাইয়ের ব্যাংক-এ জমা পড়বে। ভাবা যায় একথা!

গৌরাঙ্গবাবু সেই মুহূর্তে শিশুর অপার বিস্ময়ভরা দৃষ্টি মেলে বিষয়টা অনুধাবন করার চেষ্টা করছিলেন। কেবলই মনে পড়ছিল সেই আপ্ত বাক্যটি— ‘স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়’। তিনি কি সেই মুহূর্তে চোখ খুলে দিবাস্বপ্ন দেখছেন? সেই মুহূর্তে তার ইন্দ্রিয়গুলো অসাড় হয়ে পড়েছিল বলে বোধ হচ্ছিল। এও কি সম্ভব? তিনি ভুল কিছু শুনছেন না তো? ভুল কিছু দেখছেন না তো? সব সত্যি তো!

কেবলই মনে হচ্ছিল, ছেলের কাছে তিনি হেরে গিয়েছেন। তবুও বারে বারে ঘুরে ফিরে একটা কথাই মনে পড়ছিল। তাই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন এই বলে— পুত্রের কাছে পিতার পরাজয় সে তো পরাজয় নয়, গর্বের বিষয়। পুত্র সিদ্ধার্থের সিদ্ধিলাভের পরে পিতা শুদ্ধোদন পুত্রের চরণ স্পর্শ করে তাঁকে প্রণাম করেছিলেন। একথা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ করা আছে।

সেই মুহূর্তে গৌরাঙ্গবাবুর নিজেকে ভীষণ অপরাধী এবং ছোটো বলে মনে হচ্ছিল। পুন্নাম নামক নরক থেকে উদ্ধারকারী পুত্রের বিষয়ে তিনি কত কী আবোল-তাবোল ধারণা পোষণ করে বেড়াতেন। কিন্তু আজ এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার মাধ্যমে তাঁর সেই ভুলটা ভেঙে গেল৷

অবাক পৃথিবী (পর্ব-০১)

সকালবেলায় বাজার সেরে একটু জিরিয়ে নিয়ে গৌরাঙ্গবাবু পাড়ার মুদিখানার দোকানের উদ্দেশে ঘরের বাইরে পা বাড়াতেই বিশাল এক ভ্যান গাড়িতে বসা চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি তরতাজা যুবক হঠাৎ কৌতূহল ভরা স্বরে জিজ্ঞাসা করে, ‘কাকু, অভিরূপ মুখার্জ্জী নামে এখানে কেউ থাকেন?”

অজানা অচেনা ছেলেটির মুখে সকালবেলায় নিজ পুত্রের নাম উচ্চারিত হতেই গৌরাঙ্গবাবু যারপরনাই একটু যেন অবাক হন এবং বলতে দ্বিধা নেই, একটু রাগতঃস্বরে জবাবদিহি করেন, ‘হ্যাঁ, আমারই নবাব পুত্তুর সে।’ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “আবার কোনও জিনিসপত্র অর্ডার করেছে নাকি?”

অতঃপর ছেলেটির কাছ থেকে কোনওরকম উত্তরের আশা না করেই মনে মনে তিনি বলতে থাকেন— এ এক জ্বালা হয়েছে! কোভিডের কারণে বিশ্বজুড়ে সবাই দিশেহারা, অথচ আমার ‘সুপুত্র’-র এখনও ষোলআনা বাবুগিরি বজায় আছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু আসছেই। ঠাঁট-বাট দেখে আর বাঁচি না! তিনি মনে মনে সেকাল আর একাল নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। বলি এককালে আমরাও ইয়াং ছিলাম, মনের নিভৃত কোণে আমাদেরও অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা জমে ছিল। কিন্তু আমাদের কালে এখনকার মতো বাবুগিরির প্রতি এতটা প্রবণতা ছিল না।

ছেলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি হাঁক দিলেন, ‘অ্যাই কে আছো? একবার বাইরে এসো, নবাব পুত্তুরের নামে কী সব জিনিসপত্তর এসেছে। ছাড়িয়ে নিয়ে যাও।’ কথাটুকু শেষ করেই তিনি দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন নিজের কাজে। আর মনে মনে কেবলই সেকাল-একাল নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।

স্পষ্ট মনে আছে স্কুলের সাদা কাপড়ের জুতোর তলাটা ঘষে ফুটো হয়ে যাওয়ার পরেও সেখানে অতি যত্ন সহকারে তাপ্পি লাগিয়ে পায়ের শোভা বর্ধন করতে হতো। ছেঁড়া জুতোর পরিচর্যার বেলাতেও কোনওপ্রকার অবহেলা ছিল না। ক্লাসের পরিত্যক্ত অবশিষ্ট টুকরো চকগুলি লোকচক্ষুর আড়ালে আগাম সংগ্রহ করে রাখতে হতো ছেঁড়া জুতো পালিশ করার জন্য। কী সুন্দর ছিল ফেলে আসা সেই বিগত দিনগুলি! অভাব ছিল, কিন্তু স্বভাবটা কখনও বদলায়নি। এখনও রাস্তায় একটা বোতাম পড়ে থাকলে তিনি সেটা নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নেন, ভবিষ্যতে যদি কখনও প্রয়োজন পড়ে এই ভেবে।

—সেকালে গরিব হওয়ার কারণে মানুষের মনে বিন্দুমাত্রও ক্ষোভ ছিল না। অভাব ছিল অলংকারতুল্য অহংকার। মানুষের চরিত্র গঠনে অভাবের অবদান অনস্বীকার্য! এর প্রভাব যেমন দীর্ঘস্থায়ী, তেমনই অতুলনীয়। মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়। তাঁর মতে অভাব এক মহান সম্পদ। সেই সম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে মনের আঙিনা জুড়ে বিরাজ করে অপার শান্তি। অথচ এখনকার মানুষের ধারণায় অভাব, নাকি এক অমোঘ অভিশাপ! তারা বুঝতেই চায় না কথাটা যে, অভাব অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদ। কারণ ইতিহাস প্রসিদ্ধ অধিকাংশ মহাপুরুষ-ই ছিলেন অভাবগ্রস্ত। অভাবের কারণেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং জীবনে সুপ্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন।

—এখন ব্র্যান্ড-এর যুগ। অথচ সেকালের মানুষের ব্র্যান্ডেড মেজাজটা কিন্তু ইদানীংকালে বিরল। এমনকী আত্মসম্মান বোধটাও ইদানীংকালে অতীব নিম্নগামী! তখনকার দিনের আত্মসম্মান বোধ এখনকার মতো এতটা ঠুনকো ছিল না। অনেকটা ক্রাস্ট আয়রন নির্মিত টিপু সুলতানের তরবারি তুল্য, যেমন ধারালো, তেমনই ছিল শক্ত।

হঠাৎ নিজের অজান্তে বহুদিন পূর্বে কোনও এক পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা তাঁর অতর্কিতে মনে পড়ে যায়— একবার প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তাঁর বাড়িতে অনুষ্ঠিত দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে স্বয়ং না গিয়ে পরিবর্তে পুত্র দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে পেয়াদা পাঠিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়কে সেই পুজোয় অংশগ্রহণ করার জন্য নিমন্ত্রণ করতে। কিন্তু আত্মসম্মানপ্রিয় রাজা রামমোহন রায় বন্ধুবর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নিমন্ত্রণ রক্ষা করেননি সেইবার এই কারণে যে, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সশরীরে নিজে না এসে, পেয়াদা পাঠিয়েছিলেন বলে।

কিন্তু এখনকার দিনে মুঠো ফোনের সাহায্যে কাউকে নিজের পোষ্য কুকুরের জন্মদিনে নিমন্ত্রণ করলেও, নিমন্ত্রিত ব্যক্তিটির তন- মন-প্রাণ অপার কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে ওঠে। নিমন্ত্রণ রক্ষা বা সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পারাটা তার বিচারে অধর্ম বা মনুষ্যত্বের অবমাননা বলে বিবেচিত হয়। ভাবতে অবাক লাগে যে, সময়ের বিবর্তনে মানুষের আত্মসম্মান বোধটাও আজ অধোগামী!

—মোজা পরে লোকে হাঁটু পর্যন্ত। আজীবন তাই দেখে অভ্যস্ত। অথচ এখনকার আধুনিক যুগের ছেলে-মেয়েদের ফ্যাশনের ধরনটাই আলাদা। তারা মোজা পরে গোড়ালি পর্যন্ত, জুতোর বাইরে যেন দেখা না যায়! জুতোর ভিতরে অদৃশ্য হয়ে থাকে সেই মোজা। কী যে বাহারের স্টাইল তা ভগবানেরও অজানা! ওই ভাবে মোজা গলানোর যে কী প্রয়োজন সেটা তাঁর বোধে কুলোয় না? তারচেয়ে বরং মোজা ছাড়া জুতো পরলেই হয়। ধুতির সঙ্গে বিহারিরা যেমন মোজা ছাড়া জুতো পরেন। ওদের বিচারে এটাই নাকি আধুনিক স্টাইল! বলিহারি স্টাইল!

—নিজের রুচিবোধ অপরের মধ্যে সংক্রমিত করতে পারাটাই প্রকৃত স্টাইল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এদের বিচারে কোনটা আসল, কোনটা নকল, এই বিষয়ে কোনও ধারণাই নেই। এদের কোট-জামা-জ্যাকেট সব অ্যাবডোমিন পর্যন্ত। মেয়েদের ব্লাউজ সদৃশ্য সব পোশাক। এরা জামা পরে অথচ বোতাম লাগায় না। দূর থেকে অনেকটা যেন কাকতাড়ুয়াদের মতো দেখতে লাগে, যখন জামার দু’দিকটা পতাকার মতো আন্দোলিত হতে থাকে বাতাসের দাপটে।

—প্যান্টের ভিতরে জামা গোঁজার দিন শেষ। কোমর নেই অথচ পরনে জিন্‌স। কী যে বিকট লাগে দেখতে একেকজনকে! কথায় বলে না— মাথায় নাই চুল, বগলে শ্যাম্পু। অনেকটা সেইরকম। আজকাল কোর্টেরও হাত গোটানো থাকে কবজি পর্যন্ত, ভাবা যায়? এরা প্রকৃত স্টাইল কাকে বলে তা জানেই না। এর চেয়ে আমাদের সময়ে ধুতির প্রচলন ছিল ঢের ভালো।

স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী, বাঙালির গর্ব শ্রদ্ধেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হাফ হাতা বুশ সার্ট আর ধুতি পরে। স্টাইল কাকে বলে তিনি সেটা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে গিয়েছেন।

—বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তাঁর স্কুল কর্তৃপক্ষ সাহেবি পোশাক পরে স্কুলে আসতে বলায় সেদিন তিনি নিঃসঙ্কোচে এবং সগর্বে চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। আসল কথা, সর্বসম্মতিক্রমে সুরুচিসম্পন্ন স্টাইলই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

কতবার ছেলেকে তিনি নিষেধ করেছেন খোলামকুচির মতো যেন টাকা নষ্ট না করে। বেসরকারি চাকরির কোনও স্থিরতা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। যে-কোনও দিন ‘চাকরি নট’ হয়ে যাওয়ার নোটিস আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতে টাকার মূল্য বোঝাটা যে একান্তই আবশ্যক। কিন্তু কাকে বোঝাবেন তিনি?

—“টাকা মাটি, মাটি টাকা’ যে যাই বলুক, সংসারি লোকের কাছে টাকার মূল্য কিন্তু অসীম। অর্থ বিনে সুস্থ জীবনযাপন করা যে বড়োই দুরূহ। বিপদকালে কারও কাছে হাত পাতলেও এই বস্তু সহজে কেউ হাতছাড়া করতে চান না। এই কথাটুকু অন্তত এই বয়সে বোধগম্য হওয়া উচিত। অবশ্য অন্য কেউ দেবেনই বা কেন? যে-মানুষ সময় থাকতে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন থাকে, তাকে তো উপযুক্ত কর্মফল ভোগ করতেই হবে।

—প্রকৃতি থেকে যথাযথ জীবনের শিক্ষা নেওয়া উচিত। সঞ্চয়ের পাঠ সামান্য পিঁপড়ের কাছ থেকেও নেওয়া যায়! কিন্তু চোখ থাকলে তবে তো? রাজর্ষি অত্রির পুত্র দত্তাত্রেয়ও প্রকৃতি থেকে পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর মানুষরূপী কোনও গুরু ছিল না। বনের চব্বিশটি প্রাণীর আচরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তাদের গুরু হিসাবে বরণ করেছিলেন। অথচ আমার সুপুত্র চটিও পরেন এগারোশো টাকা দামের আর জুতো পরেন দু’হাজার টাকা দামের। কোনও মানে আছে এই বাবুগিরির? খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। বলি অত দামি চটি-জুতো পায়ে গলাবার জন্য, নাকি মাথায় রাখার উপকরণ? সস্তা দামের চটি-জুতোতেও তো সেই একই কাজ হতে পারে। এ কেবল যুক্তিহীন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

—মানুষের ইয়ং বয়সটা হল পরিশ্রম করার জন্য, ঝুঁকি নেওয়ার জন্য। এই সময়টা হারিয়ে গেলে আর কি ফিরে পাওয়া যাবে? কখনওই না। এই সময়টাতেই পরিশ্রম করে রোজগার করতে হয় অনাগত ভবিষ্যৎ জীবনটাকে সুরক্ষিত করার জন্য। বোঝা উচিত, “দেহপট সনে নট সকলি হারায়। তা না করে— ‘উঠল বাই তো কটক যাই’।

ছদ্মবেশী (শেষ পর্ব)

কিছুই মাথায় ঢুকছিল না সুধাকরের। অফিস গেল না, সোজা ঘরে চলে এল। সুবোধকে একটা ফোন করে দিল— তুই এখুনি একবার আমাদের বাড়ি চলে আয়, জরুরি কথা আছে।

বাড়িতে গিয়ে সুধাকর দেখল চন্দ্রা এখনও বাজার থেকে ফেরেনি। বসার ঘরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল ছেলেটির। মনে মনে ভাবতে লাগল কী করবে এবার? কী ব্যবস্থা করবে ওর?

একটু পরে সুশান্ত ঘরে ঢুকতেই সুধাকর শিকারি বাঘের মতো তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কলার ধরে চেঁচিয়ে উঠল, “মিথ্যাবাদী, ঠগবাজ, ধাপ্পাবাজ কোথাকার! ছেলে সেজে আমাদের ঘরে ঢুকেছিস কী মতলবে? আমাদেরকে বশ করে টাকাকড়ি, গয়নাগাঁটি, সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার মতলব করেছিলি, না? সে গুড়ে বালি, তোর সব কেরামতি ধরা পড়ে গিয়েছে।’

আচমকা আক্রমণে হকচকিয়ে গিয়েছিল সূর্য। নিজেকে ছাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলতে লাগল, ‘আমি ঠগ জোচ্চোর নই। কোনও মতলবেও আসিনি। আমি কেবল…।’

—চোপ বদমায়েশ, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। সত্যি করে বল, তুই আমাদের ছেলে সূর্য কিনা?

সুশান্ত ক্ষীণস্বরে বলল, ‘না, আমি সূর্য নই।’

—তাহলে কেন মিথ্যা কথা বলেছিলি? কেন মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ঢুকেছিলি আমাদের ঘরে? কী ভেবেছিলি, আমরা ধরতে পারব না, সেই সুযোগে আমাদের সবকিছু আত্মসাৎ করে পালাবি, তাই না? বলে তার গালে দিল এক থাপ্পড়।

সুশান্ত নিজেকে সামলে মিনতি করে বলল, ‘আমি কোনও খারাপ মতলবে আসিনি। ডাক্তারকাকুর কথায় আপনাদের…।’

—চুপ কর বদমায়েশ, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। আর তোর ষড়যন্ত্রে ডাক্তারকেও জড়াবি না। সত্যি করে বল তোর আসল মতলব কী? আর কার কার বাড়িতে এমন কীর্তি করেছিস?

—ও ঠিকই বলছে সুধাকর, মিথ্যা বলছে না।

চমকে উঠল সুধাকর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে সুবোধ ডাক্তার, কখন এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।

রাগের স্বরে বলল, ‘আরে জানিস না তুই, ও আমাদের সূর্য নয়, একটা ধাপ্পাবাজ, সূর্য সেজে এসেছে। এটা ওর পেশা, আরও অনেকের বাড়িতে এই কীর্তি করেছে। আজ হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়ে গল্প ফাঁদছে। আবার তোকেও জড়াচ্ছে এর মধ্যে।’

—আমাকে জড়াচ্ছে না বন্ধু। আর ব্যাপারটা আমার অজানাও নয়। সত্যি বলতে কী, আমিই ওকে নিয়ে এসেছিলাম তোদের কাছে৷

—কী বলছিস তুই? সুধাকর তো অবাক।

—ঠিকই বলছি। কিন্তু আগে ওর কলার ছেড়ে শান্ত হয়ে বোস, তারপর সব বলব।

দু’জনে সোফায় বসল। সুশান্ত দাঁড়িয়ে রইল অধোবদনে। তারপর সুবোধ ডাক্তার বলতে শুরু করল আসল ঘটনাটা।

—বউদির অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে দেখে আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম এভাবে চললে উনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। ছেলের ফিরে আসাই একমাত্র পারে ওনাকে বাঁচাতে। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? এরই মধ্যে হঠাৎ আমার কানে এল আমার এক পুরোনো রোগীর কথা। তারও খানিকটা একইরকম কেস। এক ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধার একমাত্র অবলম্বন নাতনিকে দুর্ঘটনায় হারিয়ে খুবই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, মৃত্যু ত্বরান্বিত হচ্ছিল। তখন নাকি তার নাতনির মতো একটি মেয়ে তার নাতনি সেজে এসে বৃদ্ধাকে সারিয়ে তুলেছিল। যদিও তারপর বৃদ্ধা বেশিদিন বাঁচেননি। হঠাৎ ডেঙ্গিতে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তার শেষ ক’টা বছর খুব আনন্দে কেটেছিল। তখন সেই মেয়ের খোঁজ করে করে আমি পৌঁছাই এই সুশান্তর কাছে। দেখলাম ওরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে মিলে এইরকম বৃদ্ধবৃদ্ধাদের সেবা করে, তাদেরকে সারিয়ে তোলে। বিনিময়ে সামান্য কিছু অর্থ নেয় ওদের খরচ চালাবার জন্যে। ওদের পরার্থপরতা, বয়স্কদের প্রতি ওদের ভক্তিশ্রদ্ধা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তারপর যখন দেখলাম সুশান্তর সঙ্গে তোদের সূর্যের মুখের আদলে অনেকটা মিল আছে আর বয়সটাও সূর্য বেঁচে থাকলে এইরকমই হত, তখনই আমি ঠিক করি ওকে সূর্য সাজিয়ে তোদের বাড়িতে নিয়ে আসব। ওকে রাজি করিয়ে নির্দিষ্ট ফি জমা করে দিলাম। তারপর তোকে আমার দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়ার এবং সেখানে খুঁজে পাওয়ার মিথ্যা গল্প ফেঁদে ওকে নিয়ে এসেছিলাম তোদের ঘরে। তারপর যা যা হয়েছে সবই তোর জানা। এবার তুইই ঠিক কর কী করবি? ওকে তাড়িয়ে দিবি, না পুলিশের হাতে দিবি। তবে হঠাৎ ও চলে গেলে বউদির মনের অবস্থাটা কী হবে সেটাও একটু মাথায় রাখিস।

—না না, তুই যা-ই বল, ও ঠকিয়েছে আমাদের। চন্দ্রাকে তো ঠকিয়েছেই, আমাকেও ঘুণাক্ষরে কিছু জানতে দেয়নি। ডেঞ্জারাস ছেলে ও, ওকে আমি পুলিসে দেব।

—না, ওকে কোথাও দেবে না তুমি।

পিছন ফিরে সুধাকর দেখে বাজারের ব্যাগ হাতে চন্দ্রাবলী দাঁড়িয়ে। সুধাকর বলল, ‘তুমি জানো না চন্দ্রা, ও আমাদের…।

—সূর্য নয়, তাই তো? সেটা আমি জানি।

—কী বলছ তুমি? সুধাকর তো হতবাক।

—ঠিকই বলছি গো। তবে সত্যিটা জেনেছি বেশ কিছুদিন পরে। ও যখন তোমার অফিসে গিয়ে বসতে রাজি হল না, আমি একটু আশ্চর্য হয়েছিলাম। তোমাদের অফিসে কাঁচাটাকার লেনদেন, তবুও গেল না কেন? আরও অবাক হলাম তোমার উইলে ওর নাম দিতে মানা করতে দেখে। অর্থ বা সম্পত্তি নিতে আবার কেউ অস্বীকার করে নাকি? নিজের ছেলেও না বলবে না। বুঝেছিলাম কিছু একটা ব্যাপার আছে। আর মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। যতই সূর্যর মতো দেখতে হোক, ও যে আমার সূর্য নয়, সেটাও আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম। তখন একদিন আদর করে গায়ে হাত বুলিয়ে জেনে নিলাম আসল সত্যটা। ডাক্তারের কথায় ঝুঁকির পরোয়া না করে সূর্য হয়ে এসেছে আমার মতো এক মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচাতে। অভিভূত হয়ে গেলাম আমি। ও যেভাবে সেবাযত্ন করে আমাকে সারিয়ে তুলেছে, আমার সূর্যের অভাব পূরণ করে অন্তরে মমতার ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছে, তার তুলনা হয় না। সেদিন মনে হল, আজ আমার সূর্য বেঁচে থাকলেও বোধহয় আমার জন্যে এতখানি করত না।

সব শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল সুধাকর। বলল, ‘তুমি তো এসব কিছুই বলোনি আমাকে?’

—কী আর বলব? বললে তুমি ওকে রাখতে? তখনই তাড়িয়ে দিতে।

স্বাভিমানে ঘা লাগল সুধাকরের। রাগের স্বরে বলল, ‘না, সে যাই হোক, ও যে মিথ্যাচার করেছে তার শাস্তি তো পেতেই হবে। ও আমাকে এসব কথা এতদিন বলেনি কেন?’

চন্দ্রাবলী ক্ষণিক তাকাল সুশান্তর দিকে। বেচারি মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিম রাগের সুরে বলল, “ঠিকই বলেছ, শাস্তি তো ওকে পেতেই হবে। তবে সে শাস্তি আমি দেব।’

ডাক্তার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী শাস্তি দেবে বউদি?”

—ওর শাস্তি হল… আমার সূর্য হয়ে এই বাড়িতে ওকে বন্দি থাকতে হবে সারা জীবন। কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না। বলে সুশান্তর মাথাটা বুকে টেনে নিল।

আনন্দে ভরে উঠল ডাক্তারের মনটা। হাতের মোবাইল যে বেজে চলেছে সেদিকে খেয়াল ছিল না।

সুধাকরও সেই আনন্দের ছোঁয়াচ এড়াতে পারল না। এগিয়ে গিয়ে স্ত্রী-পুত্রকে আবদ্ধ করল উষ্ণ বাহুবন্ধনে।

নবজন্ম

আজ অনেকদিন পর আবার এক নতুন সাজে সেজেছে ইমন-কল্যাণ। আজ এই অনুষ্ঠান শুধুমাত্র এই বাড়ির মালিক ও মালকিনের পঞ্চম পুণ্যতিথি বলে যে তা কখনওই নয়, কারণ সেই ভয়ঙ্কর দিন কখনওই তিথি ভুলতে পারে না। আজকের দিনে সে তার একান্ত নিজের বলেই যাদের জানত, তার মা ও বাবাকে হারিয়েছে। আর তাদেরকে হারাতেই এই সমাজের কদর্য, স্বার্থপর রূপ ওর সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে। আজ সেই সকল স্মৃতি ওর মনের আনাচে কানাচে উঁকি মারছে। কিন্তু কিছু বিশেষ কারণে আজ তার মন কিছুটা তৃপ্ত আবার শান্ত।

আজ বহুদিন ধরে চলে আসা নানান পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে চলেছে। তার মায়ের মনের ইচ্ছে সে আজ পূরণ করতে চলেছে। আর তারই সঙ্গে অনেক মানুষের অনেক প্রশ্নের জবাব আজ বিনা বাক্যব্যয়ে করেই দিতে পারবে, এটা ভেবেই সে আজ অনেক তৃপ্ত। আজ সকল অপেক্ষার অবসান হবে কিছু সময় পর। আজ দীনু কাকা, মঙ্গলা পিসি আর যারা বাইরের কাজ করেন, প্রত্যেকে নতুন উদ্যমে কাজ করছেন।

আবার বহুদিন পর এই বাড়ি অনেক মানুষের কথায় ভরে উঠবে। সত্যিই তিথি দিদির হাত ধরেই এইসব মানুষগুলো যেন আরও কয়েক বছর বাঁচার রসদ পেল। কিন্তু তিথি সে এরপর কী করবে, তার তো পথচলা এই পর্যন্তই ছিল। তাকে তো এবার তার নতুন ঠিকানা খুঁজতে হবে। কখনও কখনও গভীর চিন্তায় আমরা আমাদের বাহ্যিক পরিবেশ থেকে এতটাই সরে যাই যে, আমাদের আশেপাশে কোনও মানুষের উপস্থিতিও আমরা টের পাই না।

তিথি নিজের ভাবনার মধ্যে এমন ভাবে ডুবেছিল যে, বাবা ও মায়ের ছবির ভিতর যে কারোর প্রতিচ্ছবি এসে পড়েছে সে সেটা এতক্ষণ খেয়ালই করেনি। এবার সে পিছন ফিরতেই বাগানের মালি দামু দাদাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবে?” তার প্রশ্নে দামু কিছু একটা ভেবে বলল, ‘এজ্ঞে ওই ভালোমানুষ দাদা, দিদিরা এয়েছেন গো দিদিমণি, তোমার খোঁজ করতাছেন। আমি উনাদের বৈঠকখানাতে বসায়ে এলুম।’

তিথি সব শুনে বুঝতে পারল, কাদের কথা দামু বলছে। দামুকে বিদায় করে নিজের মনে হাসল, আহা এই সহজ সরল মানুষগুলো কত সুন্দর ভাবে মানুষের কাজের উপর বিশ্বাস রেখে তাদের পরিচয়ের সামনে একটা বিশেষণ ব্যবহার করে তাদের উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়। সত্যিই তো মেঘা, রুমেলা, কৌশিক, নীল— এরা সততার সঙ্গে সমাজের উদ্ধারে নিজেদের ব্রতী করেছে। আর তাদের সাহায্যেই আজ তিথিও এত বড়ো কাজটা করতে পারবে।

নীচে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ওর নজর চলে গেল সোজা লনের দিকে, যেখানে তার কিছু পরিচিত প্রতিবেশী, সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত কিছু অতিথি আর এই বাড়ির মালিকের কিছু আত্মীয় নিজেদের আসনে বিরাজ করছেন। এত জনসমাবেশের কারণ বুঝতে না পারায় কিছু কৌতূহলী চোখ তিথিকে খুঁজছে, আর কেউ কেউ নিজেদের মধ্যেই সম্ভাব্য কী ঘটতে পারে তা নিয়ে নিজেদের মত পোষণ করছেন, ফলে একটা মৃদু গুঞ্জনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।

যথাসময়ে তিথি তার ভালোমানুষ বন্ধুদের (দামু দাদার মতে) নিয়ে সকলের সামনে উপস্থিত হল। সকলের সামনে দুই হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানাল। এরপর সে আজকের এই অনুষ্ঠানের মূল কারণে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানাল— সে আগে সকলকে কিছু পুরোনো কথা জানাতে চায়, যা এই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত, তার জীবনের সঙ্গে জড়িত। এই বলে সে সকলকে আজ থেকে পাঁচশ বছর পিছনে নিয়ে গেল।

ইমন-কল্যাণ-এর প্রধান আকর্ষণ ছিল তার মালিক কল্যাণ রায় আর মালকিন ইমন রায়। দুইজন ছিলেন যেমন প্রাণবন্ত, তেমনই তাদের ছিল পরোপকারী মন। সকলের খুব প্রিয়, কোনও শত্রু তাদের ছিল না। পৈতৃক ব্যাবসা সামলানোর পরও সকলের বিপদ-আপদে ঠিক পৌঁছে গেছেন ওনারা। শুধুমাত্র একটি কষ্ট ভগবান তাদেরকে দিয়েছেন, সেটা হল সন্তান-সুখ থেকে বঞ্চিত থাকার দুঃখ। এই দুঃখের একদিন অবসান হল এই ছোট্ট তিথিকে দত্তক নিয়ে।

কিন্তু এই মেয়ে যত বড়ো হতে লাগল ততই ইমনের মনে নানান ধরনের দ্বন্দ্ব শুরু হল। কারণ সে বেশ বুঝতে পারছিল তাদের অবর্তমানে আশেপাশের লোকজন তাকে নানাভাবে বিরক্ত করবে। যে সত্য ওনারা তিথিকে কোনওদিন জানতে দিতে চাননি, সকলে মিলে সেটাই আগে তার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। এইসব ভেবেই ইমন ঠিক করলেন যে, তিনি তিথিকে এমন ভাবেই মানুষ করবেন যেন সকল পরিস্থিতির জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত রাখে।

যখন তিথির ষোলো বছর পূর্ণ হল, তখন থেকেই তিনি তার সকল প্রয়োজন মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলতেন, ‘সব বাবা-মা সন্তানকে সেরা জিনিসটা তুলে দেন, আমরাও তাই করবার চেষ্টা করি। কিন্তু সন্তান যদি এটাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তবেই হবে মুশকিল। কারণ সকলের সবদিন এক নাও যেতে পারে। তাই এই উপযুক্ত সময় নিজেকে তৈরি করার, একে কাজে লাগাও। নিজেকে সকল পরিস্থিতির জন্য তৈরি করো। আমরা তোমার এই নিজেকে গড়ার কাজে সাহায্যের জন্য আছি, কিন্তু তারপর তোমাকে নিজেকে সফল ভাবে সমাজের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তোমার সেই উন্নতি, প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র তোমার— যা কেউ কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।’

এতসব কথা ঠিক মতোন করে সবটা তিথির বোধগম্য হতো না। কিন্তু যখন মা এইসব কথা বলতেন তখন মাকে যেন ভীষণ অচেনা মনে হতো। এই ভাবেই বেশ ক’টা বছর আনন্দের সঙ্গে কাটছিল। তিথির স্কুল-জীবন শেষ হতেই কল্যাণবাবু তার উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু সময় সব সময় একরকম যায় না। হঠাৎই একটা দুর্ঘটনার ফলে এই রায় দম্পতির জীবনের প্রদীপ নিভে গেল। তিথি খবর পেয়ে এসে দেখল সব শেষ।

এই ভাবে তার জীবনে যে এরকম বিপর্যয় নেমে আসবে তা তার কল্পনার অতীত। যখন সে সকল ক্রিয়াকর্ম মিটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে তখন অতিপরিচিত মানুষদের ব্যবহার তার কাছে খুব অদ্ভূত লাগতে লাগল। যারা এতদিন তাকে খুব ভালোবাসত এখন কেমন ঈর্ষার চোখে দেখছে, বলছেও যে তার নাকি কপাল খুলে গেল। সে ভাবত, তার যা হারিয়ে গেল তাতে কীভাবে সে লাভবান হয়। নিজের মা-বাবাকে হারিয়ে কেউ কি খুশি হয়।

এইসব ভাবনা নিয়ে সে বিদেশ ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। কারণ তার পড়া শেষ হতে এখনও কয়েক বছর বাকি। সেইসময় জিনিসপত্র গোছানোর সময় তার হাতে আসে মায়ের ডায়েরি। যার প্রথম পাতার উপর তিথির উদ্দেশ্যে লেখা, তিথির জন্য মায়ের আশীষ। সেই ডায়েরি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে নতুন করে জানতে শুরু করল। সে এইদিন প্রথম জানল যে, সে দত্তক কন্যা। তাই আশপাশের লোকজনের থেকে তার মা তাকে কীভাবে আগলে রেখেছেন। তার মা ও বাবা তাকে তাদের যথা সর্বস্ব দিয়ে মানুষ করতে চেয়েছেন। এইসবের বদলে তার মা তার কাছে একটাই দাবি রেখেছেন, ‘জীবনে তুই অনেক বড়ো মাপের মানুষ হয়ে আশপাশের সকলকে দেখিয়ে দে যে, তুই শুধুমাত্র মা ও বাবার আশীর্বাদ নিয়ে, নিজের যোগ্যতায় নিজের একটা আলাদা জগৎ ও পরিচয় তৈরি করেছিস। তোর বাবার সমস্ত কিছুই তোর হওয়া সত্ত্বেও তুই সকল বৈভব দূরে রেখে নিজের কর্মের দ্বারা এইসব কিছু অর্জন করে দেখা। তখন আমরা যেখানেই থাকি আমাদের তোকে নিজের সন্তান বলে ভাবতে গর্ববোধ হবে। মনে হবে কাউকে আমরা আমাদের সত্যিকারের উত্তরাধিকারী হিসেবে এই পৃথিবীতে রেখে যেতে পারলাম। আর আমাদের অবর্তমানে তুই এই বাড়ি কোনও এক সংস্থাকে দিয়ে দিবি, যারা এখানে অনাথ শিশুদেরকে যথার্থ শিক্ষা দিয়ে বড়ো করতে পারে। এটা আমার একটা স্বপ্ন।’

এইসব কথা বলতে গিয়ে কখন যে তার দুই গাল বেয়ে অশ্রুধারা নেমে এসেছিল, তা তিথি খেয়াল করেনি। চোখ মুছে সে সকলকে জানাল যে, আজ সে তার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছে। এই বাড়ি সে ‘নবজন্ম’ নামে এক সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে। এই বলে সে রুমেলা, নীল, কৌশিক আর মেঘার হাতে বাড়ির কাগজ আর কিছু চেক তুলে দেয়। আর সকলকে বলে সে আজ থেকে এইসব কিছু থেকে মুক্ত। তার নতুন ঠিকানায় সে কেবল তার মা ও বাবার স্মৃতি হিসেবে তাদের ফোটোটাই নিয়ে যাবে। কিন্তু এখানকার পুরোনো কাজের লোক আগের মতোই এখানে থাকবে।

তার এই মহৎ উদ্দেশ্য জানার পর ওখানে উপস্থিত সকলে এতটাই অবাক হলেন যে, বলার মতো কিছু ভাষা খুঁজে পেলেন না তাঁরা। শুধু এই মেয়েটিকে আজ মন থেকে আশীর্বাদ জানালেন। কারণ সে আজ প্রতিষ্ঠিত শুধুমাত্র কারওর দয়ার জন্য নয়। তার মধ্যে যে মেধা ছিল, সহনশীলতা আর শালীনতাবোধ ছিল, তার জন্যই আজ সে সকলের থেকে আলাদা। আজ সকলের সামনে তার ‘নবজন্ম’ হল।

কুড়ি হাজার সাতশোর জন্য (শেষ পর্ব)

সুমন এখান থেকে মুক্তি চায়। এখানে আকাশের গায়ে কথারা দানা বাঁধে না। এখানে এসে কবিতার দল তাকে ছেড়ে গিয়েছে। কিন্তু পালাবার পথ নেই। আজকাল কিছু ভালো লাগে না। গত কয়েকদিন পিয়ালির মিলনের ডাক উপেক্ষা করছে সুমন। বারবার গায়ের জোরে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে পিয়ালিকে। এইভাবে সে আর মিলিত হবে না। এমন পরিস্থিতিতে এখানকার মেয়েরা প্রশাসনকে জানাতে পারে। তখন কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি হয় পুরুষটির। কিন্তু সুমন ভালোবাসা চায়। ভালোবাসাবিহীন যৌনতায় লাভ নেই। অবশ্য পিয়ালি কাউকে কিছু জানায়নি।

সেদিন মেডিটেশনের সময় একটা ঘটনা ঘটল। তখন পিয়ালি বাড়ি ছিল না। হঠাৎ বহুদূর থেকে একটা ডাক শুনতে পেল সুমন।

—সুমন শুনতে পাচ্ছিস?

ওই গলা শুনেই সুমন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। এই কণ্ঠস্বর তার কাকার। মানসিক তরঙ্গ দিয়ে যোগাযোগ করেছে তার সঙ্গে।

—শুনতে পাচ্ছি কাকা।

—শোন সেদিন আমার একটা ভুলে তুই ব্ল্যাক হোলে পড়ে গিয়েছিলি। অকস্মাৎ ইউনিভার্সাল বোসন পার্টিকলের ভাইব্রেশনের কম্পাঙ্ক বদলে গিয়েছিল। তাই ব্ল্যাক হোল খুলে যায়। তখন তুই ঘরে থাকলে তোর কিছু হত না। আমি অনেক কষ্ট করে মানসিক তরঙ্গ দিয়ে তোকে খুঁজে বের করেছি।

—মা কেমন আছে কাকা?

—ও কথা পরে হবে। শোন ওখানকার হিসেবে আজ থেকে সাতদিন পর আবার ব্ল্যাক হোল খুলবে। এনার্জি ইমপাল্স রিডারের রিডিং সেই কথাই বলছে। তৈরি থাকিস। ওটাই তোর ফিরে আসার রাস্তা।

সেদিন অকস্মাৎ কী হয়ে গেল সুমনের ভিতর। তার ভিতরে তখন কত সুখ। পিয়ালি বাড়ি ফিরেছিল তাড়াতাড়ি। তবে সুমনের কাছে আসেনি। সেদিন সুমন নিজেই পিয়ালিকে আক্রমণ করল। পিছন থেকে অকস্মাৎ ওর বুকে হাত রাখল সুমন। হঠাৎ এমন আক্রমণে হকচকিয়ে গেল মেয়েটি। জীবনে এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম। পুরুষ এমন ভাবে বলিষ্ঠ হাতে আক্রমণ করবে এ পিয়ালি ভাবতেও পারে না।

—এই, পিয়ালির প্রথম শিৎকার।

সমস্ত নিয়ন্ত্রণ তখন সুমনের হাতে। মিলন কাকে বলে পিয়ালিকে শেখাল সুমন। প্রথমবার অনাবিল সুখে ভেসে গেল ওরা।

পরদিন প্রশাসন থেকে মেয়েরা এসেছিল। এখনও সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। পিয়ালি পুরুষ বদলাবে কিনা জানতে চাইল ওরা। কুড়ি হাজার সাতশো তার পুরুষটাকে বদলাতে রাজি হল না। তারপরের দিনক’টা সুমনের কাটল বড়ো আনন্দে। এই ক’দিন পুরুষসুলভ স্বাভাবিকতায় ও নিজেই এগিয়ে গেছে। নীরব আত্মসমর্পণ করেছে মেয়েটা। গুঙিয়েছে, সুমনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। চুমু খেয়েছে তীব্র আশ্লেষে। ফেরার আনন্দে তখন সুমন মশগুল।

পাঁচদিন পর পিয়ালি জানাল, যুদ্ধ বাধতে চলেছে। তাকে যুদ্ধে যেতে হবে। সে মারা গেলে সুমন অন্য কোনও মেয়ের কাছে জায়গা পাবে। সুমন জানে পিয়ালি না থাকলেও তার কিছু না। ব্ল্যাক হোল খুলে গেলেই সে ফিরবে পৃথিবীতে। সেখানে স্থানকালের হিসেব আলাদা।

দু-দিন পর যুদ্ধ শুরু হল। লেগেছে পাশের দেশের সঙ্গে। তারা অযাচিত ভাবে হানা দিয়েছে এদেশের সীমানার ভিতর। তারা এদের জমি কেড়ে নিতে চায়।

এখানকার দেশগুলো খুব ছোটো ছোটো। প্রাচীন পৃথিবীর মতো। এখানকার সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, দেশ ছোটো হলে শাসন করতে সুবিধা হয়।

যুদ্ধের দিন সীমান্তে একটা বড়ো ময়দানে মুখোমুখি দাঁড়াল দুই দল। দুই দল উলঙ্গ মেয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে। এক তরফে আক্রমণকারী হানাদার মেয়েদের দল। অপর দিকে এদিকের মেয়েরা।

দু-পক্ষের সেনা জমায়েত বেশ বড়ো। এখানে খালি হাতে যুদ্ধ হয়। তাই দূর থেকে যুদ্ধ দেখা যায়। ময়দান থেকে নিরাপদ দূরত্বে একটি ঢিবির উপর গিয়ে দাঁড়াল সুমন। তার মতো এখানকার আরও অনেক ছেলে যুদ্ধ দেখতে এসেছে। জুল জুল চোখে তাকিয়ে আছে ছেলেরা। তাদের চোখে মুখে উৎকণ্ঠা। তাদের অনেকেরই ঘরের মেয়েরা রয়েছে ময়দানে।

এক সময় উভয় তরফ থেকে বিউগলের মতো বাজনা বাজল। যুদ্ধ শুরু। প্রথমে উভয় তরফ থেকেই শুধু প্রথম সারির মেয়েরা পরস্পরের মুখোমুখি হল। একের বিরুদ্ধে এক লড়াই। অপরপক্ষ যথেষ্ট মল্লযুদ্ধ পটু এবং শক্তিশালী। এইপক্ষের সবক’টা মেয়েকে ওরা মেরে ফেলল। এবার উভয় তরফের দ্বিতীয় সারির পালা। কিন্তু সেই লড়াইতেও এইপক্ষের মেয়েরা দাঁড়াতে পারল না। ওরা সবাইকে মেরে ফেলল। এবার গেল তৃতীয় সারি। পিয়ালি নামল ময়দানে। মনের মধ্যে কেমন একটা উৎকণ্ঠা অনুভব করল সুমন। এই প্রথমবার। অন্য ছেলেরা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কিছুক্ষণ লড়াইয়ের পর আবার এইপক্ষের মৃত্যুমিছিল শুরু হল। সুমন খেয়াল করল পিয়ালিকেও কোণঠাসা করে ফেলেছে তার প্রতিদ্বন্দ্বী। একটি ঢিবির কাছে নিয়ে গেছে পিয়ালিকে। আর হয়তো কিছুক্ষণ। মেয়েটি নিশ্চিত মেরে ফেলবে পিয়ালিকে।

ঠিক তখনই একটা আবছা কণ্ঠ। সুমনের কাকা। ‘সুমন তাড়াতাড়ি। ব্ল্যাক হোল খুলছে। এনার্জি ভাইব্রেশনের কম্পাঙ্ক বদলাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ব্ল্যাক হোলে ঢুকে পড়।”

আশ্চর্য হয়ে নিজের থেকে কয়েক হাত দূরে, একটা কালো গহ্বরকে খুলে যেতে দেখল সুমন। এই সুযোগ। ওদিকে পিয়ালি ততক্ষণে ধরাশায়ী হয়েছে মাটিতে। হঠাৎ মনের ভিতর কেমন যেন ঝটকা দিল সুমনের। বুকে যেন কীসের ঝড় উঠল! মনের ভিতর ও কীসের অনুরণন! সুমন লাফ দিয়ে গিয়ে পড়ল ওদের দু’জনের মাঝখানে। পিয়ালির প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য কমান্ডো ট্রেনিং নেওয়া সুমনের একটা আঘাত যথেষ্ট। সুমনের একটা ঘুষিতে ঘুরে পড়ে গেল মেয়েটি। আর উঠল না।

এই আশ্চর্য ঘটনায় চমকে গিয়েছিল যুদ্ধরত মেয়েরা। যুদ্ধ থামিয়ে তারা হাঁ করে তাকিয়ে ছিল এইদিকে। ঘোর কাটিয়ে অপরপক্ষের দু’জন মেয়ে তেড়ে এল এইদিকে। তবে সুমনের পরের আঘাতে ওদের একজন ধরাশায়ী হতেই অপরজন পালাল। এই দৃশ্য দেখে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের মধ্যে কী হল কে জানে! তারা রে রে করে ময়দানের দিকে ছুটে আসতে লাগল। অপরপক্ষের মেয়েদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া তখন শুরু হয়ে গেছে।

তখনই আবার কাকার গলা। ‘সুমন আর তিরিশ সেকেন্ড বাকি। কুইক।”

পিয়ালিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়েই ব্ল্যাক হোলে ঝাঁপ দিল সুমন। এখানে কে আর আছে মেয়েটার। কুড়ি হাজার সাতশোর ঠোঁটে তখন মৃদু হাসি। চোখের কোলে দুটো টলটলে মুক্তো। এই জীবনে প্রথমবার। আজ থেকে আকাশের গায়ে আবার কথারা দানা বাঁধবে।

নিরাপত্তা (পর্ব-০১)

আট বছরের মাথায় আবার একটা ফ্ল্যাট। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে একেবারে সাততলায়। ছোটো প্রমোটারের, বস্তির পাশ থেকে সরকার-মিলিওনেয়ারের জয়েন্ট ভেঞ্চার। ইএম বাইপাসে বেঙ্গল-ডিসুজার ‘স্বর্ণলতা’ আবাসন। বারো বছরের পুরোনো, কিন্তু অরুণালোকের ঠিক চাহিদা মতো।

আট বছর আগে, নতুন ফ্ল্যাট জীবনের প্রারম্ভে, পরেও সৃজা নিজস্ব বাড়ির পক্ষে ওকালতি ছাড়েনি। তখন কুড়ি লাখে একটা বাড়ি কেনা সম্ভব ছিল না। এখনও না। দাম বেড়ে তিনগুন হয়েছে। তাই ফ্ল্যাটের পক্ষে যুক্তিগুলো মেনে নিয়ে বত্রিশ লাখে আটশো স্কোয়ার ফুট, সাততলায়। ঝুটঝামেলা কম। ব্যালকনি থেকে দেখা যাবে— সবুজ দারুচিনি দ্বীপ!

দশ বছর আগে গ্রামের শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে কলকাতা চলে আসে সৃজা। এক মেয়ে এক ছেলে। অরুণালোক এক কামরা ঘরে ভাড়া থাকত। পালটে দু’-কামরা ঘর নিল। শুরু হল জলের সমস্যা। অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেও বনল না। আরও ভালো পরিবেশে, আরও ভালো ঘর ভাড়া নিতে যা খরচ— অরুণালোক বলল, ‘তার চেয়ে হাউসিং লোন নিয়ে ছোটো ফ্ল্যাট কিনে ফেলি। ঘরভাড়ার খরচে ইএমআই হয়ে যাবে।’

ডাবল বেড, ডাইনিং-কাম-ড্রইং, কিচেন সবই ঠিক, কিন্তু বাজেটে না থাকায়, দু’টো ব্যাপারে ওদের আপোশ করতে হয়েছিল— এক- গ্রাউন্ড ফ্লোর; দুই- একটা বাথরুম। বাথরুমের বিষয়টা ব্যক্তিগত থেকে গেলেও গ্রাউন্ড ফ্লোরের নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ল সৃজার বাপের বাড়ি, অরুণালোকের অফিস, অন্যান্য পরিচিত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে। আরও এক লাখ পারলে একই সাইডে দোতলায় ফ্ল্যাট হতো ওদের। অরুণালোক রাজিও ছিল, ‘হোয়াইট’ মানি হলে ব্যাংক থেকে আরও লোন নিতে পারত, ডেভেলপার চাইল ‘ব্ল্যাক’-এ।

গ্রাউন্ড ফ্লোর শুনে কেউ কেউ বলত, ‘ভালো করেছ। সিঁড়ি ভাঙা নেই, পাম্প খারাপ হলে উপরে জল তোলার সমস্যা নেই। বোরিং লাগলে চট করে বাইরে এসে একটু পায়চারি করতে পারবে।’

অরুণালোক বা সৃজা যুক্তি খণ্ডন করে বলত, ‘হলেও গ্রাউন্ড ফ্লোরে উলটোপালটা অনেক বেল বাজে। একটু কোথাও বেরোলেও জানলা বন্ধ করে যেতে হয়। ল্যাপটপ, জামা-কাপড় চুরির ভয়।’

গ্রাউন্ড ফ্লোর শুনে যারা বলত, ‘কেন উপরে পেলে না? তাদের সমস্যা না শুনিয়ে ওরা সুবিধার কথা বেশি বেশি বলত। যেমন—গ্রাউন্ড ফ্লোর হলেও পনেরো ফুট ছেড়ে প্রাচীর। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি রোদ। বাতাস খেলে। বাইরেটা ব্যবহার করতে পারি। পিছনে ব্যালকনি কেটে গেট বানিয়ে নিয়েছি, ইচ্ছে হলে চেয়ার পেতে বসা যায়। সামনেই কেয়ারটেকারের ঘর। এক ডাকে হাজির। তবু হিতাকাঙ্ক্ষীরা সন্তুষ্ট হয় না। বলে, “তাছাড়া কলকাতায় যা সব ঘটনা শুনি, কেয়ারটেকারকেই বা ভরসা কী!’

অরুণালোক তখন গলা চড়িয়ে জয় ঘোষণা করত, ‘সন্তোষপুরের মতো এলাকায় আড়াই হাজার টাকা স্কোয়ার ফিট, ভাবা যায়! আমি তো প্রথমে ওয়ান বেডরুমের ফ্ল্যাটের কথা ব্রোকারকে বলেছিলাম। তবে চারজনে একটা বাথরুম এই যা প্রবলেম।’

বাইরের লোক যে যাই বলুক বা বাইরের লোককে যাই বলা হোক অরুণালোকেরা এই ফ্ল্যাটে খুশি নয়। এই ‘বিধান অ্যাপার্টমেন্ট’-এর সামনের ফ্ল্যাটগুলো বেশ বড়ো। বিশেষকরে ড্রইং-কাম-ডাইনিং বড়ো হওয়ার জন্য যথেষ্ট খোলামেলা হয়েছে।

সবচেয়ে কম দামের ফ্ল্যাট আমরা নিলাম, এই হীনমন্যতাবোধ প্রতিপদে কুরে খেতে লাগল সৃজাকে। অরুণালোক সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, “থাক না। প্রায় শূন্য হাতে হাউসিং লোন নিয়ে একটা তো কিনলাম। এটাই ভাড়ায় নিলে মাসে আট হাজার টাকা লাগত। পনেরো বছর ভাড়া গুনলে কত টাকা হিসেব করো। তাছাড়া ভাড়া তো আর সবসময় এক থাকত না, বাড়ত। অথচ নিজের কোনও দিনই হতো না। অল্পদিন গ্রাম থেকে কলকাতায় এসে সাধারণ একটা চাকরির উপর নির্ভর করে একটা ফ্ল্যাট কেনা কি সহজ কথা! আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় এসেছি— সেটা তো ভাবতে হবে। আমার বয়সটাও দেখো, এখানে সবার চেয়ে কম।’

কথাগুলো তো ঠিকই, সৃজা ভাবে। তবু ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। শুধু তো ফ্ল্যাট কেনা নয়, সাজানোরও বিরাট খরচ আছে। ‘বিধান অ্যাপার্টমেন্ট’-এ ছটা কার স্পেস। সৃজার ইচ্ছা ছিল একটা কিনে রাখে। হয়তো একদিন গাড়ি হবে। তিনটে প্রথমেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ক্রমে চার নম্বর, পাঁচ নম্বর। সৃজা মনে মনে চাইছিল

ছ’-নম্বরটা যেন অন্য কেউ না কেনে। একদিন সে ওটা কিনবে। যখন সেটাও বিক্রি হয়ে গেল, বেশ কিছুদিন মন খারাপ ছিল সৃজার। অরুণালোককে অপদার্থ মনে হয়েছিল। মেজাজ খিটখিটে হয়েছিল।

ছ’শো স্কোয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাট হল তো মন মতো সাজানো গেল না। অথচ এই ফ্ল্যাট কেনার আগে ভাড়া বাড়িতে থাকতে ঘর সাজানোর কথা বললে অরুণালোক বলত, ‘এ ঘর আর কী সাজাব। ফ্ল্যাট কিনি তারপর দেখো।’ ফ্ল্যাট কেনার পরও নানা বাহানা। ‘এই ধারগুলো আগে শোধ করি।’ ঋণ কমল তো বলল, ‘এবার রেজিস্ট্রিটা করি। তারপর মিউটেশন, বকেয়া ট্যাক্স, ছেলে-মেয়েদের স্কুলের খরচ— সে নানা ফিরিস্তি।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আসবাবও ভরে উঠল। আহামরি কিছু নয়। মেগা সিরিয়ালের মতো সাজানো নয়, যেমনটা আরও কয়েকজনের আছে।

মন মতো ফ্ল্যাট হল না, গ্যারেজ হল না, ঘর সাজানোও যেমন তেমন। সৃজার খোঁচা খেয়ে অরুণালোক আবার বলত, ‘দাঁড়াও না এবার দশতলায় ফ্ল্যাট কিনব। নো মশকুইটো, নো ফ্রগ, নো স্নেক, নো থিফ, নো ড্যাকোইট।’

মশার সমস্যা তো জানা কথা, গ্রাউন্ড ফ্লোরে দু’-একটা ব্যাঙ আসাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কলকাতা মহানগরের কেন্দ্রে বাস করে সাপকে ভয় পেতে হবে ভাবা যায়নি। নিকাশি নালা গিয়েছে কাছ দিয়ে। সেখানে ঢোঁড়া জাতীয় সাপ দেখা যায়। কিন্তু ঝোপঝাড় ভর্তি পাশের প্লটে যে সাপ আছে—সেই সাপ একটাই ফ্ল্যাট বেচে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। অরুণালোকও বুঝতে পারল আজীবন এ ফ্ল্যাটে থাকা যাবে না। তখনই লাখ সাতেক টাকা বেশি খরচ করতে পারলে এখানেই মন মতো ফ্ল্যাট হতে পারত। কিন্তু তখন সাত লাখ এক্সট্রা বের করার মতো সামর্থ্য ছিল না।

বেতন বাড়ছিল, কমছিল সুদের হার। অরুণালোক আবার শুরু করল যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ। একদিন হঠাৎ-ই চোখ আটকে গেল বেঙ্গল-ডিসুজায়। বাড়ি-বাজারের বিজ্ঞাপনের ভিড়েও চকচক করে উঠল— ‘জলের দরে’।

ভদ্রমহিলা বাপের বাড়ির কাছে নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে শীঘ্র উঠে যাবে। অরুণালোক ব্যাংক-এ কথা বলল। নো প্রবলেম।

প্রথম ফ্ল্যাটে আসার আগে যেমন তুলনা চলত— -দু’-কামরা বনাম তিন-কামরা, ভাড়া বনাম ইএমআই, জলের প্রবলেম বনাম ওভার-ফ্লো…। এবারও তেমনই শুরু হল— একতলা বনাম সাততলা, সিঁড়ি বনাম লিফট, তিন বনাম চার কামরা, সাপ বনাম ঘুড়ি-লাটাই।

দুই

আবার গোছগাছ। আবার যা যা মূল্যবান মনে হয়েছিল তার অনেক কিছুকে মূল্যহীন করে ফেলে যাওয়া। ভাড়াবাড়ি থেকে প্রথম ফ্ল্যাটে আসার সময় বেমানান বলে অনেক কিছু আনা যায়নি। এবারও অরুণালোক বলে, “না না এসব ফেলে দাও। ছড়িয়ে দাও। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘উদ্বাস্তু’ কবিতার মতো।’

সৃজা বলল, ‘থাক, এটা মামণির অন্নপ্রাশনের জামা।’

অরুণালোক মুচকি হাসল।

সৃজা ছেলের জামা হাতে নিয়ে বলল, ‘থাক, এটা মাত্র দু’বার পরেছে। একেবারে নতুনের মতো আছে।’

অরুণালোক আবার হেসে বলল, ‘না না, সাততলার ফ্ল্যাটে ভার বাড়িয়ে লাভ নেই।’

সৃজার মতো অরুণালোকও কোনও বই বা ম্যাগাজিন হাতে থমকে যেত। কোনটা অর্ধেক পড়া হয়েছে পরে পড়বে বলে সময় হয়নি বা খুঁজে পায়নি।

গারদ (শেষ পর্ব)

নিজের কথা বলবার আগে গৌতম সেই ডকুমেন্টের শেষ পাতায় চোখ রাখে। সত্যি, কী নেই সেখানে। প্রথম বিয়ের কার্ড থেকে আরম্ভ করে, তাদের ডিভোর্স-এর কাগজ। তারপর একই ভাবে দ্বিতীয় বিয়ের কার্ড ও তাদের মধ্যে ডিভোর্স না হওয়ার কাগজ, সব এক্কেবারে পরপর সাজানো। সঙ্গে একগুচ্ছ বধূ নির্যাতনের অভিযোগ। সব মিলিয়ে প্রায় পঁচিশ পাতার জেরক্স করা ডকুমেন্ট। পুরো সেটটা এক্কেবারে মন্ত্রি পর্যন্ত কপি ফরোয়ার্ড করা হয়েছে।

—ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলব ভাবছি। যেভাবেই হোক বড়োছেলের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় না এলে এই ছেলে তো মারা যাবে। উনি কেন যে বুঝছেন না, আগে তো পরিবার তারপরে তো বাড়ি।

গৌতম এই প্রসঙ্গে কোনও কথা না বলে আগেরদিন সঞ্জীবকে কেমন দেখেছে, সেই কথাগুলোই বলতে লাগল। আরও সব শিক্ষক ও শিক্ষিকা ছিলেন। সঞ্জীবের অবস্থাতে সবার কষ্ট হলেও কারওর কিছুই করবার নেই। এদিকে ছয়জনের মধ্যে একজন চলে যাওয়াতে বাকিদের উপর চাপ পড়ছে। প্রাইমারি স্কুল হলেও বড়ো স্কুল। প্রতিটা ক্লাসের দুটো করে সেকশেন। এই অবস্থাতে একজন চলে যাওয়া মানে…।

ছাত্র-ছাত্রীরাও সঞ্জীবের কথা প্রায় জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু গৌতমদের কাছে সঞ্জীবের অনুপস্থিতির কারণ হিসাবে তার শরীর খারাপ ছাড়া আর কিছু বলবার নেই।

সপ্তাহ তিনেক এমনি ভাবেই কেটে যায়। ইতিমধ্যে স্কুলে সঞ্জীবের সাসপেনশনের অর্ডার চলে আসে। অরুণবাবু সপ্তাহে একদিন সঞ্জীবের বাড়িতে ফোন করে তার মায়ের খবর নেবার পাশে সঞ্জীবেরও খবর নিতেন। সেই ভাবেই একদিন ফোন করে জানতে পারলেন সঞ্জীবের জামিন হয়েছে। অবশ্য অফিস থেকে আগেই স্কুলে জানিয়ে দিয়েছিল, ‘সঞ্জীববাবু এলেও ওনাকে সই করতে দেবেন না। ক্লাস করতে পারেন, তবে এই সময় না আসাটাই ভালো।’

অবশ্য পাঁচদিন পর সঞ্জীব নিজে এসে জানালেন, তিনি এখন ক্লাস করবেন না। অরুণবাবু অফিসে ফোন করে সাসপেন্ড থাকাকালীন কী করতে হবে ও কী কাগজ জমা দিতে হবে সেইসব জেনে নিলেন। বেচারা এক মাসের পেমেন্ট তো পেলই না, পুলিশ কাস্টডিতে থাকাকালীন যে কয়েকদিনের টাকা পেমেন্ট হিসাবে ঢুকেছে সেটাও ট্রেজারিতে গিয়ে জমা দিয়ে আসতে হবে। অবশ্য সেসব পরে জানানো হবে। সঞ্জীব সেইসব জেনে স্কুল থেকে অফিস হয়ে বাড়ি যাবার কথা জানাল। কিন্তু তিনদিন পর গৌতম স্কুলে আসতেই শুনল, সঞ্জীবের বাড়ি যে পঞ্চায়েত এলাকায় সেখান থেকে কোনওরকম সাহায্য পাচ্ছেন না। সে যে আর কোনও কিছু রোজগারের সঙ্গে জড়িত নয়, এই মর্মে পঞ্চায়েত থেকে তাকে একটা সার্টিফিকেট এনে অফিসে জমা দিতে হবে। কিন্তু পঞ্চায়েতের কেউ তাকে সাহায্য করছে না।

গৌতম এই স্কুলে খুব অল্পদিন হল ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। কিন্তু এখানে এসেই জেনেছে সঞ্জীব এই স্কুল ছাড়া আর কোথাও যায় না। পাড়ার কোথাও, কারওর সঙ্গে মেশে না। তার না আছে কোনও বন্ধু, না আছে কোনও কথা বলবার লোক। শোনা যায় তার শরীরেও নাকি পৌরুষ সম্পর্কিত কী সব সমস্যা আছে। তার জন্যেই তার প্রথম বউ বিয়ের মাত্র দু’মাস পরেই বাপের বাড়ি চলে গেছে। তার দাদা-বউদি এই সবকিছু জানত, তাও বউদি নিজের বোনের সঙ্গে বিয়ে দিল। বোনেরও মাথার ঠিক ছিল না। এই কথাগুলো অবশ্য সঞ্জীবের মুখ থেকেই শোনা। এদিকে সঞ্জীবের শরীর খারাপের ব্যাপারে তার দাদা ডাক্তার দেখানোর কথা বললেও মা বলেন, ‘ছেলেদের আবার ওইসব দিকে কিছু সমস্যা হয় নাকি, ওরা সব বানিয়ে বানিয়ে বলছে।”

এমনি ভাবেই আরও কয়েকমাস পেরিয়ে যায়। সঞ্জীবের সাসপেনশনকালীন ভাতা আরম্ভ হয়। পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেট না পেলেও অফিস থেকে অন্য আরেকটা উপায়ে ব্যবস্থা করেছে। পিএফ-এর সাবক্রিপশনটা কয়েক হাজার কমিয়ে দিয়ে হাতে যেটা পাচ্ছে সেটাতে মা-ছেলের মোটামুটি চলে যাবার কথা। সঞ্জীব অবশ্য অরুণবাবুকে প্রতিমাসে একবার ফোন করে বিল হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করে। অরুণবাবু প্রতিমাসেই জানান, ‘তোমার বিল আমাদের সঙ্গে হয় না, একটু পরে হয়। তবে আমাদের স্যালারি হবার পরের দিনেই তোমার হবে।”

সঞ্জীব ছাড়াই স্কুল চলতে থাকে। তার অনুপস্থিতিটাও যেমন করে হোক ঢেকে যায়। আসলে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে খাতায়-কলমে ঠিক যতজন ছাত্র বা ছাত্রী থাকে, বাস্তবে তার অর্ধেকও থাকে না। বেশিরভাগই আশেপাশে গজিয়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়ে। সরকারি স্কুলে শুধু নামটাই লেখা থাকে। কেউ কেউ শনিবার অথবা সেই স্কুলের ছুটির দিনে এই স্কুলে আসে। কেউ কেউ এক্কেবারেই আসে না। পরীক্ষাগুলো দেয় অথবা দেয় না। সুযোগ সুবিধা বিশেষ করে পোশাকটা নিতে আসে। আর আসে আধার কার্ডের বা কোনও ভ্যাকসিনের ক্যাম্প হলে, সেখানে। স্বভাবতই বেশি সংখ্যায় ছাত্র বা ছাত্রী অফিসিয়ালি থাকলেও আসলে খুব কমজনই আসে। তাই সঞ্জীব স্কুলে না এলেও অসুবিধা হয় না। এমনকী সঞ্জীব যে এই স্কুলে কোনওদিন ছিল, সেটাও কেউ না বললে মনে হয় না। শোনা যায় সঞ্জীব নিজেও নাকি বলেছে, ‘স্কুলে না এলেও টাকাটা তো পেয়ে যাচ্ছি। কেসের টাকাপয়সা দিতে হচ্ছে, না হলে ঠিক ছিল।’

অরুণবাবু এর মাঝে নিজের থেকে বহুবার সঞ্জীবের মাকে ফোন করে বড়োছেলের সঙ্গে ঝগড়া-ঝামেলা মিটিয়ে নেবার কথা বলেন। সেই উকিলবাবুও জামিনের জন্যে অনেক টাকা চেয়েছেন৷ সেটাও একদিন ফোনে সব শোনেন।

আরও কয়েকমাস পরে সঞ্জীব স্কুলে আসেন। চেহারাটা একটু ঠিক লাগে। মুখ চোখের কালিটা ফিকে হয়েছে বলে মনে হয়। অফিসে ঢুকেই খুব উত্তেজিত হয়ে অরুণবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন, ‘এবার মুক্তি বুঝলেন স্যার। বাড়িটা ষাট লাখ টাকায় বিক্রির কথা হয়েছে। মা রাজি হয়েছে, মায়ের নামেই তো বাড়িটা আছে।”

গৌতমরা খুশি হয়েই জিজ্ঞেস করে, “তার মানে তোমাদের হাতে টাকাপয়সা আসছে। দাদাও রাজি হল তো?”

—হ্যাঁ। দাদা পঁচিশ লাখ নেবে, মাকে রাখবার জন্যে আরও পাঁচ লাখ।

—বাকিটা তোমার? খুব ভালো। এবার দেখে শুনে আরেকটা বিয়ে করো। অরুণবাবু হাসিমুখে কথাগুলো বলেন। সঞ্জীব মুচকি হেসে উত্তর দেন, ‘কেসটা তোলার জন্যে শালাবাবু কুড়ি লাখ টাকা নিচ্ছে।”

—তোমার মাত্র দশ লাখ! গৌতম জিজ্ঞেস করে।

—না না, ওটা তো উকিল নেবে।

—কিন্তু তুমি থাকবে কোথায়? মা, দাদার কাছে থাকলে তুমি খাবে কী? তোমার সাসপেনশন এখনও ওঠেনি।

এইসব প্রশ্ন সঞ্জীবকে পরের পর করে গেলেও সঞ্জীব কোনও উত্তর দেন না। গুম হয়ে থাকা মুখে অন্ধকার নেমে আসে। স্কুলের অফিসরুম থেকে বেরিয়ে বাইকে চাপে। গৌতম সহ বাকিরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। জামিন পাবার কতদিন পর সাসপেনশন উঠবে কে জানে…

(সমাপ্ত)

গারদ (পর্ব-০৩)

কী বিচিত্র অবস্থা, সবাই দোষ করে? কেউ কেউ তো পরিস্থিতিরও শিকার হয়? সঞ্জীব কি দোষ করেছে? সংশোধনাগার নাম হলেও আসলে এটা কিন্তু জেল। বড়ো বড়ো জল্লাদ প্রাচীর, লোহার দরজা, আর ভিতরে আত্মীয় পরিজনদের থেকে আলাদা থাকা কিছু মানুষ। গৌতমের মাথার মধ্যে জেল সম্পর্কিত বিভিন্নরকমের কথা ও ঘটনা ভেসে বেড়াতে লাগল। সেই ও’হেনরি থেকে তার দেখা বিভিন্ন হিন্দি ও ইংরেজি সিনেমা, যেখানে জেল একটা চরিত্র হয়ে উঠেছে।

দুটো বড়ো বড়ো লোহার গেটের পরে একটা জায়গা আছে। ওখানে দু’জন পুলিশ বসে আছেন। একজন টেবিল চেয়ারে আরেকজন এমনি চেয়ারে। তারপর আরেকটা বড়ো লোহার গেট। সেই গেটের সঙ্গে আছে একটা ছোটো গেট। সেটা খুলেই সেই রোগা ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে একজনের নাম ধরে জোরে হিন্দিতেই চিৎকার করে বললেন, ‘কে এসেছে এনার বাড়ি থেকে…, খাবার দাবার যা কিছু এনেছেন, ওই ট্রেতে রাখবেন।’

গৌতম একপাশে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখে। কীভাবে বাইরের লোহার বড়ো গেটটার একপাশে রাখা প্লাস্টিকের ট্রেতে ভিতরের এক বন্দির সঙ্গে দেখা করতে আসা একজন বিস্কুট, মুড়ি আরও অনেক কিছু এক এক করে রেখে দিলেন। রেখে দিলেন বিড়ি, এমনকী খৈনির প্যাকেট। কিছু সময় পর এক ভদ্রলোক ভিতরের লোহার বড়ো গেটটার নীচে থাকা ছোটো গেটটার ভিতর দিয়ে মাঝের জায়গাটাতে এসে কিছু সময় দাঁড়ালেন। এদিকে তখন দাঁড়িয়েছিলেন বাকি দু’জন ভদ্রলোক। গৌতমের বুঝতে অসুবিধা হল না এনারা সবাই কাঁদছেন।

জেল অফিসের সেই রোগা ভদ্রলোক ততক্ষণে সেই প্লাস্টিকের ট্রে থেকে এক এক করে সব খাবার জিনিস বের করে একটা বড়ো প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভিতরে ভরে মুখটা সুতো দিয়ে বেঁধে দিলেন। সেই সঙ্গে আরেকবার হিন্দিতেই ‘দেখা করবার জন্যে বেশি সময় দেওয়া যাবে না’ সেটাও জানালেন। পাশে একটা জানলাতে কথা বলবার ব্যবস্থা আছে, সেটা বোঝা গেল। গৌতম অপেক্ষা করতে লাগল।

বাচ্চা দুটোর বাবাও মাঝের জায়গায় এল। তাদেরও এক প্রস্থের কান্নাকাটি হল। এনারাও খাবারের প্যাকেট দিলেন। তাদের চলে যাবার কিছু সময় পর গৌতমের সুযোগ এল। কিন্তু এই সঞ্জীবকে তার খুব অচেনা লাগল। সঞ্জীবও গৌতমকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেল। পরনে একটা জিন্সের প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি। দুটোই খুব নোংরা হয়ে গেছে। সঞ্জীবের চোখ মুখটাও কালো হয়ে গেছে। ওর সুগার আছে সেটা গৌতম আগেই শুনেছিল। স্কুলে মিষ্টি আনলে সঞ্জীবের জন্যে সুগার ফ্রি সন্দেশ আনানো হতো। একটা জানলার দু’পাশে দু’জন দাঁড়িয়ে। সরু জালের বেড়ার পাশে দু’জনের দূরত্বও পাঁচফুটের কম নয়। গৌতমকে দেখে সঞ্জীবের ভিতর থেকে একটা কষ্ট বেরিয়ে এল। কিন্তু খুব অসহায়ের মতো বলে উঠলেন, ‘দেখলে কেমন ফাঁসিয়ে দিল।”

সঞ্জীবের মুখেই গৌতম শুনল তার দ্বিতীয় শ্বশুরবাড়ি থেকে তার সঙ্গে তার মায়ের নামেও কেস করেছে। তাকে তুলে এনেছে কিন্তু বয়সের জন্যে তার মাকে আর পুলিশ আনেনি। তবে এখান থেকে নিজে জামিন পেলে মাকে কোর্টে নিয়ে গিয়ে জামিনের ব্যবস্থা করতে হবে। খুব অল্প সময় হলেও গৌতমের সঙ্গে সঞ্জীবের কথাবার্তাতে অনেক বিষয় উঠে এল। গৌতম সঞ্জীবের মুখেই জানতে পারল টাকা দিলে জেলের ভিতর সব কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু তার মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন থানা সিজ করে নেওয়ার জন্যে সেই মুহূর্তে তার হাতে এক নয়া পয়সাও নেই। গৌতম কথাগুলো শুনলেও তার কিছু করবার নেই। কোনও অবস্থাতেই তার হাতে টাকা দেওয়া যাবে না। চলে আসবার সময় সঞ্জীবের গলাতে আবার কষ্ট ঝরে পড়ল, ‘চাকরিটা থাকবে তো?”

গৌতম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে উত্তর দিল, ‘থাকবে, তবে আটচল্লিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে তো সাসপেনশনের অর্ডার বেরোবে, সেরকম শুনছিলাম।’

—এই রে, তাহলে তো মাকে নিয়ে না খেয়ে মরব। উকিলই তো সব নিয়ে নিচ্ছে। শরীরের অবস্থাও ভালো নয়। পুলিশ তুলে আনবার সময় তাড়াতাড়িতে প্রেশক্রিপশনটা আনা হয়নি। আমার সুগারের ওষুধ প্রেশক্রিপশন ছাড়া দিচ্ছে না, এদিকে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যাচ্ছে না।

গৌতম সব শুনে গেলেও তার করবার কিছু নেই। একে তো তার সঙ্গে সঞ্জীবের কোনও আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, সেখানে দেখা করতে দিয়েছে এটাই বিরাট। এরপর আর কোনওদিন আসতে হবে কিনা জানে না। এখানে সঞ্জীবের অনেক কিছু লাগবে। তার উকিল একজনের হাত দিয়ে কয়েক প্যাকেট বিস্কুট পাঠিয়েছিল। কিন্তু সঞ্জীবের একটা তেলের বাটি, আরেক সেট জামা-প্যান্ট, অনেক কিছুই লাগবে। কিন্তু পৌঁছাবে কে? স্কুলের বাকি কেউ আসবে না। এলে তাকেই আসতে হবে। প্রথমে সঞ্জীবের বাড়িও যেতে হবে। সেখানে তার মায়ের থেকে সব কিছু নিয়ে তারপর আবার এখানে আসা। ঝামেলার থেকে বড়ো কথা হল কিছু সমস্যা হলে তার পাশে কে দাঁড়াবে। সঞ্জীবের কথা শুনে যা মনে হল তার নিজের দাদা এই সমস্ত ঘটনার পিছনে আছে।

পরেরদিন স্কুল যেতে গৌতমের একটু দেরি হল। কিন্তু সঞ্জীবের সঙ্গে দেখা করবার ব্যাপারে কথা বলবার আগেই শুনল সঞ্জীবের শালা স্কুল ও অফিসে পঁচিশ পাতার একটা ডকুমেন্ট পাঠিয়েছে। হেডস্যার অরুণবাবু গৌতমকে দেখেই মুখ ছোটো করে বলে উঠলেন, ‘ছেলেটা মনে হয় বেরোতে পারবে না। এই দ্যাখো ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে কীসব পাঠিয়েছে। শুধু আমাদের স্কুলে নয়, কত জায়গায় পাঠিয়েছে একবার দ্যাখো।’

(ক্রমশ…)

দুর্ঘটনা (শেষ পর্ব)

সমরের মনে হল কিছু একটা গড়বড় হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞাসা করল— আপনার নাম আপনার মনে পড়ছে কি? —পড়েছে, হ্যাঁ, অনামিকা। ডাক্তারবাবু তো তাই বলেই ডাকছিলেন।

—আপনার কি কিছুই মনে পড়ছে না? কোথায় থাকেন, আপনার নাম কী ইত্যাদি।

—আমার আগের কিছুই তো মনে পড়ছে না। ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উনি উত্তর দিলেন মাথায় চোট-টা একটু বেশি লেগেছে তো, তাই এমন লাগছে। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কথাগুলো শুনেই সমর বেশ গম্ভীর হয়ে গেল, বুঝতে পারল যে, ঘটনা এবার অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। তাই কী করবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে গাড়ি চালাতে লাগল। সমরের মনে নানা প্রশ্ন, নানা দ্বন্দ্ব উঁকি মারতে লাগল। এসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে বাড়িতে পৌঁছে গেল। ভাবল খেয়ে দেয়ে ভালো করে একটা ঘুম মারলেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।

( চার )

খাওয়াদাওয়ার পর সমর অনামিকাকে খাটে বিছানা করে দিয়ে, নিজে মাটিতে বিছানা করে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে নানা অজানা আশঙ্কার কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙল অনামিকার ডাকে।

—উঠে পড়ো। চা খেয়ে নাও।

সমর চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। অনামিকা চা বানিয়ে নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

সমর নিঃশব্দে যখন চা-এ চুমুক দিচ্ছে, তখন সব নীরবতা ভঙ্গ করে অনামিকা বলে উঠল— অ্যাই জানো, গতকাল বা তার আগের দিনের কোনও ঘটনাই আমার মনে পড়ছে না। তুমি আমাকে একটু সাহায্য করবে?

সমর দেখল এই সুযোগ। সে সমস্ত ঘটনা অনামিকাকে শোনাল, কিন্তু মনে হল অনামিকা যেন কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না। অনামিকা বলে উঠল— তাহলে ডাক্তাররা কি মিথ্যে বলল যে তুমি আমার স্বামী!

সমর কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তাই চুপ করে রইল।

এভাবেই কেটে গেল বেশ কিছু দিন। ওরা দু’জনেই বেশ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। একে অন্যকে বুঝতে পারছে। ঘনিষ্ঠতাও বেড়েছে। সমর আর আজকাল অফিসে লেট সিটিং করে না। অনামিকাকে না দেখলে যেন মনটা কেমন ছটফট করে। তাহলে কি অনামিকার ব্যপারে দুবর্লতা দেখা দিল।

অন্যদিকে অনামিকারও ঠিক তেমন অবস্থা। একই ঘরে একজন খাটে শোবে আর অন্যজন নীচে বিছানা পেতে শোবে তা কী করে হয়! আজকাল ঘরের সব কাজকর্ম অনামিকাই করে। আগুনের সামনে ঘি থাকলে যেমন আপনা থেকেই জ্বলে ওঠে, ঠিক তেমনই একদিন সমর অফিস থেকে ফেরার পর অনামিকা বলল – তোমার সঙ্গে আজ কথা আছে। আগে হাত, পা ধুয়ে নাও।

অনামিকা রান্নাঘর থেকে ততক্ষণে চা বানিয়ে নিয়ে এল। দু’জনেই চায়ে চুমুক দিতে দিতে গল্প শুরু হল। অনামিকা বলে উঠল— শোনো, আমরা দু’জনে

স্বামী-স্ত্রী হয়ে এভাবে আলাদা আলাদা থাকব, এ কীভাবে সম্ভব?

—অনামিকা, আমি জেনেশুনে এমন কিছু করতে চাই না যাতে তোমার বা আমার কোনও ক্ষতি হোক। তবে তুমি চাইলে এ ব্যাপারে আমরা ম্যারেজ রেজিস্টারের কাছে গিয়ে পরামর্শ নিতে পারি। উনি যদি বলেন কোনও আপত্তি নেই তবে আমরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করতে পারি।

মনে হল অনামিকার কথাটা পছন্দ হয়েছে। পরের দিন সমর আর অনামিকা একজন ম্যারেজ রেজিস্টারের সঙ্গে দেখা করে সব পাকা করে এসেছে এবং কিছুদিনের মধ্যে ওদের রেজিস্ট্রি ম্যারেজও উনি করিয়ে দিলেন। এরপর থেকে ওদের সংসার বেশ আনন্দেই কাটছিল। ছুটির দিন হলেই ওরা দু’জনে গাড়ি নিয়ে বেড়াতে চলে যেত লং ড্রাইভে।

এক রবিবার সমর বলল— অনামিকা, চলো আজ তোমাকে বনগাঁ-তে বাংলাদেশের সীমান্তটা দেখিয়ে নিয়ে আসি। আসলে আমিও বই-এ ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এর কথা পড়েছি কিন্তু কখনও দেখিনি। চলো, আজ বনগাঁ ঘুরে আসি। শুনেছি ওখানে নাকি খুব ভালো ও সস্তায় মিষ্টি পাওয়া যায়। যাবে নাকি সেখানে?

—আমি অত বুঝি না বাপু। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানেই যেতে রাজি। তুমি সঙ্গে থাকবে এটাই অনেক। আমি আর কিছু চাই না। আমি আর পুরোনো জীবনেও ফিরে যেতে চাই না।

সকালবেলায় প্রাতঃরাশ, স্নান সেরে দু’জনেই চলল বনগাঁর উদ্দেশ্যে। রাস্তায় যেতে যেতে দু-দিকে বড়ো বড়ো গাছ আর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে দু’জনেই খুব খুশি হচ্ছিল। হঠাৎ ওদের চোখে পড়ল একটা বড়ো ট্রাক ওদের উলটোদিকের গাড়িটাকে ওভারটেক করতে গিয়ে ওদের দিকেই ধেয়ে আসছে। সমর নিমেষের মধ্যে গাড়ির স্টিয়ারিংটা বাঁদিকে ঘুরিয়ে নিল কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারল না। গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা খেল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বড়ো গাছের সঙ্গে। এর পর আর সমরের কিছুই মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন নিজেকে দেখল হাসপাতালের বিছানায়। জ্ঞান ফিরতেই নার্সকে জিজ্ঞাসা করল। আমার সঙ্গে যিনি ছিলেন তিনি কেমন আছেন।

—ওঁকে তো আজ সকালে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ওঁর মাথায় একটু আঘাত ছিল। ওটা ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। আপনি তিনদিন অচৈতন্য অবস্থায় ছিলেন।

সমর কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। কিন্তু অবাক হল অনামিকা তাকে একটিবার দেখতেও এল না! তাহলে ও গেল কোথায় ? ও তো এ শহরের কিছুই চেনে না।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার দিন রিসেপশন থেকে খবর নিয়ে জানতে পারল অনামিকা ওর বাড়িতে ফোন করে ওর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তারাই নাকি ওর হাসপাতালের বিল মিটিয়ে দিয়েছে। তাই সমরকে আর তার বিল দিতে হবে না। ওর নাম নাকি মধুছন্দা বলেছে। এর পর সমর পাগলের মতো খুঁজেও অনামিকার কোনও সন্ধান না পেয়ে অফিস থেকে দিল্লিতে ‘ট্রান্সফার’ নিয়ে চলে যায়। ওর স্মৃতি থেকে এখনও অনামিকার ছবি মুছে ফেলতে পারেনি। আজও রোজ বাড়ি ফিরে অনামিকার ছবি নিয়ে বহুক্ষণ কাটিয়ে দেয়। ছবির সামনে বসে চোখের জল ফেলে। কিছুতেই মন থেকে ভুলতে পারছে না তাকে। মনে হয় ওর মরুভূমির মতো জীবনে অনামিকা মরুদ্যান হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল।

এভাবে কেটে গেল দু’বছর। অনামিকার দেখা পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিল প্রায়। এমন সময় একদিন অফিসের এক সহকর্মী কৌশিকের বউভাতে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে সমর চমকে উঠল। এ কী? এ তো অনামিকা। ওর বন্ধু তাহলে অনামিকাকেই বিয়ে করেছে। সমরের তখন বাকরুদ্ধ অবস্থা। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। শরীরে কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করছে। কাউকে কিছু না বলেই ধীর পায়ে গেটের বাইরে বেরিয়ে আসছিল। হঠাৎ কৌশিকের সঙ্গে দেখা। কৌশিক বলল— কিরে কোথায় চললি?

—আমার শরীরটা ভালো লাগছে না রে। বাড়ি যাচ্ছি। পরে একদিন হবে। আচ্ছা, তোর বউ-এর নাম কিরে?

—মধুছন্দা।

সমরের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, অনামিকা তার জীবনে এখন অতীত। তাই ধীর পায়ে বিয়েবাড়ি থেকে ঘরে ফিরে এসে, অনামিকার সব ছবিগুলো নামিয়ে রাখল। অব্যক্ত এক গভীর বেদনায় চোখ জলে ভরে এল।

(সমাপ্ত)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব