পত্রমিতালি

মাস ছয়েক হল সাতপাকে বাঁধা পড়েছে অরিত্রি। সবে সবে এমএ কমপ্লিট করেছে, তারপরেই সম্বন্ধ করে বিয়ে। বরানগরের সাহা বাড়ির জ্যেষ্ঠ পুত্র ঋদ্ধির সঙ্গে। অফিস কলিগের ছেলের বিয়েতে গিয়েই ঋদ্ধির বাবা-মায়ের চোখে পড়ে যায় অরিত্রি। পড়বে না-ই বা কেন, ফরসা, টিকোলো নাক, টানাটানা চোখ, যাকে বলে একেবারে প্রকৃত সুন্দরী। ব্যস তারপরেই পাকাদেখা, আর চারহাত এক করা।

অরিত্রির নতুন পরিবার বলতে ঋদ্ধি, শ্বশুর-শাশুড়ি আর সমবয়সি এক দেওর। ভীষণ ফিচেল। হবি বলতে সময় পেলেই শার্লক হোমস্-এর বই নিয়ে বসে পড়া। কেমন যেন সন্দেহপ্রবণ। সবেতেই নাকি রহস্যের গন্ধ পায় সে। আর একজন বিবাহিত ননদ। সাংসারিক কিছু সমস্যার জন্য ইদানীং বাপের বাড়িতেই থাকছে। তবে ভীষণ মিষ্টি স্বভাবের। যাই হোক অরিত্রি এগুলো বেশ এনজয়ই করে। এযুগের মেয়ে হলেও নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি অরিত্রির একেবারেই পছন্দের নয়। বরং বরাবরই সংযুক্ত পরিবারের প্রতিই তার ঝোঁক বেশি। সে তার পছন্দ মতোই পরিবার পেয়েছে বটে। সারাদিন কাজ বলতে শাশুড়ির হাতেহাতে টুকটাক কিছু। আরও একটি ব্যাপারে অরিত্রি বেশ প্রাচীনপন্থী। এই ফেসবুক, টুইটারের যুগেও সে পত্রমিতালিতেই আস্থাশীল।

সেদিনও বেলা এগারোটা নাগাদ শাশুড়ি আর দেওরের সঙ্গে বসার ঘরে গল্প করছিল অরিত্রি। শ্বশুর ধৃতিমান আর স্বামী ঋদ্ধি তখন অফিসে। সেই সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল। সোহম-ই দরজা খোলার জন্য উঠে গেল। খানিক পরে একটা গোলাপিরঙা খাম নাকে দিয়ে শুঁকতে শুঁকতে ঘরে ঢুকল। খামটা অরিত্রির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এই নাও বউমণি তোমার চিঠি।’ ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।

মুহুর্তেই অরিত্রির মুখচোখের রঙই বদলে গেল। একপ্রকার লাফিয়ে উঠেই সোহমের হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নিল সে। নিজের ঘরের দিকে যাবার উপক্রম করতেই শাশুড়ি বিমলাদেবী প্রশ্ন করে বসলেন, ‘কার চিঠি বউমা?’

‘আমার বন্ধুর’ কোনওমতে জবাব দিয়েই নিজের ঘরের দিকে চলে গেল অরিত্রি।

বউমণির হাবভাব দেখে অবাক হয়ে গেল সোহম। এমনিতে তো অষ্টমঙ্গলার দিন-দুয়েক পর থেকেই চিঠি আসা শুরু হয়েছে। তবে সোহমের মারফত এই প্রথম। মনে মনে ভাবতে থাকল, এমন কার চিঠি যে হাতে পাওয়া মাত্রই বউমণির মুখে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে গেল? অমন ভাবে ছিনিয়েই বা নিল কেন? তার উপর খামের ওই সুগন্ধী! আরও যেন উসকে দিল সোহমের সন্দেহপ্রবণতাকে।

ভাবনায় বাধ সাধলেন বিমলাদেবী। চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁরে সোহম আজও দিদির কোনও ফোন বা চিঠিপত্তর কিছু এল না নারে?’

‘মা এব্যাপারে আমাদেরও তো কোনও তৎপরতা নেই বলো। আমরাও যেমন ভাবছি ওদিক থেকে কোনও সাড়া পেলে আমরা এগোব, তেমন ওরাও হয়তো সেটাই ভাবছে। তাছাড়া ওরা দিদিকে যেভাবে হেনস্থা করেছে, তাতে করে ওর আর ওবাড়িতে না যাওয়াই ভালো। ও এখানেই থাক।’ কথা বলতে বলতেই কানে ভেসে এল রবীন্দ্রসংগীত। সম্ভবত বউমণির ঘর থেকেই। ‘দ্যাখ সংসার থাকলে একটু-আধটু অশান্তি হয় বটে। পরে সব ঠিকও হয়ে যায়। তাছাড়া মা-বাবা যেমনই হোক জামাই তো আমাদের খুব ভালো। লজ্জায় হয়তো ফোন করতে পারছে না। চিঠি পাঠালেও তো পাঠাতে পারে। আচ্ছা বউমা তো মাঝেমধ্যেই পোস্ট অফিসে যায়, না? তা ওকে বললেই তো একটু খোঁজ নিতে পারে।’

‘তোমার বউমা তো তার বন্ধুকে চিঠি দিতে যায়। ননদের কথা ভাবার কি তার সময় আছে? এই দ্যাখো না পনেরো দিনের মাথায় দু-বার চিঠি এল বউমণির। সেদিন তো নিজেই নিল। আর আজ… সেই একই গোলাপি খামে সুগন্ধী দেওয়া চিঠি।’ সোহম বেশ গম্ভীর ভাবেই বলল।

‘বউমার এই চিঠির কথা ঋদ্ধি জানে? নিশ্চয়ই জানে।’ আশঙ্কা প্রকাশ করেও নিজেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন তিনি। এমনিতে অরিত্রিকে নিয়ে অভিযোগের জায়গাই ছিল না বিমলাদেবীর। দেখতে যেমন, তেমনই মিষ্টি ব্যবহারও। সকলকে যত্ন করে খাওয়ানো, কেউ কষ্ট পেলে তা লাঘব করার চেষ্টা, একেবারে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল ওর। তবু মা তো। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এমনিই মেয়েকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় আছেন, তার উপর এখন আবার ছেলে। সোহমের কথাগুলো বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল বিমলাদেবীকে।

‘ঠিকানাটা দেখলি? কোথা থেকে এল চিঠিটা?’

সোহম কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দিল, ‘আমি কী করে জানব, বউমণির পেন ফ্রেন্ড। কাজেই ওটা বউমণিই জানবে।’

‘পেন ফ্রেন্ড’ আবার কী জিনিস রে?’ ভুরু কোঁচকালেন বিমলাদেবী।

‘মা তুমিও না! কী করে বোঝাই বলো তো? মানে পত্রমিত্র।’

‘আচ্ছা আচ্ছা, এবার বুঝতে পেরেছি। ঋদ্ধি যখন ছোটো ছিল, তখন বাচ্চাদের পত্রিকা থেকে ঠিকানা খুঁজে খুঁজে ও তাদের চিঠি লিখে পাঠাত।’

‘মা, তুমি না খুব সহজ সরল। তোমাকে বোকা বানানো খুব সোজা। মানুষ বছরের পর বছর একসঙ্গে স্কুলে পড়ার পর সেইসব বন্ধুদের একটা সময় পর ভুলে যায়, আর এ তো কোন পত্রমিত্র। বউমণির মতো নিয়মিত পত্রমিত্র-র চিঠি আসতে কখনও দেখিনি।’

সোহমের কোথাও বেরোনোর ছিল বোধহয়। বন্ধু ডাকতে হনহন করে বেরিয়ে গেল। বিমলাদেবী খানিকক্ষণ সেখানেই বসে রইলেন। হয়তো কিছু ভাবছিলেন। তারপর গতানুগতিক ভাবে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

ঋদ্ধি আবার খিদে সহ্য করতে পারে না। খিদের সময় খাবার না পেলে ওর মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়। তাই বিকাল বিকাল জলখাবার বানাতে শুরু করে দেন বিমলাদেবী। সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে, ‘ওহ্, অরিত্রি তোমার দাদা ফোন করেছিল। তোমাকে ফোনে না পেয়ে আমাকে কল করেছিল। কাল রমামাসি নাকি কে যেন আসবে ওবাড়িতে। তাই আমাদের যাওয়ার জন্য বলছিল। আমার তো সময় হবে না, তুমি ঘুরে এসো।’

‘ঠিক আছে। তুমি গেলে ভালো হতো। কিন্তু সময় না পেলে আর কী করা যাবে। সময় করে আমিই একবার দেখা করে আসব।’

পরদিন ঋদ্ধি অফিস যাবার পর অরিত্রি পরিপাটি হয়ে সেজেগুজে বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রমামাসি অরিত্রির ছোটোমাসির বড়োজা। ছোটোমাসি মারা গেলেও ওনার জায়ের সঙ্গে অরিত্রির মায়ের ভীষণ ভালো সম্পর্ক। একেবারে মায়ের পেটের বোনের মতো। অসুস্থ থাকায় অরিত্রির বিয়েতে আসতে পারেননি। তাই আসার সময় আদরের অরিত্রির জন্য একছড়া সোনার মালা আর কানের দুল এনেছেন। সেটা পেয়ে অরিত্রি একেবারে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে।

রমামাসির সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় সকলে গল্পে মশগুল হয়ে গেল। গল্পের মাঝে হঠাৎই অরিত্রির মা বিভাদেবীর কিছু মনে পড়ে যাওয়াতে ‘একটু আসছি’ বলে ভিতর ঘরে গেলেন। খানিক পরে একটা খাম হাতে করে নিয়ে এসে মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই নে অরি, পরশুদিন এটা এসেছিল। বলব বলব করে আর বলা হয়ে ওঠেনি।’ সেই গোলাপিরঙা খাম দেখে একপ্রকার মায়ের হাত থেকে কেড়েই নিল অরিত্রি।

‘কার কার্ড রে?’ অরিত্রির নেওয়ার ভঙ্গিমা দেখে প্রশ্ন করে বসল বউদি অনিন্দিতা।

‘কেন তুমি আমার পত্রমিত্র-র কথা জানো না? নতুন নাকি?’

‘বাবা, তোরা যে কীভাবে না দেখেশুনে একজন অচেনা লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাস কে জানে। এইভাবে আবার…’ বলতে বলতে হঠাৎই থেমে যায় অনিন্দিতা। মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায় তার। কোনও এক অশনিসংকেতের আভাসে মুহূর্তেই মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় তার।

‘হ্যাঁরে ওবাড়িতে এইরকম কোনও চিঠি যায় না তো?’ শঙ্কা প্রকাশ করে অনিন্দিতা।

‘কেন, না যাওয়ার কী আছে?’

‘তোর এই পত্রমিত্রের কথা ঋদ্ধি জানে?’

‘নাহ্। আর জানলেই বা কী হবে? আমি তো কোনও অন্যায় করছি না।’ সহজ ভাবে উত্তর দেয় অরিত্রি।

‘ভুলে যাস না অরি, তুই এখন বিবাহিত। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভীষণ স্পর্শকাতর। সামান্য থেকে সামান্য জিনিসও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই এমন কিছু করিস না, যেটাতে ওর বা ওর বাড়ির লোকের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। ছেলেমানুষি ছাড়, এসব চিঠিপত্র দেওয়া-নেওয়া বন্ধ কর।’ অরিত্রিকে বোঝানোর চেষ্টা করে অনিন্দিতা।

‘বউদি তুমি ভালো করেই জানো আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছাড়া আর অন্য কোনও সম্পর্ক নেই। এই সামান্য একটা কারণে আমার আর ঋদ্ধির সম্পর্কে ফাটল ধরবে, ঋদ্ধি আমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে এটা আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। সরি বউদি, তোমার এই অ্যাডভাইস-টা মানতে পারলাম না।’

গল্প আর কথার মাঝে বিকাল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে। বাড়িতে ফেরারও তাড়া ছিল। তাই আর কথা না বাড়িয়ে মাসির দেওয়া উপহারগুলো সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেল অরিত্রি।

দেখতে দেখতে আরও দুটো মাস কেটে গেল। শীত গড়িয়ে গরম হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এইরকমই এক গ্রীষ্মের দুপুরে অরিত্রি স্নান সেরে ঘরে ঢুকে দেখল ঋদ্ধি মুখটা ভার করে বসে রয়েছে। তার দিকে ফিরেও দেখছে না। অথচ অন্যান্য দিন ভিজে চুলে অরিত্রিকে দেখে ঋদ্ধির যে কী হয় কে জানে। নিজেকে একদম কন্ট্রোল করতে পারে না। অরিত্রি নানা অছিলায় তাকে আকর্ষিত করার চেষ্টা করে। ইচ্ছে করেই বুক থেকে আঁচলটা খসিয়ে দেয় সে। কিন্তু কিছুতেই কোনও লাভ হচ্ছে না দেখে চিন্তিত স্বরে বলে ওঠে, ‘আজ কী হয়েছে তোমার? এত নির্লিপ্ত কেন?’

অরিত্রির গলার আওয়াজ শুনে ঘাড়টা ফিরিয়ে ঋদ্ধি বউয়ের হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিল, ‘তোমার চিঠি’। ঋদ্ধির কপালে অসন্তোষের ভাঁজ স্পষ্ট।

‘আমার চিঠি!’ চিঠির দিকে চোখ যেতেই আনন্দে হাসতে হাসতে খামটা খুলতে খুলতে বলল, ‘আরে এটা তো সুরজের চিঠি।’ বলেই চিঠিটা পড়তে শুরু করল।

সিগারেট ধরিয়ে টান দিতে দিতে প্রশ্ন করল, ‘সুরজ কে? এর কথা তো আগে কখনও বলোনি!’

‘আমার পত্রমিত্র। ভীষণ ভালো। ওর গুণের তুলনা হয় না।’ পড়তে পড়তেই জবাব দিল অরিত্রি। তারপর আবার চিঠির মধ্যে ডুবে গেল। পরে আয়নার সামনে বসে গুনগুন করে গাইতে থাকল। ঋদ্ধি আড়চোখে অরিত্রিকে পরখ করছিল। পরপুরুষের প্রতি স্ত্রীর প্রীতি কোন পুরুষই বা মেনে নিতে পারে? রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কোনওমতে নিজেকে সংযত করে বেশ দৃঢ় ভাবেই বলল, ‘আজ খাবারদাবার পাওয়া যাবে নাকি?’

‘খাবার তো রেডিই আছে,’ বলে রান্নাঘরে চলে গেল সে। স্ত্রীর এত খুশির কারণ কী? ওই চিঠিতে কী এমন লেখা রয়েছে? কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে অরিত্রি যাওয়া মাত্রই আলমারি থেকে চিঠিটা বার করে পড়তে শুরু করল ঋদ্ধি। হিমাচল প্রদেশের কোনও এক গ্রাম থেকে চিঠিটা এসেছে। প্রতিটি ভাষায় রয়েছে পর্বতীয় সংস্কৃতির ছাপ। অরিত্রিকে সপরিবারে ওখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে সুরজ। নতুন বছরে কার্ড পাঠাবার জন্য অরিত্রিকে ধন্যবাদ জানিয়েছে, সঙ্গে ওর কিছু প্রশ্নের উত্তরও। চিঠির ভাষা আর লেখনী সত্যিই তারিফযোগ্য।

অরিত্রি খাবার দেওয়ার পর একে একে সকলে এসে টেবিলে খেতে বসে গেছে। ঋদ্ধি খেতে বসলেও খাওয়ায় বিন্দুমাত্র মন নেই তার। কেমন যেন উদাস। সোহম শুরু থেকেই দাদাকে খেয়াল করছিল। কারণ এই খাম আসার সাক্ষী সে নিজেও, তাই হয়তো দাদার কষ্টটা ও ফিল করছিল। মনে মনে বউমণিকে দূষতে ছাড়েনি সে।

দাদার মন ঘোরাতে মটর পনিরের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দাদা এটা তো খেলেই না। দারুণ টেস্ট, খেয়ে দ্যাখো।’

‘না না দিস না। পেটটা ভারভার লাগছে।’ বলে টেবিল থেকে উঠে চলে গেল ঋদ্ধি।

দাদার অবস্থা দেখে সোহম মনে মনে ঠিক করেই নিয়েছিল এবার কোনও চিঠি এলে সে তার বউমণিকে না দিয়ে দাদা ঋদ্ধির হাতেই তুলে দেবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই রহস্য ভেদ করতেই হবে।

সোহমের পরিকল্পনা অনুযায়ী দিন পনেরো পরে সেই শুভক্ষণ উপস্থিত হল। বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবে বলে বেরোচ্ছে, এমন সময় গেটের মুখে ডাকপিয়োন হরিদার সঙ্গে দেখা। দাদার অফিসের একটা চিঠির সাথে সাথে বউমণির সেই গোলাপিরঙা খাম পকেটস্থ করে বেরিয়ে গেল সোহম।

সিনেমা, খাওয়াদাওয়া সেরে সোহম যখন ফিরল তখন ঋদ্ধিও অফিস থেকে বাড়ি ফিরে গেছে। বউমণি রান্নাঘরে আর মা বারান্দায় বসে বসে রেডিয়োতে পুরোনো দিনের গান শুনতে ব্যস্ত। সেই সুযোগে সোজা দাদার কাছে গিয়ে, ‘দাদা, এগুলো নাও। এটা বোধহয় তোমার অফিসের, আর এটা বউমণির। দুপুরে বেরোনোর সময় রাস্তাতেই হরিদার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল।’

‘ওহ্, ঠিক আছে। টেবিলে রেখে যা। আমি দেখে নেব।’ সোহম যাওয়ার পর অফিসের চিঠিটা নিজের কাছে রাখল। অরিত্রির-টা ওর বালিশের নীচে।

ডিনার সেরে অরিত্রি যখন শুতে এল তখন ঋদ্ধি তার চিঠির কথা তাকে জানাল, সঙ্গে এও জানাল সেটা তার বালিশের নীচে রয়েছে।’

‘আমার চিঠি এই সময়?’ অরিত্রি বেশ আশ্চর্য হয়েই কথাগুলি বলে বসল।

‘ওটা দুপুরেই এসেছে। ছোটোন নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। এখন দিয়ে গেল।’ ঋদ্ধির মুখের দিকে তাকাল অরিত্রি। ‘সুরজ-এর চিঠি তাই তো?’ তাচ্ছিল্যের সুরেই বলল সে।

‘হ্যাঁ, তুমি কেমন করে জানলে?’ হাসতে হাসতেই প্রশ্ন করল অরি।

‘খাম দেখে। তা, যে আমার বউয়ের মনের এত কাছে, সেই মহাশয়ের সম্পর্কে আমারও তো জানার অধিকার রয়েছে নাকি?’ বিছানায় বসে পড়ল ঋদ্ধি।

‘অবশ্যই রয়েছে। সুরজের সম্পর্কে তোমাকে কী বলব, ঠিক ভাষা খুঁজে পাই না। আমারই সমবয়সি হবে। যেমন সুন্দর তেমনি ব্যক্তিত্ব, আকর্ষকও বটে। ভীষণ ভালো লেখে। মনে হয় পড়তেই থাকি। আর ওর চোখ দুটো…’ বলতে বলতে থেমে যায় অরি। বোধহয় ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এমনটা মনে হয় ঋদ্ধির। সন্দেহ আর ঈর্ষায় জ্বলে যেতে থাকে সে। তারপর আর মুখ খোলেনি ঋদ্ধি। পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছে সে। অরিত্রি একবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সাড়া দেয়নি ঋদ্ধি। সেও পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

এই কদিনে ঘর সংসারের কোনও পরিবর্তন না হলেও, ঋদ্ধির আচার-ব্যবহারে বেশ একটা পরিবর্তন এসেছে। দেরি করে বাড়ি ফেরে। অরিত্রি না খেয়ে বসে থাকলেও ‘বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি’ বলে হাত-পা ধুয়ে সোজা বিছানায় চলে যায়।

বিমলাদেবী আর সোহমও ঋদ্ধির এই আকস্মিক পরিবর্তনে চিন্তান্বিত হয়ে উঠেছিল। চোখের সামনে ছেলেটা সিগারেটের পর সিগারেট খেয়ে চলেছে। বাড়িতে কারওর সঙ্গে ঠিক করে কথা পর্যন্ত বলছে না। চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

একদিন সন্ধ্যাবেলা কোনও কারণে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে ঋদ্ধি। ফেরা থেকেই ঘর থেকে এক পা বেরোয়নি। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সিগারেটে টান দিয়েই চলেছে। একটা শেষ হলে আরেকটা। সামনে টিভি চালিয়ে বসেছে, কিন্তু একবারের জন্যও সেদিকে তাকিয়ে দেখছে না। যেন অন্য কোনও জগতে রয়েছে।

চোখের সামনে এসব আর দেখতে পারছিল না অরিত্রি। রাগে হাত থেকে সিগারেট কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল সে, ‘কী হয়েছে তোমার? আমাকে খোলসা করে বলোতো। আমাকে দেখলে তুমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি। আমি কি এতটাই অবহেলার পাত্রী? নাকি আমাকে আর পছন্দ হচ্ছে না তোমার?’

টুঁ-শব্দটি পর্যন্ত করল না ঋদ্ধি। তাই দেখে রাগে গা জ্বালা করে উঠল অরিত্রির। কিন্তু তাতেও স্বামীর কোনওরম তাপোত্তাপ নেই দেখে একটু নরম হয়েই জিজ্ঞাসা করল, ‘কী এত ভাবো তুমি? কারণটা আমাকে বলা যায় না? আগে তো এত সিগারেট খেতে না। কী এমন হল বলো না?’ চোখ ছলছল করে উঠল অরিত্রির।

‘তুমি আগেও যেমন সুন্দর ছিলে, এখনও তেমনি সুন্দর আছ। বরং আমিই তোমার যোগ্য নই। সুরজের মতো আমি সুন্দরও নই, অত সুন্দর কথাও বলতে পারি না, আর আকর্ষকও নই।’ কথাগুলো কানে গিয়ে লাগল অরিত্রির।

‘এসব কী বলছ তুমি?’

‘ঠিকই বলছি। তোমাকে আমি আর বেশিদিন ধরে রাখব না। যাতে খুব তাড়াতাড়ি পাকাপাকি ভাবে সুরজের কাছে যেতে পারো, সেই ব্যবস্থাই করছি।’ ঠান্ডা মেজাজে জবাব দিল ঋদ্ধি।

‘তুমি কী পাগল হলে? এসব কী আবোল-তাবোল বকছ তুমি?’ বলেই হাউহাউ করে কেঁদে উঠল অরিত্রি। সে ভালোমতোই বুঝে গিয়েছিল ঋদ্ধির মনে সন্দেহ বাসা বেঁধেছে। সহজে এটা যাওয়ারও নয়।

‘তুমি যেটা মুখ ফুটে বলতে পারোনি, আমি সেই সত্যিটা-ই বলছি। প্লিজ আমাকে ভালোবাসার নাটকটা এবার বন্ধ করো।’ কঠোরভাবেই ঋদ্ধি কথাগুলো বলে গেল।

‘এমন করে কেন বলছ। সুরজ শুধুই আমার পত্রমিত্র। আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসি না। শুধু শুধু সন্দেহ করছ।’ দু-গাল দিয়ে জল বয়ে নেমে এল অরিত্রির।

‘তুমি যতই সাফাই দাও না কেন, আমি জানি তোমাদের সম্পর্কটা কী। স্ত্রীকে পরপুরুষে প্রেমপত্র পাঠাচ্ছে, এটা কোন স্বামী মেনে নেবে।’ একই ভঙ্গিমায় বলে যাচ্ছিল ঋদ্ধি।

‘তুমি পড়ে দ্যাখো, এগুলো প্রেমপত্র নয়।’ দৌড়ে আলমারি থেকে চিঠিগুলো নিয়ে এসে স্বামীর হাতে ধরিয়ে দিল অরিত্রি।

কিন্তু ঋদ্ধির সেই এক গোঁ। অরিত্রির কোনও কথাই সে শুনবে না। ‘ওগুলো নিজের ভবিষ্যতের জন্য রেখে দাও।’ বলেই চিঠিগুলো অরিত্রির মুখের উপর ছুড়ে মারল।

‘তুমি জানো না ঋদ্ধি, আমাদের সম্পর্ক এই কাগজের চিঠিপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তোমাকে কী করে বোঝাব।’

‘বোঝানোর আর আছেটা কী? কী বোঝাবে আমাকে? ধরা পড়ে গেছ অরি। এত বোকা ভেব না আমাকে।’ রাগে বিছানা থেকে বালিশটা নিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল ঋদ্ধি।

কাঁদতে কাঁদতে অরিত্রি আওড়ে যেতে থাকল, ‘তুমি ভুল বুঝছ। ফোটো ছাড়া আমি তাকে কোনওদিন দেখিনি পর্যন্ত, বন্ধুত্ব ছাড়া কোনও সম্পর্ক নেই আমাদের। প্লিজ ট্রাস্ট মি।’ অরিত্রির পৌনঃপুনিক কাতর স্বীকারোক্তি ঋদ্ধির কান পর্যন্ত পৌঁছাল কিনা কে জানে। অনেক রাত পর্যন্ত ওই ভাবেই বসে রইল অরিত্রি। ভোরের দিকে গা এলিয়ে দিল বিছানায়।

পরদিন সাততাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যায় ঋদ্ধির। অরিত্রি তখনও অবচেতন ভাবে ঘুমিয়ে রয়েছে। প্রায় সাতটা নাগাদ বাড়ির ল্যান্ড ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙে তার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠেই কোনওরকমে হাত-পা মুখ ধুয়েই ছোটে রান্নাঘরের দিকে। ব্রেকফাস্ট রেডি করে আনতে আনতেই বেরিয়ে যায় ঋদ্ধি। প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকে অরিত্রি। ছেলেকে বেরিয়ে যেতে দেখে, ‘কী হল বউমা?’ প্রশ্ন করেন বিমলাদেবী।

‘কিছু না মা।’ লোকানোর চেষ্টা করে অরিত্রি।

‘বাবু না খেয়েই চলে গেল?’

‘তাড়া ছিল তাই…’

‘এত কীসের তাড়া, যে না খেয়ে চলে যেতে হল। বেশ কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি তোমাদের দুজনের কিছু একটা হয়েছে। যাই হোক ঝামেলা মিটিয়ে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ভেবে দেখো’ বলে অন্যত্র চলে গেলেন বিমলাদেবী।

সেইদিন ঋদ্ধি বাড়ি ফিরলও বেশ রাত করে। সকলে অপেক্ষা করছিল তার জন্য।

ফ্রেশ হয়ে যখন খাবার টেবিলে এল, তখন বিমলাদেবী ছেলেকে পাশে বসিয়ে একপ্রকার চেপে ধরলেন, ‘হ্যাঁরে বাবু আগে তো অফিস থেকে ফিরতে এত দেরি করতিস না। কদিন ধরে কী হচ্ছে, রোজই দেরি করছিস, ঠিক করে খাচ্ছিস না।’

‘মা, অফিসে ভীষণ কাজের চাপ। তাই দেরি হচ্ছে।’

‘কেন জানি না, আমার মনে হচ্ছে তুই ভালো নেই।’ ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বিমলাদেবী।

‘না-না মা। সেরকম কিছু নয়।’ হাসার চেষ্টা করল ঋদ্ধি।

‘জানিস বাবু তুই তো তাড়াহুড়োতে না খেয়ে চলে গেলি। তারপর থেকে মেয়েটা সারাটা দিন কিচ্ছুটি মুখে দিল না।’

‘পতিব্রতা নারীদের মতো?’ কথার মাঝেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তীর্যক উক্তি করল সোহম। ছোটোছেলের রসিকতার জন্য বিমলাদেবী তাকে বকাও দিলেন। ওদিকে অরিত্রি লক্ষ্য করল শাশুড়ি বলার পর থেকেই ঋদ্ধি আড়চোখে তাকেই দেখে যাচ্ছে। ভালো করে খাচ্ছে না দেখে এবার শাশুড়িই ছেলেকে খাওয়াতে উদ্যোগী হলেন। হাতে খানিকটা ভাতের দলা তুলে ছেলের মুখে দিতে দিতে বললেন ‘তোর মনে আছে বাবু, ছোটোবেলায় তুই একটা গল্প শুনতে খুব ভালোবাসতিস। বামুন আর পাঁঠার গল্প। সেই যে বলি দেবে বলে বামুন হাট থেকে একটা স্বাস্থ্যবান পাঁঠা কিনে ফিরছিল। ফেরার পথে একদল দুষ্টু লোক বামুনকে বোকা বানিয়ে পাঁঠা নিয়ে কেটে খাবে বলে তাকে বলল, ‘এমা পুরুতমশাই আপনি একটু কুকুর ঘাড়ে করে কোথায় চললেন?’ বামুন তো একপ্রকার তাদের গালমন্দ করে ভাগিয়ে দিলেন। ‘অন্ধ মুখপোড়ার দল কিছুই কি তোদের চোখে পড়ে না?’

ঋদ্ধি ছেলেমানুষের মতো গল্প শুনতে শুনতে ভাত মুখে পুরতে থাকে। বিমলাদেবী গল্পের জাল বুনতে থাকেন। তারপর আরেকদল ছেলে একই উদ্দেশ্যে বলে, ‘ও পুরুতমশাই এই গাধাটাকে ঘাড়ে নিয়ে কোথায় চললেন?’ এই শুনে পুরোহিত তাদের এই মারে তো সেই মারে। কিন্তু তৃতীয়বার একই উদ্দেশ্যে একদল চাষী যখন বলে ওঠে ‘ও ঠাকুরমশাই ব্রাহ্মণ হয়ে আপনি শেষে কিনা একটা মরা বাছুর ঘাড়ে নিয়ে চললেন’। এবার পুরুতমশাই তাদের কথায় বিশ্বাস করে ওখানেই পাঁঠাটাকে নামিয়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন। এই গল্পের নীতিবাক্যটা মনে আছে বাবু? সত্যতা যাচাই করে তবেই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত। চল উঠে পড় খাওয়া শেষ তোর।’

ঋদ্ধি যেন ঘোর ভেঙে উঠে পড়ল। পরিবেশ হালকা করার জন্য এবার বিমলাদেবী বললেন, ‘তাহলে আজকে একটা সায়গলের গান হয়ে যাক, কী বলিস বাবু।’

অন্যমনস্ক থাকায় হঠাৎই মায়ের কথা শুনে চমকে উঠল ঋদ্ধি। কোনওমতে জবাব দিল, ‘ঠিক আছে।’

ডিনার সেরে ওঠার পর হালকা করে সায়গলের গান চালিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। শরীরটাও খুব একটা ভালো নেই ঋদ্ধির। হয়তো মানসিক অশান্তিও এর একটা কারণ। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালতেই বিছানায় থাকা বিয়ের অ্যালবামগুলো নজরে পড়ল। স্বাভাবিক ভাবেই হাত চলে গেল অ্যালবামগুলোর দিকে। বিছানায় বসে অ্যালবামগুলো হাতে নিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে ওলটাতে পালটাতে থাকল সে। বিয়ের সেইসব সুখের মুহূর্তগুলো ভেসে উঠল চোখের সামনে। সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল।

সমস্ত কাজ গুছিয়ে ঘরে ঢুকে সোজা স্বামীর পাশে গিয়ে বসল অরিত্রি। ‘বিশ্বাস করো আমার মনে কোনও পাপ নেই। হ্যাঁ পত্রমিত্র-র ব্যাপারটা আমি আগাগোড়াই সহজভাবে নিয়ে এসেছি। এটা নিয়ে কোনওদিন গভীর ভাবে ভাবিইনি। এটাই আমার সব থেকে বড়ো ভুল। প্রতিটি ক্ষণে যার মাসুল গুনছি আমি।’

ঋদ্ধি অ্যালবামের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। অরিত্রি বলে চলেছিল তার কথা। ‘আজ সারাদিন ভেবেছি, এই সামান্য একটা ভুলের জন্য আমার সংসারটা আজ ভাঙতে বসেছে। আমার ভালোবাসা প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ঠিক করেছি এই কাগজের সম্পর্ক আমি আজই শেষ করব’ বলে সমস্ত চিঠিগুলো টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দিল অরিত্রি। তারপর একটু এগিয়ে ঋদ্ধির গা ঘেঁষে বসে তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলে, ‘আমি শুধু তোমার… শুধু তোমার। ভুল বুঝে আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না প্লিজ। একটা মুহূর্ত তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না আমি।’

বারবার মায়ের বলা গল্পটা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথার মধ্যে। অরিত্রির কথা শুনে জমে থাকা সব অভিমান গলে জল হয়ে গেল ঋদ্ধির। চোখ ছলছল করছিল তার। অরিত্রির হাত দুটো নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে, ‘তুমি জানো না অরি এই কয়েকদিনে তোমার থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছি আমি। প্রতিটি মুহূর্তে ছটফট করেছি। সুরজের প্রতি তোমার অ্যাটেনশন, কথায় কথায় ওর প্রশংসা, মেনে নিতে পারছিলাম না। সুরজের নাম শুনলেও কেমন একটা আশঙ্কা তাড়া করে বেড়াচ্ছিল আমাকে।’ খানিক চুপ করে যায় ঋদ্ধি। অরি-র হাতদুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলে, ‘জানো ছোটোন যখন তোমার চিঠিটা লুকিয়ে আমাকে দিতে এল, তখন লজ্জায় ওর চোখের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারিনি। শুধু মনে হয়েছে ওরা তোমাকে কত ছোটো নজরে দেখছে। তোমার চরিত্র নিয়ে… বিশ্বাস করো তোমাকে কেউ ছোটো করুক সে আমি চাইনি।’ মাথা হেঁট করে নেয় ঋদ্ধি।

স্বামীকে কাছে টেনে নেয় অরিত্রি। ‘দুঃস্বপ্ন ভেবে সব ভুলে যাও। দেখো আমরা খুব সুখী হব।’ একে-অপরের খুব অন্তরঙ্গ হয়ে আসে ওরা। দেখতে দেখতে রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে যায়। তখনও দুজনের চোখে গভীর ভালোবাসার সঙ্গে সুদূর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন জ্বলজ্বল করছে।

 

কাটমানি

ঘরের বাইরে এসে পাপোশের উপর ডান পা রাখতেই পুরোনো পাপোশ প্রতিশোধ নিল। হড়হড় করে তিন হাত দূরে সরে যাওয়া আর ৮২ কিলো ওজনের ধপাস আওয়াজ। এ তো যে সে বউ নয় যে, ওই লাশ টেনে তোলার আয়োজন করবে! বদলে রান্নাঘর থেকে চিল চিৎকার– পই পই করে বলি মিনসেরে, অত নোকের চোকের জল সইবে না, সইবে না। ঠিক একদিন না একদিন প্রাশ্চিত্তি করতি হবেই হবে– তা আমার কতা শুনবে না। এখন হল তো! আমার কপাল খেল। ও মাগো রে, ও বাবা গো রে, এ আমার কোথায় থুয়ে তোমরা চলে গেলে! এই কম্পোজিশনে কড়াই-খুন্তির ঝনাৎকারও তখন প্রবল।

কালিশংকর সেই যে থেবড়ে বসে পড়েছে আর নট্ নড়নচড়ন। রান্নাঘরের ভয়ে আঃ ওঃ টুকুও করতে পারছে না। আজ তাড়াতাড়ি অফিস যাবার কথা, তাড়াতাড়ি চানে ঢুকেছিল আর আজই কি না যত বিপত্তি! বসে থেকে থেকেই কোমরে হাত দেয় সে। না, কোমর থেকে যন্ত্রণাটা আসছে না। ডান পায়ের মালাইচাকির পেছন দিকে যন্ত্রণায় টাটিয়ে যাচ্ছে। উঠতে পারছে না সে। কিছু একটা ধরতে পেলে হয়, একটু সাপোর্ট পেলে হয়তো ঠেলে উঠতে পারবে। মনে জোর আছে। কিন্তু কাছাকাছি সাপোর্ট নেবার মতো কিছুই তো চোখে পড়ছে না। বউ শান্তিবালা হারগিস হাত বাড়াবে না। চাই কি আর এক প্রস্থ আগুনে ঘরের জল-বাতাস ঝলসে দিতে পারে।

কালিশংকর ঘষটাতে ঘষটাতে অনেকখানি যেয়ে সোফার কাছাকাছি গেল। তারপর সোফায় হাতের ভর দিয়ে কোনওক্রমে উঠে বসল। বসতে বসতে নিজের বুদ্ধির একটা তারিফও করে ফেলল মনে মনে। বউয়ের নির্দেশ না মেনেই সে বাড়িতে হাফপ্যান্ট বা বার্মুডা চালু করে দিয়েছিল আগেই। চানঘর থেকে বার্মুডার বদলে যদি গামছা বা তোয়ালে পরে সে বের হতো, তবে তো ধিঙ্গি শিবের অবস্থাতে আরও কেলো!

যাই হোক সোফায় বসতে না বসতেই কালিশংকরের হাঁটুর ব্যথা ছাপিয়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আজ অফিস না যেতে পারলে নিবাস তো পুরোটাই ঝেড়ে দেবে। আজকে পেমেন্ট আছে। আজ পিওন থেকে, দরোয়ান থেকে, ক্লার্ক থেকে, ক্যাশিয়ার থেকে অ্যাকাউন্ট্যান্ট থেকে শুরু করে ড্রাফট্সম্যান, ইঞ্জিনিয়ার, চিফ– সবাই হাজির থাকবে। আজ অফিস বসে পড়বে দশটা বাজতে না বাজতেই। অন্য দিন, যখন পেমেন্ট থাকে না তখন গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে দেড়টা দুটোতে সব বাবুরা আসেন। আজ পেমেন্ট আছে আর আজ কি না কালিশংকরের এই অবস্থা! উঠে গিয়ে যে আরনিকা থার্টি-র দু’ফোঁটা জিভে ফেলবে তারও উপায় নেই।

খুব যন্ত্রণা করছে। এই পঞ্চাশোর্ধ বয়সে গোটা শরীরই নাড়াচাড়া খেয়েছে। জ্বর আসতে পারে। ঘরে মুভ আছে। তা লাগিয়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ বেঁধেটেধে সে যাবে কোনওক্রমে। ট্যাক্সি নিয়ে হলেও যাবে। এমনিতেই আগের মতো অবস্থায় নেই কোম্পানি। বাজেট সেকশান কুঁতে কুঁতে ফান্ড দেয়। মাসে দুবার, তিনবার। নেই নেই করেও তা-ও চল্লিশ-পঞ্চাশ লাখের পেমেন্ট হয়। সে গতকাল বিলটিল সব রেডি করে ক্যাশিয়ারের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছে। কিন্তু না গেলে তো সব চৌপাট! এমন দিনে এরকম হতে আছে! মাথা চাপড়াল। ছয় জনের পেমেন্ট আছে। সবাই একটা করে হাজার টাকার পাত্তি ছোঁয়াবে। সে স্টোরকিপার। মেজারমেন্ট বুক, এগ্রিমেন্টের কপি– এসব বের করে দিতে হয় তাকে। মুশকিলটা হল ওই নিবাস মুনশিকে নিয়ে। ব্যাটা পিওন– সবার সাথে লদকালদকি। ভান করে যেন সব কাজ জানে। অফিসে যখন বিড়ি ফোঁকে তখন মনে হয় লাটের বাট। কালিশংকর না গেলেই তো দখলদারি নিয়ে নেবে। আর এই ছয় হাজার টাকা ওর ট্যাঁকে। ভাবতেই গা জ্বলে যাচ্ছে।

এই সময় মেয়ে নিশার কথা মনে এল। মেয়ে বলেছিল– বাবা, বয়স বাড়ছে, একটা গাড়ি নিয়ে নাও। মাঝেমধ্যে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বা এদিকওদিক যাওয়া, একটু কাছাকাছি বেড়ানো, মার্কেটিং– খুব জরুরি একটা গাড়ি। মেয়ে বুঝিয়েছে, গাড়ি আজকাল আর বিলাসিতা নয়। জল, বিদ্যুৎ, বাজারহাটের মতো জরুরি একটা বিষয়। কালিশংকর গা করেনি। তার হাউজিং-এ একমাত্র কালিশংকরেরই গাড়ি নেই। আজ এখন গাড়িটা সত্যি খুব জরুরি মনে হচ্ছে কালিশংকরের।

টেলিফোনের এতখানি আর্তি! ঠিক টেলিফোনের নয়, টেলিফোনের মাধ্যমটি থেকে সে আর্তি ঝরে পড়ছে– আমাকে ছেড়ে যেও না, প্লিজ! অথচ এই দুজনেরই, মানে যে শুনছে আর যে শোনাচ্ছে, তাদের কারও কিছু দেবার বা নেবার নেই। তাহলে কেন মিসেস মুখার্জি, ওরকম সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুন্দরী গৃহিণী, এমন আর্ততায় ভরিয়ে তুলবে রৌণকের কাজের দুপুর! মিসেস নিশা মুখার্জি তখনও বলে যাচ্ছেন– আমি তো তোমার কাছে কিচ্ছু চাইনি রৌণক, কিচ্ছুটি না। শুধু তুমি আমার পাশে থাকো। আমার সাথে কথা বোলো। মাঝেমধ্যে সময় পেলে দেখা কোরো, ব্যাস!

রৌণক সেনগুপ্ত তরুণ সুরকার। মুম্বই ও বাংলায় কিছুটা নামডাক হয়েছে। চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই গোটা তিরিশ ফিল্মের সুরকার সে। মিসেস মুখার্জিও ওর সুরে কয়েকটা ফিল্মে গান করেছেন। আর অফকোর্স সংগীত পরিচালক হিসেবে সে সব কটিতেই রৌণকের পছন্দ ছিলেন তিনি। আজকাল মুম্বইতেই বেশিটা সময় কাটে রৌণকের। নিশাও কলকাতায় স্বামী-সন্তান লালন করেও গানের জগতে পুরোপুরি ঢুকে পড়েছেন। চেনাজানা বেড়েছে তারও। টালিগঞ্জে একটা দুটো ডাকও পেয়েছেন। গানের অ্যালবাম হয়েছে। তবুও রৌণকের জন্য মন কেমন তার। রৌণক যেখানেই থাকুক প্রতিদিন কিছুক্ষণ কথা বলা চাই। তিনি টের পাচ্ছিলেন, আজকাল রৌণক তেমন আন্তরিকতায় কথা বলে না। কোথায় যেন প্রাণের অভাব। কী যেন এক ভুল তারে বেজে যায় রৌণকের স্বর। কিন্তু কেন এমন হল! গত বছরও তো এমন ছিল না! তাহলে কি সুমন ভরদ্বাজের সুরে গান গেয়ে তার একটু নাম হয়েছে বলে রৌণক ঈর্ষাতুর হয়েছে! কে জানে! কিন্তু ওরকম কোল্ড ব্যবহার নিশার সহ্য হচ্ছে না। ও ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছে। কী করে যে রৌণক তার গোটা মনটা দখল করে বসে আছে! আজকাল ডিপ্রেশনও বেড়ে গেছে। রেকর্ডিং থাকলে বাড়ি থেকে হয়তো বের হল, কিন্তু না থাকলে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটায়। রৌণক নিজে থেকে ফোন করলে মনটা ফুরফুর করে, নচেৎ বিষাদের শ্রাবণে সারাদিনমান শুধু অশ্রুরই গান যেন।

কাল একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিল বলে সকাল এগারোটাতেও ঘুম ভাঙেনি নিশার। ছয়-সাত পেগ তো হবেই। রবীন্দ্রসদনে একক অনুষ্ঠান ছিল তার। গান শেষ হবার পর শুভংকর মানে ওর অনুষ্ঠানের আয়োজক ক্যালকাটা ক্লাবে নিয়ে গেছিল। বেসামাল ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে বারোটা একটা তো হয়েছেই। গাড়ির ভেতর শুভংকর কত কি কান্ড ঘটাচ্ছিল। ঘাড়ে চুমু খাচ্ছিল, মুখে চুমু খাচ্ছিল। নিশা ঠোঁট বাঁচিয়ে যাচ্ছিল লাস্য দিয়ে। শুভংকর কাল পুরো আউট ছিল মনে হয়। না হলে তো এমন করে না। গাড়িতে বুকেও হাত দিয়েছে। খুব জোরে একবার চটকে দিয়েছে। বেশ ব্যথা। নিশা রৌণক ছাড়া কাউকেই শরীর দিতে মন থেকে সাড়া পায় না। এমনকী স্বামীকেও। অঘোরে ঘুমোচ্ছে। প্রোগ্রাম করে মাঝে মাঝেই বেশি রাতে ফেরে নিশা। ফলে পরের দিন ওকে তেমন কেউ ডাকে না। আজ কলকাতায় ভোরের ফ্লাইটে এসেই দু-তিনবার বাজিয়েছে রৌণক। নিশা ফোন তোলেনি। সাইলেন্সে আছে। ঘুমও ভাঙেনি। রৌণক ভাবছে কী হল রে বাবা! ফোন ধরছে না কেন! অভিমান খুব বেশি কি জমে গেছে! তা না হলে ওর ফোনের জন্য তো মুখিয়ে থাকে নিশা!

ব্যাপারটা টের পায় নিশা বেলা দুটোর পর। দেড়টা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে স্নানটান করে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসেছে। দু’পিস ব্রেড-বাটার গোলমরিচ দিয়ে নিয়েছে। হাফ আপেল। এটাই লাঞ্চ। আজকাল মদ্যপানের বহর যেভাবে বেড়ে গেছে মধ্যপ্রদেশে স্ফীতির একটা ভাব ধরা পড়ছে। নিশা জানে শরীর চলে গেলে অনেক কিছুই চলে যাবে। যেখানে যতটুকু নামডাক– তাও থাকবে না। তখনও থ্রি-স্টেপ চুল থেকে দু-এক ফোঁটা জলকণা উঁকি মেরে গ্রীবার চিকন লাবণ্যে ঝাঁপ খেলছিল। এরকম একটি ফোঁটা টেবিলে রাখা মোবাইলের উপর পড়তেই নিশা ওটা শাড়িতে মুছে দিতে গিয়ে দেখে অনেকগুলো মিস্ড কল। খুলতেই দেখে রৌণক বাজিয়েছে। আরে আজ এতগুলো ফোন করেছে রৌণক! আর ও কিনা ফোন ধরেনি! নিশ্চয়ই আহত হয়েছে। কিছু ভাবনা ভেবে নিয়েছে। তড়িঘড়ি রিং ব্যাক করে। দেখে সুইচ্ড অফ্।

বিকেলে রৌণকই ফোন করে আবার। কী হলো, ফোন ধরছ না যে নিশা? এনগেজ আছ?

আরে না না, ঘুমিয়ে ছিলাম, শুনতে পাইনি। তুমি তো জানো আমি একটু দেরি করে উঠি। আর গতকাল রবীন্দ্রসদনে আমার একক গানের অনুষ্ঠান ছিল। ঘুমোতে ঘুমোতে বেশ রাত। তাই… তা তুমি কেমন আছ? ফোন করলে যে বড়ো!

কেন আমি ফোন করতে পারি না? গলায় একটু অভিমান লাগায় রৌণক।

না, আমি তা বলিনি! সচরাচর তুমি তো করো না। শরীর ঠিক আছে তো? খবরের কাগজে দেখলাম মুম্বই তো জলের তলায়। তুমি নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বের হতে পারোনি। তাই আড্ডা মারার জন্য ফোন করেছ। বেশ বেশ। আমার ভালো লাগল।

আরে মুম্বই কেন, আমি তো তোমার দরজায় দাঁড়িয়ে।

মানে?

মানে আমি এখন কলকাতায়। আর মোদ্দা কথাটি হল যদি তেমন ব্যস্ত না থাকো, গাড়ি বার করো, সন্ধ্যা ছ’টার মধ্যে হোটেল ব্রডওয়ে, মানে র্ব নং গনেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ-এর ব্রডওয়ে হোটেল, আমার রুম নম্বর চ্জ্ঝ। সেকেন্ড ফ্লোরে। চলে এসো।

নিশার শরীরে একটা আশ্চর্য কাঁপন। কতদিন হল রৌণক, তার রৌণককে সে চোখের দেখাটিও দেখতে পাচ্ছে না। বছর দেড়েক তো হবেই। মনে মনে একবারে আর্ত হয়ে আছে। কিন্তু নিজেকে ধরা না দেবার ঈপ্সায় নিশা বলে– আজ না এলে হয় না! কাল যদি দুপুর দুপুর আসি!

সশব্যস্ত হয়ে রৌণক বলে– একদম অন্যথা কোরো না। কাল বিকেলের ফ্লাইটে আমি ফিরে যাচ্ছি। আর শোনো তোমাকে একজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে চাই। তোমার কেরিয়ারের জন্য দেখো খুব একটা বড়ো স্টেপিং হবে। চলে এসো।

রৌণক ফোন রাখতে না রাখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিশা। কতদিন বাদে রৌণকের সামনে যাবে। কী শাড়ি পরবে, কেমন করে সাজবে– হাতে তো মাত্র দেড়টি ঘণ্টা সময়। রৌণকের খুব পছন্দ সমুদ্র-নীল শাড়ি। ওই রঙের শাড়ি পরে যতদিন দেখা করেছে, ততদিনই আবেগে কলকল করেছে রৌণক। কত না গান শুনিয়েছে, ছোটো ছোটো মিড়ের কাজ, ঝিলিক দিয়েছে চোখের তারায়। নিশার একটা বিশেষ গুণ আছে, ও ঠোঁট ভালো করে প্রেজেন্ট করতে জানে। অর্থাৎ দিন-রাত্রি, সময়-টময় মেপে ঠোঁটের সীমানা কমিয়ে বাড়িয়ে তাতে আশ্চর্য আরোপ করা। এছাড়াও নিশা আজ ঠিক করল নীল আংটিটা পরবে।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যে মেক-আপ নিয়ে আয়নার সামনে একবার পাক খেয়ে নিজের সৌন্দর্যের উপর আস্থাশীল থাকল সুন্দরী। শাড়ির নীলাভ মায়ার আড়ালে নিজের নিক্তিমাপা বুকের আধখানা দেখে নিজেই কিছুটা যেন আসক্ত, পুলকিত। এখনও মনেই হয় না তার বিয়ে হয়েছে। তার একটা ছেলে আছে ক্লাস এইটে পড়ে। নিশার এখনও মনে হয় সে যাদবপুরের কম্পারেটিভ লিটারেচারের ছাত্রী। আর সে মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে শিক্ষক, ছাত্র, বন্ধুদের। এমনিতেই লাস্য ছড়ানোর একটা সাবলীল আবহ তার অধিগত। নিশা তার বিখ্যাত জুঁই ফুলের এসেন্স ছড়িয়ে কপালের উপর থেকে নেমে আসা একগুচ্ছ অলকচূর্ণকে একটু হাওয়ায় উড়িয়ে দেখে নিল পুনরায়। মনে মনে হাসল– আজ রৌণককে পাগল করে দেবে। আজ অবহেলার জবাব নেবে। নিশা দেখল আজ সব মিলিয়ে পারফেক্ট অ্যাপিয়ারেন্স তার।

পাকা গমের রং চকচক করে আছে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে। মুখ যেন গর্জনতেল মাখা দেবীপ্রতিমা। মাথায় ধবধবে সাদা একরাশ চুল, এলোমেলো। কালো জিনস্, কালো টি-শার্ট। উজ্জ্বল, গভীর কালো চোখে রিমলেস চশমা। রৌণক পাশেই বসে আছে, কিন্তু হোটেলের ঘরে ঢুকে বেশ খানিকটা সময় ধরে নিশার চোখ তাকে ফোকাস করতে পারেনি। রৌণক পরিচয় করাল– ইনি মিস্টার হিম্মতসিংকা, অসমের বিখ্যাত ব্যবসায়ী।

হিম্মতসিংকাও নিশার চোখে চোখ রেখে হাত জোড় করলেন। বেশ কিছুক্ষণ তিনজনই দাঁড়িয়ে ছিল। রৌণক বলল– বসো নিশা। ফোনে ওনার কথাই তোমাকে বলছিলাম। ওঁর জন্যই আমি মুম্বই থেকে কলকাতায় এসেছি। উনি এখানে সিনেমা প্রোডিউস করছেন একসঙ্গে অনেকগুলি। হিম্মতসিংকা থামিয়ে বলে– হ্যাঁ, ছ’খানা বাংলা ছবি আমি করব এ বছরই। আপনার কথা আমি শুনেছি মিসেস মুখার্জি, আপনি ভালো গান করেন। রৌণকবাবু তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আসুন না, আপনিও আমাদের সাথে কাজ করুন। কী রাজি তো!

নিশাকে কোনও কথা বলতে দেয় না হিম্মতসিংকা। এমনিতেই ওই প্রৌঢ়-র রূপ ও ব্যক্তিত্বের ছটায় ঘোর লেগে আছে নিশার চোখে। রৌণকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে নিশা কিন্তু এখনও রৌণককে ফোকাস করে উঠতে পারেনি। গাড়িতে আসতে আসতে একটা আন্দাজ করেছিল কিছু একটা সুযোগ-টুযোগ আসতে পারে। কিন্তু এত দ্রুততায় সেসব!

নিশা মাথা একদিকে কাত করে সম্মতির ইঙ্গিত দিতেই ভদ্রলোক ব্রিফকেস থেকে চেক বই বের করে অ্যাডভান্স করলেন। পাঁচ লাখ। প্রথম ছবির ফিমেল ভয়েস নিশারই। কী মিস্টার সেন, ঠিক আছে তো?

সার্টেনলি ও কে।

রৌণকের দিকে একটা ব্ল্যাংক চেক এগিয়ে দিয়ে হিম্মতসিংকা বললেন– আমার ছ’টা ছবিরই সুরকার, সংগীত পরিচালক আপনি। অ্যামাউন্ট বসিয়ে নিন। কাল সকালে আমার সেক্রেটারি কনট্র্যাক্ট সই করিয়ে নিয়ে যাবে।

তারপর নিশার দিকে তাকিয়ে বলল– আপনার কনট্র্যাক্ট ফর্মও কাল আপনার বাড়িতে পৌঁছে যাবে। হিম্মতসিংকাকে একপ্রকার থামিয়েই রৌণক বলে– ওকে আজই সই করিয়ে নিন। ওর বাড়ি তো আপনার হোটেলের রাস্তাতেই। বেহালায় থাকে। আপনি তো তাজ-এ উঠেছেন। ওই পথেই যাবে।

ব্রডওয়ের লবি পর্যন্ত নিশা ও হিম্মতসিংকাকে এগিয়ে দিল রৌণক। –গুড নাইট নিশা, পরে ফোনে কথা হবে। এই কনট্র্যাক্ট-টা সই করেই যাও।

নিশা তখনও ভেবে উঠতে পারছে না ঘটনার পরম্পরা। কী একটা টানে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। রৌণকের সাথেও একটু একান্তে কথা বলতে পারল না। অথচ কত কী ভেবেছিল। কত কী আদর করবে রৌণককে। বুকে মুখ ডুবিয়ে হাউহাউ কাঁদবে ভেবেছিল। কিন্তু তা না হয়ে এখন হিম্মতসিংকার গাড়িতে উঠতে হবে তাকে। তার গাড়ি ড্রাইভার নিয়ে যাবে। নিশা দেখল রৌণক অন্যরকম হয়ে গেছে। অবলীলায় হিম্মতসিংকার সামনেই সই করা ব্ল্যাংক চেকে প্তঙ্ম লাখ বসিয়ে নিয়েছে। নিশার সাথে ভালো করে কথাও বলেনি। কেবল কত তাড়াতাড়ি হিম্মতসিংকার গাড়িতে তুলে দেবে তাই যেন ভাবছিল। নতুন কাজ পাবার আনন্দ তেমন করে লাগল না নিশার। বদলে কী এক শূন্যতা চোখের তারায় নিয়ে একবার মুখ ঘুরিয়ে চোখাচোখি করল রৌণকের।

অনেকখানি খরচা হয়ে গেল কালিশংকরের। গজগজ করতে লাগল। ফ্ল্যাটের নীচেই ওষুধের দোকান সন্তোষ মেডিকো। ফোন করে মেডিকেল শপের ছেলেটিকে দিয়ে নিয়ে এল ক্রেপ ব্যান্ডেজ, ব্যথা কমানোর জন্য ক্রোসিন অ্যডভান্স। ওতে দুরকম সুবিধা, জ্বর আসাটাও প্রোটেক্ট হবে। ডাক্তারখানার ছেলেটা তার উপর একটা স্প্রে ওষুধ দিল। সাড়ে চারশো টাকার ধাক্বা। তারপর আরও রচ্প্ত টাকা খরচ করে ট্যাক্সি করে অফিস আসতে হয়েছে তাকে। পায়ে ব্যান্ডেজ, খোঁড়াতে খোঁড়াতে আসতে দেখে অফিসের লোকেরা তো হইচই বাধিয়ে চেয়ারে বসাল তাকে। তারপর সব বৃত্তান্ত শুনে নিবাসই বলে বসে– এলেন কেন, এই ভাঙা পা নিয়ে কেউ অফিসে আসে? যান, বাড়ি গিয়ে ভালো করে ডাক্তার দেখান, এক্সরে করান। কালিশংকর একবার নিবাসের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘ’ষে– তাহলে তোমার বিশেষ সুবিধা হয়। আমার ভাগটা পুরোটাই ঝেড়ে দেবার ধান্দা। মাত্র ওয়ান পার্সেন্ট ওদের তিন জনের মধ্যে ভাগ হয়– রেকর্ডকিপার, পিওন আর ফ্রাঞ্চাইজির ছেলেটা, যে কম্পিউটারে বিল লোড করে। থ্রি পার্সেন্ট নেবে ক্যাশিয়ার। চিফ্ এগ্জিকিউটিভ সিক্স পার্সেন্ট। ওটা গত একবছর ধরে টেন পার্সেন্ট হয়েছে। অন্য এগ্জিকিউটিভ শাক্যদেবের ফোর পার্সেন্ট এই এগ্জিকিউটিভ নিয়ে নেয়। আর আড়ালে সবাই শাক্যদেবকে বোকা, গাধা বলে হাসে। শাক্যদেবও মাঝেমধ্যে হাসেন যখন গ্রুপ ডি ইউনিয়নের নেতা কর্মিরা বাবা-মা তুলে সবার সামনেই ক্লাস ওয়ান অফিসার চিফ্ এগ্জিকিউটিভকে ডাঁটে। ঘুসখোর, চোর বলে তাকে আটকে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

চিফ্ এগ্জিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারও আজ এসেছেন। আজ ভরা অফিস। শ্যাম বারে বারে ফ্লাস্ক ভর্তি করে চা নিয়ে আসছে। অবশ্যই কন্ট্রাক্টরদের পয়সায়। চেক লেখা হচ্ছে আর হিসাব মতো অডিটর, ক্যাশিয়াররা টাকা পেয়ে যাচ্ছে। কালিশংকরদের হিসেব হবে সবার শেষে। তা সন্ধ্যা সাতটা তো হয়ে যাবেই। কিন্তু এখন তো সবে পাঁচটা। আর পারছে না তো সে। খুব যন্ত্রণা করছে পায়ে। বসে থাকা যাচ্ছে না। মাথাটা দপদপ করছে। জ্বর এল বলে। তবে কি ভেঙেছে! দুশ্চিন্তা হচ্ছে কালিশংকরের। বাড়ি ফিরবে কীভাবে! বাড়ি ফিরল না হয়, কিন্তু রাতে ডাক্তার পাবে কোথায়! বউ তো কোনও হেল্প করতে পারবে না। কেবল চ্যাঁচাবে। একমাত্র সন্তান মেয়ে, সেই বেহালায় থাকে, তাকে তো রাতবিরেতে এই সামান্য কারণে ডেকে পাঠানো যায় না! তারও তো ঘর গেরস্থালি আছে। তা-ছাড়াও তার মেয়ে যে গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তা-ও জানে কালিশংকর। বেহালা থেকে বালিগঞ্জ খুব একটা দূরের নয়। কিন্তু জামাইবাবাজি অত রাতে… কী ভাববে… সাত-পাঁচ কালিশংকরের সামনে সমাধান ধরা দিচ্ছে না। বরং সকাল থেকেই আজ সবকিছু প্রতিকূল। মেয়ে নিশার গাড়ি আছে, তাকে কি এখনই বলে দেবে একবার গাড়ি পাঠিয়ে একটু অফিস থেকে নিয়ে যেতে! কিন্তু এখন বললেও বিপদ– হয়তো এখনই গাড়ি পাঠিয়ে দিল। তার ভাগ-বাটোয়ারা তো সেই সাতটার পরে।

এক কাপ চা খাওয়াল শ্যাম। কিন্তু বিস্বাদ লাগছে। সেই থেকে ক্যাশিয়ারের ঘরের সামনেটায় বসে আছে। বিশেষ নড়াচড়া করতে পারছে না। কিন্তু এক একজন কন্ট্রাক্টরের নাম আর চেক অ্যামাউন্ট লিখে রাখছে একটা কাগজে। আজ মুখ বিকৃত হচ্ছে তার। একবার খেঁকিয়ে ওঠে ক্যাশিয়ারের উপরঃ আর কত সময় লাগাবি! একদিনও কি তাড়াতাড়ি শেষ করতে নেই! সাড়ে ছ’টার সময় আর পারছিল না কালিশংকর। মেয়েকে ফোন করে বলে দিতে হবে, না হলে আজই যন্ত্রণায় মরে যাবে সে। বাড়ির কাছেই রুবি হাসপাতাল। রাত্রে বরং ওখানেই ভর্তি করে দিক। ওরা ওষুধপত্র দিয়ে কিছু একটা করতে পারবে, যন্ত্রণা কমাতে পারবে। কিন্তু নিশাকে ফোন করে দেখল, ফোন সুইচড অফ। সন্ধ্যা সাতটায় সুইচড অফ কেন? দু-তিনবার ইলেকট্রনিক শীতল সুইচড অফ ঘোষণার পর বাড়িতে, ল্যান্ডলাইনে বউকে ফোন করে নিশাকে ফোন করতে বলল। নিশার শ্বশুড়বাড়িতে ল্যান্ডে ফোন করে তারপর বউ জানাল নিশা শুটিং-এ গেছে। আর তা-ই ফোন অফ্ রেখেছে।

রুবিতে নয়, অফিসের গাড়িতে ডিসানে নিয়ে এসেছে কলিগেরা। রাত সাড়ে আটটা। ডিসান ওদের রিকগনাইজড হসপিটাল। পয়সা লাগবে না। মেডিকেল কার্ড দেখিয়ে ভর্তি করে দেওয়া গেল।

কালিশংকর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। সবাই যে যার মতো হিসেবনিকেশে ব্যস্ত থাকায় কেউই তেমন করে ওর মুখের দিকে চায়নি। না হলে যন্ত্রণা তো ফুটে উঠেছিল সেখানে। জ্ঞান হারিয়ে যখন চেয়ার থেকে সশব্দে পড়ে যায় তখনই সকলের চোখে পড়ে। ধরাধরি করে এগ্জিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের গাড়িতে তুলে এখানে নিয়ে আসা গেছে। এমার্জেন্সির ডাক্তার দেখে তো খুব ধমকালেন। এরকম মেজর ফ্র্যাকচার এতক্ষণ রেখে দিতে আছে! এক্সরে-তে দেখা গেছে গোড়ালির হাড়ে অনেকগুলো টুকরো হয়েছে। অপারেশন করতে হবে। তবে রাতে তো আর অর্থোপেডিক সার্জনকে পাওয়া যাবে না। ডাক্তার গুপ্ত কলকাতার বিখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন। কাল সকাল ন’টায় সময় দিয়েছেন। কালিশংকরকে ঘুমের ইনজেকশন, ব্যথার ওষুধ, আর একটু অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে ততক্ষণ ফেলে রাখা হবে।

মণিজিঞ্জির জায়গাটা একবার দেখে নিতে এসেছে। ঝাঁ ঝাঁ করছে এপ্রিলের রোদ। দুপুর দুটো-আড়াইটে হবে। তাড়াহুড়োয় ঘড়ি পরে আসতে ভুলে গেছে। রেলের গুমটি থেকে খাকি হাফপ্যান্ট পরা এক মাঝবয়সি লোক পিটপিট করে তাকাচ্ছে। অদ্ভুত এই জায়গাটা। দুটো রেল স্টেশন আর একটা জাতীয় সড়ক লোকালয়ের মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেছে। একটা পাকদণ্ডি পথ ওই রেলগুমটির পাশ থেকেই নীচে নেমেছে। অটো ট্যাক্সিতে বড়ো রাস্তায় অনেকে নেমে ওই শর্টকাট অ্যাভেল করে। দিনের বেলায় কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই যে সন্ধ্যা থেকেই গুমটির চার পাশটা ছোঁক ছোঁক করে উঠবে চোলাই খদ্দেরদের আগমনে। দিন সাতেক আগেও বসের গাড়িতে লিফট্ নিয়ে এই পথেই রাত সাড়ে আটটায় বুক ঢিপঢিপ করতে করতে বাড়ি ফিরেছে। আজ ভয়ডর নেই, বা বলা চলে একটি ডেসপারেট অ্যাটেম্প নেবে বলে মণিজিঞ্জির মহড়া দিতে এসেছে এখন। সারদা স্ক্যামের সাথে তাদের কোম্পানি জড়িয়ে ছিল না। কিন্তু কী আশ্চর্য, জড়িয়ে গেল এবং ছোবল এল তারই মস্তকে।

সারদাগোষ্ঠীর কাগজ সকালবেলা বন্ধ হয়ে গেছে। সকালবেলার একটি মেয়েকে চাকরি দেওয়ায় মণিজিঞ্জিরকে স্যাক্ করল কোম্পানি। মুখে সহানুভূতি বইয়ে দিয়ে বললঃ অত দূর থেকে আসো, এত কম স্যালারিতে তোমার পোষাবে না। তুমি বরং কাছাকাছি কিছু একটা দেখে নাও। এক কথায় খতম। কিন্তু বাবার পেনশনের টাকায় হার্টের অসুখের চিকিৎসা-সহ সংসার চালানো অসম্ভব ব্যাপার। গত চার-পাঁচ দিনে ঘুরে কিচ্ছুটি জোগাড় করতে পারেনি। প্লেন গ্রাজুয়েট, বাংলা ডিটিপি জানে, আর খবরের কাগজের অফিসে দুবছর ডেস্কে কাজ করেছে– এই। এতে কিছুই হবার নয়। নকরি ডট কমে দিয়ে রেখেছে সিভি। ডিপ্রেসড হয়ে যখন একেবারে হাল ছেড়ে দিয়েছে তখন আজ সকালবেলায় খবরের কাগজে চোখ বোলাতেই মাথায় ঢুকে পড়ল এই মতলব। সরকার ঘোষণা করেছে ধর্ষিতদের এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে পঞ্চাশ হাজার থেকে দুই লক্ষের মধ্যে। বয়স অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ। যার বয়স যত কম সে তত বেশি ক্ষতিপূরণ পাবে। মণিজিঞ্জির গত ফেব্রুয়ারিতে চ্চ্ছ্র বছর পার করেছে। ফলে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী তার হক লক্ষাধিক টাকার। মণিজিঞ্জির ভাবল এটা কি সরকারি ঘুস! না ল-অ্যান্ড অর্ডারের বিকল্প এটি! সেদিন তো চ্যানেল দাপিয়ে এক বুদ্ধিজীবী বলে বেড়াচ্ছিলেনঃ ধর্ষণ থাকবেই, ধর্ষণ মানুষের ইনস্টিংক্ট, তাকে চাপা দেওয়া যাবে না।

সত্যি সত্যি একটা বোটকাগন্ধ নাকে লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। গুমটির পাশ দিয়ে নামতে নামতে তবু খুঁটিয়ে দেখতে থাকে ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া মাটির পথ। পথের পাশে ভূতভৈরবীর ঘন ঝোপ। এমনিতে জায়গাটা নির্জন। এই পথে যেতে দু দুটো রেললাইন পেরোতে হয়। ফলে তেমন বিশেষ লোকজন হয় না এই ঝুঁকির রাস্তায়। রাতে আরও অন্য হয়ে যায় এই স্থান। মুখে কাপড়চাপা দিয়ে টেনে নিয়ে গেলে কেউ টেরটি পাবে না। কিন্তু, মণিজিঞ্জির ভাবে, যদি মেরে ফেলে তাকে, তবে তো বাবা-মাকে দেখার লোক নেই কেউ। আগে ধর্ষণ ছিল, কিন্তু ধর্ষণ করে খুন করে ফেলাটা আজকাল রেওয়াজ হয়ে গেছে। একটু বুক কাঁপে। যদি চার পাঁচজন মিলে লাইনে ফেলে ট্রেনে কাটা দেখিয়ে দেয়। শিয়ালদায় লাশকাটা ঘরে রেলপুলিশ অনুসন্ধান করতে যাবে না ধর্ষণ কি না। ফলে বাবা-মা টাকাটাও তো পাবে না। সব ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু ওখানে যারা থাকে সব চোলাই খেতে খেতে বুকের খাঁচা হারানো প্যাংলা লোকজন। ওদের সাধ্য হবে না, মানে মনে জোরও হবে না খুন করে ফেলার। নেশার ঝোঁকে বড়ো জোর রেপ করতে পারে। দাঁতে দাঁত চেপে চার-পাঁচজনকে অ্যালাউ করতে হবে। দেখা যাক। একবারই তো। রং মেখে এসকর্ট সার্ভিসে যারা প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছে তাদের অবস্থাটা একবার অনুমান করার চেষ্টা করল মণিজিঞ্জির। না না রোজ রোজ ওই মৃত্যু সে ডেকে আনতে পারবে না। একদিনের ঘটনা দুর্ঘটনা হিসেবেও মেনে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু গোটা জীবন শরীর ব্যাবসায় লাগিয়ে দিতে পারবে না।

মুখোমুখি ধাক্বা যাকে বলে তা-ই। লোকটার হাতের ফাইল ছিটকে গেছে। চশমা বাঁচাতে কোনওদিকে না তাকিয়ে লোকটা তরতর করে নেমে যাচ্ছে নীচে। মণিজিঞ্জির মাটিতে বসে পড়েছে, চোখে সরেষেফুল ফুটেছিল কয়েক সেকেন্ড। কপালে ব্যথা করছে। নিশ্চয়ই ফুলে ঢোল। ব্যথায় কান্না পাচ্ছে। লোকটার দোষ নয়। অন্যমনস্ক হয়ে নাকমুখ চাপা দিয়ে, হয়তো ওড়নায় চোখও ঢেকে গেছিল, এই জায়গাটা দ্রুত  পার হতে গিয়ে এই বিপত্তি। লোকটা চশমাটা বাঁচিয়ে ফেলেছে। দুপুরের রাস্তা ফাঁকা হলেও বালির লরি চলাচল করে। মণিজিঞ্জির একা একা উঠতে পারছে না, কারও হাত চাই টেনে তোলবার। এমনিতেই জায়গাটায় ঢাল। হাত পা কাঁপছে। লোকটা চশমা কুড়িয়ে ফের উঠে আসছে। ভালো করে তাকাতে পারছে না মণিজিঞ্জির। কপালে খুব যন্ত্রণা। ভাবে, কেন যে মরতে এসেছিলাম। লোকটা কি তাকে একটু উঠতে সাহায্য করবে, না কি গালাগাল দেবে! মুখের দিকে তাকাতেও সাহস হচ্ছে না। ওর ফাইলের কাগজপত্রও তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। খুব ভয় লাগছে, চড়-ফড়ও কষিয়ে দিতে পারে। এই গনগনে দুপুরে কেউ কোথাও নেই তল্লাটে। মণিজিঞ্জির দম বন্ধ করে, মাটির দিকে চেয়ে লোকটার উপরে উঠে আসা দুটো পা-কেই শুধু দেখতে পায়।

খুব লেগেছে ম্যাডাম? সো সরি। গলায় খুব স্নিগ্ধতা। কোত্থাও কোনও ঝাঁঝালো ভাব নেই। আসুন, আমার হাতটা ধরে ওঠার চেষ্টা করুন। গলাটা চেনা চেনা লাগছে মণিজিঞ্জিরের। কিন্তু তেমন করে চোখ খুলতে পারছে না। ডানদিকের ভ্রু-র উপর এমন ফুলে উঠেছে, চোখ মেলতে গিয়ে টনটন করছে। ওঠা দরকার। অনন্তকাল তো এখানে রাস্তার মাঝখানে পড়ে থাকা যায় না! হাত বাড়িয়ে দিতে খুব যত্ন করে লোকটা তুলে দিল। তারপর বললঃ একটু দাঁড়ান, আমি কাগজপত্র তুলে নিই, আপনাকে বাসস্ট্যান্ড পেৌঁছে দিচ্ছি।

নীচে বাসস্ট্যান্ডে একটা চা-এর দোকানের বেঞ্চে বসাল তাকে। আপনার ব্যাগে রুমাল আছে? লোকটা জিজ্ঞাসা করে। ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে দিতেই পাশের দোকান থেকে বরফের পেটি থেকে কয়েক টুকরো তাতে নিয়ে কপালে চাপা দিয়ে ফোলা ভাবটা কমাতে চায়। লোকটার হাতে কী যেন জাদু আছে। কপালে হাতের ছোঁয়া পেতেই কেমন আশ্চর্য ভালোলাগা এসে উপস্থিত হল সমস্ত অনুভূতিতে। মনে মনে সমর্পণের ভাব এল। গত কয়েকদিন ধরে চাকরি হারাবার পর পাগলের মতো নতুন চাকরি খোঁজা। বাবার অমন ভঙ্গুর দশা, দাদা-র বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার স্মৃতি– সব কিছু তার উপর অক্টোপাসের আকার নিয়ে ঘিরে ধরেছিল। সমস্ত স্নায়ুগুলো জট পাকিয়ে উত্তেজনায় টানটান ছিল। এই মুহূর্তে সে সব উধাও হতে চাইছে। যেন কোনও আশ্রয় এসে উপস্থিত। এই ভালোলাগা থেকে মণিজিঞ্জির শরীরের সমস্ত প্রতিরোধ ছেড়ে দিল আর ওই অচেনা লোকটির হাতের উপরেই সে মূর্চ্ছিত হয়ে পড়ল।

চোখ মেলে মণিজিঞ্জির নিজের বিপন্নতা খোঁজার চেষ্টা করল। আঃ সে বেঁচে আছে। ধর্ষণকারীরা তার গলা কেটে রেললাইনে ফেলে দেয়নি। সরকারের ঘোষিত ক্ষতিপূরণের টাকা কয়টা নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে। হাত-পা ছড়িয়ে বড়ো করে একটা শ্বাস নিতে গিয়ে দেখল হাতে স্যালাইনের সূচ টনটন করে উঠেছে। উলটো দিক থেকে নার্স হইহই করে উঠল– হাত-পা ছুড়ছেন কেন, স্যালাইনের পাইপ ছিঁড়ে যাবে যে! আর একটি কণ্ঠস্বর মাথার পেছন থেকে জেগে উঠলঃ যাক, জ্ঞান ফিরেছে। মণিজিঞ্জিরের চিত হওয়া চোখের মণি একটু ঊধর্বমুখী করতেই মনে হল, এই মুখ তো সে চেনে। লোকটির মুখের প্রসন্নতা থেকে আস্তে আস্তে মণিজিঞ্জির বুঝতে পারছে সে এখন কোনও হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের বেডে রয়েছে।

লোকটি জিজ্ঞাসা করল, এখন কেমন লাগছে? খুব কষ্ট হচ্ছে না তো! মণিজিঞ্জির মাথা নেড়ে জানায়, তার কষ্ট হচ্ছে না। তার মনে পড়ে যায় কপালের আঘাতের কথা, দুপুরের ওই নিজেকে বিনিয়োগের অ্যাডভেঞ্চারের কথা। আর ভাবতেই ভয়ে সারা শরীর কেঁপে উঠল। মুখে যন্ত্রণা ফুটে উঠল ফের। তাকে তো ফের যুদ্ধে নেমে পড়তে হবে। এই সমাজ তো তাকে হিংস্র চিতার মতো তাড়া করে ফিরবে। তার অমন ব্রিলিয়ান্ট দাদা কোথায় আজ… কোথায়!

মণিজিঞ্জিরের এই মুখের ভাবের পরিবর্তনে শঙ্কিত ও ত্রস্ত হয়ে লোকটি মাথার কাছ থেকে ঘুরে এসে পাশে দাঁড়াল। কপালে হাত রাখলঃ খুব কষ্ট হচ্ছে আপনার?

সন্ধ্যা সাড়ে ছটা সাতটা হবে। সেই দুপুর থেকেই লোকটা রয়েছে তার সঙ্গে। প্রথমদিকে মণিজিঞ্জির জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পর লোকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সুন্দরী যুবতিকে একলা ফেলে রেখে যাবে– সে ভয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছিল, যদি রাস্তাঘাটের লোকজনেরা কিছু একটা অ্যালিগেশন দিয়ে তাকে চার্জ করে তবে! এই অঞ্চলে তার বিশেষ প্রভাব-ট্রভাবও নেই। যেটুকু ওই কর্মস্থলে। ওখানে খবর পেৌঁছানোর আগেই রাস্তার লোকজনেরা মেরেধরে তার সবটুকু কেড়ে নেবে তো বটেই উপরন্তু কোনও কথা না শুনেই মানুষজন তাদের বেসিক হিংস্রতার ইনস্টিংক্ট প্রকাশ করবে। আর গণপ্রহারে খুব দ্রুত জায়গা হবে পুলিশ মর্গে। আর যদি বেঁচেও যায় পুলিশে ছুঁলে তো এখন ছত্রিশ ঘা। উর্দিপরা মস্তান তারা। যা কিছুই হয়ে যেতে পারে। ফলে দুপুর বেলায় মণিজিঞ্জির জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পর মাথা ঠান্ডা রেখে লোকটি চায়ের দোকানের লোকজনেরই সাহায্য নিয়েছিল নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে। শুধু চায়ের দোকানে নয়, নার্সিংহোমেও নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে হয়েছে। লোকটা ভাবছিল মণিজিঞ্জিরের জ্ঞান এলেই একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে। না হলে যদি বেফাঁস কিছু বলে ফেলে! নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ তো পুলিশকে ডাকবে। সে বিস্তর হ্যাপা। মণিজিঞ্জির চোখ মেলতেই লোকটি নার্সকে রুমের বাইরে পাঠিয়েছে। এবার একটি টুল টেনে এনে পাশে বসে মাথায় হাত রাখল। আর ধীর স্বরে মণিজিঞ্জিরকে বললঃ দেখুন, আমি আপনার কপালে হাত  দিতে বাধ্য হচ্ছি, না-হলে ওরা বুঝবে না আমরা স্বামী-স্ত্রী।

মণিজিঞ্জির চোখ কপালে তুলে অস্ফুটে বলে, তার মানে!

দেখুন তেমন বিশেষ কোনও মানে নেই। আমি শাক্যদেব মুখোপাধ্যায়। আমি একটি কর্পোরেট সেক্টরে এগ্জিকিউটিভ। আপনাকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েই এখানে আমি ভর্তি করেছি। আমার কোনও উপায় ছিল না। আপনার নাম দিয়েছি আলোকণা মুখোপাধ্যায়। ফর্ম ফিলাপ করতে হয় তো। যা মনে এসেছে তা-ই বসিয়ে দিয়েছি। আমার অপরাধ নেবেন না। প্লিজ!

এই প্রথম, কত বছর বাদে সে কাঁদতে পারল ঠিক মনে নেই। দুঃখ জমতে জমতে পাথর হয়ে গিয়েছিল। দাদা হারিয়ে যাবার পর একবার কেঁদেছিল অজানা ভবিষ্যতের ভয়ে, আর কাঁদেনি সে। মণিজিঞ্জির এবার নিজে লোকটির হাত চেপে ধরল। নিজের মুখের উপর চেপে ধরল। আর অনর্গল রচিত অশ্রুতে দুটি হাতই তখন ভিজে সপসপ। লোকটিও হঠাৎ এই কান্নায় আরও আকুল হয়ে গেল।

কাঁদবেন না প্লিজ। শারীরিক ভাবে তো দুপুরে আপনাকে আহত করেছিই কিন্তু মানসিক দিক থেকে আমি যদি আপনাকে আহত করে থাকি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

মণিজিঞ্জির এইবার চোখ মুছে খুব সংক্ষেপে দুপুরের দুর্ঘটনার আগের তার বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থার বর্ণনা রাখল লোকটার কাছে। তার দাদার গৃহত্যাগের ঘটনার কথাও বলল। লোকটা মণিজিঞ্জিরের হাত শক্ত করে ধরে বললঃ আপনি সুন্দরী, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে এভাবে নিজের জীবনকে নষ্ট করতে আছে! না না আপনাকে মানায় না। আর আপনার বাবা-মা-র কথা ভাবলেন না! আপনার অবর্তমানে তাঁরা কীভাবে বেঁচে থাকবেন! আপাতত আপনি আমাকে বন্ধু মানুন, ভালো বন্ধু। তারপর দেখছি কী করা যায়। কিন্তু আপনাদের ফেলে রেখে আপনার দাদার পালিয়ে যাওয়া আমি মেনে নিতে পারছি না।

দেখুন প্রথম প্রথম আমিও পারিনি। কিন্তু পরে বোঝার চেষ্টা করেছি কতটা নিজের ভেতরে ছিন্ন হয়ে গেলে শুধু তো পরিবার নয়, তার ভালোবাসার জগৎ– সাহিত্য জগৎ থেকেও সে মুখ ফিরিয়ে নিল। শুধু তো বাংলা সাহিত্য নয়, সারা পৃথিবীর সাহিত্য নিয়ে তার অগাধ জানাশোনা। গ্যেটে ও রবীন্দ্রনাথ কতখানি একে-অপরের পরিপূরক যেমন ভেবেছে তেমনি পাকিস্তানের ছোটোগল্পের উজ্জীবনে দেশভাগের কী ভূমিকা, সে নিপুণ বর্ণনা করত। যাদবপুরে কম্পারেটিভের প্রতিটি পরীক্ষায় সে প্রথম। ভেবেছিল বিদেশে যাবে আরও আলো পেতে। প্রাচ্যের জ্ঞানভাণ্ডারের সাথে পাশ্চাত্যের কোথায় সংঘাত তাকে দেখতে হবে। জানেন, একদিন দাদা আর নিশার ভেতর খুব তর্কাতর্কি হচ্ছিল। দাদা আমাকেই সাক্ষী মানতে ডেকে আনে। নিশা বলছিল, মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় প্রাপ্তি কম বলেই তাকে অসৎ উপায় অবলম্বন করতে হয়। নীতিবোধ খুব একটা কাজের বিষয় নয়। ওটা বোকা মানুষদের একধরনের আপ্তবাক্য, ঢাল।

না, একদম নয়। যুগে যুগে সমস্ত আলোর যাত্রীকে তার গন্তব্য গুলিয়ে দেবার জন্য এরকমই দোলাচলের মধ্যে টেনে নিয়ে গেছে সমাজ। দাদা প্রতিরোধ করেছে।

জ্ঞান দেবার সুযোগ পেলে না তুমি গল্পের গরু একেবারে গাছে তুলে দাও। নিশা একটা বাঁকানো হাসির সাথে কথাগুলো ছুড়ে দেয়। আর দাদা চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে হাঁটুতে চাপড় মেরে বলেঃ একদম ঠিক। ওই গল্পটুকু আছে বলেই জগৎসংসার চলছে। আমাদের এই চরম স্বার্থসিদ্ধির জগতেও নীতিবোধ একেবারে অবলুপ্ত হয়ে যায়নি বলেই তরুণ-তরুণীরা শান্তির জন্য সংগ্রাম করছে, প্রকৃতি রক্ষার জন্য যুদ্ধরত, একজন পপস্টার গাইছে ইথিওপিয়ার মানুষদের জন্য। কেন, এসব তো এঁরা না করলেও পারেন। এ ধরনের অনেক উদাহরণই প্রমাণ করে যে এই বস্তু-অধ্যুষিত স্বার্থোন্মাদ জগতেও এথিক্স মরে শুকিয়ে যায়নি।

দাদা পায়চারি করতে করতে যখন দিশাহারার মতো দুচোখে কিছু খোঁজার চেষ্টা করছে, তখন নিশা দাদাকে আরও রাগিয়ে দেবার জন্য প্রায় স্বগতোক্তির মতো করে, অথচ যাতে সবাই শুনতে পায় তেমন উচ্চারণে, কপালে জোড়া হাতের গুঁতো মেরে বলেঃ হে ভগবান, হে মা মঙ্গলচণ্ডী, এই বিশিষ্ট নির্বোধটিকে একটু দেখো। বাঁচিয়ে রেখো। তারপর শব্দ করে কফির কাপে চুমুক দিয়েছে।

দাদা এবার প্রচন্ড রেগে গেছে। রেগে গেলে গলার স্বর আশ্চর্য ঠান্ডা হয়ে যেত তার! ঠিক নিশা, এই বহুবিজ্ঞাপিত নীতিশূন্য যুগে তোমার ওই প্রণাম ভঙ্গিটির কথাই বলেছেন বিশিষ্ট দার্শনিক বিমলকৃষ্ণ মতিলাল। বলেছেন, রাজনৈতিক নেতা জনমত কেনার জন্য অবলীলাক্রমে নীতিধারীর মুখোশ পরে, টেকস আ মরাল পসচার। এবং এই বহুবিজ্ঞাপিত নীতিশূন্য যুগে যখনই সে ওই নৈতিক ভঙ্গি গ্রহণ করে, তখনই সে বাহবা পায়। রাজনীতিবিদরা যা ইচ্ছে তাই করছে কিন্তু পসচার-টি ছাড়ছে না। কেন? কারণ তারা বিলক্ষণ জানে যে এই সমূহ ভ্যাকিউম-এর যুগে এই পসচার নিতান্তই লাভজনক, বিশেষ করে সংখ্যাধিক্যের কাছে যারা ভঙ্গির পশ্চাতে উপস্থিত অভিসন্ধির খবর রাখে না। রাজনীতির ক্ষেত্রে যে মরাল পসচার বিজয়ী, শনিপূজার ক্ষেত্রেও পূজারি বা সংগঠক সেই একই পসচার দেখিয়ে সফল। এক সার্বিক শূন্যতাবোধের কাছে এরা আবেদন রাখতে পেরেছে।

নার্স এসে ইতিমধ্যে বলে দিয়ে গেছে ভিজিটিং আওয়ার শেষ, পেশেন্ট পার্টি যেন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। শাক্যদেব মণিজিঞ্জিরের কথা শুনতে শুনতেই হাতের ইশারায় আরও পাঁচটি মিনিট সময় চেয়ে নিয়েছে।

জানেন, আমাকে বন্ধুর মতো ট্রিট করত। মণিজিঞ্জির বলে। সব বলত। নতুন কিছু জানলে আমাকে না জানালে তার শান্তি ছিল না। সব তো ঠিকঠাকই চলছিল। ক্লাসে তো ওর অনুরাগিনীদের মধ্যে এমন অসূয়া জন্ম নিয়েছিল যে প্রত্যেকে দেখাতে ব্যস্ত থাকত সে কতটা সারদাপ্রসাদের কাছের। সারদাপ্রসাদ মানে আমার দাদা। অনেকেই আমাদের বাড়িতে এসেছে। সবথেকে বেশি যে আসত সে হল ওই নিশা। খুব সুন্দরী। ভালো গান করত। আর তার আর একটি পরিচয় ছিল সে কম্পারেটিভের হেড অফ দি ডিপার্টমেন্টের আত্মীয়া। দাদার কোনও শত্রু ছিল না। ছিল স্বপ্ন, বিদেশে যাবার এবং ভারততত্ত্বের উপর গবেষণা করার স্বপ্ন।

আপনাকে একটুও বাড়িয়ে বলছি না। মণিজিঞ্জির তখনও নিজের হাতের ভেতর শাক্যদেবের হাত ধরে রেখেছে। কেটলির মুখ থেকে যেভাবে গমকে গমকে বাষ্প বেরিয়ে আসে সেভাবেই মণিজিঞ্জির ভেতরে জমে থাকা অসহায়তার উত্তাপ একটুখানি সমর্থনের আবহে ঝিঁকিয়ে উঠেছে। গল্প থামায় না সে বা শাক্যদেবকে যেতে দিতে চায় না। বলে চলেঃ ফাইনাল পরীক্ষার আগে হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট ওদের বসু স্যার একদিন দাদাকে ডেকে পাঠায় নিজের ঘরে। বসো সারদাপ্রসাদ। শোনো এই বিভাগের সবাই জানে তুমিই গোল্ড মেডেলিস্ট হবে। তোমাকে ডিঙানোর ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু তোমাকে একটা কথা রাখতে হবে, এবছর তুমি পরীক্ষা দেবে না। এবছর থেকেই জার্মানির একটা বৃত্তি চালু হয়েছে। আমাদের বিভাগের প্রথম যে হবে সেই চান্স পাবে জার্মানিতে দুবছরের স্কলারশিপের। তুমি এবছর পরীক্ষা দেবে না। আমি চাই নিশা ওই বৃত্তিটা এবার পাক।

আকাশ ভেঙে পড়েছিল। নিশা তো ওর বন্ধু, একটু বেশি বন্ধু-ই। দাদা নিজের হাতে কত নোট্স বানিয়ে দিয়েছে! সেই নিশার জন্য কি না এতবড়ো একটা নেপোটিজম-এর কথা শুনতে হবে প্রিয় মাস্টারমশাইয়ের মুখে! দাদা শুধু সেবছর নয়, আর যাদবপুরের পথ মাড়ায়নি। আর বিদেশ থেকে ফিরে এসে কম্পারেটিভ-এর ওদের ব্যাচেরই অন্য এক বন্ধুকে যখন বিয়ে করল নিশা। খবরটা শোনার পর দাদা খুব বেশিদিন ঘরেও থাকেনি।

আপনারা খোঁজখবর করেননি? শাক্যদেবের গলায় আকুলতার সাথে মণিজিঞ্জিরের দাদা সম্পর্কে নিজের ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশ করে ফেলার বিড়ম্বিত বোধ কেমন একটা ধরা ধরা গলা হয়ে একসাথে উঠে এল।

অনেক খুঁজেছি। পাগলের মতো খুঁজেছি। প্রাইভেট ডিটেকটিভও লাগিয়েছিলাম। কিন্তু খোঁজ মেলেনি। তবে আমরা এখনও আশা করি, বিশেষ করে মা ভাবেন হয়তো কোনওদিন ফিরে আসবে দাদা। এবার আপনিই বলুন তো সমাজ নানা ছকে দিনের পর দিন ব্যক্তিকে নষ্ট করে দিচ্ছে না, ধবংস করে দিচ্ছে না! বলুন না!

শাক্যদেব নার্সিংহোমের বিছানার সাদায় চোখ রেখে মাথা নাড়ে। ওই সাদায় কী এক অনন্ত শূন্যতা। সে জানে সমাজ কীভাবে এক একটি সুন্দর মনের গলা টিপে মেরে ফেলতে চায়। সে তো নিজেও এর শিকার। তার অফিসে চূড়ান্ত কোরাপশন। একা একা প্রতিরোধ করতে করতে সে ক্লান্ত। তার চোখের সামনে কালিশংকর বাবু, নিবাস মুনসি, শ্যাম পুরকায়েত, ড্রাফট্সম্যান পাল, অডিটর ভৌমিক, চিফ্ ইঞ্জিনিয়ার, ক্যাশিয়ার কীভাবে দিনের পর দিন কন্ট্র্যাক্টরদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কোম্পানির স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছে। আর তাকে, শাক্যদেবকে নিজেদের পথে না আনতে পেরে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের পথে ঠেলে দিয়েছে। স্রোতের বিরুদ্ধে গোটা অফিসে সে একা। কিন্তু সব সময় সে টের পায় একটা দৃপ্ত আত্মা তাকে ঘিরে আছে। বিপদে বুকে আগলে রাখছে। মণিজিঞ্জিরের গল্প শোনার পর শাক্যদেব ভাবল, এই পরিবারটির পাশে তাকে দাঁড়াতেই হবে।

আস্তে আস্তে মণিজিঞ্জিরের হাতের ভেতর থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিতে নিতে শাক্যদেব বলেঃ ডাক্তার কাল সকালে আপনাকে ডিসচার্জ করবে বলেছে। আমি সকাল দশটার মধ্যেই চলে আসব। আপনি কিন্তু মনে করে একবার আপনার বাড়িতে ফোন করে দেবেন। না হলে ওরা নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করবে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ উত্তাল ওই একটি কথায়। চুদুরবুদুর। শব্দটি কাঁটাতার ডিঙিয়ে এপারে অস্বস্তি গোপন করতে পারে না। সাগ্নিককে ওই শব্দটির জন্য গোটা ক্লাস দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে সেদিন। বন্ধুদের ফিক্ফিক্ পায়ের ব্যথা চারগুণ বাড়িয়ে দিয়ে টপটপ করে চোখের কোণ থেকে জল ঝরিয়েছে। শরীরের ব্যথা সহ্য করা যায়, কিন্তু অপমান সহ্য করা যায় না। পুপু-ই উসকেছিল, যা জিজ্ঞাসা কর শব্দটার মানে। গোপনে ওরা চিঙ্কি ম্যাম বলে ডাকে বাংলার টিচারকে। চোখ দুটো ছোটো ছোটো বলে ওই নাম তাঁর। আর রেগে যাবার পর তা আরও ছোটো হয়ে যায়। কোর্টের অর্ডার আর স্কুল কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশ থাকার ফলে পেটাতে পারেন না বলে মাঝে মাঝে টেবিলে নিজেই ঘুষি মেরে নিজে আহত হন, বিশেষ করে যখন হিন্দি টাঙে বাংলা উচ্চারণ করে বাঙালি ছেলেমেয়েরা। সাউথ পয়েন্ট, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের হিসেবে রাখতে হয়েছে সরকারি অনুজ্ঞায়। না হলে বাংলা পড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই গোয়েঙ্কাদের। বাংলা ম্যামের ভাষা প্রীতি আবার নজর কাড়ার মতো। তাঁর ক্লাসে কড়া নির্দেশ আছে বাংলা খবরের কাগজ পড়তে হবে প্রতিদিন ছাত্রদের। আর ক্লাসে কিছুটা সময় র্যাপিড রিডিং-এ তা থাকবে। ফলে তিনি প্রতিদিনই একটি দৈনিক সংবাদপত্র সহ ক্লাসরুমে ঢোকেন। আর সাগ্নিকদের ক্লাসের সাতচল্লিশ জনের মধ্যে যাকে খুশি তিনি মানে জিজ্ঞাসা করেন কোনও শব্দের, সেই কাগজের লেখা থেকে।

আজ ম্যাম প্রশ্ন করেননি। বন্ধুদের উসকানিতে দ্বিতীয় রো-র কর্নারে বসা, অষ্টম শ্রেণির এই সাদাসিধে সাগ্নিক উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে, ওই শব্দটির অর্থ কি?

অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে নতুন অন্তর্ভূক্ত হয়েছে মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা। ম্যাডাম তার কবিতা নিয়েই আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছিলেন। তিনি নিজেও কবিতা লেখেন। মাঝেমধ্যে এক নামি পত্রিকাতে তাঁর কবিতা দেখা যায়। কবিতাতে তাঁর একটু বিশেষ পক্ষপাতও আছে। সাগ্নিকের প্রশ্নে বেশ কিছুদিনের অসংগঠিত ভ্রূর অরণ্য প্রথমে কেঁপে উঠল। তখনও ওইদিনের খবরের কাগজ তিনি পড়ে উঠতে পারেননি। ফলে ওই আগন্তুক শব্দের ধাক্বার প্রস্তুতি সামলাতে তাকে কয়েকবার চুলে হাত চালাতে হল। নাক মোচড়াতে হল দু-তিনবার। সাহিত্য-বিচিত্রা বইটা দুম করে বন্ধ করে দিতে হল। সাগ্নিক অশুভ কিছু একটা টের পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলেঃ ম্যাম আজকের কাগজে আছে। আমরা কেউ শব্দটার মানে বুঝতে পারিনি। তা…ই।

নিজেকে সামলে নেবার জন্য শাড়ির অাঁচল ঠিক করার ম্যানারিজম আর একটু দেখালেন ম্যাম। তারপর অমোঘ সেই স্বর ধবনিত হল– এখন আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল মৃদুল দাশগুপ্ত। তুমি ইচ্ছাকৃত ভাবে গোলোযোগ শুরু করেছ। গোটা পিরিয়ড দাঁড়িয়ে থাকো।

যাঃ বাবা, প্রশ্ন করতে পারব না! নিজের মনে গজর গজর করতে করতে সাগ্নিক নিজেকেই বলে, ওদিকে মা-বাবা তো সারাক্ষণই বলে যায়, বুঝতে না পারলে ক্লাস টিচারদের কাছ থেকে জেনে নেবে। খুব খারাপ লাগছিল সাগ্নিকের। এই পানিশমেন্টটা তার সহ্য হচ্ছিল না। দোষ না করে কেন পানিশমেন্ট পেতে হবে! ও রোজ পড়া করে আসে। ক্লাসে গন্ডগোল করে না। কারও সঙ্গে মিসবিহেভ করে না। অথচ ওর বন্ধুরা তো সব এক একটা বিচ্ছু। ক্লাস এইট তো কী! সবকটাই লুকিয়ে-চুরিয়ে সিগারেট খায়। পুপুও খায়। ক্লাসের পরীক্ষার রেজাল্ট ট্যাম্পারিং করে বাড়িতে দেখায় পুপু। একদিন তো মোবাইলে নেকেড মেয়েদের ছবি ডাউনলোড করে নিয়ে এসেছিল পুপু। ধরাও পড়েছিল এই ম্যামের কাছে। কিন্তু ম্যাম তো কোনও শাস্তি দেননি তাকে।

স্কুলগাড়ি থেকে নামার পর নিশা দেখতে পায় ছেলে সাগ্নিকের মুখটা অন্যদিনের তুলনায় যথেষ্ট কালো। আজ কি পিটি ক্লাস ছিল? রোদে খুব পুড়েছিল?

সাগ্নিক মাথা নেড়ে জানায়– না। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে পায়ের জুতো ছুড়ে দেয়।

কী রে অমন করছিস কেন রে শমু? কিছু হয়েছে? বন্ধুদের সাথে গন্ডগোল? আজকাল গার্জিয়ানরা তটস্থ থাকে কোথায় কী হল! বাচ্চা ঘরে না ফেরা পর্যন্ত স্বস্তি থাকে না। নিশা শমুর মাথার চুল নেড়ে দিয়ে আদর জানায়। আজ নিশাই স্কুল-গাড়ি থেকে নামিয়েছে শমুকে।

রাত্রে জ্বর এল সাগ্নিকের। পরের দিন স্কুলে গেল না, এবং তার পরের দিনও। ডাক্তার ফ্লু বলে কোনও ওষুধ দিলেন না, কেবল ক্যালপল। জ্বর কমছে না, আবার টেস্ট হল– কিছু না। তবে! বাবা-মায়ের চিন্তা বাড়িয়ে এরপর সাগ্নিক বেশ কিছুদিন বলতে থাকল পেট ব্যথা করছে। স্কুলে যাওয়াও হল না তা বেশ ছ-সাত দিন।

জ্বর কমেছে। ভিডিও গেমে মেতে আছে সাগ্নিক। আজ রবিবার। কাল থেকে আবার স্কুল যেতে হবে। বুক থেকে বড়ো একটা শ্বাস নেয়। ভিডিও গেমে ঢ্যাঁ ঢ্যাঁ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে চালাতে এগোয় সে। উলটো দিক থেকে একটার পর একটা দানব আসছে। সে মেরে ফেলছে, আবার আসছে। কিছুতেই তাকে সীমানায় পেৌঁছোতে দেবে না। এই নিয়ে তিনবার হল। স্কোর সাড়ে ছশো, সাতশোর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। সাগ্নিকের হাজার চাই-ই চাই। কাজের পিসি জুনিয়র হরলিক্স দিয়ে গেছে, তা ঠান্ডা হচ্ছে। সাগ্নিক মনে মনে এই সেল্ফ-ইমপোজ্ড মিশনে স্কুল টিচারের কথা আওড়াল– ইট ইজ বেটার টু ট্রাই অ্যান্ড ফেইল দ্যান ফেইল টু ট্রাই।

সাগ্নিক একটা জিনিস দেখে অবাক হল। দানবগুলোকে আলাদা আলাদা না ভেবে যেই বাংলা ম্যাম হিসেবে চিহ্নিত করেছে অমনি ওর কিবোর্ড ছুঁয়ে ছেড়ে দেওয়া গুলি গুলো ঠিকঠিক টার্গেটে লাগতে লাগল। কম গুলি খরচ করে বেশি বাংলা ম্যাম নিকেশ করছে তখন। আর স্কোরও হু হু করে ঊধর্বমুখী। কখন যে হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দেড়হাজার, বাইশ শো। শেষে মা ঘরে ঢুকে ডাকতেই তাল কেটে গেল। একটু যেন খিঁচিয়ে উঠল ঠান্ডা স্বভাবের সাগ্নিকঃ কেন কী হয়েছে! সারাদিন পড়া পড়া কোরো না তো!

নিশা বিস্মিত হয়! সে তো কিছুই বলেনি। কোনও প্রশ্নও না। তাহলে! শমু এমন বস্তির ছেলেদের মতো চেঁচিয়ে উঠল! মাথায় হাত রাখল নিশা। অল্প গরম আছে। যাক জ্বরটা বাড়েনি। কিন্তু কোনও অ্যান্টিবায়োটিক তো পেটে পড়েনি শমুর। তাহলে এত রুক্ষতা কোথা থেকে এল!

শমু তোমার হরলিক্সটা টেবিলে পড়ে রয়েছে, ঠান্ডা হয়ে গেছে। একটু গরম করে দেব?

না না খেতে ইচ্ছা করছে না।

নিশা ব্যস্ত হয়। ছেলের ভেতর একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। এত রুক্ষতা তো কখনও ছিল না! নিশা বলেঃ শমু আজ বিকেলে সাউথ সিটিতে তুমি আর আমি সিনেমা দেখতে যাব, জানলে। এই জানলে শব্দটি নিশার একটি অন্তরঙ্গতা জ্ঞাপক বিশেষ চিহ্ন।

শমু বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়েও কেবল মাকে সরিয়ে দেবার জন্য মাথা নাড়েঃ ঠিক আছে। নিশা আবার বলেঃ কাজের পিসি একটু বাদে আসবে, তোমার মাথা ধুইয়ে হট্ স্পঞ্জ করে দেবে। একটু রেস্ট নাও। আজ আর পড়াশুনো করতে হবে না।

এই সফ্টনেস বা সিনেমার টোপটা তাকে দিতেই হতো। সাগ্নিকের থেকে সে যেন দূরে সরে না যায়। এমনিতেই তার একটা গিল্টি ফিলিং আছে। গান গান করে সংসারকে সময়ই দিতে পারে না। আর এখন তো সিনেমার প্লে ব্যাক করছে। হুটহাট করে রেকর্ডিং-এ যেতে হয়। হিম্মতসিংকা মাঝেমধ্যেই শুটিং-এর সময় তাকে ডেকে নেয়। কখনও কয়েকদিনের জন্য আউটডোরেও যায়। গুয়াহাটি, শিলং ঘুরে এসেছে গত মাসে। নিশা ভয় পায়, ছেলে কি তাকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে! কোথাও কি একটা চিড় ধরেছে মনে মনে! যদি তা-ই হয় দ্রুত মেরামতি করা দরকার। তাই নিশা সিনেমা দেখানোর প্রলোভন দিল সাগ্নিককে।

সাগ্নিকের ঘরে থাকতে থাকতেই নিশার মোবাইল বেজে ওঠে।  কে, মা? বলো।

আজ কাইল তুই তো খুবই ব্যস্ত থাকিস। তোর বাপটারে একবার শ্যাষ চোখের দ্যাখাটা দেইখ্যা আয়গা। কাল পাও ভাঙছে। অফিস থনে ডিসান হাসপাতালে ভর্তি কইরা দিয়া গেছে। অপারেশন হইব। অখনো জ্ঞান আয় নাই শুনছি। তুই সময় পাইলে একবার দেইখা আয়। কাইল সন্ধ্যাকালে তরে অনেকবার ফোন করছিল, কিন্তু পায় নাই।

সে কি, এতক্ষণ বলোনি কেন! কী করে ভাঙল! আচ্ছা আমি আর তোমার জামাই এখনি আসছি। ডিসান তো আমাদের বাড়ির কাছেই। বাবাকে দেখে আমি একবার বাড়ি ঘুরে যাব। তোমাকেও তো অনেকদিন দেখি না।

এতদিনে কুলোর বাতাস পেল কালিশংকর। মনে মনে নিবাস একথা বললেও মুখে আহা উঁহু করছে তখন থেকে। নিবাস মুনশি অনেকদিন ধরে চেয়েছে কালিশংকর বাগচির ট্রান্সফার। একে ওকে কানে বিষ ঢেলে দিয়েছে, লাগান-ভাগান দিয়েছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু করে উঠতে পারেনি। এবার পার্মানেন্ট ট্রান্সফার হয়ে গেল কালিশংকরের। অনেকখানি রিলিভড। রোজ রোজ পার্সেন্টেজ নিয়ে খুচ্ খুচ্ ঝগড়াঝাঁটি আর করতে হবে না। তাই প্রাণের আনন্দেই যেন ফোন করে অফিসের সব লোকজন টেনে এনেছে এই ছুটির দিনেও। ফোন করে বলেছেঃ স্যার কেস বিলা। টেঁসে গেছে।

ধমক লাগিয়েছে শাক্যদেব।  চুপ করুন! একজন মারা গেছেন, আপনার কলিগ, আর আপনি তার সম্পর্কে এরকম কথা বলছেন! খুব মনখারাপ শাক্যদেবের। ঘুস খেলেও লোকটা সব সময় তার সাথে সাথে থাকত। অফিসের সব খবরাখবর দিত। সে একবার শেষ দেখা দেখতে এল। আর তাছাড়া অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হিসেবে তাকে পেশেন্ট আইডেন্টিফাই করতে হয়। সার্টিফিকেট দিতে হয়। নাহলে কোম্পানির হে্কেয়ার ইউনিট হাসপাতালকে পয়সা দেবে না। ফলে আসতেই হতো।

অফিসের পিওন শ্যাম এসে বললঃ নিবাসদা বাড়ির লোকজনকে তো দেখছি না!

ন্যাকামো করিস না। একটু আগের স্যারের ধমক এবার ও নীচের দিকে চালান করল। শ্যামের মুখ কাঁচুমাচু। বলেঃ বাড়ির লোক খবর পেয়েছে তো!

বড্ড ভ্যানতারা করিস তুই! এত লোককে ফোন করছি, আর আসল বাড়িতে করব না! ওই গতরখাকি বউ-এর কথা ছাড়। গজ গজ করে উঠল নিবাস মুনশি। সারাদিন মানুষটারে এতটুকু শান্তি দেত না। দাঁতের চাপানির তলায় রেখে দেত। বউ বলে পরিচয় দেবার জুগ্গি নাকি সে! আসপে না রে আসপে না। অত দপ্প বিধেতাপুরুষ সইবে কেন! তাই তো অকালে পেরাণটা গেল কালি-দার। নাইলে পা ভাঙলে কারুর পেরাণ যায়!

সকালে অপারেশন টেবিল পর্যন্ত পৌঁছোয়নি। কালিশংকরের জ্ঞান সেই যে গিয়েছিল আর ফেরেনি। অপারেশনের আগে অ্যানিস্থেশিস্ট এসেছে। ছুরি-কাঁচি সহ অপারেশন থিয়েটারও প্রস্তুত। ডাক্তার গুপ্ত বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। অফিসের নিবাস আর শ্যামও উপস্থিত। তখনই খবরটা জানা গেল। সিরিয়াস কার্ডিয়াক অ্যাটাক হয়েছিল। ভোর রাত্রে। কিচ্ছু করার ছিল না।

ডাক্তার সার্টিফিকেট দিতে দিতে তিনটে বাজিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে নিশারা বিধবস্ত হয়ে বসে আছে ডিসানের অফিসের সামনে। নিশার পাগল পাগল লাগছে। বাবা কাল তাকে ফোন করেছিল অথচ সে কথা বলতে পারেনি। কালকে এলে কি একবার কথা বলতে পারত! হিম্মতসিংকা তাকে প্রচার দিচ্ছে বটে কিন্তু প্রাইভেট লাইফের একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। যখন তখন তাকে ডাকে দামি হোটেলে। ভালো ভালো মদ খাওয়ায় আর শরীর নেয়। সেদিনের পর থেকে রৌণকের উপর থেকেও টানটা উঠে গেছে নিশার। বাবা তাকে খুব ভালোবাসত। সে-ও বাবাকে। আর তো তেমন কেউ রইল না তার যার জন্য এই পৃথিবী সুন্দর লাগে। তেমন করে বেঁচে থাকা যায়। নিশা বেশ জানে ছেলে সাগ্নিক তাকে চায় না। তার স্বামীও চায় না। শুধু থাকে একসাথে। বার বার ফুঁপিয়ে কাঁদছে নিশা। বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু এত লোকের সামনে ভালো করে কাঁদতেও পারছে না। চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে।

শ্যাম আর ক্লার্ক মানব সিংহ শাক্যদেবকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল। শ্যাম সকাল থেকেই খুঁজছে কালিদার বাড়ির লোকজনকে। কাল একবার রাতে নিবাসদার খোমা শুনেছে। মানে মুখ ঝামটা। নিবাস শ্যামকে খুব ঝেড়েছে, কেন সে কালিশংকরের ভাগের টাকা দিয়ে আসেনি কাল। শ্যাম যত বোঝায়ঃ কাকে দেব! কালিদার সেন্স ছিল না তো। হসপিটালে পকেট থেকে যদি কেউ টাকা তুলে নিয়ে যায়! শ্যাম এখন কী করবে! আবার অফিসে গিয়ে ঝাড় খেতে পারবে না।

আরে ওই তো কালিদার মেয়ে বসে আছে সোফায়। মানব সিংহ আঙুল তুলে দেখায়। মানব নিশাকে চেনে। নিশার বিয়েতে এসেছিল সে। ওই যে নীলচে রুমালে চোখ মুছছে বারবার এক সুন্দর দেখতে বউ, ও-ই নিশা, কালিদার মেয়ে। তখনও মৃতদেহ বের হয়নি, সবাই অপেক্ষা করছে। নিশা, তার বর। নিশার বর ফোন করে শববাহী গাড়ি ডেকে নিয়েছে। তা দাঁড়িয়ে রয়েছে গেটের পাশে। শ্যাম মাথা চুলকোতে চুলকোতে গিয়ে নিশার সামনে দাঁড়ায়। ম্যাডাম, আমরা কালিদা-র অফিসের কর্মচারী, কাল থেকেই আছি। তারপর নিশার বিহ্বলতার ভেতর, তাকে কোনও কথা বলতে না দিয়েই শ্যাম পকেট থেকে একটা বন্ধ খাম বের করে নিশার হাতে দিয়ে বললঃ এর মধ্যে ছ’হাজার আছে ম্যাডাম। এটা কালিদার শেয়ার।

রুনার আকাশ

এক

আমার ঠাকুরদার নাম হরিহর। হরিহর গঙ্গোপাধ্যায়। আমাদের বাড়িতে ঠাকুরদার কোনও ছবি নেই। কেন নেই কে জানে! সে আমলেও তো ভালো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি তোলা হতো।

এইসব প্রশ্ন রুনা আমাকে করে। রুনা মানে আমার মাস তিনেকের বিয়ে করা নতুন বউ। ঠাকুমার কাছে শুনেছি দেশের বাড়ি তৈরির সময় টাটা স্টিলের লোহার বিম, এক মাইল রাস্তা ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন গাঙ্গুলিমশাই। এসব কথা রুনা অবাক হয়ে শোনে। গালে হাত রেখে প্রশ্ন করে,

– তুমি পারো?

– আমি? অবাক না হয়ে পারি না। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সদ্য বিয়ে করা বউকে অবাক হয়ে দেখা ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারি!

সেই শুরু। এরপর থেকে গাঙ্গুলিমশাই থেকেই গেলেন। আমার আর রুনার মধ্যে ছোট্ট হাইফেনের মতো। আমাদের শয়নে, স্বপনে, আহারে, বিহারে এবং সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের একান্ত ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যেও।

একটা উদাহরণ দিলে সহজবোধ্য হবে ব্যাপারটা। নাইট শো’তে সিনেমায় গেছি আমরা দুজন। এলাকার প্রেস্টিজিয়াস এসি হল ‘মৌলি’তে। রুনার হাতে আমার হাত। আর স্বাধীনতা পেলে কী করতে পারে আমার হাত সে ভালোমতো জানা আছে। রুনাও সম্ভবত তেমনই কোনও প্রত্যাশায় কাঁপছে ভিতরে ভিতরে। স্ক্রিনে তখন ভালোই চলছে ‘মিস লাভলি’র নীরব অভিসার। আমাদেরও। হলের অন্ধকার ও নৈঃশব্দ্যে। হঠাৎ এক দৃশ্যে এক দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ। ওই যেমন হয় আরকি, নায়ক কি নায়িকার দাদু বা অন্য কেউ। বুঝতে পারলাম ছটফটিয়ে উঠল রুনা।

হাতের মধ্যে ধরে থাকা ওর হাত না ছেড়েই জিজ্ঞেস করলাম,

– কী হল রুনা?

আর কিছু বলবার দরকার ছিল না। কানের পাশেই ফিসফিসিয়ে উঠল রুনা

– দাদু থাকলে খুব ভালো হতো, না গো!

বিশ্বসংসার তখন লুপ্ত আমার সামনে। স্ক্রিন ডাহা ফাঁকা। গান-গল্প বিষ লাগছে সব। নায়ক-নায়িকার চূড়ান্ত প্রেমও কেমন অভব্য লাগছে পর্দায়। অথচ ঠিক আমার পাশেই সেই মুখ, ঠোঁট আর পহলগাঁওয়ের পথের পাশের কাশ্মীরি আপেলের মতো টুকটুকে গাল। ওই গালে ঠোঁট ছোঁয়ানো যায় শুধু। হাত তোলা কক্ষনো নয়।

বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়ার পর ঘরে চার দেয়ালের নির্জনে রুনাকে একেবারে নিজের করে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

– আচ্ছা রুন, দাদুর কথাটা এবার থেকে একটু কম বলা যায় না কি?

রাতে বিছানায় উঠে আসবার আগে কন্ঠার কাছটায়, চোখের তলায় ক্রিম ঘষে রুনা। ফরাসি ক্রিম। ওরিগন। দশ মিলি সাড়ে সাতশো টাকা। ওর মাসির বাড়ি থেকে দিয়েছে। মামুলি প্রাইভেট ফার্মের কর্মচারী, আমার এসব সাধ্যের বাইরে।

ঠিক এই একটি কারণে রুনার বাবা শুভ্রজ্যোতিবাবুর, মেয়ের পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও আমার নামের পাশে বিরাট এক ঢ্যারা মেরে দিতে প্রথমে একটুও দ্বিধা হয়নি। বড়ো চাটার্ড ফার্ম ‘মুখার্জি অ্যান্ড সরকার’-এর সিনিয়র পার্টনার মুখার্জি সাহেবের ছোটো মেয়ে রুনা। কীভাবে যে কলেজ সোশ্যালে আমার গলায় ‘রামধনু মন’ শুনে মজল, উঁহু শুধু মজল না গলা পর্যন্ত ডুবল, সেটাই এক রহস্য। আমার কাছে। মুখার্জি সাহেবের কাছে তো বটেই।

সেই রুনা এবং আশ্চর্য এক মায়াবী সুগন্ধ এখন উড়ে বেড়াচ্ছে আমার মুখের আশপাশে। ওর গলায় মুখার্জি দম্পতির দেওয়া পার্ল-এর হার লকেটসমেত। দোল খাচ্ছে আমার চোখের সামনে। আলতো করে জিভ দিয়ে সেই লকেট স্পর্শ করে চোখ বন্ধ করে ফেলি। তবুও সেই অবস্থায়ই জিজ্ঞেস করি,

– কী হল, কিছু বললে না যে?

আমার নাকে নিজের নাক দিয়ে ঘষতে ঘষতে রুনা হাসল। ঘরের আলোআঁধারিতে সেই সংক্রামক হাসি কতদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে কোনও পুরুষকে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। যুগ যুগ ধরে শুধু তথ্যই আহরিত হয়েছে ব্যাপারটা নিয়ে– আর কিছু নয়। বাস্তবে সেই অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে তারাই শুধু জানে।

– আচ্ছা, তুমি কেমন মানুষ গো! যে-মানুষটার কোনও ছবিই নেই বাড়িতে, তাকে তোমার এত হিংসে কেন? আমাকে নিজের শরীরের নীচে সম্পূর্ণ কুক্ষিগত করে দখলদারিত্ব দেখিয়ে বলল রুনা।

এই সুমধুর সময়ে, যখন নাইটির পাতলা আড়াল ছাড়া রুনার পাখির মতো হালকা নরম শরীরটা সম্পূর্ণ আমারই অধিকারে এবং সেই শরীরের সর্বত্র চলে বেড়াচ্ছে আমার চঞ্চল হাত, তখন এসব কথা জিজ্ঞেস করে কোন মূর্খ? তবু একবার প্রায় জড়িয়ে আসা গলায় বলবার চেষ্টা করলাম,

– উঁ…উঁ… হিংসের কথা উঠছে কেন?

– ন্– না– এসব কথা থাক এখন। বুকের উপর অহংকারী মরালীর মতো শরীর ছেড়ে রাখা রুনা, ঠোঁট দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিল। অগত্যা আমাকে চুপ করতেই হল।

দুই

রমেনের বাবা জীবনকাকু মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার। শুধু কমিশনার বললে ভুল হবে। রীতিমতো বাঘ আর গরুকেএকঘাটে জল খাওয়ানোর এলেমধারী বলতে যা বোঝায় জীবন রায় ঠিক তাই-ই।

ওঁকে বাদ দিয়ে মিউনিসিপ্যাল চেয়ারম্যান দিনে অন্ধকার দেখেন আর রাতে চোখে তারাবাজি। সেই জীবনকাকু আমাদের মিউনিসিপ্যালিটির আঠাশ নম্বর ওয়ার্ডের। এই ওয়ার্ডেই আবার এলাকার সবচেয়ে বড়ো মার্কেটিং কমপ্লেক্স ‘উত্তরায়ণ’। কেন ‘উত্তরায়ণ’ কেন ‘দক্ষিণায়ন’ নয় এসব জটিল কথার জবাব কাকুকে জিজ্ঞেস করলে সুন্দর দাঁতের প্রদর্শনী দেখান। তারপর হাত একটু কাত করেন উপর দিকে। অর্থাৎ চেয়ারম্যান জানতে পারেন কিংবা আর একটু উপরের, সব চেয়ারম্যানের লর্ড স্বয়ং ভগবান।

এই মানুষটির ছেলে রমেন আমার বন্ধু। সেই পাঠশালার দিনগুলো থেকে। তারপর সেন্ট জন্স এইচ এস স্কুল হয়ে কলেজ পর্যন্ত। সেই রমেন। রমেন রায়। তার ফুলশয্যা। আটশো থেকে হাজার লোকের অ্যারেঞ্জমেন্ট। মিছিলের মতো একদল ঢুকছে ‘কুশন্ডিকা’ লজে আর একদল বেরিয়ে আসছে। বাজারের যত কসাই আর মাছওয়ালাদের দেখলাম। সবাই বেশ ওদের স্বাভাবিক ড্রেস লুঙ্গি, গেঞ্জি আর রক্তমাংস মাখা ফতুয়া ছাড়াই সেজেগুজে এসেছে। অনেকের চোখে আবার সুরমা টানাও দেখলাম।

রুনা আর আমিও এসেছি খুব সেজেগুজে। হালকা নীল ফুলস্লিভ ব্র্যান্ডেড শার্ট পরেছি। ‘আবু জানি’র এই শার্ট শীতের তত্ত্বে দিয়ে পাঠিয়েছেন আমার শাশুড়ি মা। এসব কি গরিব জামাইকে কিছু শেখানোর জন্য? কে জানে? পরবার জন্য শার্ট এসেছে পরেছি। তার সঙ্গে মানানসই ট্রাউজার। কোটের বাটনহোল-এ লালগোলাপ সামান্য মাথা উঁচিয়ে জানান দিচ্ছে আমার স্বাতন্ত্র্য।

আর রুনা যা সেজেছে আজ দেবতারাও মনে হচ্ছে স্বর্গের ব্যালকনিতে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে দেখছেন ওকে। বাঙ্গালোর সিল্ক-এর উপর বিয়েবাড়ির আলো পড়ে পিছলে যাচ্ছে যেন। রামধনু-রঙা চোলি, ঠিক ব্যাকলেস নয় আবার তা বলাও যায়। অদ্ভুত এক রঙিন কাটাকুটি খেলায় মেতেছে পিঠের দিকটা।

নিজের বউকে এইসব সময়েই অন্য কারওর বলে মনে হয়। গলা থেকে অনায়াসে ঝুলছে বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া মুক্তোর হার। কানে ম্যাচিং দুল। যেন ইশারায় ডাক পাঠাচ্ছে, ‘আয় আয় ছুঁয়ে যা’। হাতে সুগন্ধি ডোকরা প্রিন্টেড রুমাল। দেখেশুনে কার ফুলশয্যা হচ্ছে আমার না রমেনের বোঝা দায়।

কাজের বাড়িতে জীবনকাকু কারওর কোনও অসুবিধার জায়গাই রাখেননি। আদর-আপ্যায়ন, কফি, পকোড়া এবং অবশ্যই মাটনের সঙ্গে বিবিধ মাছের প্রিপারেশন (ইলিশ, চিংড়ি আর ভেটকি)।  খাওয়াদাওয়া শেষ করে সকলে ধন্য ধন্য করতে করতে বেরিয়ে আসছে। ঘড়িতে রাত বারোটা। খাওয়াদাওয়ার পর সকলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ সেরে রমেন আর পর্ণাকে ঘরে ঢুকিয়ে তবে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আমাদেরও ছুটি।

এত রাতে আবার বাড়ি ফেরা কেন রমেনদের বাড়ির সকলেই সেকথা জিজ্ঞেস করছিল। রুনা হেসে সকলকে বিদায় জানাল। হাসলে যে ওকে এত সুন্দর লাগে একান্নতম বার সেই সত্যটা আবিষ্কার করলাম একেবারে ওর পাশে দাঁড়িয়ে।

রমেনের বাবা ঘাড় ফিরিয়ে কাকে যেন একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে বললেন আমাদের পৌঁছে দেবার জন্য। তারপর কাজের বাড়িতে যা হয়। আরও গুরুতর কোনও কাজের তাড়ায় আমাদেরটা অনায়াসে হারিয়ে গেল।

অগত্যা শুধু আমরা দুজনে রাস্তায় নেমে এলাম। পিছন ফিরে একবার আলোয় ঝলমলে লজটার দিকে তাকিয়ে বিরাট একটা জাহাজের মতো মনে হল। টাইটানিক নাকি রে বাবা! মজা পেলাম খুব। বাতাসে ভাসিয়ে দিলাম রমেনের উদ্দেশে আমাদের যৌথ শুভেচ্ছাবাণী– ভাস রমেন, ভেসে যা ওই অথৈ সমুদ্রে!

সামনের দিকে রাস্তা পড়ে আছে রাস্তারই মতো শুনসান। অনুষ্ঠান বাড়ির গাড়িগুলো তীরবেগে ছুটে চলে যাবার পরই রাস্তা আবারও শুনসান। একটু তফাতে তফাতে হ্যালোজেন ল্যাম্পের আলো অন্ধকারের পরিধি কমিয়েছে কেবল। আলো আর অন্ধকারের সঙ্গে চোরপুলিশ খেলতে খেলতে কখন যে বেশ খানিকটা ফাঁকা রাস্তা ফেলে এগিয়ে এসেছি আমরা দুজনে একটুও বুঝতে পারিনি।

এমন ফাঁকা রাস্তায় আমার রুন-কে একলা পাবার আনন্দে মন গুনগুনিয়ে উঠল। চট করে ওর পাশে গিয়ে ডানহাত দিয়ে বেড় দিয়ে নিলাম ওর মোম আর মেদ দিয়ে তৈরি মসৃণ কোমরটাকে। নীচু হয়ে সেই কোমরে সবে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাচ্ছি, এমন সময় যেন পায়ের আওয়াজ পেলাম পিছনে।

চমকে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। কেউ কোথাও নেই। রাস্তা যেই কে সেই। একেবারে ফাঁকা। কেবল দূরে দূরে একটি দুটি কুকুর। সন্দেহজনক চোখে দেখছে আমাদের। উপযুক্ত পরিচালকের হাতে পড়লে এই সিন মারকাটারি হয়ে উঠতে পারে। এই স্তব্ধতা, এই নির্জন ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ধোঁয়া ধোঁয়া আচ্ছন্নতা। তার সঙ্গে বিমূঢ় নায়ক-নায়িকা। ফ্যানটাস্টিক!

মাথার মধ্যে কোনও প্রতিবর্তী সংকেত পাবার আগেই রুনার ভয়ার্ত গলা শুনতে পেলাম,

– একটা লোক!

স্বর্গ থেকে যেন পতন হল আমার,

– কই– কোথায়?

– পিছনে। বলতে বলতে আমার শরীরে সেঁধিয়ে এল রুনা। আহ্ রুন, আমার রুনি! ওকে শক্ত করে এক হাতে জড়িয়ে বুকের মধ্যে নিয়ে পিছনে তাকালাম। কোনও তারতম্য নেই। নির্জন রাস্তা। ল্যাম্পপোস্টের আলো শুষে নিচ্ছে নিঃশব্দে।

– ধুস্ – ভুল দেখেছ। বিয়েবাড়িরই কেউ হবে হয়তো।

রুনাকে সাহস দিতে গিয়ে গলা কেঁপে গেল আমার। এত রাতে বেমক্বা রাস্তায় নেমে পড়বার কী খেসারত দিতে হবে কে জানে। কোনও অটো কিংবা অন্য যানবাহনও তো নজরে পড়ছে না। আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল তো!

যাই হোক, এই পরিস্থিতি থেকে তো বেরোনোর চেষ্টা করতেই হবে। সঙ্গে আবার রুনাও রয়েছে। আমার যা হবার হোক। কিন্তু রুন– আমার রুন যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে। কপালে বিন্ বিন্ করে ঘাম ফুটছে টের পেলাম।

আমার এমন প্রায়-অপ্সরা বউয়ের স্পর্শও নিশ্চিন্ত করতে পারল না একটুও। একবার মনে হল পায়ের আওয়াজ পেলাম পাশেই। চমকে তাকালাম। কেউ না। কিছু না। অথচ নিশ্চিতভাবেই পায়ের শব্দ। নির্ঘাত বদ মতলবেই লুকিয়েচুরিয়ে কেউ আসছে পিছু পিছু।

চিন্তাটা মাথায় আসতেই কেঁপে উঠলাম। মনে মনে খুব ধমকাতে লাগলাম নিজেকে। কেন যে অনুষ্ঠান বাড়ির বাইরে ওদেরই বাড়ির দু’চারজন ছোকরা যারা পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রাস্তার অগুনতি সুন্দরীদের ঝাড়ি করছিল ফ্রাঙ্কো নিরো কি চার্লস ব্রনসন স্টাইলে, তাদের সঙ্গে করে নিয়ে এলাম না। আপশোশ হচ্ছিল খুব। রুনার সুগন্ধি কানের লতির পাশে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললাম,

– আর দেরি নয়। এবার দৌড় দিতে হবে।

রুনা হয়তো বলতও কিছু কিন্তু আমার হাতে বাঁধা পড়েছে ওর হাত। কুসুমকোমল যাকে বলে। সেই হাতে টান পড়ল। শুরু হল আমাদের সম্মিলিত দৌড়। রেডি-স্টেডি-গো।

পাশে পড়ে রইল ‘কমলা স্টোর্স’, ‘হিরন্ময় জুয়েলারি হাউস’। ঘাড় ফিরিয়ে আবার কাউকে দেখতে হবে, এখন আর এমন ভয় করি না। শক্ত করে রুনার হাত ধরে কাছে টানলাম ওকে। বললাম,

– এলাকায় এসে গেছি। আর কোনও ভয় নেই।

আস্তে আস্তে দুই পরাজিত সৈনিকের মতো বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম আমরা। পিছনে আর কোনও পায়ের শব্দ নেই। ওই তো সামনে হলুদ গেটওয়ালা অনিরুদ্ধ সিনহার বাড়ি। সিনহাদা’র পরই আমাদের সাতাশ’এর দুই, চণ্ডীতলা রোড-এর আস্তানা। বারান্দার আলো এখান থেকেও নজরে পড়ে বেশ।

তিন

রাতের ব্যাপারটাকে মনে মনে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলাম না। তা নইলে রুনাকে কি আর অমন করে কাছে পেতাম কোনওদিন। একেবারে সর্বস্ব নিয়ে কাছে আসা বোধহয় একেই বলে।

ভোর সত্যিই যে কত মনোরম হতে পারে এমন ঘোরতর কোনও রাত না কাটলে তা বোঝা যেত না। রাতে ঘরের তালা খুলে কখন ঢুকলাম, কখন অনুষ্ঠানবাড়ির পোশাক ছেড়ে আবার বিছানার পোশাকে ফিরলাম এসব এই ভোরে আর মনে করতে ইচ্ছা হল না।

শেষরাতে টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙেছে এটুকুই শুধু মনে করতে পারলাম। রুনার মোবাইলে সুন্দর সুরেলা আওয়াজ। হাত বাড়াতে ইচ্ছা করছিল না বলে ধরিনি। তার থেকে ঘুমন্ত রুনার কবিতার মতো ঠোঁটদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগছিল।

বসে বসে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছি, আবার ক্রিং ক্রিং… এবার ল্যান্ডলাইনে।

হাত গেল। রুনারই পছন্দ করা প্রিয়দর্শিনী রিসিভার উঠে এল হাতে। কোনও কথা না বলে শুধু ‘শুনলাম’ বলাই ভালো।

– হ্যালো রুনা, আমি আকাশ।

কেবল ‘হুঁ’ দিয়ে গেলাম। কে আকাশ, কী বৃত্তান্ত সেসব কথা এই ভোরের রাজেন্দ্রাণী উঠে জানাবে আমায়।

অফিস বেরোবার সময় শুধু আমার রুনের স্বপ্নালু চোখ দুটিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললাম,

– আকাশের ফোন এসেছিল।

– ওমা, সত্যি! কখন গো?

এত উচ্ছ্বাস ঝ’রে পড়ল রুনার গলায় যে না জিজ্ঞেস করে পারলাম না,

– কে আকাশ?

– সেকি তুমি আকাশকে চেনো না! রুনার চোখ গোল হয়ে গেল। যেন আকাশ রবিশংকরজি কিংবা রোনাল্ডো যে তাকে চিনতেই হবে। আরও হয়তো কথা বলতাম কিন্তু হাতের ঘড়ি এক মারাত্মক যন্ত্র। ঘাড় ধাক্বা দিয়ে অফিসে তাড়িয়ে নিয়ে গেল আমায়। বিয়ের পর এই কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবার দুপুরে আর বাড়িতে ফোন করলাম না।

সন্ধের একটু পরে অটো থেকে নেমে বাড়ির মধ্যে ঢুকে সিঁড়িতে পা রাখতে রাখতেই শুনতে পেলাম ড্রইংরুম থেকে ভেসে আসা রুনার হাসির শব্দ।

পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ালাম। সোফায় বসা রুনা তাকাল। অত্যন্ত রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে এলিয়ে বসে আছে সোফায়। শরীরের আঁচল নামক বস্তুটি অজান্তে কিংবা স্বজ্ঞানেই কখন প’ড়ে লুটোপুটি খাচ্ছে মেঝেয়। আর সেই শরীরের প্রখর তাপে দগ্ধ হয়ে চলেছে রুনার পায়ের কাছে ভক্তের মতো বসে থাকা এক ঝাঁকড়া চুলের ছোকরা। গায়ে অসংখ্য তারা আঁকা ‘গোয়া’ লেখা টি-শার্ট আর পরনে ডেনিম।

আমাকে দেখে হই হই করে উঠল রুনা,

– দ্যাখো কে এসেছে! আরে এ-ই তো আকাশ। আকাশ ঘোষদস্তিদার। ফেমাস আর্টিস্ট। আসলে, ঠাকুরদার একটা ছবি আঁকানোর ব্যাপারে –

ছোকরা কথার মধ্যেই তার মুগ্ধ চোখদুটি আমার দিকে ফেরাল। আমার আর শুনতে ইচ্ছে করছিল না। পর্দা ছেড়ে সিঁড়িতে বেশ কয়েকধাপ উঠে গেলাম তাড়াতাড়ি।

‘গাঙ্গুলিমশাই’-এর ছবি যে আঁকা হবেই, সেটা বুঝতে আমার বিন্দুমাত্র ভুল হল না আর।

 

দেবযানী

‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে

জানিনে জানিনে…’

– রিংটোনটা বেজে উঠতেই প্রদীপ্তর কাঁচা ঘুমে বাধা পড়ল। আচ্ছন্ন অবস্থায় কোনওমতে মাথার পাশে রাখা মোবাইলটা ধরতেই, ওপার থেকে মিষ্টি-মধুর স্বর কানে এল, ‘কনগ্র্যাচুলেশন্স। আমি জানতাম এবারের এগ্জামে তুই টপ করবি।’ দেবযানীর কথা শুনে আচ্ছন্ন প্রদীপ্ত একেবারে লাফিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।

‘কী বলছিস? আমি! আর ইউ জোকিং?’

‘না একেবারেই জোক করছি না। আমি জানি তুই লেট রাইজার। কাজেই বিনা কারণে তোর ঘুম ভাঙানোর কোনও প্ল্যান আমার ছিল না। ভাবলাম, সবার প্রথমে খবরটা আমিই দেব। তাই…’ খানিক থমকে একটু নিশ্বাস নিয়ে আবারও বলতে শুরু করল, ‘ওয়েক আপ বেবি। আজকের নিউজ পেপারটা দ্যাখো, চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে বুঝেছ। একেবারে ফ্রন্ট পেজে বড়ো করে ছবি।’

ততক্ষণে আনন্দে আত্মহারা প্রদীপ্ত বিছানা ছেড়ে খবরের কাগজটা খোঁজার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

‘ইন ফ্যাক্ট, আমি এতটা এক্সপেক্ট করিনি। ভেবেছিলাম, হবে কিছু একটা। যাক, এত ভালো একটা খবর দেওয়ার জন্য একটা ট্রিট তো হতেই পারে। আজ বিকেলে কী করছিস বল?’

‘সেরকম কিছু না। বাট তোর সঙ্গে যদি দেখা হয়, ভালোই লাগবে।’

‘ঠিক আছে, তাহলে আমাদের পছন্দের সেই টিট বিট কফিশপে বিকেল ৫টায়।’

‘ওকে চল। প্রচুর বকে ফেলেছি।’ বলেই ফোনটা রেখে দেয় দেবযানী।

দেবযানী আর প্রদীপ্ত সেই ছোট্টবেলার বন্ধু। স্কুলের সময় থেকে। প্রথম থেকেই প্রদীপ্ত ব্রিলিয়ান্ট। গ্র্যাজুয়েশনের পরে প্রদীপ্ত মাস্টারস্ ডিগ্রি আর দেবযানী কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন-কেই বেছে নেয়, নিজেদের কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রদীপ্তর বাবা নির্মলেন্দুবাবু প্রাইমারি স্কুলের টিচার। কাজেই প্রদীপ্তও খুব ভালোই জানে এই কম্পিটিশনের যুগে অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন না থাকলে চাকরি পাওয়া খুব মুশকিল। সংসার বলতে মা-বাবা, দুই বোন আর সে নিজে। আজকালকার দিনে তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সংসার চালানো একজনের পক্ষে সত্যিই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তার উপর নির্মলেন্দুবাবুর রিটায়ারমেন্ট-এর আর মাস ছয়েক মাত্র বাকি। বাবার পরে সংসারের সব দায়দায়িত্ব তারই। তাই সে চেয়েছিল গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর একটা চাকরি খুঁজতে। কিন্তু নির্মলেন্দুবাবুর তৎপরতায় সে আবারও পড়াশোনা শুরু করেছিল।

দেবযানীও যে পড়াশোনায় খারাপ তা নয়, র্যাংক না করতে পারলেও রেজাল্ট বেশ আশাপ্রদ, হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মেয়েটির। বড়োলোক পুলিশ অফিসারের একমাত্র মেয়ে। কাজেই আদরের তো হবেই।

ছেলেমেয়ের কারণে দুই পরিবারের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যের সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। প্রদীপ্তর মতো প্রমিসিং, ডিসেন্ট ছেলেকে কার না ভালো লাগে! দেবযানীর বাবা অভিমন্যুবাবুও বেশ পছন্দ করে তাকে। বাড়িতে আসা-যাওয়া সবই চলে।

আজ সকাল থেকেই যেন উড়ে বেড়াচ্ছে দেবযানী। কোনও এক অজানা খুশি ধরা পড়ছে তার চোখেমুখে। কেবলই বারে বারে ঘড়ির দিকে চোখ চলে যাচ্ছে তার। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই মহাক্ষণের আবির্ভাব। কথামতো ঠিক বিকেল পাঁচটায় কফিশপে টেবিলে বসে কিছু স্ন্যাক্স অর্ডার দেওয়ার পর টুকটাক কথা চলতে থাকে তাদের মধ্যে। ‘তারপর? পরের প্ল্যান কী? কী ভাবছিস?’ প্রশ্ন করে দেবযানী।

‘যদি মন থেকে বলি, তাহলে তো পোস্ট ডক্টরেট-ই বলব, কিন্তু আমার ফিনান্সিয়াল কনডিশন তো তোর অজানা নয়। বাবার রিটায়ারমেন্ট-এর আর মাস কয়েক মাত্র বাকি। কাজেই ফ্যামিলিকে সাপোর্ট করার একটা ব্যাপার তো আছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা চাকরি…’ কথাগুলি বলতে বলতে বেশ উৎকন্ঠিত হয়ে ওঠে প্রদীপ্ত।

‘দ্যাখ যদি তুই বলিস, তাহলে বাবার সঙ্গে একবার কথা বলতে পারি। এব্যাপারে একমাত্র বাবাই তোকে হেল্প করতে পারে।’ হেজিটেট করতে করতে কথাটা বলেই ফেলে দেবযানী।

‘মনে হয় না বাবা এটা মেনে নেবেন! বাবাকে তো জানিস, সারাজীবন নিজের আদর্শে চলে এসেছেন। যাক এখন এসব ছাড়, প্রয়োজন পড়লে দেখা যাবে।’ বলেই প্রদীপ্ত বরাবরের মতো দেবযানীর নাকটা ধরে নাড়িয়ে দেয়। দেবযানীও আগের মতোই রিঅ্যাক্ট করে ওঠে, ‘তুই না যা তা, অভ্যাস যাবে না – না।’ বলেই হেসে ওঠে। এভাবেই আরও বেশ কিছুক্ষণ খুনশুটি চলার পর যে যার বাড়িতে।

দেখতে দেখতে আরও বেশ কয়েকটা মাস কেটে যায়। এরই মাঝে প্রত্যহ বিভিন্ন পেপার থেকে কর্মখালি দেখে নিয়ম করে ইন্টারভিউ দেওয়া একপ্রকার রুটিন হয়ে গিয়েছে প্রদীপ্তর। আশ্চর্যের বিষয় মেধাবী অ্যাকাডেমিক রেকর্ড হওয়া সত্ত্বেও চাকরির শিকে ছিঁড়ল না। এই বিফলতা প্রদীপ্তকে হতাশ করে তুলছিল।

কোনও আশা না দেখে পাড়ার এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসারকে চাকরির জন্য ধরেছিল সে। লাখ চারেক টাকার বিনিময়ে তিনি একটা চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অসম্ভব জেনেও একটা শেষ চেষ্টা করতে বাবার কাছে কথাটাও পেড়েছিল প্রদীপ্ত। শোনামাত্রই তিনি নাকচ করে দেন। প্রথমত এটা তাঁর আদর্শ বহির্ভূত, দ্বিতীয়ত এতগুলো টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্যও ওনার নেই। সারাজীবনে একটু একটু করে যতটুকু জমিয়েছেন, তাতে কোনওমতে এক মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায়। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রদীপ্তর মা অনুভাদেবী নিজের গয়নাও বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন। বাধ সাধেন নির্মলেন্দুবাবু। তিনি আজও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, প্রদীপ্ত যথেষ্ট মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট, সুতরাং সে ভালো চাকরি পাবেই। এরপরে প্রদীপ্ত এব্যাপারে আর কোনওদিন একটি বাক্যও ব্যয় করেনি। দিনের পর দিন হতাশা তাকে আরও ঘিরে ধরেছে।

ভালো চাকরির খোঁজে এতদিন সে কোনও ছোটোখাটো চাকরির কথা ভাবেইনি। অবশ্য প্রদীপ্তর বাবা-মাও এর জন্য কিছুটা দায়ী। এত ভালো স্টুডেন্ট কেন যা-তা কাজ করবে। বরং তারা সবসময় এনকারেজ করেছে, এখনই ভেঙে পড়ার মতো কিছু হয়নি। ভরসা রাখো, ধৈর্য্য ধরো, ফল হাতেনাতে পাবে।’

ছোটো থেকেই গাড়ি মেরামতের কাজটা সে ভালোই পারত। গরমে স্কুল ছুটি পড়লেই সোজা মুর্শিদাবাদ। মামার বাড়ি। বাড়ির নীচেই মামার মোটর পার্টস আর রিপেয়ারিংয়ের দোকান। কাজেই মামাবাড়ি গেলেই খাওয়াদাওয়া, ঘুম বাদ দিয়ে সর্বক্ষণ ওই দোকানে। পুরোনো সেই অভিজ্ঞতাটাই কাজে এল আজ। কেষ্টদার গ্যারেজে একটা মেকানিকের পোস্ট খালি ছিল। বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হাইওয়ের পাশেই। একটু ফাঁকা বটে, কিন্তু মাসিক মাহিনা হিসাবে হাজার পাঁচেক তো পাওয়া যাবে। সেই ভেবেই কাজে লাগা। শুধু তাই নয় যথাযথ কাজ দেখাতে পারলে সময়ের সঙ্গে টাকাও বাড়বে। এতদিন পরে চাকরিটা পেয়ে প্রদীপ্ত সত্যিই খুব খুশি হয়েছে। অন্তত মানসিক শান্তি তো পেয়েইছে। খুশি হতে পারেনি দেবযানী। কোথাও গিয়ে যেন তার মনে হয়েছে প্রদীপ্ত এর থেকে অনেক ভালো চাকরি পেতে পারত। কিন্তু তৎসত্ত্বেও প্রদীপ্তকে কিছু বুঝতে দেয়নি সে। হয়তো বহুদিন পরে বন্ধুর ঠোঁটের কোণে একটু হাসি দেখে।

কয়েকদিনের মধ্যেই প্রদীপ্ত, মালিকের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল। ওভারটাইম করে আরও কিছু টাকা বাড়তি উপায় করতে শুরু করল সে। নিজের খরচের পাশাপাশি সংসারে যৎসামান্য টাকা দিতে পেরে মনে মনে খুশিই হতো।

এক কনকনে শীতের সকালে প্রদীপ্ত সবেমাত্র ওয়ার্কশপে পৌঁছেছে। তখনও অন্য কর্মচারীরা এসে পৌঁছোয়নি। সেদিন অবশ্য এক সরকারি অফিসারের গাড়ি ডেলিভারি দেওয়ার কথা। তাই সাতসকালে হাজির হতে হয়েছিল তাকে। শাটার তু্লে সামনে সারিয়ে রাখা সরকারি গাড়িটা ট্রায়াল দেবার জন্য বার করতে যাবে কী দুই আগন্তুক হন্তদন্ত হয়ে গ্যারেজের ভিতর ঢুকে মালিকের খোঁজ করতে শুরু করল। প্রদীপ্ত তাদের জানাল, ‘মালিক এত তাড়াতাড়ি আসেন না। কী দরকার আমাকে বলতে পারেন।’

প্রত্যুত্তরে তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, ‘আমাদের এক বন্ধু আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। ইমিডিয়েট একটা গাড়ি দরকার।’

‘ক্ষমা করবেন, এব্যাপারে মালিকের অনুমতি ছাড়া আমি সাহায্য করতে পারব না। না বলে গাড়ি বার করা তো অসম্ভব। একটু অপেক্ষা করুন ওনাকে ফোন করছি। উনি কাছেই থাকেন, সঙ্গে সঙ্গে চলে আসতে পারবেন।’ বলেই প্রদীপ্ত পকেট থেকে ফোনটা বার করতে যাবে কী দুজনেই তারস্বরে বলে উঠল, ‘আমাদের বন্ধুর যা সিরিয়াস কন্ডিশন, তাতে এক মিনিটও অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। যে কোনও মুহূর্তে অঘটন ঘটে যেতে পারে। আর আপনি…’

‘ওকে, সেক্ষেত্রে আপনাদের হসপিটালে ড্রপ করেই আমি চলে আসব।’

আইডিয়াটা যে তাদের মনোমতো হয়নি তা তাদের চোখমুখ দেখেই বুঝে গিয়েছিল প্রদীপ্ত। কিন্তু অসময়ে মানুষের পাশে না দাঁড়ানোটাও তো অমানবিক। শুধু তাই নয় দুজন লোকও তো সমানে প্রেশার ক্রিয়েট করে চলেছে। খানিক চাপে পড়েই গ্যারেজ থেকে একটা সাদা রঙের অ্যাম্বাসাডার বার করতে যাবে কী, দুজনের মধ্যে একজন একটু নরম সুরেই বলল, ‘দাদা সরকারি গাড়িটা নিয়ে চলুন, নয়তো রাস্তায় হ্যারাস হতে হবে। সরকারি গাড়ি দেখলে পুলিশ কোথাও আটকাবে না। বুঝতেই তো পারছেন, এখন যত তাড়াতাড়ি ছেলেটাকে হসপিটালাইজ্ড করা যায় ততই ভালো।’

‘কিন্তু দাদা ওটা সকাল এগারোটার মধ্যে যে ডেলিভারি দিতে হবে।’ প্রত্যুত্তরে জবাব দেয় প্রদীপ্ত।

কথা কেটে তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে, ‘আরে দাদা তার অনেক আগেই আপনি গ্যারেজে রিটার্ন চলে আসবেন। আপনি তো শুধু আমাদের হসপিটালে পৌঁছে দিয়েই…।’

অগত্যা সরকারি গাড়িটায় চেপে বসল তারা। খানিক এগোনোর পরেই প্রদীপ্তর চোখে পড়ল রাস্তার পাশে একজন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। গাড়িটা সেখানে থামাতেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল প্রদীপ্তর। ‘আপনারা যে বললেন অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে! এর তো গুলি লেগেছে। গুলি লাগল কী করে?’

প্রদীপ্তর প্রশ্নে একজন বেশ ধমক দিয়েই বলল, ‘এসব জানার অনেক সময় রয়েছে। আপনাকে যা বলছি তাই করুন। গাড়িতে বসুন।’ বলেই দুজনে মিলে চ্যাংদোলা করে গাড়িতে তুলল ওই আহত ব্যক্তিটিকে। তারপরে প্রদীপ্তকে আদেশের ভঙ্গিতে বলল, ‘খানিক গিয়ে জঙ্গলের দিকে ইউ-টার্ন নেবেন।’

এমনিতেই গুলি লাগার ব্যাপারটায় একটা খটকা ছিল প্রদীপ্তর। তার উপর এখন জঙ্গলের পথ ধরে, বেঁকে বসল প্রদীপ্ত। ‘এক পাও নড়ব না আমি। তখন থেকে আপনারা মিসগাইড করে চলেছেন। প্রথমে বললেন অ্যাকসিডেন্ট, পরে দেখা গেল গুলি খেয়েছে। আর এখন বলছেন জঙ্গলের পথ ধরে যেতে, যেখানে হাসপাতালের নামগন্ধ নেই। নেমে যান আপনারা গাড়ি থেকে।’

কথাটা শোনা মাত্রই তাদের মধ্যে একজন পকেট থেকে রিভলবার বার করে প্রদীপ্তর মাথায় ঠেকিয়ে, ‘অনেক ড্রামা করেছিস। যা বলছি তাই কর, নইলে একেবারে জানে মেরে দেব।’

আমতা আমতা করতে করতে জঙ্গলের পথই ধরতে বাধ্য হল সে। প্রায় ঘন্টা-আড়াই পথ অতিক্রম করার পর ঘন গভীর অরণ্যে একটা আউট হাউসের সামনে গাড়িটা দাঁড় করাতে বলল তারা। গাড়িটা থামাতেই একজন আর একজনকে প্রশ্ন করল, ‘এবার কি আমরা নামতে পারি?’

অন্যজন কমান্ডোর মতো জবাব দিল, ‘একটু অপেক্ষা কর, আগে আমি দেখে আসি ডাক্তারবাবু আছেন কিনা। তারপরে নামাস।’

ওদিকে প্রায় বেলা এগারোটা বেজে গেছে। মালিক গ্যারেজে এসে তাকে আর গাড়ি দেখতে না পেলে বেজায় চটে যাবেন। ভাববেন সে হয়তো কী না কী করে বসে আছে, হয়তো চোরও… ভেবে আঁতকে ওঠে প্রদীপ্ত। তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকে।

‘এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, আমরা পলিটিকাল অ্যাক্টিভিস্ট, ওই আপনাদের ভাষায় টেররিস্ট। সমাজের সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা যারা দিনের পর দিন খর্ব করে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। লড়াই সিস্টেমের বিরুদ্ধে। অযথা ভয় পাবেন না, আমাদের কাজ হয়ে গেলেই আপনাকে ছেড়ে দেব। জানেনই তো আমাদের এক কমরেড এনকাউন্টারে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। যতক্ষণ না সেটা বার করা যায়, ততক্ষণ আপনাকে আমাদের সঙ্গে থাকতেই হবে। আমাদের মুভমেন্টের জন্য সরকারি গাড়ির ট্যাগটাই আমাদের হেল্প করবে। চতুর্দিকে টিকটিকির তো অভাব নেই।’ প্রদীপ্ত বুঝে গিয়েছিল যিনি কম্যান্ডারের মতো আদেশ দিচ্ছিলেন তিনিই এদের গ্রুপ লিডার। অগত্যা তাদের নির্দেশ মানা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না প্রদীপ্তর।

গ্রুপ লিডার ওই আউট হাউসের মধ্যে প্রবেশ করার মিনিট দুয়েক পরেই আবার বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে স্ট্রেচার নিয়ে এক সুদর্শন যুবক। গাড়ি থেকে আহত ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে আউট হাউসের ভিতরে দিয়ে এসে বাইরে অপেক্ষা করতে শুরু করলেন। ওই ডাক্তারও যে উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী, তা আর বুঝতে বাকি রইল না প্রদীপ্তর। অপারেশন করতে অন্তত ঘন্টা-দুয়েক তো লাগবেই, সেই ভেবে আউট হাউসের পাশেই একটা জায়গায় বসে পড়ল সে। সেই ফাঁকেই আলাপ সুদর্শন যুবকটির সঙ্গে। নাম জেমস্। প্রায় প্রদীপ্তেরই সমবয়সি। কিছুক্ষণের আলাপে হাসিখুশি জেমস্কে দেখে সাহসে ভর করে প্রশ্ন করেই ফেলল প্রদীপ্ত, ‘সমাজের মূল স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে এই উগ্রপন্থা কেন?’

ঠোঁটের কোণায় খানিক হাসি নিয়ে জেমস্ জবাব দিল, ‘প্রায় দু’বছর আগের ঘটনা। চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছি। কেবল হতাশই হয়েছি। কাউকে পাশে পাইনি। অবশেষে এই পথ বেছে নেওয়া। অনেকে আমাদের দেশদ্রোহী বলেন, কিন্তু আমাদের এই লড়াই সমাজের পরিবর্তন আনার জন্য। জানি এতে জীবনও যেতে পারে।’ জেমসের বৈপ্লবিক যুক্তিগুলো নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করছিল প্রদীপ্ত। কথামতো ঘন্টাদুয়েক পরে ওয়ার্নিং দিয়ে প্রদীপ্তকে ছেড়ে দেওয়া হল। ততক্ষণে সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়েছে। গ্যারেজে পৌঁছেই একেবারে মালিকের তোপের মুখে। তিনি প্রদীপ্তর কোনও কথা শুনতেই রাজি নন। সাফ জানিয়ে দেন তার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন লোককে কাজে রাখবেন না।

অনেক কষ্টে একটা কাজ যোগাড় করেছিল সে। সেটাও যদি চলে যায়– সেই ভেবে প্রদীপ্তের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। বারবার অনুনয়-বিনয় করতে থাকল। কিন্তু মালিক তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। সে খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছিল, কোনও কিছুতেই চিঁড়ে ভিজবে না। অগত্যা গাড়ি রেখে বেরিয়ে পড়ল। মাথায় হাজারো চিন্তা। বাড়িতে গিয়ে কী বলবে? চাকরি নেই! আবার বেকারত্ব! সংসার চলবে কী করে?

মনে পড়ে জেমসের কথা। রওনা দেয় আউট হাউসের দিকে। ভাবে অন্তত বাবার ঘাড়ে তো বসে থাকতে হবে না, নিজেরটা নিজে চালিয়ে নিতে পারবে।

কাজের কারণে অনেক সময়তেই রাতে গ্যারেজে থেকে যেত প্রদীপ্ত। বাড়ির লোক ভাবল, আজও হয়তো কাজের চাপে থেকে গেছে। কিন্তু সকালেও না ফেরায় চিন্তায় পড়ে যায় তার বাবা-মা। গ্যারেজের মালিক জানিয়ে দেন তিনি জানেন না। ছেলের খোঁজ না পেয়ে থানায় ডায়ারি করেন নির্মলেন্দুবাবু।

এর মধ্যে আর এক দুর্ঘটনা। উগ্রপন্থী হানায় মারা যান দেবযানীর বাবা ইন্সপেক্টর অভিমন্যু। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সবাই পাশে এসে দাঁড়ায় দেবযানীর, শুধু আসেনি সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি। দেবযানী ভেবেছিল প্রদীপ্ত হয়তো খবরই পায়নি। নাহলে সবার আগে সে-ই ছুটে আসত।

কিছুদিন পর বাবার চাকরিটা পায় দেবযানী। প্রথম পোস্টিং পুরুলিয়ার পুলিশ হেড কোয়ার্টারে। ইয়ং এসপি রাহুল মুখার্জির অধীনে। শুরু থেকেই কাজের প্রতি মনোযোগী দেবযানী। মাঝেমধ্যে অফিস আওয়ার্স-এর পরেও থেকে যেত কাজের জন্য। দেবযানীর বাবাও খুব হার্ডওয়ার্কিং মানুষ ছিলেন। পুলিশ মহলে বেশ সুনাম ছিল। দেবযানীর মধ্যেও যা ভীষণ রকম ছিল। ওর এই একাগ্রতা টানত রাহুলকে। ক্রমে সে ভালোবেসে ফেলে দেবযানীকে। কিন্তু কোনওদিন মুখ ফুটে বলতে পারেনি সে কথা। দেবযানীর মনজুড়ে তখনও প্রদীপ্ত। তার দৃঢ় বিশ্বাস, একদিন না একদিন সে ঠিক ফিরে পাবে তার মনের মানুষটাকে। পুরুলিয়ায় সেই সময় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অতি সক্রিয়। রাহুলের মূল দায়িত্বই ছিল টেররিজ্ম উৎখাত করা। আর এদের কেউ যদি সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে চায়, তাদের সরকারিভাবে সবরকম সাহায্য করা। তাদের পাশে দাঁড়ানো। প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের কথা বলা। তাদের বোঝানো। হিংসা কখনওই কোনও সমস্যার সমাধান হতে পারে না। তার জন্য আলোচনায় বসা যেতে পারে। তবেই দেশের এবং দশের উন্নতি সম্ভব।

ওই গোষ্ঠীর-ই এক সদস্য স্বরাজ দলের কিছু কিছু নীতিগত কারণে উগ্রপন্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল। কথায় কথায় গুলিগোলা, হানাহানি, খুন-জখম সে আর নিতে পারছিল না। অনেক দিন থেকেই একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। নতুন এসপি রাহুলের নাম তখন সর্বজনবিদিত। ঠিকই করে রেখেছিল সুযোগ বুঝেই একদিন সে চম্পট দেবে। কিন্তু তবুও একটু আশ্বস্ত হওয়া দরকার। সেইমতো একদিন পুলিশেরই এক কর্মী জয়ের সহায়তায় আত্মসমর্পন করার আগে এসপি রাহুলের সঙ্গে দেখা করে।

সহকর্মী দেবযানী এবং জয়কে নিয়ে রাহুল গোপনে একটি জায়গায় দেখা করে স্বরাজের সঙ্গে। নির্ভয়ে এসপি রাহুলের কাছে তাদের গোষ্ঠী সম্পর্কিত সমস্ত কার্যকলাপ তুলে ধরে স্বরাজ। আরও জানায়, কীভাবে শিক্ষিত ইয়ং ছেলেগুলোকে মিসগাইড করে ব্যবহার করছে তারা। মাস্টারর্স ডিগ্রিতে ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট হয়েছে, এমন ছেলেও রয়েছে তাদের সংগঠনে।

‘মাস্টারর্স ডিগ্রিতে ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট,’ কথাটা শুনেই চমকে ওঠে দেবযানী। কোনও এক অশনিসংকেত যেন ভেসে বেড়ায় তার মনের কোণে। বারবার মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকতে থাকে সে, যেন ভুল হয়। তার মন যা বলছে, তা যেন সঠিক না হয়। ওদিকে তখনও কথা চলে রাহুল আর স্বরাজের মধ্যে। সেখানে সশরীরে উপস্থিত থেকেও কোথাও যেন হারিয়ে যায় সে। কোনও কথা কানে আসে না তার। অবশেষে রাহুল যখন উঠে দাঁড়িয়ে স্বরাজকে আশ্বস্ত করে, প্রতিশ্রুতি দেয় সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসার জন্য সবরকম সাহায্য করা হবে তাকে, তখন সম্বিত ফেরে দেবযানীর।

খানিক পরে রাহুলকে অন্যদিকে ডেকে গিয়ে জয়ের সঙ্গে কিছু কথা বলতে শুরু করে। সেই ফাঁকে দেবযানী স্বরাজকে বেশ উৎকণ্ঠিত হয়েই জিজ্ঞাসা করে, ‘দেখুন আপনাকে ফোর্স করব না, যদি খুব কনফিডেন্সিয়াল না হয়, তাহলে এসপি রাহুলকে যার সম্পর্কে বলছিলেন, তার নামটা কী বলা যায়? প্রমিস করছি ব্যাপারটা আমাদের মধ্যেই থাকবে।’

‘দেখুন গ্রুপের অন্যান্যদের নাম ডিসক্লোজ করাটা আমাদের এথিক্স-এর বিরুদ্ধে, অন্তত যতদিন এই দলের সঙ্গে যুক্ত আছি। হ্যাঁ একদিন স্যারেন্ডার করব এটা সত্যি।’ স্বরাজের কথায় বেশ বিমর্ষ দেখাল দেবযানীকে। হতাশ হয়ে সে বস রাহুলের দিকে পা বাড়াতে যাবে, স্বরাজ তাকে ডাকল, ‘শুনুন, জানি না কেন, আমাদের এথিক্স-এর বাইরে গিয়ে আপনাকে বলতে ইচ্ছে করছে। অনেকের নাম হলে হয়তো বলতাম না, যেহেতু নির্দিষ্ট মাত্র একজনেরই নাম জানতে চাইছেন, তাই বলছি। কিন্তু দয়া করে কাউকে বলবেন না। ওর নাম প্রদীপ্ত। বছর দুয়েক আগে ইউনিভার্সিটিতে টপ করেছে।’

ভীষণভাবে ধাক্বা খেল দেবযানী। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকল সে। তার অবস্থা দেখে স্বরাজ বলে উঠল, ‘কী হল? আপনাকে এমন ডিস্টার্বড্ দেখাচ্ছে কেন?’

‘আমি একটিবার প্রদীপ্তর সঙ্গে দেখা করতে চাই। আপনি আমাকে সাহায্য করবেন?’ অনুরোধ করে দেবযানী।

‘সত্যি কথা বলতে কী আমিও জানি না এখন সে কোথায়। দীর্ঘদিন তার সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ নেই। এনিওয়ে, আমি জানার চেষ্টা করছি, এই মুহূর্তে একজনই তার সঠিক ঠিকানা বলতে পারে।’

‘কে সে? কোথায় গেলে তাকে পাব?’ প্রশ্ন করে দেবযানী।

‘অমর। ওর আন্ডার-এই প্রদীপ্ত কাজ করত।’

‘কিন্তু ওনার সঙ্গে দেখা করব কীভাবে?’

‘সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। কাল বিকাল পাঁচটার সময় সীমান্তবর্তী জঙ্গলের পাশে দাঁড়াবেন। উনিই দেখা করে নেবেন আপনার সঙ্গে।’ এমন সময়ে ফের রাহুলের উপস্থিতিতে কথা বন্ধ হয়ে যায়।

কথামতো পরদিন বিকেল পাঁচটায় দেখা হয় তাদের। প্রদীপ্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে অমর, দেবযানীকে জানায়, ‘হ্যাঁ প্রদীপ্ত আমাদের দলের সঙ্গেই যুক্ত। তবে এই মুহুর্তে তাকে স্পেশাল অপারেশনে দূরবর্তী স্থানে পাঠানো হয়েছে। সে ফিরলেই আপনার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেব, তবে তার পরিবর্তে আমাদেরও কিছু কাজ আপনাকে করে দিতে হবে।’

‘আপনাদের কাজ?’ অবাক দেবযানী পালটা প্রশ্ন করে।

‘হ্যাঁ, আপনি খোদ পুলিশের হেড কোয়ার্টারে কাজ করেন। সুতরাং গোপন তথ্য বের করে আনা আপনার পক্ষে কঠিন নয়।’

শুনে আঁতকে ওঠে দেবযানী। কঠোর ভাবে জবাব দেয়, ‘একাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। স্যার আমাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করেন, সে বিশ্বাসের অমর্যাদা আমি করতে পারব না। আর এটা আমার জবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাও।’

‘ওকে, তাহলে প্রদীপ্তকে ভুলে যান। বাই দ্য ওয়ে কোন এথিক্সের কথা বলছেন? দেশ যা আমাদের উপহার দিয়েছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শোষণ?’ ক্ষুব্ধ গলায় বলে অমর।

দেবযানীও চুপ করে থাকে না। বলে, ‘তার মানে এই নয়, যে আপনারা অস্ত্র তুলে নেবেন। সমস্যা সমাধানের আরও অনেক রাস্তা আছে।’

দেবযানীকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে অমর বলে, ‘তর্ক করে লাভ নেই, যা বলার বলে দিয়েছি। এবার আপনিই ঠিক করুন কী করবেন।’

প্রদীপ্তকে বাঁচাতে দ্বিতীয় কোনও পথ নেই বুঝে যায় দেবযানী। তার ভালোবাসা ফিরে পেতে অমরের শর্তে রাজি হয়ে যায় সে। সেইমতো নিয়মিত গোপন তথ্য তুলে দিতে থাকে মাওবাদীদের হাতে। ওদিকে রাহুলও বুঝে পায় না কীভাবে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। আশপাশের বেশ কয়েকজনকে সন্দেহের নজরে দেখলেও দেবযানীর কথা মনের কোণেও আসে না তার।

এইভাবেই কেটে যায় আরও দুটো মাস। কিন্তু প্রদীপ্তর দেখা মেলেনি। বারবার অমরকে জিজ্ঞাসা করেছে দেবযানী। কিন্তু তার সেই একই কথা, খুব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ফিরে আসবে প্রদীপ্ত। কিন্তু একসময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় দেবযানীর। স্পষ্ট জানিয়ে দেয় সাতদিনের মধ্যে প্রদীপ্ত ফিরে না এলে সংগঠনের আর কোনও কাজ করবে না সে।

এরপর আসল সত্যটা সামনে আসে। দেবযানী তার অবস্থানে অটল দেখে এগিয়ে আসে অমরেরই গ্রুপের এক দলীয় কর্মী। জানায়, মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে তাকে। প্রদীপ্ত অনেক দিন আগেই মারা গেছে। নির্দেশ অমান্য করায় অমরই গুলি করে মারে প্রদীপ্তকে।

নিমেষে অন্ধকার নেমে আসে দেবযানীর দুচোখে। হতভম্ব হয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি নিশ্চিত প্রদীপ্ত আর নেই।’ সদস্যটি জানায়, ঘটনাটা তার সামনেই ঘটেছিল। ‘ব্লু-হিলস্ অপারেশনে’ প্রদীপ্তকে দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশি কনভয়ের উপরে হামলা চালানোর জন্য। আর এই কনভয়ের নেতৃত্বে ছিলেন দেবযানীর বাবা অভিমন্যুবাবু। রাজি হয়নি প্রদীপ্ত। জীবন দিয়ে যার মাশুল গুনেছিল সে।’

মুহুর্তের জন্য ভেঙে পড়লেও নিজেকে সামলে নেয় দেবযানী। ঠিক করে ফেলে পরবর্তী পদক্ষেপ। রিভেঞ্জ। বাবার এবং প্রদীপ্তর মৃত্যুর বদলা তাকে নিতেই হবে। অমরকে ছাড়া যাবে না।

পরের দিন সকালে অমরের ডেরা ঘিরে ফেলে বিশাল পুলিশবাহিনী। যার নেতৃত্বে রাহুল মুখার্জি। চার ঘন্টার অপারেশনে ধরা পড়ে অমর ও তার দলবল। মারা যায় দুজন অ্যাক্টিভিস্ট-ও। বিপুল পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। আর এই সফল অপারেশনের পুরো কৃতিত্বটাই দেওয়া হয় রাহুল মুখার্জিকে। সরকারের তরফে রাহুলের নাম বিশেষ সম্মানের জন্য প্রস্তাব করা হয়। যদিও রাহুল জানত কৃতিত্বটা কার। পরের দিন কৃতজ্ঞতা জানাতে দেবযানীর বাড়িতে যায় রাহুল। জিজ্ঞাসা করে কী করে জঙ্গিদের এত খবর জানল সে। সত্যিটা আর আড়াল করতে পারেনি দেবযানী। ভেঙে পড়ে সে। জানায় তার ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য সে কত বড়ো অপরাধ করেছিল। অমরের হাতে তুলে দিয়েছিল সরকারি গোপন নথি। যার জন্য তার শাস্তি প্রাপ্য, প্রশংসা নয়।

‘আমাকে অ্যারেস্ট করুন, শাস্তি দিন।’ ডুকরে ওঠে দেবযানী।

দেবযানীর কান্না দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি রাহুল। মেলে ধরেছে দেবযানীর কাছে, ‘বিশ্বাস করো স্বপ্নেও ভাবিনি এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হব। প্রথম থেকেই মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে। কিন্তু সাহস করে বলে উঠতে পারিনি। যাকে ভালোবাসায় অ্যারেস্ট করতে চেয়েছি, তার হাতে হাতকড়া পরানো আমার দ্বারা সম্ভব নয়। এতদিন যা বলতে পারিনি তা আজ বলছি, তোমাকে ভালোবাসি। বিয়ে করতে চাই।’

উত্তরে দেবযানী বলে, ‘না স্যার আমি আপনার যোগ্য নই। দেশ এবং কাজের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি আমি। আমি অপরাধী। আমার শাস্তি হওয়া উচিত। আমার জীবনের সঙ্গে আপনাকে জড়াতে চাই না। বরাবর আপনার কথা শোনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজ পারব না। আমাকে অ্যারেস্ট করুন।’

পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্ট-দের কাছে সরকারি গোপন তথ্য পাচারের জন্য পাঁচ বছরের জেল হয় দেবযানীর। রাহুল কিন্তু হার মানেনি। পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছে দেবযানীর জন্য। নিয়মিত জেলে দেখা করেছে দেবযানীর সঙ্গে। ভরসা জুগিয়েছে। স্বপ্ন দেখিয়েছে নতুন জীবনের। সঙ্গে এও জানিয়েছে, সে-ই তার জীবনের প্রথম ও শেষ নারী।

ছুটি

হঠাৎ গোঁ ধরেছিল ছেলেটা। কাল থেকে অ্যানুয়াল পরীক্ষা শুরু, কিন্তু কিছুতেই পড়তে বসবে না। বিকেলে খেতে খেতে নিনজা হাতোড়ি, ছোটা ভীম, বেনটেন রোজকার মতো কালও অনুমোদন করা হয়েছে। খাওয়ার ছলে বেশ খানিকক্ষণ টিভি দেখতে থাকে এমনিতেই। কিন্তু কাল ওকে বোকাবাক্সের সামনে থেকে নড়ানোই যাচ্ছিল না। লিটারেচারের কী বিরাট সিলেবাস। অত প্রশ্নোত্তর, শব্দার্থ, ইডিয়ামস, কবিতা, বানান– তিথি নিজেও মনে রাখতে পারত কিনা সন্দেহ। আর রন্তির ভ্রূক্ষেপ নেই। দশ পূর্ণ হল। ক্লাস ফাইভে উঠবে। ছেলের নিজেরও তো গরজ থাকবে। তা নয়। মা চামচে মেখে গিলিয়ে না দিলে এক বর্ণ পড়বে না। আধাখ্যাঁচড়া প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষার আগের দিন নিশ্চিন্তে কার্টুনে ডুবেছিল।

অনেকক্ষণ বোঝানোর পর পিঠে একটা চাপড় বসায় তিথি। এমন দুর্বিনীত ছেলে, মাকেই উলটে আক্রমণ করে। তবে রে? ছেলেকে এলোপাতাড়ি মেরে ধরে শোবার ঘরে টেনে নিয়ে যায় মা। যার জন্য নিজের প্রিয় ধারাবাহিক ছেড়ে দিচ্ছে, তার একটু হুঁশ থাকবে না? উলটে মাকে মার? ভাগ্যিস শাশুড়ি ওই সময় ফ্ল্যাটে ছিলেন না।

মার খেয়ে রন্তি আরও গোঁয়াড় হয়ে উঠল। এমন বিশ্রী জেদ, আদর করে ভুলিয়েও গলানো গেল না। বাবা অফিস থেকে ফিরেছে ছেলের জন্য বেনটেন কমিক্স আর এক প্যাকেট হিমায়িত চিকেন কাটলেট নিয়ে। কী আক্বেল। পড়ানোর বেলা গোল্লা, পরীক্ষার আগে এমন বিনোদনের বই কেউ কেনে? সাধারণত যেদিন এই ধরনের খাদ্য আসে, সেদিনই ভেজে উদ্বোধন করা হয়। ছেলে বই নিয়ে সদ্য বসেছে, আর দেরিও হয়ে গেছে। তাই বলল, ‘আজ থাক, কাল ভালো করে পরীক্ষা দাও। কাল ভেজে দেব। আর পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে যা চাইবে তাই দেব। সোনা বাবা আমার, পোয়েমদুটো লিখে দেখাও তো। ওগুলো থেকে ফিল ইন দি ব্ল্যাঙ্কস আসবে না? কমা ফুলস্টপ, সেমিকোলন সব ভালো করে দেখে নাও।’

‘কোলন আর ড্যাশও আছে। টু আ বাটারফ্লাই আমার মুখস্থ।’ অসন্তুষ্ট গলায় গজগজ করল রন্তি। তারপর দুটো মাঝারি কবিতা লিখতেই সাড়ে ন’টা বাজিয়ে দিল। প্রায় পঞ্চাশখানা প্রশ্নোত্তর ঝালানো বাকি। তাছাড়া সাহিত্যের টেক্স্ট থেকেও ব্যাকরণের প্রশ্ন আসে। সবই করিয়েছে তিথি একবার করে। কিন্তু পরীক্ষার আগে না দেখলে? ছেলের ঠাকুমা বলেন, ‘ও সব পারবে’। বাবা বলে, ‘বাদ দাও’।

অগত্যা জেনারেল লি’র অধিনায়কত্বে খ্যাঁদা-নেকো জাপানিদের তাকেশি’স কাসল অভিযান দেখতে দেখতে খাবার টেবিলের বদলে সেন্টার টেবিলে ডিমের ঝোল ভাত মেখে রন্তিকে গিলিয়ে দিল। খাওয়ার ব্যাপারে রন্তিকে সাধতে হয় না। কিন্তু আজ একে মার-বকুনি, তার ওপর আলু-পটল দিয়ে ডিমের ডালনা। মুখে মুখে প্রশ্নোত্তর ধরতে গিয়ে দেখল ছেলে হাঁ করে হাড়গোড় গুঁড়োনো খেলার একশো সাতান্নতম রিপিট টেলিকাস্ট আর ভাত গিলছে। মায়ের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না একটাও। চুলের মুঠি ধরে একবার নাড়া দিয়ে থালা হাতে উঠে গেল তিথি। ‘ব্রাশ করে সোজা বিছানায় যা। আইদার টেক্স্ট বুক, কিংবা ঘুম। কমিকস্ খুলতে দেখলে ছিঁড়ে ফেলব।’

রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত গোঁজ মারা ভাবটা কমেনি। ঠাকুমার রসিকতায় জবাব দিল না। মা মেরেছে তাই বাবার আদরে ভুলবে না। ফুঁপিয়ে কেঁদে বালিস ভিজিয়েছে। তিথি রান্নাঘর, টেবিল ফ্রিজ, কোলাপ্সিব্ল গেটে তালা, বসার ঘরের আলো-পাখা, রাতের গা ধোয়া ইত্যাদি সেরে এসে দেখে বাপ নাক ডাকাচ্ছে। ছেলে বাবার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তিথি আর মনোময় দুজনেই লম্বা দোহারা। ছেলেটার এখন থেকেই কী সুন্দর সুঠাম দেহ। মায়ের চোখ ডাইনির চোখ। নিজেকে শাসন করল তিথি।

‘মায়ের সঙ্গে কি অমন করতে আছে সোনা? আমার কষ্ট হয় না তোকে মারতে? এত বড়ো হয়েছিস এটুকু বুঝবি না? অয়না দ্যাখ তোর চেয়ে ছোটো হয়েও কেমন ভালো রেজাল্ট করে। মাথায় কি তোরও বুদ্ধি কম? পরীক্ষার পর কত আনন্দ করব। বাবা বিরিয়ানি রাঁধবে। একদিন বাইরেও খেয়ে আসব। সোনা বাবা আমার…।’ ছেলের পাশে শুয়ে তার গুঁজে রাখা অভিমানী মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিতে চাইল। ডান পা-টা নিজের পেটের ওপর চাপাতে চাইল। রন্তি ঘুমের মধ্যেও মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল না। কাঠ হয়ে থাকল। এগারো বছরের ছেলের সঙ্গে গায়ের জোরে পেরে ওঠে না মা। ছেলের ঘাড়ে চুমু খেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শুয়ে পড়ল। তার স্কুলেও পরশু থেকে পরীক্ষা শুরু।

একজনের অফিস, একজনের স্কুল ও সংসার। পাশের ঘরে বৃদ্ধা শাশুড়ি। তাঁর জায়গাও বেশি লাগে, আর রন্তিও মাকে ছেড়ে ঠাকুমার কাছে শোবে না। রাতে ঘুমের ঘোরে ছেলে এখান সেখান হাত-পা ছুড়লে অস্বস্তি লাগে। কিন্তু উপায় কী? স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত আড়াল নেই। তাগিদও নেই। তেরো বছর তো হল। ছেলেই মা-বাবার অগ্রাধিকার। কাল থেকে পরীক্ষা শুরু। শেষ হতে দু সপ্তাহ।

দশ বছরে কয়েকটা টিকার বুস্টার ডোজ আছে। দীর্ঘদিন সর্দিকাশিতে ভোগায় সেগুলো দেওয়া যাচ্ছিল না। ডাক্তারের কাছে গিয়ে সর্দির প্রেসক্রিপশন হাতে ফিরতে হচ্ছিল। এমনিতেই তিনখানা টিকা একদিনে দেবেন না। দশ বছর বয়স থাকতে মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় পাবে তো? সর্দিকাশি, পেট ইত্যাদি মোটামুটি ঠিক আছে দেখে পরীক্ষার আগের দিনই ডাক্তার সান্যালের কাছে ঘুরে এল শ্রেয়সী। আসার পথে রাই বায়না ধরল ফুচকা খাবে। মাথা খারাপ? পরশু থেকে পরীক্ষা শুরু। রাত্রে বাড়িতে ফ্রায়েড রাইস, মাংসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়েকে ভোলাতে চাইল। রাই তবু ঘ্যানঘ্যান করে, ‘বেশি নয়, মোটে চারটে ফুচকা মা। কিছু হবে না। তুমি ওষুধ কিনে বাড়ি চলো।’

‘পাঁচ টাকার ফুচকার খেসারত একশো টাকার ওষুধের কোর্স, সেই সঙ্গে অরুচি? না বললাম না? কাল বাদে পরশু থেকে পরীক্ষা শুরু। একেই আজ এটা কাল ওটা করে ভুগিস। রাতে ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন করব বললাম তো। এখন বরং একটা আইসক্রিম খা। আসতে আসতে চেটে খাবি, গলায় ঠান্ডা না লাগিয়ে।’

আইসক্রিম যতই প্রিয় হোক, ফুচকার গন্ধে নাকে মুখে জল এলে আইসক্রিম কি তার বিকল্প হতে পারে? নিমরাজি হয়ে মাথা নাড়ল রাই। ওপারে দোকান। মা মেয়ে রাস্তা পার হতেই একটা ফাঁকা অটো হাঁকতে হাঁকতে পাশে দাঁড়াল। লাইনে না দাঁড়িয়েই বাহন পেয়ে যাওয়ায় শ্রেয়সী আর আইসক্রিমের দোকানে না ঢুকে সোজা অটোয় চড়ে পড়ল মেয়ের হাতে ধরে।

‘তুমি মিথ্যেবাদী।’

মাথায় চড়াক করে রক্ত উঠলেও শান্ত হয়ে মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘তোমায় কি আইসক্রিম, চকোলেট দিই না? কিন্তু আইসক্রিম খেলে আধ ঘন্টা অটোর লাইনে দাঁড়াতে হতো। এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত পা ধুয়ে পড়তে বসাটা জরুরি নয় এই সময়? আচ্ছা বাবাকে ফোন করে দিচ্ছি বাড়ি ফেরার সময় আইসক্রিম নিয়ে আসবে। এখন বাড়ি গিয়ে দুধ ফিনিশ করলে কিন্তু।’

তরুণকে ফোন করল শ্রেয়সী। তরুণের ফিরতে রাত হবে। সে দোকানের কর্মচারী শান্তনুর হাতে পাঠিয়ে দেবে। শান্তনু কোনও কাজে গিয়ে ফেঁসে গেছে। তরুণ ফিরল রাত দশটায়। এতক্ষণ বকুনি সহ ঘ্যানঘ্যান করতে করতে পড়ছিল রাই। রাতে বাবাকে খালি হাতে ফিরতে দেখে আর নতুন করে হতাশা প্রকাশ করল না। ফুচকার বদলে আইসক্রিম, তাও না দুধ-বোর্নভিটা। এখন রুটি তরকারি। মা ফ্রায়েড রাইস করতে পারেনি। রান্নার মাসিরও তাড়া ছিল। গতকালের একটু পনির উদ্বৃত্ত ছিল। তাই দিয়ে শান্ত হয়ে মায়ের হাতের রুটি খেয়ে নিল রাই ডিজনিতে হাসির ধারাবাহিক দেখতে দেখতে। রাতে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত মায়ের মুখে মুখে প্রশ্নোত্তরও ঝালিয়ে নিল। হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘কাল করবে তো মা? সব পরীক্ষা শেষে দাদা-বউদির বিরিয়ানি আনবে বাবা?’

‘নিশ্চয়ই’। কে জানে, মেয়ে মনে মনে মা-বাবাকে মিথ্যেবাদী বলল কি না।

মেয়েটা দিন দিন বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে। সেভেন হল। এর মধ্যেই বাবার কানের পোকা খেয়ে ট্যাব আদায় করেছে। মাকে দিদি নম্বর ওয়ানে গিয়ে প্রাইজ জিতে আসার অনুপ্রেরণা দিয়ে কাজ হয়নি। নিজেই বাড়ি থেকে ইন্টারনেটে মায়ের আর নিজের অনলাইন আবেদন জমা করেছে। বছর ঘুরতে চলল। কতদিন আর দরকারি জিনিস অনিশ্চিত ইভেন্টের হাতে ফেলে রাখা যায়?

পড়াশুনো কী করছে দেখাতে চায় না। সারাক্ষণ কম্পিউটারে নেট খুলে খানাতল্লাশি চালায়। নাকি পড়াশুনো হচ্ছে। অত অত মোটা বইয়ের পাহাড় থাকতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর ইন্টারনেট থেকে বাড়তি কী এমন তথ্য জানার থাকতে পারে? তিনটে টিউশনি। নেট-এ খোঁজাখুঁজি। তাও ফলাফল ভালো থেকে ক্রমশ মাঝারি হয়ে যাচ্ছে। কিছু বললে যা মূর্তি ধারণ করে। মাকে তো পাত্তাই দেয় না। বাবাকে একটু মানে। আবার আবদারের বেলায়ও বাবা। কিন্তু এই বয়স থেকে একা একা নেটে থাকা মা-বাবা কেউই অনুমোদন করে না। পৃথিবীর কদর্যতম দৃশ্যটাও কয়েকটা মাউস ক্লিকের অপেক্ষায় সাইবার দুনিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। নারী-পুরুষের ভালোবাসার মাধুর্য বোঝার আগেই যদি চরমতম বিকৃতি আর বীভৎসতার সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায় তাহলে রুচি, মানসিকতা কেমন দাঁড়াবে? অবশ্য তেমন কিছু ব্রাউজিং-এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধু গাদা গাদা চ্যাট। পড়ার বই খুলে রেখে ট্যাব হাতে চেনা-অচেনা মানুষের সঙ্গে গপ্পো।

বাধ্য হয়ে পরীক্ষার দুদিন আগে সাত্যকী বারো বছরের মেয়ের গায়ে হাত তুলল। এগালে-ওগালে এলোপাতাড়ি। মল্লিকা ঝাঁপিয়ে পড়ে থামাতে এলে তার গায়েও দু-একটা পড়ল। পরীক্ষার আগে কেউ এভাবে মেরে মনমেজাজ খারাপ করে দেয়? নিজে যখন বুঝবে না, বোঝাতে হবে। মেয়ে বড়ো হচ্ছে। এভাবে বাপের মার খেলে আত্মসম্মানে লাগবে না? এখনকার ছেলেমেয়েরা মা-বাবার সব কিছুতে হস্তক্ষেপের অধিকারটা মেনে নেয় না। একদিকে আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু রাগলে নিজের চূড়ান্ত ক্ষতি করে ফেলে, ভালোবাসার মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে দুবার ভাববে না। মল্লিকা সাত্যকীকে ঠেলে সরাতে গেল, ‘ছাড়ো। ওকে বুঝিয়ে বললেই শুনবে’।

‘বাবাকে লেলিয়ে দিয়ে এখন সাধু সাজা হচ্ছে। আমার বইখাতা খুলে স্পাইং করো না তুমি?’

সদ্য কিশোরী কন্যার এই মন্তব্যে মা দিশাহারা হয়ে গেল। বাবা তো অফিস থেকে ফিরে প্রায়দিন দেখে মেয়ে টিউশনি থেকেই ফেরেনি। মা-ই মেয়ের খাতা বই দেখে যতটা সম্ভব পড়াশুনোর খবর নিয়ে নেয়। পারিজাতের সেটাও অপছন্দ? মায়ের গোয়েন্দাগিরি মনে হয়? মায়ের স্নেহ-চিন্তাকে চরবৃত্তি মনে হলে সে মেয়ের মুখে ঠাটিয়ে চড়ই মারা উচিত। কিন্তু তাহলে মোবাইলের সেল্ফিতে যে কেষ্টঠাকুরের ছবি আছে, তার সম্পর্কে জানা যাবে না, জানা যাবে না এমন আরও অনেক কিছুই। প্রশ্ন করলে হয়তো শুনতে হবে, মোবাইল ব্যক্তিগত বস্তু। তেরো বছরের নাবালিকা তার মাকে ব্যক্তিগত ব্যাপারে আড়াল করবে? এখনও বিছানার চাদরে, পোশাকে দাগ লাগলে কেচে দিতে হয়। মেয়ের সঙ্গে কি মারামারি করবে? মরিয়া হয়ে বলল, ‘পরীক্ষাগুলো তো উৎরোতে হবে পুপু। বন্ধুবান্ধব, আনন্দ-ফুর্তি তো আছেই।’

‘কিচ্ছু নেই। ঘাড় গুঁজে পড়ে পড়ে চোখে পাওয়ার আর ঘাড়ে পিঠে ব্যথা বাড়ানো ছাড়া আমাদের জীবনে কোনওটাই সিকিওরড নয়। পরীক্ষা তো দেব আমি। পড়ার ফাঁকে একটু রিল্যাক্স করলে এত গায়ে জ্বালা তোমাদের?’

সন্দীপন পড়াশোনায় মনোযোগী। মনোযোগ আর আগ্রহ আরও অনেক বিষয়ে। ভালো আঁকে, ফুটবল খেলে। ওদের সেকশনে নতুন আগত একটি মেয়ে গত বছর থেকেই সন্দীপনকে হটিয়ে প্রথম হচ্ছে। নিশ্চয়ই প্রিন্সিপাল বা টিচারদের সঙ্গে চেনাজানা আছে। এদিকে ছেলের নামে অন্য ছাত্রদের, বিশেষ করে মেয়েদের অভিভাবকরা নিয়মিত নালিশ জানায়। সন্দীপন ওদের মারে, ল্যাং মেরে ফেলে দেয়, বেণি ধরে, কানের রিং ধরে টানে। হিংসা! সব হিংসায় ফেটে যাচ্ছে। ভালো ফল করে কিনা। তাই যুক্তি করে ওকে পিছিয়ে দেওয়া। হলে একটা নতুন স্টুডেন্ট, তাও আবার মেয়ে, কালো শিকলি চেহারা কখনও ফার্স্ট হয়? ছেলেরা তো হাতেপায়ে দুরন্ত হবেই। দাদু আদর করে নাম রেখেছেন গুন্ডা। গুন্ডার অধীনে আবার স্কুলে একটা দলও আছে। ইচ্ছা করেই ছেলেকে বেশি বয়েসে পড়াচ্ছে সঙ্গীতা। বার্থ সার্টিফিকেটের বয়স বারো দেখালেও সন্দীপন আসলে চোদ্দ বছরের। ওর সঙ্গে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলো পারবে কেন? কী পড়াশুনোয়, কী খেলাধুলোয়। ছেলেকে শেখানো আছে, ‘মার খেয়ে ফিরবি না, মেরে আসবি’।

কেন করবে না। সকলেই এগিয়ে যেতে চায়। তোমার সামনে যারা আছে দরকারে তাদের মাড়িয়েই এগিয়ে যেতে হবে। তোমায় কেউ একচুল জায়গা ছেড়ে দেবে? যারা পেরে ওঠে না, তারাই নালিশ করে। তা বলে ছেলে কি হাত-পা গুটিয়ে থাকবে? মারামারির ভয় যখন, তোদের মেয়েদের গার্লস স্কুলে পড়ালেই পারতিস। অত বড়ো খেলার মাঠ দেখে রাত থাকতে লাইন দিয়ে খুকিদের ভর্তি করিয়েছিস। এখানেও গুন্ডার নামে নালিশ। সে নাকি খেলার ক্লাসে মেয়েদের ইচ্ছা করে মেরে ফেলে দেয়। সঙ্গীতা মাঝে সাঝে স্কুলে গিয়ে দেখেছে, খেলার পিরিয়ডে ছেলেরা স্যারের সাথে ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেট বল খেলে। মেয়েরা গজালি করে, নয় রুমাল চোর খেলে, নয় তো স্রেফ বসে বা পায়চারি করে কাটায়। ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট চাইলেও নাকি দিতে চায় না গেমস্ টিচার, দিলেও ছেলেরা কেড়ে নেয়। মেয়েরা খেলেই না তো মার কখন খাবে? আমার ছেলে কি খেলা ফেলে তোদের মেয়েদের পেছনে ধাওয়া করে?

ওই শুঁটকি অরিত্রিকে এবার বিট করতেই হবে। গুন্ডার চাইতে দু’বছর ছোটো হয়েও অমন রেজাল্ট এমনকী অংকেও? তা খাতায় কলমে কম দেখিয়েও মা পুত্রের বয়সের সুবিধাটা মনে মনে স্বীকার না করে পারে না। ছেলে আজকাল কম্পিউটারে ইন্টারনেট খুলে জোর পড়াশুনো শুরু করেছে। কী পড়ে দেখাতে চায় না। ছেলের বাবা চাকরিসূত্রে অন্যত্র থাকে। মা নিয়ম করে ছেলেকে কোচিং ক্লাসে নিয়ে যায়। শুধু ক্লাসে নয়, আইসিএসসিতেও স্কুল থেকে ফার্স্ট হতে হবে।

কাল থেকে যুদ্ধ, মানে পরীক্ষা শুরু। গুন্ডা সকাল বেলা বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছে বলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে। দুপুর দুটো বাজতে চলল, এখনও পাত্তা নেই। প্রথমে অর্ণবের বাড়ি, তারপর এর বাড়ি ওর বাড়ি ফোনাফুনি। সোয়া দুটোয় সিঁদুর মুখে বাড়ি ফিরে মায়ের কোনও প্রশ্নেরই জবাব দিতে চায় না। একবার ঝেঁজে বলল, ‘এই জন্যই মোবাইল চাই। বাড়িবাড়ি ফোন করতে হতো না তোমায়।’ ক্লাস সেভেনের ছেলে মোবাইল নিয়ে ঘুরবে? স্কুলেও তো অনুমতি দেবে না। আবার আসল বয়সটা মনে পড়ল। মায়ের কথায় উদ্ধত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক খোঁচাখুঁচিতে বলল, ‘তোমায় বলে কী হবে? তুমি তো না-ই বলবে।’ এখন থেকে এমন কী চাই যা মাকে বলা যাবে না? কাল থেকে পরীক্ষা শুরু সে খেয়াল আছে? পড়াশুনোয় ভালো বলেই ও অনেক বদমায়েশি করে পার পেয়ে যায়। এবার রেজাল্ট খারাপ হলে আর ছাড় দেওয়া যাবে না।

সারাদিন জিজ্ঞাসাবাদে নির্বিকার থেকে রাতে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বলল, ‘একটা স্পোর্টস্ সাইকেল দেখেছি। চল্লিশ হাজার পড়বে। আইসিএসসি দেখিও না। এই পরীক্ষার পরই চাই।’

সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উঠতেই এই। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করলে তো হেলিকপ্টার চাইবে। এর চেয়ে অরিত্রি, মেঘা, তিতিক্ষাদের পেটানোর অনুমতি চাইলে দেওয়াটা অনেক সহজ হতো। এই প্রথম ছেলেকে অচেনা লাগল মায়ের, ভয়ও হল। মাথা নাড়ল শুধু, যার মানে হ্যাঁ ও হতে পারে, নাও হতে পারে। পরীক্ষাটা তো উৎরোক। দর কষাকষি পরে।

স্নেহা শান্ত মেয়ে। অঙ্কে একটু দুঃখ আছে। কিন্তু বেয়াড়া নয়। পড়ালে খুব একটা আপত্তি করে না, অঙ্ক ছাড়া। একটু আদুরি আহ্লাদী প্রকৃতির। রোজ নিয়ম করে মা আর বাবার কাছে চটকাই মটকাই খাবে। সান্তাক্লজের রহস্য জানার পরও সান্তার কাছে উপহার চাই। গত বছর জন্মদিন পালন হয়নি ঘটা করে। এবার পরীক্ষার ঠিক পর জন্মদিন। মানে জন্মদিনের ঠিক আগেই পরীক্ষা শেষ হয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্মীসোনা হয়ে ভালো করে পরীক্ষা দিয়ে বার্থ ডে সেলিব্রেশনটাও জমকালো করে করতে হবে। এইটুকু বায়না রাখাই যায়। বেচারার সব প্রিয় খেলনা খুড়তুতো ভাই এসে ভেঙে দিয়ে যায়। ভাইকে বড্ড ভালোবাসে। তাকে কিছু বলতে পারে না, পাছে কাকিমা আর নিয়ে না আসে। সে চলে গেলে মায়ের কোলে কিংবা বাবার বুকে মুখ গুঁজে হাপুসনয়নে কাঁদে।

বহুদিনের শখ আইপডের। বন্ধুদের আছে। ওকে বস্তুটা ঠাম্মা, দিদা, মাসি না মা-বাবা কে দেবে ঠিক না হওয়ায় এখনও পায়নি। এবার জন্মদিনে সেটাই দাবি। অঙ্কিতা নিজে বড়ো সিস্টেমেই গান শুনতে ভালোবাসে। অমন স্বার্থপরের মতো কানে গুজি গুঁজে অনেক কথা কানে না ঢুকিয়ে গান শোনা তার পোষায় না। তবে ধুমধাড়াক্বা গান পরিত্রাহি বাজলে মনে হয়, যার যেমন রুচি তেমন গান হেডফোনেই শোনা ভালো।

পরীক্ষা শুরুর কদিন আগেই মাসিমণি তার আদরের বোনঝিকে একটা আইপড দিয়ে গেল। অনেকগুলো নতুন গান লোড করা আছে। ব্যস! সারাদিন মারমার গান শোনা। এখন কি গান নিয়ে মেতে থাকার সময়? পড়াশুনোর বারোটা বাজবে জানালে মাসি বলবে, ‘আমার ইচ্ছে দিয়েছি। তোদের পছন্দ না হলে ডাস্টবিনে ফেলে দে।’

বুঝিয়েসুঝিয়ে যন্ত্রটা পরীক্ষা পর্যন্ত মায়ের জিম্মায় চালান করা গেলেও জন্মদিনের জন্য তাহলে নতুন কিছু চাই। নতুন মানে ট্যাব। টিভি রিয়ালিটি শোতে কাউকে ট্যাব জিততে দেখলেই এমন হাততালি দেয়, যেন পুরস্কারটা সেই জিতেছে। এমনিতে অঙ্কিতার অ্যানড্রয়েড মোবাইল অঙ্কিতার চেয়ে স্নেহাই ভালো চেনে। ক্লাস ফোর তো কী? এখনকার বাচ্চারা মায়ের পেটে থাকতে কম্পিউটার নাড়াঘাটা করতে শিখে আসে। অঙ্কে ভয় থাকলেও, কম্পিউটারের ঘাঁতঘোঁত ফাইলের অবস্থান খুঁজে বার করতে ওস্তাদ। মাকে কাজ করতে দেখে নিজে নিজে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বানাতে শিখে ফেলেছে। মোবাইলে গান আর গেম ডাউনলোড তো হাতের ময়লা। সে তো ট্যাব চাইতেই পারে। কিন্তু বাড়িতে তিনজন মানুষের জন্য পাঁচটা সিম এটা ওটা অফার পরখ করতে গিয়ে জমে গেছে। প্রীতমের তাই বাচ্চার হাতে এখন থেকে নেট সমৃদ্ধ ট্যাবলেট তুলে দেওয়ার ইচ্ছা নেই। বলে, ‘যা করার পিসিতে করো। আর একদম নেট খুলবে না। আমি বা মা পাসওয়ার্ড দিয়ে মেশিন ওপেন না করা পর্যন্ত ওয়েট করবে। আমি এত বছর সিস্টেমস্-এ আছি, এখনও পর্যন্ত আমিই একটা ল্যাপটপ কিনলাম না, আর পাকু-মার ট্যাব চাই।’

মৌমিতা সদ্য চাকরির আনন্দে বলে ফেলল, ‘ডোন্ট ওরি। আই উইল টেক কেয়ার অব দ্যাট।’

সোজা প্রীতমের প্রেস্টিজে ছ্যাঁকা। সে কি নিজের মেয়েকে কিনে দিতে পারে না? এই বয়স থেকে এত বিলাসিতা ঠিক মনে করে না বলেই তো আপত্তি করছে। প্রিয় শ্যালিকাকে দেখলে হাসা বন্ধ। মৌমিতাও দমবার পাত্রী নয়। ‘কেন, হিয়া আমার কেউ নয়? মাসি হিসাবে আমার কোনও শখ থাকতে পারে না? অধিকার নেই? আমি আনন্দ করে কিনে দেওয়া মানেই প্রীতমদাকে ছোটো করা? তোরা আমাকে পুজোয় টাকা দিস না? আমার বিয়েতে দামি গয়না দিসনি? তোদের বিয়ের সময় আমি তো স্টুডেন্ট ছিলাম। কী দিয়েছি? আজ আমার আনন্দে যদি কারও মুখ গোমড়া হয়, তাহলে আমি আর এ বাড়ি আসব না। হিয়ার জন্মদিনেও নয়…’

আচ্ছা মুশকিল! অঙ্কিতা বরকে বোঝায়, না বোনকে। বড়োদের মান হানাহানিতে হিয়া অর্থাৎ স্নেহা বেচারা বোমকে গেছে। মায়ের কানে কানে বলল, ‘মাসিকে বলো, আমার ট্যাব চাই না। শুধু এগ্জামের পর আমরা, মাসি-মেসো সবাই মিলে আইনক্সে একটা থ্রিডি দেখব, নয়তো সিটি সেন্টার টুতে সেভেন ডি। আর সবাই মিলে বাইরে খাব। আর আমার বার্থডেতে মাসি সকাল থেকে এসে থাকবে।’

মৌমিতা শুনতে পেয়ে ঝুঁকে বোনঝিকে হামি খেয়ে বলল, ‘আমার তরফ থেকে ডান। তোর বাবা ছুটি না নিলেও আমি কিন্তু আমার নতুন চাকরিতেও একদিন ছুটি নিয়ে হিয়া সোনার সঙ্গে কাটাব, ক্যারাম খেলব। আর ওটা আমাদের সিক্রেট। রাইট?’

নিজের হাতে খেতে পারে না। মা খাওয়ালেও ন্যাকরচ্যাকর। কিন্তু কাল থেকে যে পরীক্ষা শুরু। লক্ষ্মী মেয়ের মতো টিভি না দেখেই খেয়ে দাঁত মেজে শুয়ে পড়ল। শোবার ঘর থেকে একটু পরে ডাকল, ‘মা তোমাদের হয়েছে? তুমি ছাড়া ঘুম আসে না মা।’

একটা টাটা সুমোয় গাদাগাদি করে চোদ্দজন বাচ্চা। সবাই বাচ্চা নয়। সপ্তম অষ্টম শ্রেণির ছেলেমেয়েরা কেউ কেউ আকারে বড়ো মানুষই বলা যায়। মাঝেমাঝে এইসব গাড়ির পারমিট, ফিটনেস সার্টিফিকেট নিয়ে ধরপাকড় ওঠে। আবার সব মিটমাট হয়ে যায়। গরজ বড়ো বালাই। গাড়ি বন্ধ থাকলে গাড়িওয়ালাদেরও ক্ষতি, ছাত্রছাত্রী পক্ষেরও ক্ষতি। ধেড়েগুলো কুচোকাচাদের ওপর দাদাগিরি দিদিগিরি ফলায়, ঝগড়া থামায়, আবার বাধায়ও। কিন্তু পরীক্ষার কদিন বেশির ভাগই স্কুল যাবার পথে বই মুখে নিবিষ্ট। আজকের মতো ছুটি। বাড়ি ফেরার পালা। কালকের দিনটা পার করতে পারলেই ক্লাস ফাইভের কেল্লা ফতে। সিক্স, সেভেন আর এইট শেষ হতে আরও পাঁচ দিন। রোজ পরীক্ষা নয়, মধ্যে বিরাম আছে। কারো দুটো কারও তিনটে পরীক্ষা বাকি। ক্ষুদেগুলো কাল পরীক্ষার পর কী করবে তার জোর আলোচনা চালাচ্ছে। বড়োগুলো তাদের কাউকে কাউকে খ্যাপাচ্ছে। হই হই করতে করতে চলেছে টায়েটায়ে ভর্তি যান। গাড়ির চালকও যোগ দিয়েছে গুলতানিতে। এই গাড়িকাকু ওদের সবার খুব প্রিয়। না খেতে পারা টিফিন উদ্ধার করে সাহায্য করে। আবার যাদের যেদিন পরীক্ষার ইতি, সেদিন তাদের চকোলেট খাওয়ায়। বড়োগুলোর পরীক্ষা শেষ হতে দেরি থাকলেও চ্যাঁচাচ্ছে, ‘আমরাও আছি কিন্তু মোহিতকাকু। নো পার্শিয়ালিটি। কালকেই সবাইকে খাইয়ে দাও। শেষের দিন আমরা ফিস্ট করব। ওফ্ তোমাকে কখন থেকে গান লাগাতে বলছি না? আর ওই সামনের গদ্ধড় বাসটাকে ওভারটেক করতে পারছ না? পুরো রাস্তাটা আগলে চলছে।’

‘…ক্যাঁ…চ্’! বড়ো রাস্তার এক পাশটা খাওয়া। এক্সপ্রেসওয়ে কে বলবে? গদ্ধড় বাসটাকে কাটাতে গিয়ে পাশ থেকে একটা দৈত্যাকার লরির সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি। কাছাকাছি লোকালয় ছিল না। দেরিতে লোক পৌঁছোল। গাড়ির হেল্পারটি লাফিয়ে পালাতে পেরেছে, গুরুতর আহত। চালক ঘটনাস্থলেই শেষ। পকেটে তার আজও লজেন্স আছে। ফুচকা, আইসক্রিম, বিরিয়ানি, সাইকেল, ট্যাব, জন্মদিন সান্তাক্লসের ছোটো ছোটো স্বপ্নগুলো দুমড়ে দলা পাকিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে চেপে ভাঙা রাস্তা দিয়ে ছুটে চলল।

 

প্রতিজ্ঞা

জীবনের চল্লিশটা বছর পেরিয়ে এসেছি। কত ওঠা-পড়া দেখেছি। এখন আর কোনওকিছুই মনকে সেভাবে ছুঁয়ে যায় না। দিন আসে দিন বয়ে যায়। ঝরা, শুষ্ক গাছের মতো কেবলই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা। জানান দেওয়া যে, এপৃথিবীতে আমিও আছি, আমারও অস্তিত্ব রয়েছে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ, একাকী জীবন যেন আরও গ্রাস করে ফেলেছে আমাকে। নিজেকে খানিক গুটিয়েও ফেলেছি আমি। তাই ভিড়ভাট্টা, হইহুল্লোড় একটু এড়িয়েই চলি।

স্বাতীলেখা। বন্ধু বলা যায় কী না জানি না, একমাত্র ও-ই একটু জোর খাটায় আমার উপর। মাঝেমধ্যে আসে আমার ফ্ল্যাটে। কখনও কখনও ওর কাছেই মনের দু-এক কথা প্রকাশ করে ফেলি। আজ ওর ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। শ-দুয়েক লোক নিমন্ত্রণ করেছে। আমার যাওয়া নিয়ে ভীষণ নাছোড়। কাজেই আর না করতে পারলাম না।

আটটা নাগাদ যখন অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছোলাম তখন আমন্ত্রিতদের বেশ কয়েকজন এসে গেছে। আমাকে দেখামাত্রই টেনে নিয়ে গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপও করিয়ে দিল স্বাতী। আমার পরিচয় দিতেই তাদের মধ্যে এক অপরিচিত মহিলা কেমন যেন ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে বলে উঠল, ‘ওহ্, তাহলে আপনিই সেই ঋত্বিকা।’

একজন অচেনা-অজানা মহিলার মুখে নিজের নামটা এভাবে শুনে অবাক হয়ে গেলাম। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ওনাকে ভালো করে দেখলাম। ‘না এর আগে কখনও দেখিনি। তাহলে? উনি কি আমাকে চেনেন? নাকি স্বাতী আমার সম্পর্কে কিছু বলেছে? কিন্তু এমন কী বলেছে যে, মহিলা এভাবে রিঅ্যাক্ট করলেন!’ ভাবতে ভাবতে বোকার মতো ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। যখন মনে হল, না জানা দরকার, ততক্ষণে উনি সেখান থেকে কয়েক পা এগিয়ে সোফায় বসে পড়েছেন। হাতে কফি। ওনাকে লক্ষ্য করে আমিও সেদিকেই এগিয়ে গেলাম।

ওনার নামটাও ঠিক করে মনে পড়ছিল না। স্বাতী পরিচয় করানোর সময় কী যেন বলেছিল একটা? মনে করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না।

বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে শুরু করব, আমি কিছু বলার আগে উনিই বলে উঠলেন, ‘জানতাম আপনি আসবেন। আমিও অপেক্ষায় ছিলাম। চলুন বারান্দায় গিয়ে বসি।’ আমাকে ওনার দিকে এগোতে দেখেই হয়তো উনি বুঝে গিয়েছিলেন তীর লক্ষ্যভেদ করেছে। যেটা আমার চোখেমুখেও প্রকাশ পাচ্ছিল।

অদ্ভুতভাবে দুজনের কারওর ঠোঁটের কোণায় হাসির লেশমাত্র ছিল না। প্রথম সাক্ষাতেই যে কারও প্রতি কারওর এতটা তিক্ততা থাকতে পারে, সেটাই আমার বিশ্বাসযোগ্যতার বাইরে। সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তবুও আমাকে জানতেই হবে আমার প্রতি মহিলার এত বিদ্বেষ কেন? কী করেছি আমি! বারান্দায় রাখা চেয়ারে গিয়ে বসলাম দুজনে।

সব অতিথি আসতে শুরু করেছে। ওয়েটারগুলো স্ন্যাক্স আর ড্রিংক্স সার্ভ করছে। খাওয়ার এখন অনেক দেরি। স্বাতীও আমন্ত্রিতদের অভ্যর্থনায় ব্যস্ত। এখানে উপস্থিত সকলকে সেভাবে চিনিও না। কাজেই ডিসটার্ব করারও কেউ নেই।

খুব ভদ্রভাবে, বিনয়ের সঙ্গেই বললাম, ‘মাফ করবেন, আপনাকে আমি ঠিক চিনতে পারলাম না। এর আগে কি আমাদের কখনও দেখা হয়েছে?’

‘নাহ্। সেই সৌভগ্য এর আগে না হলেও আপনাকে আমি ভালো করেই চিনি।’ এখনও সেই রুঢ় গলাতেই উত্তর দিলেন মহিলা। মনে হল গলায় যেন কাঁটা বিঁধে গেছে। কেমন যেন একটা ইরিটেশন হচ্ছিল। দেখা হওয়া পর্যন্ত মহিলার খোঁচা দেওয়া ব্যবহার আর নিতে পারছিলাম না। একটু উগ্রভাবেই বলে বসলাম, ‘আপনার মনে হয় কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।’

‘না ম্যাডাম, একটুও না। আমরা মুখোমুখি না হলেও একে-অপরকে খুব ভালো করেই চিনি।’

হতভম্বের মতো ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শত চেষ্টা করেও স্মৃতি সঙ্গ দিল না। মিনিট খানেক চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমার স্বামী ঈপ্সিত-কে নিশ্চয়ই চেনেন, নাকি তাও বলবেন…।’

ঈপ্সিতের নাম শোনামাত্রই মাথায় কে যেন হাতুড়ির ঘা দিল। কিন্তু ওই কষ্টের জায়গাটা তো আমি বহু আগেই কাটিয়ে উঠেছি। প্রায় পনেরো বছর ওই মানুষটার সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। আর আজ এত বছর পরে মহিলা সেই সম্পর্কে রসদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। হায় ভগবান! আমার প্রতি ওনার তিক্ততার বহিঃপ্রকাশ সেই কারণেই। অনেকদিন পর এই নামটা শুনে প্রায় মলিন হয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি মনের আয়নায় ভেসে বেড়াতে থাকল।

আমারই অফিস কলিগ ছিল ঈপ্সিত। বেশ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। সব মহিলারাই ওর সান্নিধ্যে থাকতে পছন্দ করত। যাকে বলে একেবারে টল, ডার্ক আর হ্যান্ডসাম। সবথেকে বড়ো কথা ছিল ওর মিষ্টি ব্যবহার আর ওর কথাবার্তা, সময়ে-অসময়ে, অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া, যার কারণে ডিরেক্টর থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্টের সমস্ত লোক ভীষণ ভালোবাসত ওকে। সকলের মাঝে কখন যে আমি ওর পছন্দের পাত্রী হয়ে উঠেছিলাম, সত্যিই জানি না।

এদিকে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আমাকে পাত্রস্থ করার একটা আপ্রাণ প্রচেষ্টা মা-বাবার ছিলই। ইতিমধ্যে এক ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের খোঁজ পাওয়া গেল। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। সুদর্শন, উচ্চ আয়, বাড়ি-গাড়ি– এমন পাত্র কী আর হাতছাড়া করা চলে। তড়িঘড়ি বিয়ের দিনটাও ঠিক হয়ে গেল।

বিয়ের কথা শুনে সবাই খুশি হয়ে অভিনন্দন জানিয়ে গেল। কেবলমাত্র ঈপ্সিত ছাড়া। খবরটা শুনে ও যে একেবারেই খুশি হয়নি তা ওর বডিল্যাঙ্গোয়েজে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ জানানোর সময় কী যেন অস্ফুটে বলল। শুনে যেটুকু বোধগম্য হল, ‘এত তাড়াতাড়ি বিয়ের সিদ্ধান্ত না নিলেই চলছিল না?’

সেইদিন প্রথম বুঝেছিলাম, ঈপ্সিত কেন আমার এত খেয়াল রাখত। আমাকে চিন্তিত দেখলে ও-ও কেন চিন্তান্বিত হয়ে পড়ত। সহকর্মীদের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, অফিস পলিটিক্স– সব কিছু থেকে আগলে রাখত আমাকে। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

দিনদুয়েক মনটা একটু খচখচ করলেও, পরে বিয়ের কেনাকাটা থেকে শুরু করে হাজারো ব্যস্ততায় সব ভুলেও গেলাম। তারপর তো একমাস ছুটিতে। বিয়ে, হনিমুন, সব কিছু নতুন নতুন। নতুন এক নেশায় কীভাবে যে দিনগুলো কেটে গেল টেরই পেলাম না।

প্রথম যেদিন অফিস জয়েন করলাম, সেদিন একেবারে হইচই পড়ে গেল। যারা বিয়েতে যেতে পারেনি, তারা সবাই এক-এক করে এসে দুঃখপ্রকাশ করে অভিনন্দন জানিয়ে গেল। আর কয়েকটি কৌতুহলী কান নাছোড়বান্দা হয়ে রইল, আদ্যোপান্ত শোনার জন্য। কিন্তু ঈপ্সিত এল না।

এতদিন নির্দ্বিধায় ওর সাথে কত বকবক করেছি, কিন্তু এখন ওর কাছে যেতেও কেমন যেন সংকোচ হল। ওর টেবিলের দিকে দু-পা বাড়িয়েও আবার পিছিয়ে এলাম। সত্যি বলতে কী ওর কাছে গিয়ে আমি ওর কষ্ট বাড়াতে চাই না। এখন আমার একটা সংসার আছে।

সংসারের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। আর সেখানে তৃতীয় ব্যক্তির কোনও জায়গা নেই। সেই সময় নতুন সংসার, নতুন সম্পর্কই আমার কাছে সবচেয়ে দামি। কিন্তু আন্দাজ করতে পারতাম তখনও ঈপ্সিতের মনজুড়ে আমি এবং শুধুই আমি। ওর আচার-ব্যবহার প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিত ওর মনের কথা। তখন সবকিছু জেনেও না-জানার ভান করে থাকতাম। আর করারই বা কী ছিল। ভেবেছিলাম সময়, পরিস্থিতি মানুষকে সব ভুলিয়ে দেয়, ঈস্পিতও একদিন সব ভুলে যাবে।

দিন সাতেক পরে ও-ই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘চলো, আমরা পরস্পরের জীবনসঙ্গী না হতে পারি, অন্তত আগের মতো বন্ধু তো হতেই পারি।’ সেদিন আমিই মেনে নিতে পারিনি। মন যেন সায় দেয়নি কিছুতেই– সবকিছু জানার পরেও আবার আগের মতো বন্ধুত্ব! একেবারেই সম্ভব নয়।

ওদিকে দিনের পর দিন ছেলেকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত দেখে বাড়ির লোকেরা একপ্রকার জোর করেই ঈপ্সিতের বিয়ে দিয়ে দিল। ওর বিয়ের কার্ড হাতে পেয়ে সবথেকে খুশি বোধহয় আমিই হয়েছিলাম। কারণ ওর এই অবস্থার জন্য পরোক্ষভাবে হয়তো আমিই দায়ী ছিলাম। ভীষণ গিলটি ফিলিং হতো। মনে মনে আশ্বস্ত হলাম।

কিন্তু কথায় বলে না– কপালে নেই কো ঘি, ঠকঠকালে হবে কী। কপালে আমারও সুখ সইল না। মাস ঘুরতে না ঘুরতেই একদিন মাঝরাতে আবিষ্কার করলাম কার যেন ফিসফিসানি আওয়াজ। পাশে প্রতুল নেই। মনে হল আমারই ঘর সংলগ্ন বারান্দা থেকে আওয়াজটা ভেসে আসছে। নিঃশব্দে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দেখি বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে প্রতুল কাকে যেন ফোনে ফিসফিসিয়ে বলছে, ‘প্লিজ আগে আমার কথাটা তো শোনো, তারপর না হয়…’। কথা শেষ হওয়ার আগেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামে প্রতুল। তারপর আবার বলতে শুরু করে, ‘প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো, বাড়িতে কী বলতাম, যে আমি একজন পুরুষকে ভালোবাসি, ওর সাথেই আমি আমার সারাটা জীবন কাটাতে চাই! সেটা কি সবাই মেনে নিত?’

এক ঝটকায় যেন পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল। এসব কী বলছে প্রতুল! চোখের সামনেটা হঠাৎই যেন ঝাপসা বোধ হল। পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে সরে যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগল। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবলাম, ‘না, এর শিকড় পর্যন্ত আমাকে পৌঁছোতেই হবে। মন শক্ত করতেই হবে। দিনের পর দিন কেউ আমার বিশ্বাসে আঘাত হানবে, তা তো মেনে নেওয়া যায় না।’

যাইহোক, তখনও প্রতুল তার প্রেমিকের মান ভাঙানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। ‘একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবো, আমাদের সমাজ তো এখনও এত দরাজ হয়নি যে সমকাম ব্যাপারটাকে মেনে নেবে। সমাজে থাকতে গেলে সমাজের কিছু রীতি তো মেনে চলতেই হবে। তাছাড়া তুমিও খুব ভালো করেই জানো, আমার যা কিছু ভালোলাগা, আনন্দ সব তোমার সঙ্গেই জড়িয়ে। তোমার সাথে যে-সুখ পাই ঋত্বিকার সঙ্গে সেই সুখ কোথায়? এমনকী চরম মুহূর্তেও…।’

আর সহ্য করতে পারছিলাম না। দৌড়ে গিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে প্রতুলও চুপচাপ এসে শুয়ে পড়েছিল। সারারাত তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করেছি। কিন্তু সেদিন ওকে কিছু বুঝতে দিইনি। একবার মনে হয়েছিল, সরাসরি প্রশ্ন করি, কেন আমাকে এভাবে ঠকাল। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয়েছে, যে ছেলে সমাজে নিজের সত্যিটা ফাঁস হয়ে যাবার ভয়ে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পারে, সেখানে নিজের মান বাঁচাতে একটা প্রাণ নিতেও হাত কাঁপবে না তার। একপ্রকার ভয়েই চুপ থাকলাম সেই রাতটা। পরের দিন কাকভোরে পালিয়ে গেলাম বাবার কাছে। সেখান থেকেই ডিভোর্স ফাইল। ডির্ভোসটাও মিউচুয়াল ভাবেই হয়েছিল। পাছে যদি ওনার কু-কীর্তির কথা লোকে জেনে ফেলে সেই ভয়েই সাত-তাড়াতাড়ি সম্পর্কের ইতি টানা গেল।

জীবনটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। এই এক মাসের মানসিক টানাপোড়েন অনেক পরিণত করে তুলেছিল আমাকে। কাজেই ডিসিশন নিয়েই ফেলেছিলাম, এজন্মে আর ওপথ (বিয়ে) মাড়াব না। এখন আমার সংসার বলতে মা-বাবা-আমি। অতএব সবকিছু ভুলতে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিলাম নিজেকে।

এসব খবর তো আর চেপে থাকে না। অফিসে জানাজানি হওয়া মাত্রই কানাঘুষো শুরু। হাজারো সহানুভূতি, আশ্বাস আর ব্যঙ্গের মাঝে মর্মাহত একজোড়া চোখ সর্বদা যেন খুঁজে বেড়ায় আমাকে। ওই চোখের দিকে তাকালে হয়তো পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ব, সেই ভয় থেকেই ঈপ্সিতকে এড়িয়ে চলতে থাকি। বারংবারই ও চেষ্টা করেছে আমার দুঃখ ভাগ করে নিতে। সর্বক্ষণ ব্যস্ততা দেখিয়ে উপেক্ষা করে গেছি। ওর আর আমার মাঝে থাকা সুক্ষ্ম প্রাচীর কোনওদিনই ভেদ করতে চাইনি। আমার সীমা সম্পর্কে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। নিজের সংসার সুখের হয়নি বলে ওর সংসারের দিকে হাত বাড়ানোর মতিভ্রম কোনওদিনই হয়নি। কিন্তু ঈপ্সিতকে বোঝায় কে! নিজের সাংসারিক চিন্তা ছেড়ে ও সর্বদা আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তাতেই জড়িয়ে থাকে।

তখন কিন্তু আমি চাইলে একাকীত্ব কাটাতে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই পারতাম। শুধু মাত্র সামনে বসা এই অচেনা মহিলার কথা ভেবেই সেদিন আমি এগোইনি। আমি চাইনি আমার মতো উনিও কষ্টের সম্মুখীন হোন। অথচ এই মহিলাই আমাকে দোষী মনে করে বসে আছেন। জানি কোনও মহিলাই তার স্বামীকে অন্য কোনও মহিলার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। কিন্তু আমি তো তা নই। তাহলে এত ঘৃণা কেন? বরং সেদিন এই অপরিচিত মহিলার কারণেই ঈপ্সিতকে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম যে, আমাদের দুজনের পথ আলাদা। কাজেই ভবিষ্যতে আমাকে সে যেন আর বিরক্ত না করে। তাহলেই আমি খুশি হব।

একই অফিসে কাজ করে অপরিচিতের মতো থাকাটাও তো সম্ভব নয়। আমাকে দেওয়া কথা রাখতে ঈপ্সিত চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। আজ হঠাৎ এত বছর পর ঈপ্সিতের নাম শুনে মনটা কেমন যেন হু-হু করে উঠল। অনুভব করলাম আজও মনের কোণে কোথায় যেন লুকিয়ে বসে রয়েছে। এই মহিলাও তো পনেরোটা বছর ধরে ঘৃণার সাথেই আমাকে মনে রেখেছে। তাহলে ঈপ্সিতও কি…?

কিন্তু আজ এত বছর পরে এসবের অর্থ কী? তাও আবার এই বয়সে! সবকিছু অনেক আগেই পিছনে ফেলে এসেছি। আমার এই মহিলার জন্য খারাপই লাগছিল, আমার কারণেই এত বছর ধরে ভয়ে ভয়ে থেকে এসেছেন, এই বুঝি ওনার সংসার ভেঙে গেল! ওনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ‘দেখুন, কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। বহু বছর হয়ে গেল আমাদের দেখাসাক্ষাৎ নেই। ইভেন আপনারা যে কোথায় থাকেন আমি সেটাও জানি না।’

‘আমার কোনও কিছু অজানা নেই। একদিন নেশায় বুঁদ হয়ে ঈপ্সিত আমাকে সবকিছু বলে ফেলেছে।’

‘বিশ্বাস করুন, একজন অফিস কলিগের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন হওয়া উচিত, আমরাও ঠিক তেমনই ছিলাম। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।’ বুঝতে পারছিলাম না কী প্রমাণ দিলে ওনার সন্দেহ দূর হবে।

‘সেটাই তো জানতে চাই, কেন এরকম একজন মানুষের থেকে তুমি মুখ ফিরিয়ে থেকেছ? কীভাবে পারলে তুমি? ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে তো সবাই মুখিয়ে থাকত।’ বেশ উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল ঈপ্সিতর অর্ধাঙ্গিনী।

‘কিন্তু আমি তো শুধুমাত্র তোমার জন্য…’ আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমার জন্য… আমার জন্য তুমি ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকেছ? এত বছরে একবারও জানার চেষ্টা করেছ তোমার এই সিদ্ধান্তে আমি কী পেয়েছি? আমার কী লাভ হয়েছে।’ দুচোখ জলে ভরে গিয়েছিল মেয়েটার।

বুঝতে পারছিলাম না ও কী চায়। ওর স্বামী ওকে ফিরিয়ে দিয়েছি। তবুও এত অভিযোগ। এরই মাঝে খেয়াল হল অভিমানই হোক বা অভিযোগ কখন যে দুজনেই আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছি, বুঝতে পারিনি। শ্যামলারঙা পানপাতা মুখের মেয়েটির নামটা এখন হঠাৎ করে মনে পড়ল আমার। আলো। হ্যাঁ, বিয়ের কার্ডে ওই নামই দেখেছিলাম।

‘কোনওদিন ওই মানুষটার কথা ভেবেছ যাকে তুমি নিজের করে নাওনি, আর আমারও হতে দাওনি।’ চোখের জল মুছতে মুছতে বলছিল আলো।

‘কী বলছ, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।’ সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিলাম না।

‘আমাদের মাঝে সবসময় তুমি থেকেছ। ঈপ্সিতের ভালোবাসার আর আমার ঘৃণার পাত্রী হয়ে।’

‘কীভাবে বললে বিশ্বাস করবে, আমি তোমাদের মাঝে আসতে চাইনি। তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছ তোমাদের বিয়ের আগেই আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।’ সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

প্রত্যুত্তরে বেশ ঝাঁঝিয়ে উঠল আলো। ‘আমি বললাম না, আমি সব জানি। শুধু তোমার কাছে একটাই প্রশ্ন, ঈপ্সিত কী এমন চেয়েছিল তোমার থেকে। শুধু একটু বন্ধুত্বই তো। কীসের এত অহঙ্কার তোমার? তোমার জন্য একটা মানুষ তিলেতিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সারাটা দিন নেশায় ডুবে থাকে মানুষটা।’

‘কী?’ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে। বিস্ময়ের পর বিস্ময়। সত্যি বলতে কী ভাবতে অবাকই হচ্ছিলাম, যে মানুষটাকে বিশ্বাস করে সংসার বাঁধলাম, আর যাকে কোনও সুযোগই দিলাম না, দুটো মানুষের মধ্যে কতটা ফারাক। একজনের থেকে উপেক্ষা পেয়েছি, আর একজন পাগলের মতো ভালোবেসেছে অথচ বদলে সে আমার থেকে নির্লিপ্তি ছাড়া কিছুই পায়নি।

ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। খানিক পরে নিজেকে একটু ধাতস্থ করে ধরা গলায় বলে উঠলাম, ‘তুমি কেন বাধা দাওনি?’

‘কেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিচ্ছ!’

আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। মনে মনে ভাবছিলাম, এ কী পাগল? এই মহিলা আমাকে ঘৃণা করে কারণ, আমি ওর বরের বন্ধুত্ব অ্যাকসেপ্ট করিনি। ভাবনায় বাধ সাধল আলো। ‘দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে না কেন?’

শুনেই মাথাটা গরম হয়ে গেল, ‘প্লিজ স্টপ। এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি জবাবদিহি করতে বাধ্যও নই।’ সবকিছু জেনেশুনে এমনভাবে বলে বসল যেন বিয়েটা কোনও খেলা। ভাগ্যের পরিহাস দ্যাখো যার থেকে ভালোবাসা চেয়েছিলাম, সে অন্য পুরুষের প্রতি আকর্ষিত আর যে আমাকে ভালোবাসল সেও ততদিনে অন্য কারওর হয়ে গেছে। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। হাউহাউ করে কেঁদে উঠলাম।

আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমরা স্বাতীর পার্টিতে এসেছি। ততক্ষণে সমস্ত অতিথিরাই চলে এসেছে।

আমাকে কাঁদতে দেখে আলো কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। তখন গলার স্বর নামিয়ে খানিক বোঝানোর ভঙ্গিমায় আলো বলতে থাকে ‘পৃথিবীতে এত লোকের ভিড়ে একজন মানুষকে কেন ভালো লাগে জানো? জানো না তো? এরকম কত প্রশ্নের উত্তরই তো জানা নেই আমাদের? না হয় ঈপ্সিত আর তোমার সম্পর্কটা কী সেটাও একটা প্রশ্ন হয়েই থাকত!’

‘ঈপ্সিতের বউ হয়ে তুমি একথা বলছ?’

‘কেন? নিজের ঘর-সংসার, স্বামীর কথা ভাবাটা কী অন্যায়? প্রয়োজনে আমি ডিভোর্সও দিয়ে দিতাম। তিনটে মানুষ সারাজীবন কষ্ট পাওয়ার থেকে অন্তত দুটে মানুষতো সুখি হতো।’

আলোর কথা শুনে মনে হল, কত বড়ো হূদয় ওর। স্বামীর খুশির জন্য নিজের খুশিও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ও। সব বাঁধ যেন মুহূর্তে কে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। এতদিন পর মনের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই ভালোবাসা গাল বেয়ে বয়ে যেতে থাকল। চোখ মুছতে মুছতে বোকার মতো বলেই বসলাম, ‘এতই যদি ভালোবাসত, ফিরে এলো না কেন আমার কাছে?’

‘কীভাবে ফিরত? তুমি-ই তো সব পথ বেঁধে রেখে দিয়েছিলে। প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলে যেন কোনওদিনও ও তোমার পথে না আসে।’

‘উহ্, শুধুমাত্র একটা প্রতিজ্ঞা রাখতে সারাজীবন–’ আর কোনও শব্দ বের হচ্ছিল না মুখ দিয়ে। আজ অনুভব করতে পারছি ঈপ্সিত আমার, সত্যিই আমার। ওকে দেখার অদম্য ইচ্ছে, জানার ইচ্ছে ও কি এখনও আমাকে এতটাই ভালোবাসে? আমাকে নিজের করে পেতে চায়? বোধহয় এখন আর…। ভালোবাসার জন্য তো মানুষ কত কী করে! এতো সামান্য একটা প্রতিজ্ঞা। সেটা ভাঙা গেল না? ছুটে এসে বলা গেল না ‘ঋত্বিকা আমি তোমাকেই ভালোবাসি। শুধু তোমাকে…’

 

ছলনা

অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়েই সোজা বারান্দায়। তারপর চা-সহযোগে একটু জলখাবার খাওয়ার পর, ফুরফুরে বাতাসে আরামকেদারায় গা এলিয়ে দেওয়া নিত্য অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে আকাশের। একফালি বারান্দা থেকে যে প্রকৃতির এমন অপরূপ রূপ দেখা সম্ভব, তা বোধকরি নতুন বাড়িতে শিফট না করলে বোধগম্য হতো না তাঁর। দখিনা বাতাস আর মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রকৃতি সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়েমুছে কখন যে তাঁর চোখে আচ্ছন্নের ভাব এনে দেয়, তিনি নিজেও বুঝতে পারতেন না। সেদিনও একটু তন্দ্রাভাব এসেছে কী আসেনি, পাশের বাড়ি থেকে এক নারীকন্ঠ ও জনৈক পুরুষের তুমুল চিৎকার-চ্যাঁচামেচি কানে এল। বেশ কিছুক্ষণ স্থির থাকার পরেও এই মহাভারতের অবসান নেই বুঝে স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘রমা, দ্যাখো তো এত হাঙ্গামা কীসের!’

কাজের মেয়ে পারুলের পেছনে খিটখিট করা রমার স্বভাব। তাকে দিয়ে ঘর মোছাতে মোছাতে এটা সেটা গজগজ করছিল রমা। আকাশের দেওয়া এই বাড়তি কাজে সে তেমন উৎসাহ পেল বলে মনে হল না। দিল্লির দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল আকাশের। শ্বশুরবাড়ির জ্বালায়, একটু শান্তির খোঁজে দিল্লি থেকে তার কলকাতা চলে আসা। অনেক ছোটাছুটির পর তবেই এই ট্রান্সফার। দিল্লিতে তো সর্বদা রমার বাড়ির লোকের আনাগোনা। অফিস যাওয়ার আগে, ফেরার পরে কেবলই কথাবার্তা আর হুল্লোড়। নিরিবিলি বলে যেন কিছুই ছিল না সংসারে।

পঁয়ত্রিশ বর্ষীয় আকাশ বরাবরই একটু রিজার্ভ প্রকৃতির। তেমন হইহল্লা কোনওদিনই পছন্দ করেন না  বরং একান্তে থাকতেই ভালোবাসেন। বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়ির লোকের জ্বালায় জীবনটা তাঁর অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। লোকে বোধহয় ঠিকই বলে– মনের শান্তি, বড়ো শান্তি।

ভাবনায় বাধা পড়ে রমার গলার আওয়াজে। কিছুক্ষণ পর কাজের ঝিকে বিদায় করে রমা এসে দাঁড়ায় আকাশের সামনে। তীর্যক হাসি হাসতে হাসতে বলে, ‘তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে পতিদেব। কয়েকদিন ধরে বলব বলব করে আর বলা হয়ে ওঠেনি। শুনলে খুব খুশি হবে। পাশের বাড়িতে আমার পাতানো বোন মালারা ভাড়া এসেছে। দুবছর আগেই ওর বিয়ে হয়েছে।’

কথাটা শোনামাত্রই আকাশের মুখ একেবারে শুকিয়ে আমসি হয়ে গেল। শুধু একটা অস্পষ্ট আওয়াজ রমার কানে এল, ‘এখানেও?’

রমা বেশ তাচ্ছিল্য করেই বলল, ‘আরে শোনো শোনো, এইটুকুতে ভেঙে পড়লে চলবে? শালি বলে কথা। তাও আবার তোমার একমাত্র শাশুড়ির বান্ধবীর মেয়ে। তখন না হয় কাজের জন্য শালির বিয়েতে যেতে পারোনি, এখন তো বাড়িতে ডেকে আতিথেয়তা করতেই হবে।’

আর সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না আকাশের। বউয়ের কথার মাঝখানে কথা কেটে একেবারে ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন, ‘ওহ্, তাহলে অমন নির্লজ্জের মতো ঝগড়াটা তারাই করছিল, তাই তো?’

বড়ো বড়ো চোখ করে স্বামীর দিকে তাকায় রমা, ‘সহানুভূতি না দেখাতে পারো, অন্তত তাদের নিয়ে পরিহাস কোরো না। কার যে কখন কেমন সময় আসে, কে বলতে পারে!’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রমা। খানিক চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করে, ‘দুজনেই ভালো চাকরি করত। মালার কল সেন্টারের চাকরিটা ছাড়তে হল নাইট শিফ্টের কারণে। আর তার কয়েকদিন পরেই সৌরভ যে-কোম্পানিতে চাকরি করত, সেই কনস্ট্রাকশন কোম্পানিটাও বিনা নোটিশে হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায়। তাও প্রায় দুমাস হয়ে গেল। সংসার খরচ, ঘরভাড়া– কী করে যে সংসারটা চলবে! তাই আপাতত হাজার কুড়ি টাকা দেব…।’

টাকার কথা শোনামাত্রই মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায় আকাশের।

‘আমার থেকে অনুমতি না নিয়েই যাকে-তাকে…।’

‘যাকে-তাকে কাকে বলছ। আফটার অল আমার মাসির মেয়ে।’

মেজাজ চড়েই ছিল আকাশের। ‘মাসির মেয়ে, মাসি! তবু যদি জানতাম নিজের কেউ। বলা নেই কওয়া নেই, উনি একেবারে কথা দিয়ে চলে এলেন। আমাদের গাছ আছে নাড়া দেব, আর তুই টাকা নিয়ে চলে আসবি। সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাটলে তবে দুটো পয়সা পাওয়া যায় বুঝেছ।’ কথাগুলি বলতে বলতে হঠাৎই থেমে যান আকাশ। দরজার সামনেই অত্যন্ত সুন্দর, আকর্ষক এক মহিলা এবং একজন পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির মতো হাইটের সুপুরুষ। বোকার মতো মহিলাটির দিকে তাকিয়ে থাকেন আকাশ। চিরকালই মহিলাদের উপর একটা আলাদা টান ছিল তাঁর। তাও আবার এমন আকর্ষণীয়া সুন্দরী।

ঠিক তখনই রমা বেশ উঁচু স্বরে বলে ওঠে, ‘আয়, আয় মালা। সৌরভ এসো। আরে দাঁড়িয়ে গেলি কেন তোরা।’

নিজের শান্ত জীবনে দুই আগন্তুকের অতর্কিত প্রবেশ সত্ত্বেও আর কিছু বলতে পারলেন না আকাশ। খানিক আলাপচারিতা আর চা-জলখাবার খাওয়ার পর দিদিকে আলাদা ঘরে নিয়ে যায় মালা, ‘দিদি টাকাটা!’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ’ আনছি।’ বলেই কুড়ি হাজার টাকা আলমারি থেকে বার করে মালার হাতে ধরিয়ে দেয় রমা।

টাকা হাতে পাওয়া মাত্রই খুশি মনে কপোতকপোতী গেট থেকে বেরিয়ে গেল। ঘণ্টা চারেক আর দুজনের টিকিটি পাওয়া গেল না। রাতে ফিরে, ফের রমার বাড়িতে হাজির দুজনে। মালা ঘরে ঢুকেই সোফায় গা এলিয়ে বলে, ‘রমাদি ডিনারটা কিন্তু এখানেই সারব। আর রান্না করার মতো শক্তি নেই আমার। ভীষণ ক্লান্তি লাগছে।’

‘এতক্ষণ কোথায় ছিলি তোরা দুজন?’ প্রশ্ন করে রমা।

‘বেশিরভাগ সময়টাই তো চলে গেল পার্লারে।’ চমকে ওঠে রমা। মালা কোনও দিকে না তাকিয়ে কলকলিয়ে ওঠে, ‘পেডিকিওর, ম্যানিকিওর, ফেসিয়াল, হেয়ার কাটিং।’

‘তুই তো এমনিই সুন্দর। তাহলে এসবের কী দরকার ছিল বলতো? খামোকা এই সময়ে কতগুলো টাকা নষ্ট হল।’ বিমর্ষতার ভাব ঝরে পড়ছিল রমার স্বরে।

‘কতগুলো আর কোথায়, মোটে পনেরোশো টাকাই তো লেগেছে।’ নিজের এলো চুলগুলো নাড়তে নাড়তে মালা কেমন অকপটে বলে গেল, ‘মেনটেন না করলে কী আর সৌন্দর্য ধরে রাখা যায় রমাদি। নিজের দিকেই দ্যাখো না, এমন চাঁদপানা মুখটার কী অবস্থা করে রেখেছ। ভাই, হয় পয়সা বাঁচাও, না-হয় রূপ… টাকা তো হাতের ময়লা, আজ আছে কাল নেই।’

আকাশের সহ্যশক্তির বাঁধ প্রায় ভাঙতেই বসেছিল। নিজেকে কিছুটা সংযত করে তাচ্ছিল্যের সুরেই বলে ফেললেন, ‘সৌরভ কি তাহলে মেন্স স্যালন-এ গিয়েছিল নাকি?’

‘আরে না না। ওর এত সময় কোথায় যে ও পার্লারে যাবে। রাজ্যের বিল জমা দিতে দিতেই তো ওর সময় চলে গেল, ঘরের ভাড়া, ইলেকট্রিক বিল, টেলিফোন বিল। না হলে হয়তো ও-ও…।’

শিউরে ওঠে রমা, ‘তাহলে তো অনেকটাই গেল!’

‘হ্যাঁ, বেশিরভাগটাই। এখনও দুধের বিল বাকি আছে। সঙ্গে নিত্যদিনের খরচাপাতি।’

মনে মনে আকাশ বলতে থাকেন, ‘পকেটে কড়ি নেই, অথচ ফুটানি দ্যাখো, যেন একেবারে জমিদারের ব্যাটা।’

স্বামীর চোখমুখ দেখামাত্রই ঘাবড়ে যায় রমা। ‘মালা তোকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তোরা বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। আমি খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

মালা আর সৌরভ যাওয়া মাত্রই আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়লেন আকাশ, ‘কোথাও যাবে না তুমি। লাটসাহেব সব একেবারে। দু-পয়সা উপায় করার মুরোদ নেই, অথচ ঠাটবাট দ্যাখো। ভগবান একটু সুখশান্তি আর আমার কপালে লেখেনি। সেই কথায় বলে না, তুমি যাবে বঙ্গে, তোমার কপাল যাবে সঙ্গে।’ গজগজ করতে থাকেন আকাশ।

খাটোগলায় রমা বলার চেষ্টা করে ‘না না ওটা ধার হিসাবে নিয়েছে…’ কিন্তু তাতে আরও রেগে ওঠে আকাশ।

প্রায় মাস-দুয়েক হতে চলল আকাশ আর রমা বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে এসেছে। আস্তে আস্তে পাড়াপড়শির সাথে পরিচিতি বেড়েছে। সেখান থেকেই খবর পাওয়া। মালা-সৌরভ আশেপাশের অনেক লোকের থেকেই টাকাপয়সা ধার করে বসে আছে। যখন তাদের হাতে টাকা থাকে তখন মনে হয় এরা একে অপরের জন্যই তৈরি। আর পকেট ফাঁকা হলেই দুজনের চ্যাঁচামেচির জ্বালায় পাড়ায় কাকপক্ষীও বসতে সাহস দেখায় না।

এমনভাবেই কেটে গেল আরও ছটা মাস। ততদিনে পাড়াপড়শিরাও এই জুটির স্বভাব সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। তাই তারাও ধার দেওয়ার ঝাঁপি একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন। ওদিকে ছ’মাসের ভাড়াও বাকি পড়ে গেছে। বাড়িওয়ালা রোজই আসে আর খালি হাতে ফিরে যায়। ক্রোধের বশে একদিন বাড়িওয়ালা সৌরভকে না পেয়ে ঘরের সমস্ত মালপত্র তুলে বাইরে ফেলে দিয়ে দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেয়। মালার সঙ্গে বাড়িওয়ালার তুমুল বচসা বেধে যায়। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হয় না।

ঘটনাচক্রে সেদিন সৌরভ কোনও কাজে কলকাতার বাইরে ছিল। তার ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত। ওদিকে রমাও সেদিন পাড়ার এক মহিলার সঙ্গে পরিচিত কারওর বাড়িতে ঠাকুরের নামগান শুনতে গেছে। তারও বাড়ি ফিরতে রাত গড়াবে। এমতবস্থায় আস্তানা হিসাবে কেবলমাত্র তার রমাদির গেটকেই বেছে নেয় মালা।

রোজের অশান্তির কারণে কলকাতার প্রতিও মোহভঙ্গ হতে বসেছিল আকাশের। সেই জন্যই অন্যত্র বদলির জন্য কোম্পানিতে আবেদনপত্র জমাও দিয়েছিল। কিন্তু ওই ভাগ্য। অফিস থেকে ফিরে গেটের দরজাটা খুলতে যাবে কী, সামনে আলুথালু ভাবে বসে মালা। মালাকে দেখামাত্রই হকচকিয়ে ওঠেন আকাশ। খানিক পরে ধাতস্ত হয়ে মালাকে ঘরে বসার জন্য বলেন। ঘরে ঢোকামাত্রই জামাইবাবুকে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে মালা। সৌরভ আর মালার প্রতি তিতিবিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও মালাকে সরিয়ে দিতে পারেন না আকাশ। মালার শরীরের মদির স্পর্শে আকাশের শরীরে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে যায়। মালার গায়ের মিষ্টি গন্ধ আর ঘন চুলের আবর্তে আরও আকর্ষিত হতে থাকেন আকাশ। হূৎস্পন্দন বাড়ার সাথে সাথে কেঁপে ওঠে শরীরও। কয়েক মুহূর্তের লাবণ্যে বশীভূত হয়ে যান তিনি। সেইসময় হঠাৎই বেজে ওঠে আকাশের ফোনটা। সম্বিত ফেরে আকাশের। এ-কী করতে বসেছিল সে! সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে সরিয়ে দেন মালাকে। পাশের সোফায় বসায় তাকে। ‘শান্ত হও। যাই হোক, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

চোখ মুছতে মুছতে মালা জবাব দেয়, ‘ঠিক হওয়ার জন্য টাকাই তো আমাদের কাছে নেই। নাহলে কী আর বাড়িওয়ালা জোর করে এভাবে তুলে দেয়। কী করে সব ঠিক হবে?’

‘ঠিক আছে দেখছি কী করতে পারি। তুমি একটু বোসো, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমি আসছি।’ বলে পকেট থেকে এটিএম কার্ডটা বার করে গাড়ি নিয়ে চলে যান আকাশ।

মিনিট সাতেক পরে ফিরে ছয় মাসের বাড়ি ভাড়া বাবদ মালার হাতে হাজার তিরিশেক টাকা দিতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে মালা। কায়দা করে শাড়ির আঁচলটা খসিয়ে দিয়ে আকাশের একদম কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘থ্যাংক ইউ আকাশদা, থ্যাংক ইউ।’

জুতো খোলার জন্য সোফায় বসা আকাশের চোখ আটকে যায় যৌবনে ভরা মালার সুডৌল স্তন যুগলের উপর। মুখ থেকে কোনও কথা সরে না তার। কেবল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।

সেদিনের পর থেকে মালা-সৌরভের প্রতি আকাশের ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন চলে আসে। এই পরিবর্তনটা যে রমার চোখে পড়েনি, তা নয়। অবাক যেমন হয়েছে, খুশিও হয়েছে তার দ্বিগুণ। মনে মনে ভেবেছে, যাক রোজকার ঝঞ্ঝাট থেকে তো অন্তত মুক্তি পাওয়া গেল। আকাশ রমাকে বলব বলব করে মালাকে টাকা দেওয়ার কথাটা শেষ পর্যন্ত আর বলে উঠতে পারেননি।

ওদিকে মালাও বুঝে গিয়েছিল আকাশ ক্রমশ তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাকে নিজের মোহজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতে শুরু করল সে।

সহজসরল রমা যখনই কোনও কাজে বাইরে যায়, এমনকী বাপের বাড়ি গেলেও সংসারের দায়িত্ব মালার উপরেই দিয়ে নিশ্চিত থাকে সে। সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় মালা। বিভিন্ন অছিলায় নিজের রূপযৌবনকে হাতিয়ার করে আকাশের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করা। আজ এটা চাই, কাল সেটা চাই– তৎপর আকাশও মোহের বশে উড়িয়ে যায় টাকা। বাদ যায়নি রমাও। তার কাছ থেকেও কুমিরের কান্না কেঁদে টাকা হাতাতে থাকে মালা।

সহজসরল স্বভাবের অনুরাগী স্বামীর, হঠাৎই তার প্রতি উদাসীন হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কিছুতেই মন থেকে মানতে পারছিল না রমা। খটকা একটা লাগছিলই। কিন্তু কোথায় যে এর গোড়া, অনেক চিন্তাভাবনার পরেও সেটা কোনওভাবেই অনুসন্ধান করতে পারল না রমা।

কেবলমাত্র পয়সার জন্যই মালার যত ছলাকলা। আকাশের প্রতি বিন্দুমাত্রও দায়বদ্ধতা ছিল না তার। একদিন রমার অনুপস্থিতিতে সংযম হারিয়ে আকাশ মালাকে বিছানায় টেনে নেয়। সব বাধা পেরিয়ে মালার শরীরী সান্নিধ্য পেতে চায় একান্তভাবে। বাধ সাধে মালা। রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘ভেবেছেনটা কি টাকা দিচ্ছেন বলে কি নিজেকে উৎসর্গ করব আপনার কাছে? এতটা সহজলভ্য বস্তু বোধহয় আমি নই। আরে আপনার মতো বোকা লোকেরও তো অভাব নেই পৃথিবীতে, শরীরের একটু হালকা স্পর্শ পেলেন কী না পেলেন সবকিছু লোটাতে শুরু করলেন। যাক অনেক হয়েছে, হাজার কুড়ি ছাড়ুন তো।’

হতবাক আকাশ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন। মালা বলতে থাকে, ‘ছাড়ুন, ছাড়ুন, নয়তো আপনার আসল চেহারাটা আর কারওর জানতে বাকি থাকবে না।’ বাঁচার জন্য মানুষ কী না করে, অগত্যা মালাকে দিতেই হয় সেই টাকা। এইভাবেই মালার লোভ আরও বেড়ে চলে।

কলশির জলও গড়াতে গড়াতে একদিন শেষ হয়ে যায়। রমা আর আকাশের সংসারেও অভাবের ছাপ পড়তে শুরু করে। তাই একদিন বাধ্য হয়েই মালাকে দেওয়া পাওনা টাকার কিছুটাও যদি মালার মায়ের থেকে পাওয়া যায়, সেই আশায় অনুভামাসিকে ফোন করে রমা। কিন্তু তিনি বলেন, ‘ছোটোবোনকে কটা টাকা দিয়েছিস বলে সেটাও চাইছিস। এত নীচ তোকে কখনও ভাবিনি।’

পরে রমা তার মাকে সব কথা জানালে, তিনিও ঝাঁঝিয়ে ওঠেন মেয়ের উপরে, ‘মালা যে দিনের পর দিন তোর সরলতার সুযোগ নিয়ে এভাবে টাকা নিচ্ছে কই আগে বলিসনি তো? সবকিছু খুইয়ে দিয়ে এখন বলছিস। অনুভা আর ওর পরিবারের ওই দোষের জন্য আমরা ওদের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে ছেদ করে দিয়েছি।’

এতদিনে বাপের বাড়ির লোকেদের থেকে মোহভঙ্গ হয়েছে রমার। ওদিকে মালার প্রতিও ঘেন্না জন্মে গিয়েছিল আকাশের মনে। তৎসত্ত্বেও তিনি না পারছিলেন রমাকে সত্যিটা বলতে, না পারছিলেন মালার দিনদিন বেড়ে যাওয়া চাহিদা মেটাতে। সংসারের চাপ আর মালার চাহিদায় আকাশ রীতিমতো নাজেহাল হয়ে উঠেছিলেন। রাতের ঘুম চলে গিয়েছিল তাঁর। অন্যত্র বদলির জন্য আবেদন জমা দিয়ে কোনও সদুত্তর মেলেনি।

এরই মাঝে মালা আবার কলসেন্টারে জয়েন করেছে। সৌরভও একপ্রকার চাপে পড়েই একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে জয়েন করেছে। পাড়াপড়শির কাছে প্রচুর দেনা, তারাও তো আর ছেড়ে কথা বলছে না। সেই চাপেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু উপায় তেমন বিশেষ নয়। বরং খরচা অনেক বেশি।

দিন পনেরো এভাবে চলার পর হঠাৎই একদিন মালা উধাও হয়ে গেল। অফিসে গিয়ে আর ফেরেনি। পুলিশ এদিক-সেদিক খুঁজলেও কোনও হদিস পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র এটুকুই খবর পাওয়া গিয়েছিল মালা সেইদিন কলসেন্টার যায়ইনি। সৌরভ পাগলের মতো খুঁজে বেড়াল তাকে। তারপর একদিন সেও নিরুদ্দেশ।

ঠিক তখনই মালার মা অনুভাদেবী, আকাশ আর রমার বিরূদ্ধে রিপোর্ট দায়ের করলেন। তাদের নিখোঁজের পিছনে নাকি রমা আর আকাশের-ই হাত রয়েছে। পাড়াপড়শির হস্তক্ষেপ এবং উপরমহলের কিছু বন্ধুর জন্য জেলে যেতে হয়নি তাদের। বড়ো বাঁচা বেঁচেছে তারা।

মাসদুয়েক পর হঠাৎই একদিন দেরাদুন থেকে ট্রান্সফার লেটার এসে উপস্থিত হল। এই পরিবেশে দুজনেই বেশ হাঁফিয়ে উঠেছিল তাই পাকাপাকি ভাবে দেরাদুনে সেটল করার আগে একবার সেখানে তদারকি করতে ও কয়েকদিন ছুটি কাটাতে রমাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিল আকাশ।

প্রথমদিনটা অফিসেই কেটে গেল। দ্বিতীয় দিন টুরিস্ট বাসে চড়ে পুরো শহর ঘোরার পালা। সেইমতো সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া। যেতে যেতে পথের মাঝে শুটিং হচ্ছে দেখে গাড়ি থামিয়ে সকলে হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ল। কোনও এক হিন্দি ছবির নাচের শুটিং চলছিল। নায়ক-নায়িকার পিছনে বেশ কয়েকজন রংবেরঙের পোশাক পরে তালে তালে নাচছে।

আচমকা রমা চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে ওটা মালা না?’

আকাশেরও বিন্দুমাত্র চিনতে অসুবিধা হল না। মালাকে দেখে রমা আকাশকে বলল, ‘এবার অনুভামাসির হাতে ওকে তুলে দিয়ে আমাদের বদনাম ঘোচাব। একবার যখন পেয়েছি তখন আর ছাড়ার প্রশ্নই নেই।’

রমার কথায় ঘোর আপত্তি তোলে আকাশ। বলে, ‘খবরদার, একবার যখন এই ধান্দাবাজগুলোর হাত থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি তখন আর এসবের মধ্যে ঢুকতে যেও না। ফালতু ফালতু জল ঘোলা করে লাভ কী। চলো ফিরে যাই।’

কিন্তু রমাকে বোঝাবে কে? তার মাথায় জেদ চেপে বসেছে, এই কলঙ্ক থেকে তাদের মুক্তি পেতেই হবে। তাই স্বামীর বিরুদ্ধে গিয়ে, শুটিং শেষ হওয়ার পরেই মালার পিছু পিছু একটা ট্যাক্সি নিয়ে পিছনে ধাওয়া করল। একটি নিম্নবিত্ত পাড়ায় একখানা অপরিসর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিল মালা। অপ্রত্যাশিত ভাবে আকাশ আর রমাকে দেখে, মালা এমন ভান করল যেন তাদের কোনওদিন দেখেইনি। রীতিমতো চিনতে অস্বীকার করল তাদের। সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায় রমার। রাগে চিৎকার করে ওঠে, ‘তুই এখানে আয়েশে আছিস, আর তোর মা তোর কারণে আমাদের দুজনকে জেলে পাঠাবার পাকাপাকি বন্দোবস্ত প্রায় সেরেই ফেলেছিল। তোকে নাকি আমরা গায়েব করেছি। এখুনি আমাদের সাথে চল। তোর মায়ের কাছে নিয়ে যাব তোকে।’

একটা কথাও বলল না মালা। কোনও সদুত্তর না পেয়ে রাগের বশে মালার গালে একটি সজোরে থাপ্পড় কষিয়ে দিয়ে রমা বলে, ‘যে তার নিজের স্বামীর হতে পারেনি, সে অন্যের কী হবে! তুই এখানে আনন্দে বেলেল্লাপনা করছিস, আর তোর বর সৌরভ পাগলের মতো খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে তোকে। ভগবান জানে সে এখন কোথায়।’ হ্যাঁচকা টানে মালাকে ঘর থেকে বাইরে আনার উপক্রম করতেই, মালা রীতিমতো জোরে চিৎকার করে উঠল, ‘বাঁচাও, বাঁচাও।’

আওয়াজ শুনে আশপাশের বেশ কয়েকজন লোক জড়ো হতেই ঘাবড়ে গিয়ে রমা, মালার হাত ছেড়ে দিল। সেখানকার গতিক ভালো নয় বুঝে আকাশ একপ্রকার জোর করেই রমাকে টেনে নিয়ে ট্যাক্সিতে এনে বসালেন।

খানিক যাওয়ার পরেই আকাশ বলে উঠলেন, ‘আমাদের এখানে কোনও গন্ডগোল না পাকিয়ে ওদের ঠিকানাটা কলকাতার পাওনাদারদের দিয়ে দিলেই হতো, তারাই যা করার করত।’ আকাশের কথাতে সম্মতি জানাতে গিয়ে হঠাৎই রমার মনে পড়ে গেল, তাইতো ঠিকানাটাও তো ঠিক করে দেখা হল না। গাড়ি থামিয়ে রমা বলে, ‘তুমি গাড়িতেই থাকো। আমি লুকিয়ে জেনে আসছি।’

জায়গাটায় ফেরত আসতেই, রমা হকচকিয়ে গেল। গলায় জয়ের উল্লাস নিয়ে মালা বলছে, ‘কি মা, কেমন অ্যাক্টিংটা করলাম বলোতো? রমাদিকে একেবারে আউট করে দিলাম কেমন। দ্বিতীয়বার আর এখানে আসার ভুলটা করবে না।’

অনুভাদেবীও মেয়ের কাজে খুশি হয়ে শাবাশ শাবাশ করতে লাগলেন।

‘মানছি বাবা মানছি। তুই তো আচ্ছা আচ্ছা নায়িকাদেরও কাত করে দিবি রে! কী দারুণ অভিনয়টাই না করলি। তোর হিরোইন হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না দেখিস।’

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মালার বর সৌরভও মালার তারিফ না করে পারল না।

সবকিছু দেখে হতবাক রমা, বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। নতুন করে আর কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না তার। গাড়িতে ফিরে স্বামীকে সমস্ত বৃত্তান্ত শোনাতে শোনাতে কেঁদে ফেলল সে, ‘আমরা ঠকে গেছি আকাশ, একেবারে ঠকে গেছি। সবাই প্লান মাফিকই টাকা হাতানোর এই ফাঁদটা পেতেছিল। আমাদের সরলতা আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মালা-সৌরভ দিনের পর দিন ছলনা করে গেছে। ছলনা।’

 

দুরন্ত ঘোড়া

এই সমাজে ছোটাটাই দস্তুর। কেউ কেউ পরিকল্পনা করেই ছোটে। মিশনটা ভোগ সাগরে ডুব দেওয়া। অনেকে শক্তি হারিয়ে সেই সাগরে অতল গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আবার কেউ সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরে আসে। জীবনের মূল্যবোধ, পরম্পরা দায়দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ সব খুইয়ে সে রিক্ত। ভোগ সাম্রাজ্যের মাঝে বসে নিরেট ভোগ সামগ্রী তাকে গিলে খেতে চায়। প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরেরা শিকারিকে নিয়ে প্রথমে খেলা করে, তারপর একটু একটু করে ছিঁড়ে খায়। সেই ছিন্নভিন্ন মনের যন্ত্রণায় প্রলেপ দিতে কেউ আসে না।

সে আজ বড়ো একা। মিঠু যন্ত্রমানবে পরিণত হতে চায় না। ছোটোবেলা থেকে অতি মেধাবী মিঠুর স্বপ্ন ছিল অন্যরকম। জীবনবিমার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আজীবন দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে পর্যুদস্ত। নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মিঠু আলোর দিশারি। মিঠুর হাত ধরে আদিত্য আকাশ ছুঁতে চায়। অফিস কলিগরা ইন্ধন দেয়– আদিত্যবাবু, মিঠুর মতো অসাধারণ মেধাবী মেয়েকে স্টেট লেভেলের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়ে পাতি ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন? ওর জন্য পড়ে রয়েছে তো গোটা জগৎ। ওকে তো আরও বড়ো জায়গায় পরীক্ষা দেওয়াতে পারতেন? ওর আসল জায়গা আইআইটি।

ভাগ্য খোলে তরুণ কর্মকারের লটারি ব্যাবসায়। ফুটপাথে চেয়ার টেবিল পেতে লটারি বিক্রিতে যা কমিশন হতো, সংসারের হাঁড়িতে তেমন একটা কালি পড়ে না। পড়ার কথাও নয়। মোড় ঘুরল এই কাউন্টার থেকে প্রথম পুরস্কার লেগে যাওয়ায়। প্রথম পুরস্কার পেয়ে ট্যারা গোবিন্দ কত নম্বর বিত্তশালীদের খাতায় নাম লিখিয়েছিল জানা যায়নি। তরুণ ফুলে ফেঁপে ঢোল। খদ্দেরের মন বুঝে মা কালীর ফটোতে প্রতিদিন তাজা জবার মালা, সিঁদুর পরিয়ে, ধুপকাঠি জ্বালিয়ে বসে। সামনে থাকে বড়ো প্লাইবোর্ডে কাগজ লাগানো বিজ্ঞাপন, আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লটারি প্রথম পুরস্কার এই কাউন্টার থেকে উঠেছে, ইত্যাদি। আওয়াজটা বহুদূর পেৌঁছে দেওয়ার তাগিদে রাখা আছে একটি সাউন্ড বক্স। চটুল হিন্দি গানের পাশে চলতে থাকে আনন্দ সংবাদ। খদ্দেররাও হঠাৎ বিত্তশালী হওয়ার বাসনায় পিল পিল করে টিকিট সংগ্রহ করে। প্রাচুর্য তরুণকে নিয়ে যায় নরক দর্শনে। অন্ধকার জগতে। সেই জগতে সে এখন মাফিয়া। জীবনের মূল্যবোধ দায়িত্ব কর্তব্যবোধ সব কিছুরই প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

বাচ্চা হওয়ার সময়ই রূপাঞ্জনার মা সমস্ত দায়দায়িত্ব সন্তান বাৎসল্য সমস্ত কিছুই তরুণের হাতে সঁপে দিয়ে জগতের মায়া ছেড়ে কেটে পড়ে। এত দায়ভার বহনের ক্ষমতা হয়তো তরুণের ছিল না। ছোট্ট শিশুর মিষ্টি হাসি সন্তান বাৎসল্য উসকে দেয়। বিরক্ত হয় না। ক্লান্তি আসে না। তিল তিল করে হারিয়ে যাওয়া মায়ের সাহচর্য দিয়ে বড়ো করতে থাকে। দাম্পত্য জীবনের আশা আকাঙক্ষা স্বপ্ন সব কিছুরই মূর্ত প্রতীক রূপাঞ্জনা। সে আজ আকাশের বুকে লেপটে থাকা নক্ষত্র। কম্পিটিশনটা ছিল মিঠুর সাথে। মিঠু ফোন করে –– হ্যালো রূপাঞ্জনা পড়তে যাবি তো?

– না রে আজকে শরীরটা ভালো নেই।

– সে কি, আজ যে ফিজিক্সের ক্লাস।

– থাক আজ ভালো লাগছে না। মাথাটা কেমন ঘুরছে।

হঠাৎই মেয়ের এই পড়াশোনার উদাসীনতার উৎস বুঝতে পারে না। টিচাররাও মিঠু, রূপাঞ্জনার অগ্রগতিতে উৎসাহিত। শ্যামলবাবু তো প্রথমেই ডেকে বললেন– তোমরা আমার কাছে ফিজিক্স পড়বে। আর শোনো তোমাদের কোনও ফি দিতে হবে না। কোচিং দেওয়া নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে কম্পিটিশন ওঠে তুঙ্গে। ফোন ছাড়তেই তরুণ উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করে– কিরে, পড়তে যাবি না কেন? শরীর খারাপ? কি হয়েছে?

– না তেমন কিছু না।

– তবে? শেষ সময়ে এসে এই ফাঁকি কতবড়ো সর্বনাশ ডেকে আনবে বুঝতে পারছিস না। তোকে যে বড়ো ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। তোর মা যে হাঁ করে বসে আছে। তাকে কি কৈফিয়ত দেব?

রূপাঞ্জনা চুপ করে থাকে। বাবার এই উৎকন্ঠা, আবেগ প্রলেপ দেওয়ার রসদ জমা নেই। শরীরের মধ্যে এক অজানা অস্থিরতা যন্ত্রণা। সমস্ত উৎসাহ উদ্দীপনা যেন ক্রমশ নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তরুণের মনে হয় মেয়েটা কোনও বয়ফ্রেন্ডের পাল্লায় পড়েনি তো? সেক্ষেত্রে এই উদাসীনতা স্বাভাবিক। তরুণ ভিন গ্রহে হ্যারিকেন নিয়ে বয়ফ্রেন্ডের তল্লাশি চালাতে থাকে।

বাড়ির সামনে লোকের ভিড় দেখে তরুণের বুকের ভিতরটা ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। পা যেন আর চলতেই চায় না। সামনে এসে অতি কষ্টে জিজ্ঞাসা করে– কি হয়েছে? পুলকের মা একটু বকে বেশি। নাম কিনতে চায়। লোকজন ঠেলে মুখ বাড়িয়ে বলে– আর বলো কেন। তুমি সাত সকালেই বেরিয়ে যাও। মেয়েটা মনে হয়, না খেয়েই পড়তে গিয়েছিল। তাই বোধ হয় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছে। জ্ঞান ছিল না। এখন এসেছে। তরুণ ঘরে ঢুকতেই বুলটির মাকে ঠেলা দিয়ে বলে– কি জানি বাবা। আজকাল ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে যা শুনি, কোথায় কি করে এসেছে কি জানি। বুলটির মা সায় দিয়ে বলে– মা মরা মেয়ে। শাসন নেই। হতেও পারে। উৎকন্ঠিত তরুণ জিজ্ঞাসা করে– কিরে মা, কি হয়েছে? রূপাঞ্জনা ধীরে ধীরে উত্তর দেয় – শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বুকে একটা যন্ত্রণা।

তবে চল কাছাকাছি কোনও নার্সিং হোমে, বলেই তরুণ উর্দ্ধশ্বাসে বেরিয়ে যায় গাড়ির খোঁজে। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পর ডাক্তার পাল জানিয়ে দেয়– পেশেন্ট ইজ ভেরি সিরিয়াস। হার্টের দুটো ভালভ্ই প্রায় ব্লক। একটি হান্ড্রেড অপরটি সিক্সটি পারসেন্ট। ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। ওয়ার্ড মাস্টারের কাছে যান। সব বলে দেবে।

তরুণ দিশেহারা। উদ্ভ্রান্ত, এসব ব্যাপারে মুরারীপুকুরের ক্লাবের ছেলেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। টাকার সংস্থান হল। সেই টাকা নিয়ে ছুটতে ছুটতে নার্সিংহোমে তরুণ যখন পৌঁছোয় সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। অনেক আশা-আকাঙক্ষা স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার চোখ দুটি স্থির। নিস্পন্দ নিথর দেহখানি। সার্জন জানিয়ে দিলেন– সরি, মেয়েটি কোনও সুযোগই দিল না। ওটি-তে নেওয়ার আগেই সব শেষ।

আদিত্য অফিস থেকে ফিরেই আইআইটি-র ফর্মটা মেয়েকে দিয়ে বলে– নে এটা ফিল আপ কর। মিঠু দেখেই বলে এটা কী?

পড়ে দেখ। ফর্মের পাতা ওলটাতে ওলটাতে মিঠু খানিকটা ভীত হয়ে প্রশ্ন করে– বাবা, এ কি আমি পারব? আদিত্য নিজেই মনোবল উসকে নিয়ে সাহস জোগায়– পারবি মানে, তোর টিউটররা কি তাহলে ভুল মূল্যায়ন করেছে। আর ছিল রূপাঞ্জনা। সে তো আজ অতীত। তোর টিচাররা তো তোদের দুজনের ব্যাপারে হাই অ্যামবিশনের এক্সপেক্ট করছে।

– কিন্তু বাবা আমি চেয়েছিলাম, স্টেট লেভেলে ইঞ্জিনিয়ারিংটা দিতে। লোকালই কোনও একটা চাকরি নিয়ে তোমাদের কাছে থাকতে। আমি তো তোমাদের একমাত্র সন্তান। এটাতে পড়াশোনা করলে চাকরি নিয়ে তোমাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে।

– তা হোক। আমাদের কথা তোর ভাবতে হবে না। চোখ উপর দিকে রাখ, তোকে অনেক উঁচুতে উঠতে হবে। তুই আমাদের গর্ব। পাড়ার গর্ব। মিঠু তর্ক বাড়ায় না। চুপ করে যায়। যে কথাটা বলতে পারল না, এই যে বাবা উঁচুতে স্বপ্ন দেখছে, অর্থের প্রাচুর্য হয়তো একদিন গিলে খাবে। দায়িত্ব, কর্তব্য মূল্যবোধ সবই হয়তো একদিন পরিত্যাজ্য হবে।

তরুণ যাচ্ছিল আদিত্য মুখার্জীর বাড়ির পাশ দিয়ে। একটা চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে বাড়িতে প্রবেশ করে। তার চাইতেও বড়ো, কারণে অকারণে মিঠুকে দেখার অভিলাষ। সে যে তার রূপাঞ্জনারই প্রতিরূপ। রাঘব আগরওয়ালার কর্মচারী সুজন অধিকারীর কঞ্চির আস্ফালনে আদিত্য কুঁকড়ে ঢোঁড়া সাপ। মুখে ভাষা নেই। প্রতিশ্রুতির বাক্যবাণী নেই। অবনত মস্তকে চেয়ারে মাথা নীচু করে বসে থাকে। সুজনের অশ্রাব্য ভাষায় দরজা নেই। অবিশ্রান্ত আস্ফালন করেই চলেছে– বুড়ো ভাম, ভাড়া চুকোতে অসুবিধা কোথায়? ছিপলিটা দিয়ে দিলেই তো সব চুকে যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে তরুণ বেকায়দায় পড়ল। আশা ছিল মেয়েটার সাথে দু-দণ্ড কথা বলে মনটা জুড়োবে। মেজাজটা হিঁচড়ে দিল। পকেট থেকে কানপুরি ছুরিটা বের করে সুজনের পেটের সামনে ঠেকিয়ে বলে– আবে এ কাঞ্চা, কি বললি? আবার বল। একদম পেট কামিয়ে দেব। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া সুজন ছুরি দেখে নীচের কাপড় আর শুকনো রাখতে পারে না, দুর্বল পরিবারে তড়পানোর শক্তি হারিয়েছে। তরুণের পা দুটি জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে বলে– দাদা আমার কি দোষ? মালিকের অর্ডার ছিল কড়া ভাষায় থ্রেট করতে।

– নে ওঠ শালা, তাই বলে আমার মাকে বেইজ্জত করবি। কত ভাড়া পাবি? সুজন করুন সুরে বলে– পাঁচশো টাকা করে ছয় মাস তিন হাজার টাকা।

পকেটের থেকে এক গোছা টাকা বের করে ছুড়ে দিয়ে বলে– নে এতে তোর তিনহাজার টাকার বেশি আছে। এর পরে যে টাকা বাকি পড়বে আমার মা চাকরি করে শুধবে। তার আগে যদি এ মহল্লায় পা দিয়েছিস তো, আসার সময় দত্তদের পুকুরটা দেখেছিস, একদম খাল্লাস করে ওখানে চালান করে দেব। চল হট শালা। মিঠুর দিকে তাকিয়ে বলে– মা-রে ও মালটার সাথে এভাবে কথা না বললে হল্লা করেই চলত। বারবার ঝামেলা করত। তোর সামনে লোকটার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করায় আমারও সংকোচ হচ্ছে। এছাড়া আমার যে আর কোনও পথও খোলা ছিল না। সংকোচ মিঠু করে না। শ্রদ্ধার পরিমাণটা অন্তরস্থলে আরও একটু জায়গা করে নেয়। আমি উঠি রে, তোর পড়াশোনার অনেকটা ক্ষতি হয়ে গেল। বলে তরুণ দাঁড়ায় না।

পরিণতি তরুণকে নিয়ে যায় নরক দর্শনে। সে জাত বজ্জাত নয়। বেপরোয়া ঔদাসীন্যের সঙ্গে যারা পাপের পথে হাঁটে, কোয়ালিস হাঁকায়, সে ধাতুতে তরুণ গড়া নয়। পাপ তার পেশা নয়, নেশা। দারিদ্র্যকে বড়ো কাছের থেকে দেখেছে। সেই দারিদ্র্য নিয়ে স্ত্রী কন্যার সংসার সামলেছে। সব হারানোর যন্ত্রণা বিষাক্ত ভয়ানক নেশার মতোই তার মতো ইস্পাতে গড়া মানুষটাকে ধবংসের পথে নিয়ে যায়। বিদ্যার কারণেই হোক আর মস্তিষ্কের উর্বরা শক্তির প্রয়োগে বন্ধ কারখানায় মাল সরানোর কাজে সে এলাকার মাফিয়া ডন। তরুণের সমগোত্রীয় কেউ ধৃষ্টতা দেখানোর স্পর্ধা দেখায় না।

শ্রীজীবের আর এক দশা। বাপটা এক মেয়েছেলের খপ্পরে পড়ে তাকে নিয়ে ভেগেছে। দারিদ্র্য অনেক কিছু দেয়। দায়িত্ব কর্তব্য সুস্থ রুচিবোধের রসদ যোগায়। ক্ষিদের তাড়না মেটায় না। সেই তাড়নাতেই বাবুর বাড়িতে কাজ ধরে। শরীরে খাদ্য যোগানের বিনিময়ে পরিশ্রমের মাত্রা বেশি হলে শরীর তা সহ্য করে না। প্রতিদিন জ্বর হয়। বুকে কফের ভাব তৈরি হয়। সবসময় শুধু কাশে। শ্রীজীবটার কোনও কাজ জোটেনি। সব কারখানায় বড়ো বড়ো তালা ঝুলছে। তরুণের ফাইফরমাশ খাটে। তরুণ কিছু দেয়। শ্রীজীবটা কদিন তরুণের কাছে যায় না। মা টার শরীরটা বাড়াবাড়ি হয়েছে।

শ্রীজীব ধূর্ত নয়। সে পরিস্থিতির দাস। সেই দাসত্বের শৃঙ্খল মোচন করার শক্তি তার নেই। অকৃতজ্ঞতা, বিবেকদংশন মনকে কুরে কুরে খায়। যথাসম্ভব সেই যন্ত্রণাকে চাপা দিয়ে কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করে হাঁপাতে হাঁপাতে তরুণকে গিয়ে বলে– তরুণদা, কোরা শিবুকে পুলিশ কৃষ্ণা রেপ কেসে সকালে তুলে নিয়ে গেছে। তরুণের মালের নেশাটা বেশ চড়েছে। চেয়ারে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে ব্যালেন্স রাখছে। শ্রীজীবের কথা শুনে চমকে ওঠে– কি, কোরা শিবুকে পুলিশ পেল কোথায়? ওকে তো ঘোড়াডাঙায় পাঠিয়েছি। আজ বিকেলে ফেরার কথা। ফোন করেছিল তো কাল রাত্রে।

– তা জানি না, হয়তো সকালেই এসেছিল। পুলিশ বাগে পেয়েই অ্যারেস্ট করেছে।

– ও কেসে শিবুকে ধরবে কেন। ওটা তো কাঁকুরগাছির কেস। ঘাপলা কেস নয়তো?

– কি জানি, একবার গিয়ে দেখলে হতো না?

– চল তবে দেখেই আসি। শীতের পড়ন্ত বেলায় হাঁটতে ভালোই লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে মালের ধুনকিটা অনেকটা কেটে এসেছে। প্রশস্ত রাস্তার দুই পাশে অজস্র এঁদো গলি। নদীর শাখা নদী। স্রোত কম থাকায় এসব নদীতে পাঁক প্রজাতির মাছের উৎপাদন ঘটে। এই এঁদো গলিতে সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসে। চাঁদ এ গলিতে উঁকি মারে না। এদের দৈন্যদশা খোঁজ নেওয়ার তাগিদ নেই। পাঁচ ফুট রাস্তার দুই পাশে সরু নর্দমার পাঁক চলকে চলকে সমস্ত রাস্তাটা পাঁকময় করে রেখেছে। হাবু ডাবু গলি থেকে বেরিয়েই তরুণের সাথে দেখা।

– আরে তরুণদা কোথায় চললে?

– আর বলিস না, আমাদের কোরা শিবুটাকে রেপ কেসে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে।

– হ্যাঁ তাই তো শুনলাম, তুমি এসেছ ভালোই হয়েছে। চলো তো যাই। কেসটা কি? তরুণ আপত্তি করে না। মনে মনে দু-একজন সঙ্গী তরুণ খুঁজছিল। শ্রীজীব অনেকক্ষণ ধরে কেটে পড়ার ধান্ধা করছিল। তরুণকে বলে– তরুণদা মা টার শরীরের অবস্থা ভালো না। আমি তবে চলে যাব? আয় তবে। প্রশস্ত রাস্তা ছেড়ে এঁদো গলিতে কিছুটা পথ যেতেই তরুণের নেশার ঘোরটা কাটতে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে– ইস, এ নোংরা গলিতে ঢুকলি কেন?

– আরে ইয়ার, এখান থেকে একটু তাড়াতাড়ি হবে।

– কেস দিয়ে দিলে সব লুচ্চা হয়ে যাবে না? মস্তিষ্কের উর্বরা শক্তি তরুণের কম নেই। সেই শক্তিতেই এক মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেয়।

এখান থেকে পালাবার আর কোনও রাস্তা নেই, মৃত্যুর বদ্ধভূমিতে ঢুকে পড়েছে।

– আরে ইয়ার থোড়া রুক, একটু খালাস করে নিই। হাবু ডাবু বাধা দেয় না। একটু এগিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করে। পরস্পরের সঙ্গে শলা পর্ব সেরে নেয়। শালা এখান থেকে ভাগবে কোথায়? নে খালাস করে নে। একটু পরে তুই খালাস হবি। মতলবটা নরখাদক বাটপাড়েরা বুঝতে পারেনি। মিশকালো ঘন অন্ধকারে পকেট থেকে মেশিনটা বার করে। অত্যন্ত সন্তর্পণে লক্ষ্য স্থির রেখে পর পর শুট। আওয়াজটা বজ্রগর্ভ নয়। সাইলেন্সার লাগানো ছিল। হাবুটা ছিটকে এঁদো নর্দমায় পড়ে। বিষধর সাপ শেষবারের মতো ফণা তোলার চেষ্টা করে। পারে না। নর্দমার পাঁক মাথা ঠান্ডা করে। পাঁকেই সমস্ত শক্তি নিঃসৃত হতে হতে নিথর হয়ে যায়। ডাবু তলপেটে দানা খেয়ে বজ্রগর্ভে হুংকার দিতে দিতে বড়ো রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে। তরুণ পাঁকে দেহটাতে পাড়া দিয়ে বিজয়ের মুকুট চাপিয়ে দাম্ভিক শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলে– শালা মারনেওয়ালা মর গই। পথের কাঁটা তরুণ উপড়ে, দ্রুত গতিতে বেরিয়ে আসে। নির্মূল হয় না। পশ্চিম আকাশে লাল দিগন্তে মৃত্যুর বলিরেখা অঙ্কিত হয়ে রইল, তাতে তরুণের পরোয়া নেই। আত্মরক্ষার কোনও দায় নেই। সে আজ পালহীন, উদ্দেশ্যবিহীন উত্তলিত জোয়ারে বয়ে যাওয়া নৌকা। সে নৌকায় সওয়ারী সে নিজেই।

মিঠু প্রথম প্রথম বাবাকে ফোন করত। সুদূর কেনটনে বসে মায়ের যত্ন, বাবার সাহচর্যের অভাবে মনটা শূন্যতায় ভরে উঠত। ট্রেনিং পিরিয়ডে তখনও, বৃহৎ কর্ম জগতে প্রবেশ করেনি। মা-বাবার মায়া মমতার তুচ্ছ মোড়কটার অভাবে জীবনীশক্তি কেমন স্তিমিত হয়ে যায়। মেয়ের সাফল্যের চূড়ার মসনদে আসীন হওয়ার মোহে মেয়ের শূন্যতা আদিত্যকে ভারাক্রান্ত করে না। সেটা ক্ষণিকের মোহজাল। অবসর গ্রহণের পর আদিত্যের একমাত্র ঠিকানা রাধিকারঞ্জনের দাবার ঠেক। দাবার ঘুটিতে চাল দেওয়ায় আদিত্যের অপরূপ কৌশল। সেই কৌশলেই রাধিকারঞ্জন কুপোকাত। একটার পর একটা চালে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, কখন যে জগৎটাকে ঘন অন্ধকার গ্রাস করেছে আদিত্য বুঝতে পারে না। এবার বাড়ি ফেরার পালা। ফিরতে হয়। সেই যাওয়া আর আসা। এরমধ্যে সবসময় যে সদর্থ ব্যাখ্যা থাকে তা নয়। তবু যেতে হয়।

ঘরে ফিরেই আদিত্য মৃন্ময়ীকে সুধোয়– মেয়েটা ফোন করেছিল? মৃন্ময়ী উত্তর দেয় না। ফুঁসতে থাকে। মৃত আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের রসদ সঞ্চয় করে। তারপর একসময় বজ্রনিনাদে বিস্ফোরিত হয়। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করতেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো বিচ্ছুরিত হতে থাকে– রোজ রোজ একই কথা বলো কেন। নিজে তো দাবার আড্ডায় সারা দিন কাটিয়ে, গভীর রাতে মেয়ের কথা মনে পড়ে। মা হয়ে আমার মন টেকে কি করে। ভেবে দেখেছ? টাকার লোভে মেয়েটাকে পরবাসী করে ছাড়লে। এখন লোক দেখানো হাপিত্যেস করে লাভ কি? লোভ আদিত্যের ছিল। লোভটা সহজাত নয়। দারিদ্রের অপমান লাঞ্ছনা তাকে লোভাতুর করে তোলে। মিঠুর নাম্বারটা ডায়াল করতেই অল লাইনস আর বিজি। কথাগুলো ফাটা কাঁসির মতো লাগে। আদিত্য ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। হতাশা অবসাদে ফোন আর ধরে না। অবসর সময়ে আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

ভয়, আতঙ্ক, সংকোচ এগুলি অপরাধী মনের সহজাত প্রবৃত্তি। সেই প্রবৃত্তিতে শ্রীজীব নিজেকে আত্মগোপন করে রাখে। তরুণদাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। মরেছে জল্লাদেরা। জল্লাদের হাতে দেবতাদের মৃত্যু হয় না। ইচ্ছা মৃত্যুতেই তাদের পরিণতি ঘটে। তরুণদার প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি শ্রীজীবের মনের দৃঢ়তা আনে। সেই দৃঢ়তায় মনের সমস্ত সংকোচ ঝেড়ে ফেলে তরুণের পায়ে মাথা নীচু করে বসে। তরুণদা আমাকে শাস্তি দাও। আমি মাফ চাই না। যে অপরাধ আমি করেছি তার ক্ষমা হয় না। তরুণের শান্ত স্নিগ্ধ মমতা যেন শ্রীজীবের উপর বর্ষিত হয়, বাইরে কৃত্রিম ক্ষিপ্রতায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে– ওঠ শালা মাকড়া, ঘাপলা করে এসে ন্যাকামি মারাচ্ছে। কি এমন দরকার পড়ল, কত টাকা নিয়েছিস? ওদের তুই চিনিস? এবারে তো তোকে সরিয়ে দেওয়ার ছক করছে, সে খবর রাখিস?

– না না বস, টাকা নিইনি। মানে ওরা বলেছিল কাজ হলে টাকা দেবে।

– যাক, খাওয়াদাওয়া করেছিস? শ্রীজীবের মুখে ভাষা নেই। অপরাধীর মতো মাথা নত করে বসে থাকে।

– যা টেবিলের উপর পাউরুটি কলা আছে। খেয়ে নে। শ্রীজীব দুটো থালায় পাউরুটি কলা নিয়ে আসে। একটি তরুণদাকে দেয়, একটি নিজে নেয়।

– তোর মা কেমন আছে?

– ভালো না, সেই জন্যই ওরা বলল, তরুণকে আমাদের হাতে তুলে দে, তোর সব চিকিৎসার খরচ আমাদের।

– গর্ধব, সেটা তো আমাকে বলতে পারতিস।

– তোমার ঋণ আর কত বাড়াব। আমার যে আর মুখ ছিল না।

– তাই বলে আমাকে খরচা করে ঋণ শোধ করবি? এখন তোর বিপদটা ভেবে দেখছিস? তোকে যে ওরা খরচা করে দেবে। শোন, বিলাসপুরে আমার এক বন্ধু আছে। কাল দুপুরের মুম্বই মেলের টিকিট কেটে দিচ্ছি। মাকে নিয়ে ওখানে চলে যা। ওরা সব ব্যবস্থা করে দেবে। আমার সঙ্গে ঋত্বিকের কথা হয়ে আছে। ওখানকার চিরিমিরি কোলিয়ারিতে তোর একটা কাজেরও ব্যবস্থা করে দেবে। আর ড্রয়ারটা খোল, ওখানে লাখ খানেক টাকা আছে। ওই টাকা নিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাবি। এটুকু সময় তোর বাড়ির চারদিকে আমার লোক থাকবে। এখানে তোকে রক্ষা করতে পারব না।

শ্রীজীব যে দেবতাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিতে গিয়েছিল সেই তাকে মারন বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে এই মহান দায়ভার গ্রহণ করছে। বিপদ যে তার অন্তরস্থলের দেবতাকেও গ্রাস করতে চলেছে। দেবতার নাম সে শুনেছে। চোখে দেখেনি। শুখা নদীতে বান এসেছে। কৃতজ্ঞতার বানে উত্তলিত হয়ে তরুণের পা জড়িয়ে ধরে– তরুণদা, ঠাকুর আমি দেখিনি। তুমিই আমার ঠাকুর। তোমাকে এই বিপদের মধ্যে ফেলে আমি কোথাও যেতে পারব না। যা হবার হোক। আমি তোমার সাথেই থাকব।

– অনেক ভাট বকেছিস। এবার ওঠ। তোর যে সংসারে অনেক কাজ। আমার সংসারে প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

– কি বলছ, তরুণদা? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

– বুঝতে হবে না। অনেক মেগাসিরিয়াল হয়েছে। এবার কেটে পড়। বাড়িতে গিয়ে গোছগাছ কর।

কতদিন ধরে মৃন্ময়ীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। পেটে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা সমস্ত শরীরটা নাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই যন্ত্রণা প্রবল হলে আদিত্য কাছাকাছি এক হাসপাতালে মৃন্ময়ীকে নিয়ে যায়। পেশেন্টকে দেখেই ডা. রায়ের সন্দেহ হয়। বায়োপসির রিপোর্ট হাতে আসতেই ডা. রায়ের সন্দেহের অন্ধকার কেটে যায়। রিপোর্ট পজিটিভ। লিভারে ম্যালিগন্যান্ট ক্যান্সার। অন্ধকারটা নেমে আসে আদিত্যর জীবনে।

ব্যাংকে যে ক’টা টাকা ছিল প্রাথমিক চিকিৎসাতেই শেষ। মৃন্ময়ীর আয়ুষ্কাল আর কতদিন, সেটা বলবে ভবিষ্যৎ। চিকিৎসার পরবর্তী ব্যয়ভার মেটাবে কীভাবে। সেটা তো গন্ধমাদন পর্বত।

যাদুকরের কেরামতিতে পুতুল নাচে। অর্থের যাদুকর দুর্বল হলে পেশেন্টও অচল হতে থাকে। মৃন্ময়ী ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ে থাকে। দৃষ্টি আবছা হতে থাকে। গলাতে আওয়াজে আর সেই ঝাঁঝ নেই। থেকে থেকে আদিত্যকে প্রশ্ন করে– মেয়েটা ফোন করেছিল গো? আদিত্যের দীর্ঘনিঃশ্বাসের আঁচ মৃন্ময়ী করতে পারেনি। বাইরে কৃত্রিম স্বাচ্ছ্যন্দে উত্তর দেয়– হ্যাঁ করেছিল তো। নানান ঝামেলায় বলা হয়নি। এই তো রাধিকার বাড়ি থেকে আসার পথে হঠাৎই মিঠুর ফোন। তোমার কথা, আমার কথা। পাড়ার সবার কথা। বলছে অফিসে খুব কাজের চাপ। তবে পুজোর সময় আসবে বলেছে। মৃন্ময়ী বাধা দিয়ে বলে– আমার শরীর খারাপের কথা বলোনি তো?– না না ওসব বলিনি। মেয়েটা ওখানে বসে ছটফট করবে। এতগুলি মিথ্যা কথা বানিয়ে বলতে আদিত্যেরও মনটা হিঁচড়ে যাচ্ছিল। বাস্তবটা যে বড়ো নিষ্ঠুর। মৃত্যু পথযাত্রীর কাছে এই মিথ্যেটাই যে বাঁচার রসদ। কিছুটা হলেও শরীর, মন চাঙ্গা হয়।

বিকেল হলেই রাধিকারঞ্জনের মনটা ছুকছুক করে। চোখ পড়ে দাবার বোর্ডের দিকে। ঘুটি সাজিয়ে বসে থাকে আদিত্যের অপেক্ষায়। আজ কতদিন হল আদিত্য এমুখো হয় না। দাবার নেশা তাকে আদিত্যমুখী করে তোলে। সদর দরজা হাট করা খোলা। মধ্য খাটালে একটা বিড়াল উচ্ছিষ্ঠ যা কিছু ছিল সাবড়ে দিয়ে মৌতাত করছে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। ম্যাও করে নবাগত অতিথির আগমনি বার্তা জানান দিয়ে খাটের তলায় নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। খাটের উপর গোটা তিনেক বালিশে হেলান দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। যে চাউনিতে আলোর রেখা নেই। অন্ধকারের করাল গ্রাস একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে। ভাঙা হাটে প্রেম ভালোবাসা স্নেহের খদ্দেররা এক এক করে সরে যাচ্ছে। এখন আদিত্য শুধুই একা। অকর্মণ্য স্বামী মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রীর শেষ চিকিৎসাটুকু করতে অপারগ। অসহায় মানুষের চিন্তাটাই একমাত্র অবলম্বন।

দরজা খোলা পেয়ে ভিতরে ঢুকে হাঁক পাড়ে রাধিকারঞ্জন – আদিত্য, ও আদিত্য ঘরে আছ নাকি? নিস্তব্ধ নিঃস্পন্দ একটা মাত্র অল্প পাওয়ারের ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো জ্বলছে। প্রাণহীন ইটের পাঁজরে চারদেয়ালে আদিত্য যেন বন্দিদশা কাটাচ্ছে। মুখমণ্ডল মনের আরসি। কোটরাগত চোখ, অসংখ্য চিন্তার ভাঁজ জানান দিচ্ছে আদিত্য ভালো নেই। – কি ব্যাপার? কত দিন তোমার দেখা নেই। আদিত্যর সাড়া মেলে না। গায়ে হাত পড়তেই ধড়মড় করে ওঠে। স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে। সবটা পারে না। উদ্বিগ্ন অশান্ত মন স্বাভাবিক হতে দেয় না। বয়সের ভারে রাধিকারঞ্জনেরও চেতনার পরিপক্বতা এসেছে। সেই পরিপক্বতায় তার বুঝতে দেরি হয় না।

– কি ব্যাপার, মনে হচ্ছে কোনও গভীর সমস্যায় পড়েছ?– হ্যাঁ ভাই, ভালো নেই। মিঠুর মা হাসপাতালে ভর্তি। উদ্বিগ্ন রাধিকা প্রশ্ন করে– কেন কী হয়েছে? অকারণ গৌরচন্দ্রিকা বাড়ায় না। আর সে মানসিকতাও নেই। সরাসরি বলে– লিভার ক্যান্সার। রাধিকা হতবাক স্তম্ভিত। সে জানে অশান্ত, উদ্বিগ্ন মনকে শান্ত করা যায় না। রাধিকা সে পথে হাঁটেও না। পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করে। তা চিকিৎসা ঠিকঠাক চলছে তো?

– চলছে, তবে প্রাথমিক পর্বটা মিটেছে। এখন দরকার পরের ধাপ। অপারেশন, কেমো এদিক সেদিক আরও খরচ। এ রাশ তো আমি আর টানতে পারছি না। এখন আমি সর্বশান্ত।

– তা এখনও খরচ কত কিছু জানতে পেরেছ?

– কি জানি, বোধহয় লাখখানেক হবে।

– মিঠুকে খবর দিয়েছ?

এক দীর্ঘনিশ্বাসে বলে– না, আসলে অতদূরে থাকে। তাছাড়া ওখানে ওর কাজের চাপও খুব বেশি। শুধু শুধু ব্যতিব্যস্ত করে লাভ কি বলো ভায়া।

এই দীর্ঘনিশ্বাসই রাধিকাকে জানান দেয় শেষোক্ত মনগড়া মন্তব্য অন্তরস্থলের হতাশার গভীরতা। বড়ো অজান্তে আদিত্যের দগদগে ঘায়ে খোঁচা দিয়ে বসেছে। রাধিকা কথা বাড়ায় না। আজ আসি– বলে রাধিকারঞ্জন রাস্তায় বেরিয়ে আসে।

বৃদ্ধ বয়সের দোসর বড়ো অবলম্বন। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ সঙ্গীহীন হতে থাকে মানুষ। সে হতে থাকে নিঃসঙ্গ, একা। এই দোসর তখন পরস্পর পরস্পরকে আঁকড়ে ধরতে চায়। এতগুলো টাকার দায়ভার সে বইবে কী ভাবে। ক্লাবের ছেলেদের বলবে? মন সায় দেয় না। আদিত্য তো তাকে দায়িত্ব দেয়ওনি। দিশাহীন, উদভ্রান্তের মতো চলতে চলতে হঠাৎই তরুণের সাথে দেখা হয়।

– পাশে এসো। একটা ভয়ংকর সমস্যায় পড়েছি।

সেটা তো দূর থেকে আসতে দেখেই বুঝতে পারছি। কি হয়েছে?

– আদিত্যের স্ত্রীর শরীর খুব খারাপ। হাসপাতালে ভর্তি। এখন ওর যা অবস্থা, তাতে চিকিৎসাটাও করতে পারছে না। ভাবছিলাম ক্লাবকে জানাব কিনা। মেয়েকে খবর দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলতেই মনগড়া কতগুলো কথা বলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল।

– মিঠুর নাম্বারটা, আচ্ছা দেখি বাড়িতে যাই।

– কি মিঠুর নাম্বার। দাঁড়াও। বলে বুক পকেট থেকে একতাড়া চিরকুট বের করে খুঁজে খুঁজে নাম্বারটা দিয়ে বলে– দ্যাখো, নবাব নন্দিনীর নাগাল পাও কিনা।

নাম্বারটা পকেটে গুঁজেই বলে– আমাকে দুটো দিন সময় দিন। আমি হাসপাতালে যাচ্ছি রাধিকাবাবু, এ চিকিৎসার খরচ আমিই দিতে পারতাম। আপনি তো জানেন আমার রোজগার সবই পাপের টাকা। বউদি বাঁচবেন কিনা জানি না, পাঁক তাঁর গায়ে লাগাতে চাইছি না।

তরুণ সময় নষ্ট করে না। মিঠুকে ফোন লাগায়। সেই ফাটা ক্যাসেট– অল লাইনস আর বিজি। তরুণ নাছোড়। হতাশায় শ্রান্ত হওয়ার ধাতুতে সে গড়া নয়। অবিশ্রান্ত ডায়াল করতেই থাকে। আচমকাই রিং বাজতে থাকে। শুখা নদীতে যেন জলের সঞ্চার ঘটে। প্রাচুর্যের মসনদে আসীন হলে কণ্ঠস্বরে আলাদা গাম্ভীর্য আসে। রুচি, চালচলনে সর্বত্র লেগে থাকে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

– হ্যালো, তরুণ ভীত নয়। মনের দৃঢ়তাই শক্তি যোগায়। অথচ স্নেহশীল বাপের মতোই আর্জি জানায়– হ্যালো মিঠু? আমাকে চিনতে পারছিস মা, আমি তোর তরুণ কাকা।

– ও হ্যাঁ, বলো, বাবা-মা কেমন আছে, তুমি কেমন আছ? পাড়ায় সবাই? দাঁড়া দাঁড়া একবারে এত প্রশ্ন করিস না, সব গুলিয়ে যাবে। ফোনটা ছাড়িস না। আমার কথা, পাড়ার কথা ছাড়, তোর বাপ মায়ের খবরটা নিস। তারা কেমন আছে?

– কাকু, এখন আর আপশোশ করে কি হবে বলো? বাবা যে আমায় এই জায়গায় আসতে বাধ্য করেছে। এটা তো আমি চাইনি। প্রচুর টাকার বিনিময়ে কোম্পানি আমার চব্বিশ ঘণ্টাই কিনে নিয়েছে। আমার পার্সোনাল লাইফ বলে যে কিছুই অবশিষ্ট নেই। যাক মা-বাবা এখন কেমন আছে?

– ভালো নেই। তোর মায়ের শরীর খুব খারাপ। লিভার ক্যান্সার। চিকিৎসার সামর্থ্যও তোর বাবার নেই। বলিস তো চাঁদা তুলে তোর মায়ের চিকিৎসা করাই।

– সে কি? বাবা একটু আমাকে জানাতে পারত।

– তোর বাবা ফোন করে করে হতাশ হয়ে অভিমানে ফোন করা ছেড়ে দিয়েছে।

– কাকু বাবার অ্যাকাউন্ট নাম্বার আমার জানা আছে। আজকেই আমি দশ লাখ টাকা ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। তুমি একটু দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা করাও। লাগলে আরও পাঠাব। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি দেশে ফিরব।

টাকা এল। চিকিৎসাও হল। পেল না অন্তরাত্মার পদধ্বনি। সেই অন্তরাত্মার অভাবে শেষ জীবনীশক্তি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে লাগল। এ রোগের শেষ পরিণতি বড়ো মর্মান্তিক। সেই মর্মান্তিকতার চরম মুহূর্তের আগে পর্যন্ত ঝাপসা স্থির দৃষ্টিতে শুধু একটাই প্রলাপ

– মিঠুর ফোন পেলে গো? আমার শরীর খারাপের কথা বলোনি তো। ও যে বড়ো কষ্ট পাবে। মিথ্যে আশ্বাস পাথেয় করে মৃন্ময়ী ভোরবেলা চলে গেল।

আজ সতেরোই শ্রাবণ। ঘন কালো মেঘে আকাশটা নীচে নেমে এসেছে। প্রকৃতির অশ্রুধারা দু’কূল প্লাবিত করছে। সে অশ্রু মোছাবার কেউ নেই। এই কালান্তক দিনটি তরুণের বড়ো একার। একা কাঁদবার দিন। মালা, ফুল, চন্দনে অপরূপ সাজে সেজেছে। আজ যে মা-মেয়ের জন্ম মৃত্যু দিন। ভরপেট্টা মাল টেনেছে এই উৎসবে। বেসামাল তরুণ মা-মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অবুঝ বালকের মতো প্রশ্ন করে– আমাকে এভাবে ঠকালি কেন বল তো? এখানে ফেলে রেখে তোরা সুখে আছিস তো? এবার তরুণ আর সামলাতে পারে না। দু-চোখ বেয়ে অবিরত ধারা বেয়ে আসে। একটু থেমে বায়না করে– আমাকে তোরা নিবি? এ শরীরের বোঝা আর যে টানতে পারছি না। রূপাঞ্জনার প্রতিকৃতি জীবন্ত মূর্ত প্রতীক হয়ে আর্জি মঞ্জুর করে– চলে এস বাবা। ওখানে যে তুমি পাঁকে তলিয়ে যাচ্ছ। তিনদিন পর বাড়িটার ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ এলাকা ভারী করে তুলল।

মালতিটা কাজ করে ভালো। বাসন মাজা, রান্না করা, কাপড় কাচা, দাদুর স্নানের জল তোলা। এসব কাজে খুঁত রাখে না। তবে একটু টকেটিভ। চান্স পেলেই ডিভিডি চালাবে। আদিত্যর অসুবিধা হয় না। বোবা ঘরে তবু একটা কথা বলার লোক তো আছে। যতক্ষণ থাকে ঘরটা কথাময় করে রাখে। আদিত্য খাটে শুয়ে খবরের কাগজটা সামনে নিয়ে পুরু লেন্সের চশমাটা নাকের ডগায় রেখে রাজনীতির দুবৃত্তায়ন হজম করছিল। মালতি বাইরে থেকে ছুটতে ছুটতে এসে আদিত্যকে সংবাদটা দেয়– দাদু বাইরে বিশুর চায়ের দোকানে চ্যাঁচামেচি হচ্ছে, শুনতে পাচ্ছ না?

আদিত্য ভাবলেশহীন কৌতুক প্রকাশ করে বলে– কই না তো।

– সে কি, কত লোক জড়ো হয়েছে, তুমি শুনতে পাচ্ছ না?

– তাহলে চ্যাঁচামেচিটা বোধহয় আস্তে আস্তে হচ্ছে। একরকম জোর করে মালতি আদিত্যকে বাইরে টেনে আনে।

দিশেহারা ভীত সন্ত্রস্ত চান্দ্রেয়ী কোলের ছেলেটাকে বিশুর চায়ের দোকানে বসায়। বাচ্চাটা ক্ষিদের ক্লান্তিতে কেমন নেতিয়ে পড়ে। চান্দ্রেয়ী এ ব্যাগ সে ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট দলা পাকানো বিস্কুট বের করে। বিশুর দিকে তাকিয়ে করুণ ভাবে বলে– দাদা এক গেলাস দুধ দেবেন? বিশু না করে না। দুধ বিস্কুট খেয়ে শক্তি ফিরে পায়। স্বভাবসিদ্ধ চরিত্রে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। উদ্দেশ্যবিহীন চান্দ্রেয়ীকে বাঁশের খুটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখে বিশুর কৌতুহলী মন জিজ্ঞাসা করে– এই মেয়ে তোমার নাম কি? চান্দ্রেয়ী নির্বাক। তুমি কোথায় থাকো? মনের বিভ্রান্তি তাকে আড়ষ্ট করে রাখে।

– আরে এ মেয়ে তো কোনও কথার উত্তর দেয় না। তোমার স্বামীর নাম কি? কোনও উত্তর না পেয়ে বিশুর মেজাজ এবার সপ্তমে।

– দুধ চাইবার বেলা তো বেশ কথা ফুটছিল। দাও তো বাপু, পয়সাটা দাও। লেডিস ব্যাগটা খুলে এদিক ওদিক ঝাঁকিয়ে করুণভাবে চান্দ্রেয়ী বলে,

– দাদা পয়সা যে নেই।

– সেটা তো আগে বলতে হয়। আগে বললে বাচ্চাটার জন্য বিশু দুধ দিত কি আদৌ দিত না সে প্রসঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানে তার বচনে লোক সমাগমের সূত্রপাত এখানেই। আদিত্য কাছে এসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে– বাপু তোমরা একটু সরো তো। মেয়েটা আসলে ঘাবড়ে গেছে। আদিত্যকে এ পাড়ার লোকজন কতকটা বয়সের কারণে কতকটা সজ্জন ব্যক্তিত্বের কারণে মান্য করে। তারা একে একে সরে যায়। বেশি দূর যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে।

– এ-ই মেয়ে তোমার নাম কী? স্নেহমাখা এই প্রশ্নে পিতৃমাতৃহীন মেয়েটা বাপের অজস্র স্নেহ ধারা বইতে থাকে। মেয়েটার মুখে কথা ফোটে– চান্দ্রেয়ী মিত্র।

– বাড়ি কোথায়?

– রায়গঞ্জ, বকুলপুর।

– থানা পোস্টঅফিস জানা আছে?

– না তা তো জানি না।

– তোমার স্বামীর নাম কি?

রজতশুভ্র মিত্র।

– মোবাইল নাম্বার আছে

– না, আমার মোবাইলটাও তো ফেলে এসেছি।

– তাহলে এভাবে তো কারও হোয়্যার এবাউটস জানা যাবে না। তুমি চাইলে আমার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারো। আমার ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। মেয়েমানুষ এখন কোথায় যাবে? তারপর দেখছি কী করা যায়। স্বামীর সাথে মান-অভিমানের পালা চলছে? পাগলি মেয়ে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান মনোমালিন্য এসব হয়ই। তাই বলে এভাবে নিরুদ্দেশের পথে কেউ পা বাড়ায়? আর দেরি কোরো না, চলে এস। পালহীন নৌকো তীর খুঁজে পেয়েছে। দেবদূতের মতো সন্তানস্নেহে যে মানুষটা তাকে আশ্রয় দিতে চাইছে, সে যে তার বাবারই সমগোত্রীয়।

আদিত্য বুড়োর একাকিত্ব ঘুচেছে। চান্দ্রেয়ী, মালতির সেবাযত্নে নিভে যাওয়া প্রদীপের সলতে আবার তিরতির করে জ্বলে উঠেছে। আর ছোট্ট শিশুটির আধো আধো বুলিতে গোটা বাড়িটা বর্ণময় করে তুলছে। তাকে জিজ্ঞাসা করে

– দাদুভাই তোমার নাম কি?

– ছিচন মিত্ত।

চান্দ্রেয়ী শুধরে দেয়– বলো দাদুভাইকে সিঞ্চন মিত্র। ছোট্ট কথাকলির দস্যিপনায় বুড়ার হাড়গোড়ের মরচেগুলো ছাড়তে শুরু করেছে। কখন যে সকাল গড়িয়ে রাতের আঁধার নেমে আসছে, সে হিসেবের খাতা খোলার বুড়োর সময় নেই। হঠাৎই কাগজে নিরুদ্দেশের প্রতি, এক বিজ্ঞাপনে আদিতের নজর পড়ে। আদিত্যের বুঝতে অসুবিধা হয় না। পোস্টআফিসে চিঠিখানা ড্রপ করে দিন গুনতে থাকে। প্রদীপের তেল একটু একটু করে নিঃশেষিত হচ্ছে। জেগে ওঠা দীপ্তিময় জীবনে রাতের আঁধার নেমে আসছে।

সিঞ্চন বাইরের বারান্দায় খেলা করছিল। বলে ওঠে– বাবা বাবা। বাসন মাজতে মাজতে মালতি ঘরে ঢুকে বলে– দাদু, বাইরে কে একজন তোমার কাছে এসেছে।

– ও এসে গেছে। ঘরে আসতে বল। রজত ঘরে ঢুকেই আদিত্যকে প্রণাম করে। আদিত্যর অনুমতিতে বসে। এদিক-ওদিক তাকায়।

– তাহলে তুমিই রজতশুভ্র মিত্র।

– আজ্ঞে হ্যাঁ

– বেশ। মালতিকে উদ্দেশ্য করে বলে। – মালতি, চান্দ্রেয়ীকে ডেকে দে তো মা। রজতকে দেখে তার দুচোখ বেয়ে ঝর ঝর করে জল পড়তে থাকে। এ অশ্রুবর্ষণের গভীরতা বহুদূর বিস্তৃত। স্বামী দর্শনের ভিতর থেকে নির্দিষ্ট হয়ে যায়, যে সংসারের প্রদীপ সে তুচ্ছ অভিমানে নিভিয়ে এসেছিল, সেই প্রদীপ আবার জ্বেলে সংসারকে সে আলোকিত করবে। এক চোখে বইছে অনাবিল আনন্দের অশ্রুধারা, আর ওই যে অসহায় বৃদ্ধ মানুষটা সন্তান বাৎসল্যে, সস্নেহে এই কটাদিন লালিত করেছে, নাতিকে পেয়ে জীবনের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত হচ্ছিল, রজতের হাত ধরে বেরিয়ে যেতেই তার প্রদীপের শিখা যে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হবে। সে চোখের জল সম্বরণ করা যায় না। আবেগ মানুষের চিরন্তন ধর্ম। সেই আবেগ হাসায়। সেই আবেগ চোখের জলে বুক ভাসায়। আবেগে ছেদ পড়ে আদিত্যের ডাকে– মা রজতকে খেতে দেওয়ার বন্দোবস্ত করো। ছেলেটা কতদূর থেকে এসেছে। রজতের দিকে তাকিয়ে বলে– তা বাবা আজ রাতটা থেকে কালকে না হয় সকালেই যেও, অতদূরের পথ। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রজত বাধা দেয় না।

সেই রাতে আদিত্য বুড়োর প্রবল জ্বর আসে। প্রলাপ বকতে থাকে– দাদু ভাই, আমার ঘোড়াটা দিয়ে যা। আমি যে হেরে যাচ্ছি। খবরটা মালতিই রাধিকারঞ্জনকে দেয়। রাধিকারঞ্জন দেরি করে না। হাসপাতালে ভর্তি করে বাইরে বেরিয়েই মিঠুকে ফোন লাগায়। রিং বাজতেই মিঠু ফোনটা ধরে– হ্যাঁ জেঠু বলো, বাবা, তোমরা কেমন আছ?

– হ্যাঁ মা, এখনও তোর আসার সময় হল না– এবার যে তোর বাবাও চলেছে রে। এক ভয়ংকর অজানা জ্বরে সঙ্গাহীন। জেঠু ফোনটা রাখ, আমি আসছি।

এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছোয়। উদভ্রান্ত উন্মাদের মতো ছুটতে ছুটতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে– বাবা আমি এসেছি। এই দেখো তোমার মিঠু। আর তোমাকে ফেলে যাব না। আদিত্য আবছা প্রলেপে তখনও প্রলাপ বকেই চলেছে– দাদুভাই এলি? ঘোড়াটা দিয়ে যা। আমি যে মাত হয়ে যাচ্ছি। আমাকে যে জিততেই হবে।

দুরন্ত ঘোড়া একসময় শান্ত হয়। প্রাচুর্যের ঢক্বানিনাদে বসে দায়িত্ব, কর্তব্য, মূল্যবোধ, জীবনের সার্থকতার তাৎপর্য সে বুঝতে পারে না। সে তখন ফিরতে চায়। অবহেলায় ফেলে যাওয়া সেই রত্নভাণ্ডারকে সংসারের ধ্বংসস্তূপের ভিতর খুঁজতে থাকে। পায় না। কোনওদিন পাবে কিনা, কে জানে।

প্রস্তাব

অফিসের মহিলা কলিগদের থেকে সৌহার্দ্য একটু ডিসটেন্স রেখেই চলে। অফিসিয়াল কথাবার্তা ছাড়া তেমনভাবে কারওর সাথে মেশে না। এর পিছনে যে কোনও কারণ রয়েছে, তেমনটা নয় বা তাকে দেখতে-শুনতে খারাপ তেমনও নয় বরং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সুন্দর, হ্যান্ডসাম, মিষ্টি স্বভাবের। হাইটও তেমনি, প্রায় ছ ফুট। গায়ের রং শ্যামলা– মেয়েরা ঠিক যেমনটা চায় আর কি। তাকে দেখলে যে-কোনও মহিলার হূদয়ে কম্পন অনুভূত হবে, এমনটা হলফ করে বলা যায়। কিন্তু হয় না– অনেকেই নিজের মতো করে ভেবে নেয়, সৌহার্দ্যও অফিসের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনকে এক করতে চায় না। তাই ছুটির পর এক মুহূর্তও ওয়েস্ট না করে সোজা বাইক ছুটিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয় সে। তবে মাঝেমধ্যে কাজের জন্য আটকেও পড়তে হয়। এরকমই একদিন একটা প্রেজেন্টেশন বানানোর জন্য শ্রেয়া আর তাকে ছুটির পরেও থেকে যেতে হল। প্রেজেন্টেশন জমা করতে করতে রাত প্রায় সোয়া দশটা হয়ে গেল। যাবার সময় বসের ফরমায়েশ, ‘সৌহার্দ্য, শ্রেয়ার ফেরার ব্যাপারটা একটু দেখে নিও।’

‘ওকে স্যার। আপনি না বললেও এত রাতে ওনাকে…।’

‘আরে না না। আমাকে নিয়ে এত ভাববেন না। আমার সঙ্গে স্কুটি রয়েছে। আমি চলে যেতে পারব,’ কথার মাঝেই বলে বসে শ্রেয়া।

পার্কিং জোনে শ্রেয়ার স্কুটি স্টার্ট করার বিফল চেষ্টা দেখে, সৌহার্দ্য বলে– ‘স্টার্ট যখন নিচ্ছেই না, ওটা এখানে ছেড়ে যান। কাল মেকানিক ডেকে দেখিয়ে নেবেন। চেষ্টা করলে স্টার্ট হয়তো নিয়ে নেবে, কিন্তু মাঝপথে যদি আবার বিগড়োয় প্রবলেমে পড়বেন।’

‘ঠিক বলেছেন। বরং সৌরভকে বলি পিক করে নিতে।’ ব্যাগ থেকে ফোন বার করতে করতে কথাটা শেষ করে শ্রেয়া, ‘আশা করি মিনিট পনেরোর মধ্যে ও চলে আসবে।’

‘কিন্তু ততক্ষণ এখানে দাঁড়ানোটাও তো নিরাপদ নয়। তার চেয়ে বরং আমি ড্রপ করে দিচ্ছি।’

‘কিন্তু আমার বাড়ি তো আপনার বাড়ির ঠিক উলটো পথে, শুধু শুধু আবার অতটা পথ…’ বলতে বলতে থেমে যায় শ্রেয়া।

‘আপনাকে বিপদের মধ্যে একা ছেড়ে যাওয়ার মতো পাত্র তো আমি নই, আশা করি এতক্ষণে সেটা বুঝে গেছেন। তাছাড়া বসের হুকুম বলে কথা। না মানলে কী আর চলে বলুন? তাই বলছি দেরি না করে গাড়িতে বসে পড়ুন।’ ঈষৎ মজা করেই বলে সৌহার্দ্য।

শ্রেয়া আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে চড়ে বসে। মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে যায় তারা।

‘চলুন, ভিতরে চলুন।’ বলতে বলতে কলিংবেলটা বাজায় শ্রেয়া।

‘অন্য আর এক দিন, শ্রেয়া।’ বলে গাড়িটা ঘোরাতে যাবে এমন সময় শ্রেয়ার মা উমাদেবী আর যমজ ভাই সৌরভ বেরিয়ে আসে। ভদ্রতার খাতিরে দাঁড়াতে হয় সৌহার্দ্যকে।

মা-ভাইয়ের সাথে আলাপ করিয়ে দেয় শ্রেয়া।

‘তা বাবা কষ্ট করে এতদূর যখন মেয়েটাকে ছাড়তে এলেই… অন্তত একটু চা যদি…’

‘শুধু চা কেন আন্টি অন্য একদিন পাত পেড়ে খেয়ে যাব’খন। আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাবা-মা না খেয়ে বসে থাকবেন।’

এমন সময় ভিতর থেকে কাঁপা গলায় শ্রেয়ার বাবা নীরেন্দ্রবাবুর আওয়াজ ভেসে আসে, ‘শ্রেয়া বাড়ি ফিরেছিস? সঙ্গে কে? ভিতরে আসতে বল।’

‘আসলে বাবার কাল থেকে আর্থ্রাইটিসের ব্যথাটা ভীষণ বেড়েছে। ঠিকমতো হাঁটতে-চলতেও পারছেন না। ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। বাবা লোকজন খুব ভালোবাসেন। যদি একবার দেখা করে যেতেন।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই, চলুন ওনার সাথে আলাপ করে আসি।’ বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে সকলের সঙ্গে সৌহার্দ্য ঘরে ঢুকে যায়।

ঘরে ঢুকেই নীরেন্দ্রবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে সৌহার্দ্য। ‘আরে বোসো বোসো। এখন আর এসব কেউ মানে নাকি। তা বুঝেছ বাবা কাল থেকে বাতের ব্যথাটা খুব কষ্ট দিচ্ছে। পা বাড়াতে গেলেই একেবারে বাবা-মা সকলকে টেনে আনতে হচ্ছে।’ বলে খানিক থেমে যান, তারপর আবার বলতে শুরু করেন, ‘দেখেছ কাণ্ড, নিজের কথাই বলে যাচ্ছি। তোমার নামটাও তো জিজ্ঞেস করা হয়নি! তোমার নাম যেন কী?’

‘সৌহার্দ্য।’

‘মানে অন্তরঙ্গ। বাহ্ বেশ মিষ্টি নাম তো।’ বলেই উমাদেবীকে ডাকতে শুরু করেন। ‘উমা, উমা। বলি ছেলেটাকে কিছু খেতে তো দেবে নাকি। সারাদিন খেটে মুখটা একেবারে আমসি হয়ে গেছে।’ ভাবটা এমন যেন কতদিনের পরিচিত। অবশ্য মানুষটাই এইরকম। নীরেন্দ্রবাবুর ডাকাডাকিতে উমাদেবী ইতস্ততবোধ করতে থাকেন।

‘না না আঙ্কল, আন্টি বলেছিলেন। আমিই না বলেছি। রাত হয়েছে তো।’

‘বলি বিয়ে করেছ?’

‘আজ্ঞে!’

‘বিয়ে করেছ কি?’

‘না-না।’

‘ব্যাচেলার। তাহলে আবার দেরি কিসের হে। না খেয়ে তোমার যাওয়া হবে না।’

‘আসলে বাবা চিন্তা করবেন তো তাই।’

‘বাবা খুব ভালোবাসেন বুঝি?’

মুচকি হেসে সম্মতি জানায় সৌহার্দ্য।

‘জানিয়ে দাও। আজ তুমি খেয়েদেয়ে ফিরবে।’ বেগতিক দেখে বাড়িতে জানাতেই হয় সৌহার্দ্যকে।

খেতে বসে এদিক-ওদিকের নানারকম কথা চলতে থাকে। আড্ডা বেশ জমে ওঠে।

‘কাল ম্যাচটা দেখলেন?’ প্রশ্ন করে সৌরভ।

কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই নীরেন্দ্রবাবু একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ‘ওই তোর এক দোষ বাবু, শুধু খেলা আর খেলা। তার চেয়ে বরং খবরটা শোন কাজে দেবে।’

‘সত্যি বাবা পারো বটে। খেলার নাম শুনলেই তোমার যে কী হয়!’ শুরু হয়ে যায় বাপ-ছেলের কথা কাটাকাটি।

‘তোমাদেরও বলিহারি যাই, ছেলেটা একদিন এসেছে কোথায় ওর সাথে চারটে কথা বলবে তা নয়, বাপ-ছেলে মিলে শুরু করে দিলে। ছাড়ো ওদের কথা। তুমি তোমার কথা বলো, বাবা।’ উমাদেবী পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা করেন।

‘আমার কথা। আলাদা করে কী বলব! পরিবার বলতে বাবা-মা আর আমি। বাবা-মা দুজনেই ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক ছিলেন। বেশ কয়েকদিন হল রিটায়ার করেছেন। এখন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং চালাচ্ছেন।’

‘তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভীষণ ভালো লাগল বাবা। সময় পেলেই চলে এসো।’

‘আরে আসবেই তো। কী হে, এই সেকেলে বুড়োটার সাথে মাঝেমধ্যে গল্প করতে আসবে তো?’

‘অবশ্যই আঙ্কল। তবে আজ উঠতে হবে। অনেক রাত হল। ওহ্… আঙ্কল আপনার বাতের ব্যথার জন্য একটা ওষুধ পাঠিয়ে দেব, ব্যবহার করে দেখবেন।’

দিন পাঁচেক পরেই শ্রেয়ার হাত দিয়ে একটা আয়ুর্বেদিক ওষুধের ফাইল পাঠিয়ে দিয়েছিল সৌহার্দ্য। সঙ্গে একটা কাগজে বড়ো বড়ো অক্ষরে ব্যবহারবিধি লিখে পাঠিয়েছিল সে।

তারপর আরও দিন দশেক কেটে গেছে। শ্রেয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তেমন না এগোলেও নীরেন্দ্রবাবু আর উমাদেবীর প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছে সৌহার্দ্য। সময় পেলেই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে একে-অপরকে ফোন করে খবর নেওয়া। কিছু স্পেশাল রান্না করলেই উমাদেবী নয় তো নীরেন্দ্রবাবুর ফোন। শ্রেয়ার হাত দিয়ে খাবারও পাঠিয়েছে বার দুয়েক। ওনাদের এই আন্তরিকতা সৌহার্দ্য-র মনকেও ছুঁয়ে গেছে। ব্যাপারটা সে বেশ এনজয়ই করে।

একদিন সৌহার্দ্য সবেমাত্র লাঞ্চবক্স নিয়ে বসেছে, ঠিক সেই সময়েই নীরেন্দ্রবাবুর ফোন, ‘বলি ব্যাপার কী হে! বুড়োটার খবর কী শুধু ফোন মার়ফত-ই নেবে নাকি দর্শনও দেবে?’

‘না না আঙ্কল, কী বলছেন, সময় পেলেই চলে যাব।’

‘না না ওসব সময়-টময় বুঝি না বাপু। তুমি বরং রবিবার দিনই চলে এসো। জমিয়ে আড্ডাও দেওয়া যাবে আর একসাথে খাওয়াদাওয়া করা যাবে। তোমার মাসিমা কী সব হায়দরাবাদি বিরিয়ানি বানাবে। তোমার খুব ভালো লাগবে।’

‘বিরিয়ানি, ওয়াও। বাবা – আমি দুজনেই ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু রবিবার তো হবে না আঙ্কল। ওই একটা দিনই তো বাড়ির সকলে একসঙ্গে লাঞ্চ করার সুযোগ হয়।’

‘তাহলে, বাবা-মাকেও সঙ্গে নিয়ে চলে এসো। ওনার ফোন নম্বর দাও। আমি নিজে ওনাদের আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাব। ওই দ্যাখো তোমার মাসিমাও বলছে আসার জন্য।’

‘আরে না-না আঙ্কল, অত ফর্মালিটির প্রয়োজন নেই, বাবাকে আমি বললেই হবে। মা হয়তো আসতে পারবে না। ওই দিন মায়ের, মাসির বাড়ি যাবার কথা।’

‘ঠিক আছে তাহলে ওই কথাই রইল।’

কথামতো রবিবার সন্ধেবেলা সৌহার্দ্য তার বাবা অসীমবাবুকে নিয়ে শ্রেয়াদের বাড়িতে উপস্থিত হল। বাবা-ছেলের হূদ্যতা সত্যিই প্রভাবিত করার মতো। হাসিঠাট্টা, আলাপচারিতার পর, খাওয়ার টেবিলে উমাদেবীর রান্নার তারিফ না করে পারলেন না অসীমবাবুও।

‘বাহ্ দিদিভাই। লাজবাব। বিশ্বাস করুন বহু বড়ো বড়ো রেস্তোরাঁতে খেয়েছি। কিন্তু এই স্বাদ…জাস্ট অতুলনীয়! তবে হ্যাঁ আপনি যেমন বিরিয়ানিতে এক্সপার্ট, আমার গিন্নি তেমনি হিংয়ের কচুরি। না খেলে বুঝবেন না।’ তারিফের বহরে খানিক কুন্ঠাবোধ করেন উমাদেবী।

‘সামনের রবিবার আমাদের ওখানে চলে আসুন। গীতার সঙ্গে আলাপও হয়ে যাবে আর ছুটিটা উপভোগও করা যাবে। কী বলিস বাবা?’

‘আরে হ্যাঁ সে আর বলতে। চলে আসুন সামনের রবিবার। সৌরভ ওইদিন কোনও কাজ রাখিস না কিন্তু। শ্রেয়া, আঙ্কল-আন্টির সঙ্গে তুমিও আসছ কিন্তু।’ শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে সৌহার্দ্য।

ঠোটের কোণায় ঈষৎ হাসি খেলে যায় শ্রেয়ার। মুখের দু-পাশ রাঙা হয়ে ওঠে। মাথা নীচু করে সম্মতি প্রকাশ করে সে।

পরের রবিবার শ্রেয়া, সৌরভ বাবা-মায়ের সঙ্গে টাইম মতোই পৌঁছে যায় সৌহার্দ্য-দের বাড়িতে। গীতাদেবীও বাপ-ছেলের মতোই মিশুকে। সহজ সরল। কাজেই দুই পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগল না। গীতাদেবীর সঙ্গে উমাদেবীও কিচেনে ওনার হাতে হাতে খানিক সামলে নিলেন। খাওয়ার সময়তেও খাবার পরিবেশন করার ব্যাপারেও হেল্প করলেন। অসীমবাবুও খাতিরে কোনও ত্রুটি রাখেননি। যাবার সময় বরং সকলে মিলে বারবার অনুরোধ করেছে আবার আসার জন্য। ‘নিশ্চয়ই আসব। কিন্তু তার আগে গীতাদিকে আমাদের বাড়িতে আসতে হবে।’ প্রত্যুত্তরে উমাদেবী বললেন।

‘আপনি না বললেও আমি আমার মিসেসকে নিয়ে আসতাম আপনাদের বাড়িতে। কি বলো গিন্নি?’ গীতাদেবীর দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন অসীমবাবু।

পরের দিন অফিসে শ্রেয়ার মোবাইলে একটা এসএমএস। প্রেরক সৌহার্দ্য। দু-চার কথায় লেখা রয়েছে– অফিসের পরে ওয়েট কোরো। কথা আছে।

শ্রেয়া বেশ অবাকই হয়েছিল। চোখের সামনেই তো রয়েছে মানুষটা, তাহলে কী এমন কথা যে এখানে বলা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল শ্রেয়াকে। তারপর থেকে কাজে মন বসাতে পারেনি একটুও।

অফিসের পরে গেটের সামনে এগোতেই সৌহার্দ্য গাড়ি নিয়ে হাজির।

‘বোসো।’ সৌহার্দ্যের হঠাৎ করে আপনি থেকে তুমি বলাতে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে শ্রেয়া। ভাবার শক্তি যেন কে ছিনিয়ে নিয়েছে। সম্বিত ফেরে সৌহার্দ্যের কন্ঠস্বরে, ‘কী হল বোসো।’

‘ও, হ্যাঁ হ্যাঁ বসছি। কোথায় যাব? আ…আপনি যে বললেন কথা…’ মাঝখানেই থামিয়ে দেয় সৌহার্দ্য, ‘কেন বিশ্বাস নেই আমার উপর?’

‘এবাবা আমি এভাবে বলতে চাইনি’, হঠাৎ এই পরিবর্তনে হকচকিয়ে যায় শ্রেয়া।

‘তাহলে?’ আর একটাও কথা বলে না শ্রেয়া। গাড়ি ছুটতে থাকে। মিনিট পনেরো পরে একটা রেস্তোরাঁর সামনে গাড়ি দাঁড় করায় সৌহার্দ্য। ভিতরে টেবিল আগে থেকেই বুক করা ছিল। সেখানে গিয়ে খাবারের অর্ডার দেয় সে।

‘দ্যাখো আমি ভীষণ স্ট্রেট ফরওয়ার্ড। ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলতে পারি না। স্পষ্টই বলছি, বাবা-মা কাল তোমাদের বাড়িতে যাবেন আমাদের বিয়ের কথা বলতে।’ কথা সরে না শ্রেয়ার। কেবল শুনতে থাকে। এতটাও আশা করেনি শ্রেয়া। বলে যায় সৌহার্দ্য। ‘তুমিও খুব ভালো করে জানো যে তোমার বাবা-মা এই বিয়েতে অমত করবেন না। তবে তোমার হ্যাঁ বলার আগে, আমার মনে হয় তোমাকে কিছু কথা জানানো উচিত। অবশ্যই আমার পরিবারের কথা। আমার জীবনে আমার বাবার স্থান সবার উপরে। আমার জন্য ওনার অবদান ভোলার নয়। সত্যিই আমি ওনার প্রতি কৃতজ্ঞ। উনি আমার জন্মদাতা নন। আমার জন্মের কয়েকমাস পরেই আমার বাবা মারা যান।

মা যে-কলেজে পড়াতেন বাবাও সেই কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, সঙ্গে মামার বন্ধুও। মামার সূত্রে মাঝেমধ্যেই বাড়িতে আসতেন আর আমার সঙ্গে আমার মতো করেই মিশতেন, খেলা করতেন। সেই সময় বাড়িতে মায়ের আবার বিয়ে দেওয়ার কথা চলছে। উনি আমাকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলেন যে শুনেই মামাকে প্রশ্ন করে বসেছিলেন, ‘তাহলে সৌহার্দ্যর কী হবে? নতুন মানুষটি সৌহার্দ্যকে মেনে নেবে এমন গ্যারান্টি কে দিতে পারে? এই সব সম্পর্কে সবসময়ই একটা রিস্ক থেকে যায়। সৌহার্দ্যর ব্যাপারে আমি কোনও রিস্ক নিতে চাই না। তোদের যদি অমত না থাকে আমি কথা দিচ্ছি সারাজীবন ওকে বুঝতেই দেব না যে, আমার সঙ্গে ওর রক্তের কোনও সম্পর্ক নেই।’ বলতে বলতে চোখে জল ভরে আসে সৌহার্দ্যর। বাবার প্রতি তার আবেগ একটু বেশিই।

সামলাতে সৌহার্দ্যের হাতটা চেপে ধরে শ্রেয়া। নিজেকে সামলে নেয় সৌহার্দ্য। অপলক দৃষ্টিতে শ্রেয়ার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আবার বলতে শুরু করে সে।

‘মামার বাড়ি থেকে মেনে নিলেও বাবার বাড়িতে মানে ঠাকুরদা ব্যাপারটা একেবারেই ভালো চোখে নেননি। শুধুমাত্র আমার জন্য সেদিন বাবা নিজের বাবা-মা, বিশাল সম্পত্তি সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছিল। এখানেই শেষ নয়, সেইসময় বাবা আইএএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরীক্ষার সময়তেই এমারজেন্সি পিরিয়ডে মায়ের ইউটেরাসের অপারেশন করাতে হল। মায়ের বেড রেস্ট। বাবা পরীক্ষা পর্যন্ত দেয়নি, কেরিয়ার ভুলে আমার আর মায়ের দেখাশোনা করে গেছে।’

সৌহার্দ্য আবেগতাড়িত হয়ে বলে যাচ্ছিল। বাবার প্রতি তার অসীম ভালোবাসা প্রতিটা কথায় ঝরে পড়ছিল।

‘এটা বললেও বোধহয় ভুল হবে না যে বাবা নিজের সর্বস্ব আমার উপর সমর্পিত করে দিয়েছিল। এখন বাবাকে বাকি জীবনটা সুখে রাখাই হল আমার একমাত্র কর্তব্য। আমার বউকেও এটা মেনে চলতে হবে। দায়িত্বটা আমার বউয়ের উপরও বর্তাবে। জানি শ্রেয়া, শুধুই পরিবারের লোকজনই নয়, আমরাও একে-অপরকে পছন্দ করতে শুরু করেছি। হয়তো বা ভালোও বেসে ফেলেছি। তবুও হ্যাঁ বলার আগে ভালো করে ভেবে নাও। সারাজীবন তোমাকে জয়েন্ট ফ্যামিলিতে মানে বাবা-মাকে নিয়েই থাকতে হবে।’ উত্তরের আশায় বসে থাকে সৌহার্দ্য।

সৌহার্দ্যর হাতটা আর একটু জোরে চেপে ধরে শ্রেয়া। বলে, ‘মেসোমশাই আর মাসিমার মতো সহূদয় মানুষের সঙ্গে থাকতে আমার কেন কারওরই কোনও প্রবলেম হওয়ার কথা নয়। ভবিষ্যতে কোনও সমস্যা হলেও কথা দিচ্ছি কোনওদিন কোনওরকম অভিযোগ করব না তোমাকে।’

শুনে খানিক আশ্বস্ত বোধ করে সৌহার্দ্য। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর শ্রেয়ার হাতটা মুঠোর মধ্যে ভরে নেয়।

‘বিশ্বাস করো আমি জানতাম তুমি পারবে।’

মাস দেড়েক পরে চার-হাত এক হয়ে গেল। অফিসের নিয়ম অনুযায়ী এক অফিসে স্বামী-স্ত্রী চাকরি করতে পারে না। সেই কারণে চাকরি ছাড়তে দ্বিধাবোধ করেনি শ্রেয়া। মধুচন্দ্রিমা থেকে ফেরার পর শ্বশুর-শাশুড়ির কোচিং সেন্টারে যোগ দিয়েছিল সে। ধীরে ধীরে অসীমবাবুর বেশ কিছু গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল শ্রেয়া। কাজের সূত্রে দিনের বেশিরভাগ সময়টা একসঙ্গে কাটানোর জন্য শ্বশুর-বউমার সম্পর্কটা আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছিল। অসীমবাবু স্নেহও করতেন তেমনভাবেই।

‘ভাগ্যিস অফিসের দায়িত্বটা নিয়েছিলে শ্রেয়া। সারাদিন কোচিং ক্লাস করানোর পর আর পেরে উঠছিলাম না।’ শ্রেয়া মমতা অনুভব করে শ্বশুরের প্রতি।

‘ঠিক আছে বাবা, নতুন অফিসে জয়েন করলেও তোমার এই অফিসের কাজগুলো ছুটির দিনে বসে আমিই করে দেব।’

‘খানিক স্বস্তি পেলাম। সত্যিই আর পারছি না, হাঁফিয়ে উঠছি। আর কতদিন পারব তাও জানি না। মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্রমশ নিজের কাছেই নিজে হেরে যাচ্ছি।’ শ্বশুরের কথাগুলো কেমন আর্তনাদের মতো মনে হল শ্রেয়ার।

অবাক হয়ে শ্রেয়া বলে, ‘কী বলছ বাবা! মনের সাথে যুদ্ধ মানে!’

‘সৌহার্দ্য বা গীতাকে একথা বলা যায় না। তাছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে ওরা আমাকে বার করতে পারবে না।’

‘তাহলে কে পারবে?’

‘তুমি, কেবলমাত্র তুমি।’ অসীমবাবুর চোখেমুখে তখন বিমর্ষতার স্পষ্ট ছাপ।

‘আমি! আমি কীভাবে?’ প্রহেলিকার থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছিল না শ্রেয়া।

‘আমার করুণ কাহিনি শুনবে?’

‘অবশ্যই। আমায় বলে যদি একটু হালকা হতে পারো, তা বলো না বাবা।’

‘এখানে নয়, চলো একটু খোলা হাওয়ায় বেরোই।’

দারোয়ানকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দুজনে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। প্রায় ঘন্টা দেড়েক পরে একটা বিশাল জমিদারবাড়ির সামনে থামল গাড়িটা।

‘এই বাড়িটা দেখছ। এটা আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটে। গীতা আর আমার বিয়েটা বাবা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। আমাদের বিয়ের পর বাবা একটাই শর্ত রেখেছিলেন, এই বিশাল সম্পত্তির মালিক শুধুমাত্র তার রক্তের সম্পর্কের নাতি বা নাতনি অর্থাৎ আমার নিজের সন্তানই পাবে। সৌহার্দ্য নয়। সৌহার্দ্যের জন্যই তো গীতাকে বিয়ে করা, আর বাবা বলে কিনা সে-ই…। রক্ত চড়ে গেল মাথায়, ডিসিশন নিয়ে ফেললাম। এমনিতেই গীতার গর্ভাশয়ে ফ্রাইব্রয়েডের সমস্যা ছিলই, হাতিয়ার করলাম সেটাকেই। ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে গীতার জরায়ুটাই শরীর থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হল। তারপর আর কখনও এ-বাড়ির পথ মাড়াইনি।’ মিনিট খানেক স্থির হয়ে বসে রইলেন অসীমবাবু।

‘তারপর? তারপর কী হল?’

‘মাস আষ্টেক হল বাবা মারা গেছেন। মারা যাওয়ার আগে উনি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন, ওনার দাহ-সংস্কার যেন আমার হাতেই হয়। সেইমতো ডেকে পাঠানো হয়েছিল আমাকে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সমস্ত সম্পত্তি আমার নামেই করে গেছেন, কারণ তিনি কখনও চাননি জায়গা-জমি-টাকাপয়সা বংশের বাইরে অন্য কারওর কাছে যাক। সঙ্গে রেখে গেছেন একটা চিঠিও। চিঠিটা পাওয়ার পর থেকেই আত্মগ্লানিতে তিল তিল করে মরছি।’

‘কেন, কী এমন লেখা ছিল সেই চিঠিতে?’

একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন অসীমবাবু। তারপর বলতে শুরু করেন ‘ওনার বংশ নিঃশেষ করার জন্য কেবলমাত্র আমিই দায়ী, এমন অভিযোগের পাশাপাশি একটা তীব্র আর্তি… ‘পারলে নিজের বংশজকে পৃথিবীতে নিয়ে এস। বংশরক্ষা কোরো নইলে আমার আত্মা শান্তি পাবে না। বেঁচে থাকতে তো বাবার ইচ্ছের দাম দিলে না, অন্তত মারা যাওয়ার পর যদি বাবাকে একটু সম্মান দাও।’

অসীমবাবুর সারা মুখে একটা ভেঙে পড়া বিষণ্ণতার ছাপ।

‘তারপর থেকেই অনুশোচনায় ভুগছি। কোথাও একটা মনে হচ্ছে, বাবার কথাটা বোধহয় কিছুটা হলেও সত্যি। যদি আমার আর একটা সন্তান এই পৃথিবীতে আসত তাতে তো সৌহার্দ্য-র প্রতি ভালোবাসা কমে যেত না। ছেলে বা মেয়ে যাই হতো দুজনে একসাথে বড়ো হতো। এতে আমার বাবাও শান্তি পেতেন আর বংশরক্ষাও হতো। এখন ভাবি সেদিন অতটা কঠিন সিদ্ধান্ত না নিলেই পারতাম। অন্তত একটা বাচ্চার পরেও তো গীতার অপারেশনটা করাতে পারতাম।’ বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন অসীমবাবু।

‘আমি তোমার ফিলিংসটা বুঝতে পারছি বাবা। কিন্তু এখন সবই তো হাতের বাইরে।’

‘না, একটা রাস্তা এখনও আছে, তুমি, একমাত্র তুমি আমায় সাহায্য করলে এখনও সম্ভব শ্রেয়া। অবশ্যই যদি তুমি চাও।’

‘এক্ষেত্রে আমি তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় শ্রেয়া।

শ্রেয়ার হাতটা চেপে ধরে অসীমবাবু। ‘কেউ জানতে পারবে না শ্রেয়া। সবাই জানবে সৌহার্দ্য-র সন্তান। শুধু তুমি আর আমি…’ তড়িতাহত হয়ে এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নেয় শ্রেয়া। শ্বশুরের কথা শুনে আঁতকে ওঠে সে।

বউমার প্রতিক্রিয়া দেখে অসীমবাবু বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘না-না শ্রেয়া তুমি ভুল বুঝছ। আমি কোনওরকম অশ্লীল বা অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বলছি না তোমাকে! স্পার্ম ট্রান্সপ্ল্যান্ট মানে আইভিএফ-এর কথা তো নিশ্চয়ই তুমি শুনে থাকবে। প্লিজ শ্রেয়া যদি একটু সাহায্যের হাত বাড়াও, তাহলে আমিও শান্তি পাই, আর বাবার আত্মাও খানিক স্বস্তি পায়।’

পরমপূজ্য শ্বশুরের আত্মতুষ্টির কথা শুনে বাক্যহারা হয়ে পড়ে শ্রেয়া। মনে মনে ভাবতে থাকে, এমন জঘন্য কথাটা বলল কীভাবে বাবা? একবারও বাধল না! ছিঃ ছিঃ ছেলের বউয়ের সম্পর্কে এমনটা ভাবতে পারে কোনও শ্বশুর? সৌহার্দ্য-র বিশ্বাস, ভালোবাসার এই দাম দিল মানুষটা! গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও সৌহার্দ্যর কাছে কখনও এটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না আর বিশ্বাস করলেও এই আঘাত সহ্য করতে পারবে না। পায়ের নীচ থেকে যেন অযাচিত ভাবে খানিকটা মাটি সরে গেছে। নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে অভিশপ্ত সেই বাড়ি থেকে উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে আসে শ্রেয়া। কোথায় যাবে সে, কাকে বলবে, তার এই লজ্জাকর পরিস্থিতির কথা। সৌহার্দ্যও কী করে করতে পারবে তার এই দুঃস্বপ্নের অবসান?

 

আশ্বাস

বড়োজামাই বিজয়ের আচার-ব্যবহার সম্পর্কে আত্মীয়-পরিজন মোটামুটি সবাই ওয়াকিবহাল। প্রতিপত্তির পাশাপাশি বদমেজাজের কারণে সমাজে তার একটা নামডাক ছিলই। মানুষকে হেয় করা, ছোটো নজরে দেখা, সবসময় কেমন যেন একটা দাম্ভিক আচরণ। বিশেষত শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে ছোটো করতে পারলে সে যেন একটু বেশিই মজা পায়। শ্বশুরবাড়ির যে-কোনও উৎসব অনুষ্ঠানে তার একটা গোল বাধানো চাই-ই-চাই।

সেসব এড়াতেই পিসিশাশুড়ি মুগ্ধা, ছেলের বিয়ের একমাস আগেই বিয়ের কার্ডের সঙ্গে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। শুধুমাত্র তাই নয় বহুবার ফোনও করেছিলেন, কিন্তু সংযোগবশত জামাই বাড়িতে না থাকায় ভাইঝি স্নেহা আর নাতি-নাতনির সঙ্গেই কথা হয়েছে প্রত্যেকবার। ব্যক্তিগত ভাবে জামাই বিজয়ের সঙ্গে কথা বলা হয়ে ওঠেনি মুগ্ধার।

বিয়ের এক সপ্তাহ আগে আবারও ফোন করেন মুগ্ধা। এইবার ফোনটা বিজয় নিজেই ধরেছিল। কোনও কিছু শোনার আগেই পিসিশাশুড়ির গলা পেয়েই খোঁচা মারল, ‘এখন আপনি বিয়েতে যাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করছেন, যখন বিয়ের আর মাত্র চার-পাঁচ দিন বাকি। কী ভেবেছেন, আমরা কি অনাহুত? ভাইঝিকে বললেই দায়িত্ব শেষ। ভাবলেন কী করে আপনাদের বাড়ির মেয়েকে বললেই আমরা হ্যাংলার মতো চলে যাব। জামাইয়ের কদর যারা করতে পারে না, তাদের সাথে আমরা সম্পর্কও রাখতে চাই না।’ বলেই ফোনটা রেখে দেয় বিজয়।

জামাইকে তোষামোদ করার নানানরকম চেষ্টা করেন মুগ্ধা। কিন্তু কেউ যদি বুঝতে না চায় তাকে বোঝানো খুব কঠিন। শেষ পর্যন্ত বিজয় তার স্বভাবসিদ্ধ আচরণের কারণে শালার বিয়েতে নিজেও অনুপস্থিত থেকেছে, স্নেহাকেও পাঠায়নি।

একমাত্র ভাইঝি, ভাইঝি-জামাই না আসায় বিয়েবাড়িতে বেশ চর্চা হয়েছে। সবকিছু শুনেও না শোনার ভান করতে হয়েছে মুগ্ধাকে। কখনও বা স্নেহার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে কাটাতে হয়েছে। শুধু বা তাকেই বলা কেন, মুগ্ধার দাদা প্রতাপবাবুকেও জামাইয়ের এই ব্যবহারের জন্য কম লজ্জিত হতে হয়নি।

বাবার মৃত্যুর পর দু’হাজার টাকা নিয়ে ফল্স পাড়ের বিজনেসে নেমেছিল বিজয়। আর আজ সে-ই শহরের সব থেকে বড়ো কাপড়ের ব্যবসায়ী। দিনের পর দিন যত উপার্জন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে অভিমান আর টাকা কামানোর দম্ভ। আর সেই দম্ভে চাপা পড়েছে সম্পর্কের রসায়ন।

উপহার পেতে কে-না ভালোবাসে। তাই বলে সেই পাওনাটা তার অধিকার ধরে নেওয়াটাও একেবারে যুক্তি সঙ্গত নয়। ঐশ্বর্যশালী, প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকার পরেও শ্বশুরবাড়ির থেকে পাওয়ার আশা বরাবরই বিজয়ের ছিলই। নিয়মমতো পূজাপার্বণ, উৎসব, ষষ্ঠীতে তত্ত্ব না পেলেই মুখ ব্যাজার। জামাইকে আমন্ত্রণ করে থালার চারপাশে বারো-চোদ্দো বাটি না সাজিয়ে দিলে কি জামাই আপ্যায়ন সম্ভব? অথচ কথাতেই আছে, কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়। ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য পাত্র হয়ে উঠতে হয়। কিন্তু দম্ভের কারণে বিজয় বোধহয় সে-সব ভুলতে বসেছিল।

তার এই দুর্ব্যবহারের জন্য স্নেহার বাবা প্রতাপবাবুও একপ্রকার মেয়ের বাড়ি যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রতাপবাবুর স্ত্রী রমাই নিয়ম মেনে, ফলটি, মুলোটি, মিষ্টিটি নিয়ে হাজির হতেন মেয়ের বাড়িতে। তাতেও কম গঞ্জনার মুখোমুখি হতে হতো না তাঁকে। তাঁর সামনেই প্যাকেট থেকে এক-একটা জিনিস বার করে প্রত্যেকটিতে কিছু না কিছু খুঁত বার করে অপমান করা। যার জন্য বিজয়ের মায়ের পেটের ভাইরাও আজ তার থেকে বিচ্ছিন্ন। তার উপর গোদের উপর বিষফোড়ার মতো নিত্যদিনের তার সুরাপান।

ছোটো থেকেই স্নেহা ভীষণ সহজ-সরল এবং শান্ত প্রকৃতির। কোনওদিন সাত চড়ে রা নেই তার। কাজেই স্বামীর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সৎসাহসও তার ছিল না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখ বুজে কেবলই স্বামীর কঠোর অনুশাসন মেনে চলা। সেই কারণেই বিজয় আরও পেয়ে বসেছে। নিত্যদিন নেশা করে বাড়ি ফেরা। চ্যাঁচামেচি করা। কিছু বোঝাতে গেলে চিরাচরিত সেই এক ডায়লগ ‘নিজের পয়সায় খাই, তোমার বাবার টাকায় খাই না। তোমার বাবার তো ডেকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোরও ক্ষমতা নেই। নিজের পয়সায় খাচ্ছি তাও সহ্য হচ্ছে না তোমার।’

কোনও বিতর্কে যায় না স্নেহা। অভয়ের বিয়েতে যেতে না পারার জন্য স্নেহার মনটা ক’দিন ধরে ভালো নেই। অভয় স্নেহার থেকে বছর দশেকের ছোটো হলে কী হবে, ভাইবোনের দারুণ বন্ধুত্ব। কত সুখ-দুঃখের কথা হতো তাদের। বিয়ের পর সম্পর্কগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে।

কিছুদিন পরে এক বিয়েবাড়িতে হঠাৎই দেখা পিসির সঙ্গে। লজ্জায় অভয়ের বউয়ের কথা পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করতে পারেনি স্নেহা। আর করবেটাই বা কী করে, বিয়ের মিষ্টি নিয়ে যা কান্ড ঘটল! মুগ্ধা, অভয়কে দিয়ে বাচ্চাদের জন্য বিয়ের মিষ্টি পাঠিয়েছিল, সে মিষ্টিও তো অভয়ের সামনেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল বিজয়। মাথা নত করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল অভয়। তারপর দু-তরফ থেকেই ফোন বন্ধ।

এতকিছুর পরেও ভাইঝির উপর বিন্দুমাত্র রাগ নেই মুগ্ধার। স্নেহার সমস্যাটা সে বোঝে। বরং ভাইঝির জন্য চিন্তাই হয় তার। যে মেয়ে বলতে গেলে, একপ্রকার তার কাছে মানুষ, ভাগ্যের পরিহাসে সুখে-দুঃখে তার পাশে দাঁড়ানোরও অধিকার নেই তাদের। জোর করে কারও সংসারে নাকগলানোটাও ঠিক নয়। যদিও এর আগে স্নেহার বড়দা, বিজয়কে বোঝানোর নানারকম প্রচেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার স্বভাব সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে।

মুগ্ধা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা। মন নিয়েই তার যত কারবার। কাজেই পুরুষদের দম্ভ আর অহং সম্পর্কে তার ধারণাটা খুব স্পষ্ট। কিন্তু তার থেকে বেশি চিন্তার কারণ বিজয়ের নেশার প্রতি আসক্তি। যেটা মুগ্ধাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল।

দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও এদিক-ওদিক থেকে কিছু খবর তো কানে আসেই। তারপর সেগুলোকেই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে রং লাগিয়ে যা হয় আর কী! মুগ্ধা সেগুলো সহজভাবে নিলেও, বিজয় তো একেবারে বিপরীত। লোকের মুখে শোনামাত্রই নিরীহ স্নেহার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘তোমার পিসি নিজেকে কী মনে করেন? ওনাকে বলো আমাদের চিন্তা ছেড়ে দিতে। বেশি পড়াশোনা শিখে কি মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি। শোনো ওসব পড়াশোনা-টড়াশোনা দিয়ে কিছু হয় না বুঝেছ, লোক টাকা চেনে, টাকা। আমার মতো উপায় করে দেখাক তো, তাহলে জানব।’ ব্যস তারপর ঝগড়ার বাহানায় আরও কয়েক পেগ চড়িয়ে নেয় বিজয়। দিন এভাবেই গড়িয়ে যায়।

অশান্তির কারণে আত্মীয়দের কারও সামনে ভাইঝির প্রসঙ্গে কিছু বলাও ছেড়ে দিয়েছিল মুগ্ধা। সারাটা দিন অধ্যাপনা নিয়েই ব্যস্ত থাকত। তার উপর মুম্বইতে অভয়ের ট্রান্সফার নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য বাড়িতেও বেশ কিছুটা সময় দিতে হচ্ছিল তাকে। পরের মাসের মধ্যে আবার নতুন বউকে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

বছর গড়াতে না গড়াতে হঠাৎ একদিন খবর এল বিজয়ের নাকি ওরাল ক্যানসার ডিটেক্টেড হয়েছে। ব্যস পরিবারের উপর একেবারে বজ্রাঘাত পড়ার মতো অবস্থা হল। যতই বদমেজাজি, দাম্ভিক হোক না কেন, বাড়ির একমাত্র জামাইয়ের এমন মারনরোগ, তাদের বেশ বিচলিত করে তুলেছিল। ক্যানসারের প্রথম স্টেজ।

ডাক্তাররাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করার কথা বলেছেন। স্নেহার বাচ্চাগুলোও ছোটো ছোটো, আর স্নেহা এমনিই একটু দুর্বল প্রকৃতির। কোনওদিনই নিজের সিদ্ধান্তে চলেনি, বরাবরই অন্যের মুখাপেক্ষী। সুতরাং তার পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও অসম্ভব। পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। টাকাপয়সার অভাব না থাকলেও কোথায় চিকিৎসা করাবে, কোথায় গেলে সমুচিত হবে কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না তার। বিজয়ের দুই ভাইও কর্তব্য পালন করতে শুধুমাত্র একদিন চোখের দেখা দেখে গেছে মাত্র, বাড়তি কোনও দায়িত্ব তারাও নিতে রাজি নয়। স্নেহার ননদও কোনওদিনই দাদার প্রতি যত্নশীল নয়। তার স্পষ্ট বক্তব্য, ‘যেটা ভালো মনে হয় করো। আমরা এ ব্যাপারে কোনও মতামত পোষণ করতে চাই না। দাদাকে তো চিনি, ভালো করতে গিয়ে যদি কিছু একটা… থাক ভাই আমাদের এর মধ্যে জড়িয়ো না।’

যত মত তত পথ। কেউ আয়ুর্বেদের উপর জোর দিতে বলে তো কেউ অ্যালোপ্যাথি বা হোমিওপ্যাথির। কেউ কেউ তো আবার এটা বলতেও ছাড়ে না যে, ‘এখনও পর্যন্ত তো এই রোগে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তিকে বেঁচে ফিরতে দেখিনি’, তো কেউ বলে, ‘এরোগের কোনও চিকিৎসাই নেই। সুতরাং এখন সবই ভগবানের ইচ্ছা।’

সবাই গা-বাঁচিয়ে চললেও স্নেহার বাবা-মা দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন বোন মুগ্ধার কাছে। না মুগ্ধা ফেরায়নি বরং সেও মুখিয়ে ছিল। আদতে মুগ্ধা চাইছিল কেউ অন্তত একবার আসুক। তাই প্রতাপবাবু কোনও কিছু বলার আগেই মুগ্ধা বলে ওঠে, ‘দাদা তুমি তো জানোই অভয়ের মুম্বইতে ট্রান্সফার হয়েছে। মাস তিনেক হল টাটা মেমোরিয়ালে জয়েনও করেছে। যেভাবেই হোক বিজয়কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মুম্বই পাঠাও। বাকি, যা ব্যবস্থা করার অভয়ই করে নেবে।’

ডাক্তার ভাগনের জন্য মামার এমনিই গর্বের অন্ত ছিল না। ভাগনে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ বলে কথা। কিন্তু তৎসত্ত্বেও ভাগনের কাছে জামাইকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে একটা সংশয় থেকেই গেল। আসলে দুই পরিবারের মধ্যে ভীষণ মিষ্টিমধুর সম্পর্ক কিনা!

ক্যানসারের মতো মারণরোগের মৃত্যুভয়ও টলাতে পারেনি বিজয়কে। সেও হার মেনেছে তার দম্ভের কাছে। তাই বোধহয়, রিপোর্ট হাতে পাওয়া মাত্রই বিকৃত হেসে বউকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ‘খবরদার স্নেহা, আমার রোগের ব্যাপারে তোমার পিসি যেন কিচ্ছুটি জানতে না পারে। এমনিতেই ছেলে এখন বড়ো ডাক্তার হয়েছে। টাটা মেমোরিয়ালে চাকরি করছে। অহংকারে তেনাদের এখন মাটিতে পা পড়ে না। তার উপর তাদের অতিবড়ো শত্রু মরতে বসেছে শুনলে খুব খুশিই হবে।’

স্নেহা জবাব দিতে গিয়েও পরিস্থিতির কথা ভেবে চুপ করে যায়।

এভাবেই কেটে যায় আরও দুটো দিন। জামাইয়ের মানা-না মানার ব্যাপারে প্রতাপবাবুর একটা দ্বিধা ছিলই। বোঝাতে গেলে যদি উলটো ভাবে নেয়, তাহলেই তো বাড়ি মাথায় করে ফেলবে। এই অবস্থায় বেশি উত্তেজনাও শরীরের পক্ষে হানিকারক। ভাবতে থাকে প্রতাপবাবু।

ওদিকে দুদিন পরেও কোনও খবর না পেয়ে তৃতীয় দিনের দিন মুগ্ধা নিজেই প্রতাপবাবুকে ফোন করে জানতে চাইলেন, ‘দাদা কিছু ঠিক হল। বিজয় মুম্বই কবে যাচ্ছে?’

‘কী যে করি, বিজয়ের সঙ্গে কথা বলতেই ভয় করছে। এক বলব আর অন্য মানে করে বসবে। তুই তো ওর স্বভাব জানিস, পারলে হাওয়া বাতাসের সঙ্গেও যুদ্ধ করে।’ মেয়ের কথা ভেবে চোখে জল আসেঞ্জপ্রতাপবাবুর। অসহায়ের মতো বসে থাকেন বেশ কিছুক্ষণ। দাদার সঙ্গে কথা বলে মুগ্ধার মনটাও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে, যে ভাবেই হোক, একটা উপায় বার করতেই হবে। দিন চারেকের জন্য বাড়ি ফিরেছিল অভয়। চিন্তামগ্ন মাকে দেখে, ‘কী হল মা চুপচাপ কেন? জামাইবাবু মুম্বই যেতে রাজি হয়নি তাই তো?’ মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করেন মুগ্ধা।

‘মা, তুমি তো নিজেই মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা। তুমি তো জানোই কিছু মানুষ আছে যারা কোনও অবস্থাতেই মাথা নোয়াতে পছন্দ করেন না। জামাইবাবু সেল্ফমেড লোক। নিজের ক্ষমতায় এতো বড়ো একটা বিজনেস দাঁড় করিয়েছে। একটু অহংকারী এই যা। তুমি চিন্তা কোরো না, আমি দেখছি।’

‘কিন্তু তুই?’ প্রশ্ন করে মুগ্ধা।

‘আরে ধুর! তুমি আমার জন্য হেজিটেট কোরো না তো। আমাদের মতো ডাক্তারদের রোজ কত ভুরিভুরি কথা শুনতে হয় জানো? কোনও পেশেন্টকে বাঁচাতে না পারলেই গালিগালাজ হজম করতে হয়। আবার রুগি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে কেউ কেউ মাথায় করে নাচে। আমাদের পেশাটাই এরকম! তার উপর উনি তো নিজের জামাইবাবু। স্নেহাদির বর। দিদির অসময়ে তার ছোটোভাই পাশে থাকবে না তো কে থাকবে?’ অভয়ের কথা শুনে আশ্বস্তবোধ করেন মুগ্ধা।

পরদিন দুপুরের মধ্যে দিদির বাড়িতে হাজির হয় অভয়। দিদিকে দেখে এমন হাবভাব করে যেন সবকিছু আগের মতোই নর্ম্যাল। ঘরে ঢুকে বসামাত্রই ডাক্তারসুলভ ভঙ্গিতে স্নেহাকে জামাইবাবুর সমস্ত রিপোর্ট আনার জন্য বলে। রিপোর্ট দেখার পর ফোনে সিনিয়র ডাক্তারের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ চলল শলাপরামর্শ। তারপর সোজা জামাইবাবুর ঘরে ঢুকে প্রায় যুদ্ধের কম্যাণ্ডারের মতো করে বলে, ‘ব্যস অনেক হয়েছে। কাল সকালের ফ্লাইটে আপনি আমার সঙ্গে মুম্বই যাচ্ছেন। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়ে গেছে। পরশুদিন আবশ্যক যা যা পরীক্ষানিরীক্ষা হওয়ার হবে, তারপরেই চিকিৎসা শুরু হয়ে যাবে।’

বিজয়ের ক্রোধ তখনও বিন্দুমাত্র প্রশমিত হয়নি। বরং যাদের সাথে এরকম তিক্ত সম্পর্ক, তাদের এত আদিখ্যেতায় রাগে তার গা জ্বালা করতে শুরু করেছিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা সময়ে তো শালাবাবুর উদ্দেশ্যে বলেই ফেলল, ‘জানি, জানি, অনেক বড়ো ডাক্তার হয়ে গেছিস। আমার চিকিৎসাও করবি। কিন্তু তোর বিয়েতে পিসি যা ব্যবহার করেছে সেটা কোনওদিনও…’

জামাইবাবুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই, ‘হ্যাঁ, জানি, আমার বিয়েতে মা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে নিমন্ত্রণ করতে আসতে পারেনি। বোঝেনই তো বাবা আর পেরে ওঠে না। আর মায়ের একার পক্ষে সব জায়গায় ছোটাছুটি করাটা প্রায় অসম্ভব। আর আমি নিমন্ত্রণ করতে এলেও তো হতো না বলুন। এসব আপনি বুঝবেন না তো কে বুঝবে বলুন তো। ঠিক আছে ছোটোর বিয়েতে আমি নিজে এসে আপনাকে নিয়ে যাব।’ কথার মারপ্যাঁচে অভয়, বিজয়ের মনের গ্লানি কিছুটা হলেও দূর করতে পারল। পরিস্থিতি আরও হালকা করতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দিদিকে দেখে, ‘কী রে চা-টাও দিবি না নাকি বলতো?’ ভাইয়ের এই সকল প্রচেষ্টায় স্নেহা কিছুটা হলেও সোয়াস্তি অনুভব করল।

পরদিন ভোররাতের ফ্লাইটে রওনা দিল তারা। প্রথমদিন ডাক্তারি পর্যবেক্ষণে পরীক্ষানিরীক্ষা সমস্ত কিছু চলল। দ্বিতীয় দিনে অপারেশন। ততক্ষণে প্রতাপবাবু আর মুগ্ধা দুই ভাইবোনেই, টাটা মেমোরিয়ালে পৌঁছে গেছে। সিনিয়র ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে এবং অভয়ের সহযোগিতায় অপারেশন সাক্সেসফুল। চার-পাঁচ দিন পর থেকেই লিকুইড জাতীয় খাবার দেওয়া হল বিজয়কে। তারপর আর সাত দিন অবজার্ভ করার পর ছুটি দিয়ে দেওয়া হল তাকে।

ছুটির দিন বিজয়, পিসিকে সামনে পেয়ে পিসির হাত দুটো ধরে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, ‘পিসিমা ওই দিন না-জানি কত বাজে কথা বলেছি আপনাকে। তারপরেও আপনারা। প্লিজ পিসিমা আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’

সঙ্গে সঙ্গে জামাইয়ের হাত দুটো ধরে নেয় মুগ্ধা। বলে, ‘এটা কী করছ বাবা! তুমি যে আমাদের কত আদরের, কত কাছের তা কী বলার অপেক্ষা রাখে। ভুলটা আমারই হয়েছিল বাবা, আমারই উচিত ছিল গিয়ে বলা।’

‘পিসিমা, আর লজ্জা দেবেন না। এখনও তো ও বাড়িতে একটা বিয়ে বাকি আছে। দেখবেন ছোটোর বিয়েতে নিমন্ত্রণের পরোয়া না করেই আমি চলে আসব। শালাবাবুর বিয়েতে সব দায়িত্ব আমার।’

অপারেশন করার পর বিজয়ের মুখটা সামান্য একটু বেঁকে গেছে। দাঁত তুলে দেওয়ার পর কথাগুলোও কিছুটা জড়িয়ে যাচ্ছে, তৎসত্ত্বেও বিজয়ের মন থেকে বলা জড়ানো কথাও বুঝতে অসুবিধা হয়নি মুগ্ধার।

ভরসা জোগাতে জামাইয়ের কাঁধে হাত রেখে মুগ্ধা শুধু এটুকুই বলতে পেরেছিল, ‘সম্পর্ক এত ঠুনকো নয় যে, দুটো কথাতে সেটা ভেঙ্গে যাবে। মন থেকে সমস্ত রাগ, দম্ভ মুছে ফেলো। দেখবে ভালো আছ। আমরা সবাই সবসময় তোমার সঙ্গেই আছি।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব