মোক্ষলাভ (পর্ব-০১)

ভুজুং ভাজুং দিয়ে বৃদ্ধ বাবার থেকে জমি জায়গা সব নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েও সুনীলের মনে শান্তি নেই। বোন যেভাবে ঘনঘন এসে বাবার কানে ফুসমন্ত্র দিতে শুরু করেছে, তাতে কোনও দিন না বাবা আগেকার দলিল বদলে মেয়েকেও অর্ধেক সম্পত্তি লিখে দেয়। তবে একটাই বাঁচোয়া, বাবার হাঁপের টান যেভাবে বাড়ছে, মনে হচ্ছে আর বেশিদিনের মেহমান নয়— এই শীতেই হয়তো একটা এসপার ওসপার হয়ে যাবে। ততদিন একটু ঠেকিয়ে রাখতে হবে বোনকে

শীত পড়তে শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কষ্টও বাড়ল সর্বেশ্বরের। সকাল সন্ধেয় তো হয়ই, গ্রন্থপাঠ করতে করতেও কাশতে থাকে নাগাড়ে। সঙ্গে আসে হাঁফের টান, একেক দিন রাতে ঠিকমতো ঘুমও হয় না। কিন্তু তবু কারও কথা শুনবে না, দুপুরে চান করে ঠাকুর দিয়ে আর সন্ধ্যায় আহ্নিক করার পর গীতাপাঠ চাই-ই। মানা করলে বলে গোটা জীবন করে এসেছি, এখন হুট করে কী করে ছাড়ি বল তো? গীতায় একটু তুলসী দিয়ে দু’ছত্র না পড়লে আমি যে মহাপাতকের ভাগী হব। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, ডাক্তারের ওষুধেও তেমন কাজ হয় না। ক’দিন ধরে একদম শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। সুনীল নিয়মরক্ষার্থে ওষুধ এনে দিলেও মনে মনে ঈশ্বরকে জানায়— তাড়াতাড়ি বাবাকে তুলে নাও ভগবান। তাহলে বাবাও বাঁচে আর আমিও বাঁচি।

দিনকয়েক পরে পাড়ার ঝন্টুর পিসিমা এল বিহারের গিরিডি থেকে বাপের বাড়িতে। বৃদ্ধের অবস্থা খারাপ শুনে দেখতে এল। কথায় কথায় বলল তার খুড়শ্বশুরের কথা। তারও হাঁপানির অসুখ ছিল। অবস্থা খারাপ হতে বাড়ির লোক তাকে বারাণসির মুক্তি ভবনে রেখে আসে। সেখানেই বারো দিনের মাথায় মারা যায়।

বাড়ি ছেড়ে কেন শেষ অবস্থায় বারাণসি নিয়ে গেল— জিজ্ঞেস করতে বলল, বারণসিতে দেহ রাখলে মোক্ষলাভ হয়, আর পুনর্জন্ম হয় না। তাদের ওদিকে অনেকে নাকি ওখানে গিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে। শুনে ধর্মপ্রাণ মুমূর্ষু সর্বেশ্বর ছেলের কাছে বায়না ধরল সেও বারাণসিতে গিয়ে দেহ রাখবে। স্ত্রী থাকলে তবুও একটা কথা ছিল। কিন্তু সেও তো বছর বারো আগে অকালে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে, এখন কার টানে ঘরে পড়ে থাকবে সে?

সুনীল দেখল এই সুযোগ, একবার বাবাকে বারাণসিতে সরিয়ে দিতে পারলে সব চিন্তা থেকে মুক্তি। তাই প্ৰথমে গেল মদন ডাক্তারের কাছে। জিজ্ঞেস করতে ডাক্তার বলল বৃদ্ধ আর কয়েকদিনের মেহমান, শরীরের যা অবস্থা আর যেভাবে শীত বাড়ছে তাতে তার আগেও যে কোনও দিন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। তারপর বউ-ছেলেমেয়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুনীল বোনকে না জানিয়ে বাবাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বারাণসির পথে।

ঝন্টুর পিসির নির্দেশ মতো দু’জনে গিয়ে হাজির হল বারাণসির মুক্তি ভবনে। ম্যানেজার ভৈরবনাথ শুক্লার সঙ্গে কথা বলে বাবার থাকার ব্যবস্থা করে ফেলল। তাকেও রয়ে যেতে হল শেষ ক’টাদিন বাবার দেখাশোনা করার জন্যে। ম্যানেজার কিন্তু জানিয়ে দিল চোদ্দ দিনের মধ্যে যদি মৃত্যু না হয় তাহলে বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আত্মবিশ্বাসী সুনীল তাতেই রাজি হয়ে রয়ে গেল বাবার কাছে।

মুক্তি ভবনে টাকাকড়ি না লাগলেও খাওয়া থাকার অবস্থা তেমন ভালো নয়। ঘরগুলো জরাজীর্ণ, আসবাবপত্রের বালাই নেই, তক্তপোশের শক্ত বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গোনা। নিজের একটু কষ্ট হলেও সুনীল মনে মনে খুশিই হল— এই ভাবে থাকলে বাবার যাওয়া ত্বরান্বিত হবে।

ধীরে ধীরে দিন দশেক কেটে গেল সুনীলদের। কিন্তু বাবার অবস্থা একই রকম আর মৃত্যুর কোনও লক্ষণ না দেখে সুনীল তো প্রমাদ গুণল। আর চারদিনের মধ্যে বাবার যদি কিছু না হয়, তাহলে তো বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তখন কী হবে? তার সব মেহনত বেকার তো হবেই, এত টাকা খরচ সব জলে যাবে। ভেবে ভেবে শেষে একটা উপায় বের করল। বিকেলবেলা ম্যানেজারের কাছে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলল— বাড়িতে বড়ো বিপদ, মায়ের শরীর খুব খারাপ, আজই তাকে একটু বাড়ি যেতে হবে, দু’দিন পরে চলে আসবে আবার। এদিকে কোনও অসুবিধা হবে না। পাশের রুমের বিদ্যামাসি এই দুটো দিন বাবাকে দেখবে বলেছে। এই বলে সুনীল সন্ধ্যায় ট্রেনে উঠে বসল। বাবাকে বুঝিয়ে বলে এল— ঘরে খুব বিপদ, দু’দিন পরেই ফিরে চলে আসব।

পরদিন সুনীল বাড়িতে ঢুকল কাঁদতে কাঁদতে। সবাইকে বলল গতকাল সকালে বাবা দেহ রেখেছে। দাহকাজ মিটিয়ে এখানে এসেছে। তারপর দিন দশেক পরে যথারীতি বাবার শ্রাদ্ধশান্তিও করল ঘটা করে। সবাই সুনীলের খুব প্রশংসা করল বাবাকে শেষ সময়ে মোক্ষধাম বারাণসিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। বলল সর্বেশ্বর সত্যিই ভাগ্যবান, খোদ বিশ্বনাথের চরণে এমন মোক্ষলাভ ক’জনার ভাগ্যে জোটে?

এরপর কেটে গেছে প্রায় বছর খানেক। অজন্তা বাবার অবর্তমানে তেমন একটা আসে না বাপের বাড়ি। সুনীলও নিশ্চিন্তমনে নিজের সংসার গুছিয়ে বসেছে। বাবার বা বোনের নাম মুখেও আনে না।

একদিন সকালে সুনীল ঘুম থেকে উঠে মুখহাত ধুয়ে এসে দুয়ারে বসে সবে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়েছে কী হঠাৎ কানে এল কারও ডাক— সুনীল কোথায় রে?

চেনা স্বর শুনে অবাক হল সুনীল। উঠে এসে বাইরে তাকিয়েই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল— উঠোনে দাঁড়িয়ে বাবা। চেহারা আগের মতো থাকলেও শরীরে বেশ তরতাজা ভাব। সুনীল হাঁ করে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে, অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘তুমি বেঁচে আছো?”

—হ্যাঁ বেঁচে আছি। তুই কী ভেবেছিলি ? মরে গেছি, তাই না?” সুনীলের মুখে কথা নেই।

সুনীলের বউ সুমতিও বেরিয়ে এসেছিল। অবাক হয়ে বলে উঠল, ‘বাবা, তুমি বেঁচে আছো? তবে যে তোমার ছেলে…।’

—চুপ করো তো। আগে বাবাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে খেতে দাও, বলে তার মুখ বন্ধ করে বাবাকে নিয়ে চট করে ভিতরে ঢুকে গেল সুনীল। বুকটা ধকধক করছিল। উঠোনে মুখ বাড়িয়ে দেখল পাড়ার কেউ দেখেছে কিনা। কাউকে দেখতে না পেয়ে নিশ্চিন্ত হল। সুমতি বাবাকে মাদুর পেতে বসতে দিচ্ছিল।

—চলো, আগে বাবার জন্যে খাবার ব্যবস্থা করো বলে তাকে টেনে ভিতরে নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে সাবধান করে দিয়ে বলল, বাবার শ্রাদ্ধশান্তির কথা একদম বলবে না। পরে বাবাকে সব বুঝিয়ে বলব।

(ক্রমশ…)

জীবন রং-বেরং (পর্ব-০২)

মিহিরের কথা শুনে গাড়ির ব্রেক কষলেন অভিজিৎ। তারপর বললেন, ‘নো প্রবলেম। বরং ভালোই হল। এখানে গাড়িটা ভালো ভাবে, নিশ্চিন্তে পার্ক করা যাবে। শপিং মল-এর পার্কিং খুব বাজে, বেরোতে সময় লেগে যায়। আর এইটুকু তো রাস্তা। আমি আর পৃথা হেঁটে মল-এর দিকে এগোচ্ছি। তুমি গাড়িটা পার্ক করে এসো।”

মিহির গাড়ি পার্ক করতে চলে গেল বস্-এর কথামতো। আর অভিজিৎ এবং পৃথা পাশপাপাশি হাঁটতে শুরু করল। এমন সময় হঠাৎ-ই অভিজিতের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনে কথা যখন শেষ হল, তখন ওরা পৌঁছে গেছে শপিং মল চত্বরে। কথা শেষ করে অভিজিৎ জানালেন পৃথাকে, ‘মুম্বই থেকে আসা আমাদের কলিগরা আর শপিং করতে আসতে পারবে না, কাজে আটকে গেছে। চলো পৃথা, মিহির না আসা পর্যন্ত ওই সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসি।’

এক সময় অভিজিৎ ক্রাশ ছিল পৃথার। তবুও আজ এতদিন পর অভিজিতের পাশে বসতে কেমন যেন একটু বাধো বাধো লাগছে তার। কারণ, সে এখন মিহিরের স্ত্রী, সুখের দাম্পত্য। অবশ্য এসব ভাবনার মধ্যেও সে কখন যেন বসে পড়েছে অভিজিতের পাশে। কয়েক সেকেন্ড দু’জনে চুপচাপ বসে থাকার পর মুখ খুললেন অভিজিৎ— ‘পৃথা, দেখা যখন হয়েই গেল এত বছর পর, আমার জীবনের কিছু না-বলা কথা শেয়ার করতে চাই তোমার সঙ্গে। আজ না বললে আর কোনও দিন হয়তো বলাই হবে না।”

অভিজিতের কথা শুনে পৃথা একটু ঘাবড়ে যায়। আজ এতদিন বাদে অভিজিতের মনের কথা শোনার পর সে যদি নতুন করে অভিজিতের প্রতি কোনও টান অনুভব করে, তাহলে তো মিহিরের সঙ্গে তার মনের দূরত্ব বেড়ে যাবে। কিন্তু অভিজিতের কথা না শুনেও তো উপায় নেই, আফটার অল তিনি তো মিহিরের বস্। বস্ রেগে গেলে কর্মক্ষেত্রে মিহিরের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে যদি মিহির এসে পড়ে? এমনই কিছু ভাবনা যখন ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথার মনে, ঠিক তখনই আবার অভিজিতের ফোনটা বেজে উঠল।

ফোনে কথা বলার পর অভিজিৎ পৃথাকে জানালেন, ‘মিহিরের ফোন। আমাদের এক ক্লায়েন্ট-এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে পার্কিং এরিয়ায়, তাই মিহিরের আসতে একটু সময় লাগবে জানাল।’

মিহিরের দূরভাষ বার্তার পর অভিজিৎ এবং পৃথা দু’জনেই হয়তো একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল। তারপর অভিজিৎ পৃথা-কে বলতে শুরু করলেন, “জানো পৃথা, চার বছর আগে আমি বিয়ে করেছিলাম। আমার স্ত্রীর নাম ছিল বিদিশা। খুব সুন্দরী ছিল। আমি খুব ভালোবাসতাম তাকে।’

—বিদিশা একা থাকত। বলেছিল, ওর মা-বাবা মারা গেছেন। টিউশন করে নিজের এবং ভাইবোনের লেখাপড়া-সহ সমস্ত দায়িত্ব বহন করত বলেই, শুনেছিলাম ওর থেকে। আমাদের এক ক্লায়েন্ট-এর অফিস-এ কাজ পেয়েছিল পরে। ওখানেই ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। ওর দুঃখ-কষ্টের কাহিনি শুনিয়েছিল আলাপ-পরিচয়ের পরে। বিয়ের আগে প্রায়ই আমাকে বলত, ‘অভিজিৎ, আই লাভ ইউ ফ্রম দ্য কোর অফ মাই হার্ট”। শুধু তাই নয়, বিদিশা আমাকে বলেছিল, “এত খেটে, কষ্ট করে আর আমি পারছি না। বিয়ে করে তুমি আমার কষ্ট লাঘব করো প্লিজ।’ ওর এই কথা শোনার পর আমি আর দেরি করিনি। ওকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলাম।”

—বিয়ের আগে বিদিশার সঙ্গে কোর্টশিপ-পর্বে আমার বন্ধুস্থানীয় দু’তিনজন আমাকে বলেছিল, “বিদিশা ভালো মেয়ে নয়, সরে যাও ওর থেকে।’ কিন্তু তখন আমি কারও-র কথা শুনিনি। কারণ, বিদিশাকে খুব বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরই ধীরে ধীরে ওর আসল রূপ দেখাতে শুরু করে দিল। প্রায় দিনই নতুন নতুন পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করে গভীর রাতে মাতাল হয়ে ফিরত। বিরক্ত হয়ে যখন আমি প্রতিবাদ করতে শুরু করলাম, তখন বিদিশা জানিয়েছিল, ‘ওটা ওর পার্সোনাল লাইফ, তাই যা- ইচ্ছে করবে।’ অবস্থা এক সময় এতটাই চরমে উঠেছিল যে, প্রায় দিনই হাত তুলত আমার গায়ে।”

পৃথা অবাক হয়ে শুনে চলেছে তার পুরোনো বন্ধু কিংবা বলা যায় এক সময়ের ভালোলাগা মানুষটার দুঃখের কাহিনি৷ আর অভিজিৎ বলে চলেছিল, ‘বিয়ের মাস পাঁচেক পর একদিন হঠাৎ বিদিশা জানাল, সে মুক্তি চায়, উড়তে চায় বাঁধনহারা হয়ে। আমার কোনও অসম্পূর্ণতা কিংবা অন্যায় না থেকেও, শুধু সম্মান বাঁচানোর তাগিদে, চাহিদা মতো আমার থেকে মোটা টাকা নিয়ে ডিভোর্স দিয়েছিল বিদিশা। পরে জেনেছিলাম, আমি একা নই, আমার আগে প্রতারিত হয়েছিল আরও দু’জন। আমি ছিলাম বিদিশার থার্ড হাজব্যান্ড।’

এবার একটু থামলেন অভিজিৎ। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি একা ছিলাম একাই হয়ে গেলাম। নেশায় ডুবিয়ে রাখলাম নিজেকে৷ সিগারেট আর মদ আমার ‘বন্ধু’ হয়ে উঠল। মনটা শূন্যতা আর হাহাকারে ভরে গেল। কখন যেন আমি আমূল বদলে গেলাম। মেয়েরা সুযোগ নিতে শুরু করল। শূন্যতা কাটানোর জন্য আমি মেয়েদের সঙ্গে ক্লাব-এ, বার-এ, পার্টিতে গিয়ে আকণ্ঠ মদ গিলতে শুরু করলাম আর নেশা চড়ে গেলে আমার গাড়ির ড্রাইভার-এর হাত ধরে বাড়ি এসে শুয়ে পড়তাম। মেয়েরা দু’- একজন আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চাইত, কিন্তু বিদিশার মুখটা ভেসে উঠলেই আমার রাগ চড়ে যেত। সব মেয়ে সমান নয় জেনেও, কেমন যেন বিদিশার মতো মনে হতো সবাইকে। কাউকে টাচ করার ইচ্ছেও এখন হয় না আমার। শুধু একরাশ ঘৃণা জমে আছে মনের মধ্যে। কিন্তু তোমার মুখোমুখি হতেই আমি কেমন যেন সেই পুরোনো ‘আমি’-কে ফিরে পেলাম। তোমার আর মিহিরের সুখী দাম্পত্য জীবন দেখে ভালো লাগছে। কত বিশ্বাসে ভরা তোমাদের দাম্পত্য! এমনই থেকো তোমরা চিরকাল। আজ তোমাদের দেখে কেন জানি না শুধরে যেতে ইচ্ছে করছে, নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করছে।”

পৃথার হঠাৎ চোখ পড়ে অভিজিতের চোখে। তার চোখ তখন জলে টইটম্বুর। অভিজিতের ওই অবস্থা দেখে পৃথা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। মনের একটা স্তর বলছে, অভিজিতের মাথাটা ধরে নিজের কাঁধে রাখতে। আবার মনের অন্য স্তর মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে মিহিরের বিশ্বাস, মিহিরের ভালোবাসা, মিহিরের স্ত্রী। তাই পৃথা আবেগ কাটিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘তোমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা খুব বেদনাদায়ক। আমার খুব খারাপ লাগছে তোমার জন্য। কিন্তু এখন কী-ই বা করতে পারি আমি? বড়োজোর তোমার ভালো বন্ধু হতে পারি। তোমার যখন মন চাইবে ফোন করবে নির্দ্বিধায়। মিহির আমার হাজব্যান্ড হলেও, খুব ভালো বন্ধু। ওকে আমি সময়মতো সব বুঝিয়ে বলব। আই অ্যাম শিওর, মিহির আমাকে সাপোর্ট করবে। আশা করি, অফিসে তুমি ওর বস্ হলেও, বাইরে মিহির তোমার ভালো বন্ধু হয়ে উঠবে। প্লিজ তুমি অবসর সময়ে আঁকায় মনোনিবেশ করো আবার। তোমার দুঃখ- যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলো ক্যানভাসে, প্লিজ…।’

(ক্রমশ…)

মোনালিসার বিয়ে (শেষ পর্ব)

মোনা শোওয়ার ঘরে খাটের উপর পা ছড়িয়ে বসেছিল। কাপড় চোপড় ঈষৎ অবিন্যস্ত। শরীরে তার যৌবনের ঢেউ। তাকে দেখে সুখেনের শরীরে উত্তেজনা খেলা করে উঠল। কিন্তু তার দুঃখের পারদ সমস্ত সীমা ছাপিয়ে গেল, যখন ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই মোনা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে টাকলু কোথায় গেছিলি?’

মোনার কথায় সে কোনও উত্তর দিতে পারল না। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে এল ছাদে। সময়ে অসময়ে আর কেউ তার পাশে না থাকলেও এই ছাদ সবসময় তার পাশে থেকেছে। এই ছাদে দাঁড়িয়েই সে আকাশ চিনেছে। জীবনের প্রথম প্রেম ভেঙে যাওয়ার কষ্ট ভুলেছে। দেবিকা যেদিন তাকে ছেড়ে, সৌম্যকে বিয়ে করে মুম্বই নিবাসী হয়েছিল, সেদিনও সুখেন এই ছাদে এসে কেঁদেছিল। এই ছাদ তাকে সেদিনও ফেরায়নি। এর বুকে বসেই ধীরে ধীরে সুখেন জীবনের লড়াইয়ে ফিরেছে। সরকারি চাকরি জোগাড় করেছে। মোনাকে দেখে সে আবার ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু তার ভালোবাসার পথে যে তার টাক আর নাম বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

সেদিন অনেক রাতে সুখেন ছাদ থেকে নামল এবং বাড়িতে জানিয়ে দিল এখন ক’টা দিন সে মোনার সঙ্গে এক ঘরে থাকবে না। পাশের ঘরে থাকবে। সুখেনের মা একটু আপত্তি করেছিলেন। তবে মোনার আচরণের কথা চিন্তা করে নিজেই চুপ করে গেলেন।

কয়েকদিনের মধ্যেই সুখেনের বাড়িশুদ্ধ সকলে মোনার পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ল। অষ্টমঙ্গলায় যাওয়া আর হল না। দিনকে দিন মোনালিসার দৌরাত্ম্য বেড়েই চলল। সে কখনও বাড়ির পেয়ারা গাছে উঠে বসে থাকে, কখনও রান্নাঘরে ঢুকে জিনিসপত্র বাসনকোসন ছুঁড়ে ফেলে, কখনও বা যাকে তাকে যা তা বলে। যুবতী মেয়ে, তার গায়ে হাত দিতে ছেলেরা ভয় পায়। আর বাড়ির মেয়েরা তার সঙ্গে গায়ের জোরে পারে না। থাকার মধ্যে সুখেন। কিন্তু সে বেচারা এমন ভালো মানুষ যে, সে বউকে কিছুই বলতে পারে না। ফলে মোনালিসাকে থামানো অসম্ভব হয়ে পড়ল।

শেষে একদিন বাড়িতে মোনালিসাকে দেখতে সাইকিয়াট্রিস্ট এলেন। মোনাকে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করে খসখস করে গোটা তিনেক ওষুধ লিখে দিলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “ও কিছু নয়। ক’দিন ওষুধ খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

বাপেরবাড়িতে মাধবী বলে একটি মেয়ে মোনার দেখাশোনা করত। তাকে ডেকে আনা হল। তার উপর ভার পড়ল মোনাকে ওষুধ খাওয়ানোর। এভাবে আরও কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু মোনালিসার উপদ্রব কিছুমাত্র কমল না। তার শোওয়ার ঘরের পিছনের আগাছা ভরা মাঠ না-খাওয়া ওষুধের মোড়কে ভরে গেল। সমস্যা কমা দূরে থাক আরও বেড়ে চলল। কয়েকদিন পর সুখেনের মা তাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠাল। ‘বাবা আর তো পারি না। ওই মেয়ে কাল আমাকে এমন ধাক্কা দিয়েছে যে, আরেকটু হলেই আমি পড়ে যাচ্ছিলাম। এই বয়সে পড়ে গেলে কি আর আমার শরীর থাকবে? তুই বাবা এবার কিছু কর।’

অবশেষে একদিন মোনালিসা মাধবীকে নিয়ে বাপেরবাড়ি চলে গেল। বুকে পাথর রেখে, সুখেন বাধ্য হল তার পছন্দ করে বিয়ে করা সুন্দরী বউকে বাপেরবাড়ি রেখে আসতে।

প্রথম প্রেমের পর তার দ্বিতীয় প্রেমও আকাশের গায়ে বিলীয়মান হতে চলল। সুখেনের ভালোবাসা মোনালিসার পাগলামির নীচে চাপা পড়ল।

মোনা যেদিন বাপেরবাড়ি ফিরে এল তার বাবা সেদিন মুখে ভাত তুললেন না। বউদি দেখে ঠোঁট বেঁকাল। মা দু-একবার ফুঁপিয়ে চুপ করে গেলেন। কিন্তু মোনালিসা যেন এই সবকিছুর থেকে বহুদূরে। কোনওদিকেই তার ভ্রূক্ষেপ নেই। সে জানলা দিয়ে গাছের পাতার নাচ দেখে। পাখির ডাক শোনে। পূর্ণিমার রাতে আকাশের গোল থালার মতো চাঁদ দেখে ফিকফিক করে হাসে। কেউ তাকে কিছু বলতে গেলে তেড়ে মারতে যায়। ননদের রকমসকম দ্যাখে তার বউদি। তারপর রাতে বর বাড়ি এলে বরের কাছে ফিসফিস করে অনুযোগ করে।

—তোমার বোন তো পুরো পাগল হয়ে গেছে গো। এই পাগলামি তোমাদের বংশগত নয় তো? তুমি আবার কোনওদিন এমন হয়ে যাবে না তো? ও মাগো! তখন আমি কোথায় যাব?

তার কথায় তার স্বামী চিন্তিত হয়। তবে মুখে হো হো করে হেসে উঠে, বউকে জোর করে কাছে টেনে নেয়। দিন গড়িয়ে চলে।

ওদিকে হীরক এতদিন সবকিছু থেকে মুখ লুকিয়ে ছিল। তার শুধু ভয় এই বুঝি সুখেন এসে ঘটকালির টাকা ফেরত চায়। কয়েকদিন বাদে তার কানে দুটো খবর এল। এক, মোনালিসা বাপের বাড়ি ফিরে এসেছে। দুই, সুখেন ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়েছে। খবরটা তাকে দিল তার এক বন্ধু তোতন। তোতন হীরকের বহুদিনের সাথী। সে হীরককে আশ্বস্ত করল, সুখেনকে সে যেটুকু চিনেছে তাতে তার মনে হয়েছে যে, সুখেন ঘটকালির টাকা আর ফেরত চাইবে না।

এর কয়েকদিন পর হীরক মনে একটু সাহস সঞ্চয় করল। মোনাকে একটু দেখে আসা দরকার। সে পায়ে পায়ে মোনালিসার বাড়িতে হাজির হল। গোটা বাড়ি থমথম করছে। হীরককে দেখে কেউ কথা বলল না। তাদের ভাব এমন যে, মোনার পাগলামির জন্য যেন হীরক দায়ী। বেগতিক বুঝে হীরক চলে আসছিল। ঠিক তখনই মোনালিসার মুখোমুখি। মোনালিসা যেন সেই একই আছে। হীরককে দেখেই সে একটা চ্যালাকাঠ হাতে তাড়া করে এল।

—এই শয়তানটাই আমাকে ওই টাকলু সুখেনের সঙ্গে ভিড়িয়েছিল।

তাকে আটকায় কার সাধ্যি।

তার তাড়া খেয়ে হীরক আর দাঁড়াল না। সোজা পিছন ঘুরে দৌড়ল। দৌড়তে দৌড়তে দু’বার আছাড় খেল। উঠল আবার দৌড়ল৷ মোনালিসা তখন সমানে পিছনে তাড়া করে আসছে।

দৌড়তে দৌড়তে হীরক একটা মজে যাওয়া পুকুরের সামনে এসে পড়ল। এরপর যাওয়ার রাস্তা নেই। যেতে গেলে পুকুর পার হতে হবে। হীরক সাঁতার জানে না। অতএব তার সে ক্ষমতা নেই। সে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। মোনালিসা ততক্ষণে কাছে এসে পড়েছে। এই পুকুরের পাড়ে তাদের অনেক স্মৃতি। সে হীরকের কলার চেপে ধরল।

—তোমার জন্য পাগল সেজে বিয়ে ভাঙতে গিয়ে কী কাণ্ডটা করতে হল। এবার কবে বিয়ে করবে বলো?

—পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হোক তারপর।

হীরক আলতো করে ছোটোবেলার প্রেমিকার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।

(সমাপ্ত)

ইচ্ছাপূরণ (শেষ পর্ব)

মিনু আপন মনে কাজ করে। গল্প করে পাড়ার। ওর বিধবা জীবনের। কিন্তু সুরাহা পেল না দিয়া। আজ অবধি এরকম হয়নি। তবে কি মস্তিষ্কের বিকৃতি সত্যিই! মিনু ঘুমায় রাতে। শীত করে, আবার দিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটা… কাঁদে। চিৎকার করে। কান চেপে থাকে দিয়া। কেউ বিশ্বাস করছে না। ও বিশ্বাস করাতেও পারছে না। দাঁতে দাঁত চেপে সইতে থাকে মানসিক ভ্রম থেকে নির্গত এই অশরীরীর যন্ত্রণা। কখনও সখনও থাকতে না পেরে দিয়া নিজেই চিৎকার করে। মানব ডাক্তার দেখিয়েছে। ডাক্তার একপাতা ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছে। সাফ জানিয়েছে, এগুলো ভৌতিক ব্যাপার নয়। নার্ভ ফাংশন ডিসটার্ব করছে। এখন যেন একটু কাছে কাছে থাকে মানব।

মিনুর পাল্লায় পড়ে তিনটে গোল্ড মেডেলিস্ট তান্ত্রিকও ঘোরা হয়ে গেছে। ঘরে ধুনো ঝাঁটা লেবু লংকা, যাগযজ্ঞ সব করিয়েছে মানব। হাতে হরেকরকম আকারের তাবিজও পরেছে। এই জল, সেই জল, কত জল খেয়েছে! নিয়ম মেনে পুজো জপ সব করেছে। তারপরও শীত করছে দিয়ার। এখনও কাঁদছে মেয়েটা। কাঁদতে কাঁদতে ক্রমশ এগিয়ে আসে। মাছিগুলো সারাক্ষণ ভনভন করছে! গায়ে এসে বসছে দিয়ার। দিয়া চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল, “কী চাই তোমার? আমার সঙ্গে তোমার কী শত্রুতা?”

—সংসাআআআআর! হাড় হিম করা দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস বেরিয়ে আসে মেয়েটার পচনযুক্ত মুখ থেকে।

—আমার সংসার কেন চাও? মাছি তাড়াতে তাড়াতে প্রশ্ন করে দিয়া।

মানবের কাছে সরে সরে যায় মেয়েটা। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদে। সেই বিশ্রী কান্না। তারপর বলে, ‘সানন্দা!”

চোয়াল শক্ত করে বসে থাকে দিয়া। ভোর অবধি। মানব ঘুম থেকে উঠে হাই তোলে। কৃত্রিম ভাবে জিজ্ঞেস করে, “কী হল? সারারাত তোমার ঘুম হয়নি নাকি?”

—সানন্দাকে চেনো?

কথা আটকায় মানবের।

—কে সানন্দা? আমি চিনি না।

সারারাত তোমার পাশে বসে চিৎকার করে কেঁদেছে।

—আবার শুরু করেছ? এত কিছু করেও শান্তি পাওনি?

—হয় জানাও সানন্দা কে, না হয় আমি সুইসাইড করব। আমি আর পারছি না মানব। আমার জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। কিচ্ছু হবে না এই হাজাররকম পুজো তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে।

ঢোক গেলে মানব। বুঝতে পারে না কীভাবে কী বলবে। কীভাবে শুরু করবে! সানন্দার সঙ্গে পরিচয় গড়িয়াহাট বাজারে। ভিড়ে সঙ্গীরা হারিয়ে গিয়েছিল। সানন্দার কাছে ফোন ছিল না। মানবের কাছে ফোন চেয়ে ফোন করেছিল বন্ধুদের। তারপর একদিন ফেসবুকে যোগাযোগ। ভালোলাগা। ভালোবাসা। তারপর উলের কাঁটায় বুনতে শুরু করা একে অপরের সঙ্গে ঘর করার স্বপ্ন। বেকার মানবের সঙ্গে বিয়েতে নারাজ ছিল সানন্দার পরিবার। খুব কষ্টে, অনেক অত্যাচার সহ্য করে মুখ বুজে ছিল সানন্দা। শুধু অপেক্ষা একটা চাকরির। ঘর থেকে হাত খরচটুকুও বন্ধ করে দিয়েছিল সানন্দার। অত্যাচার বাড়ছিল দিনকে দিন। ঠিকমতো খেতে দিত না। আটকে রাখত সারাদিন চার দেয়াল মোড়া ঘরে। প্রতিষ্ঠিত ঘরের ছেলের সঙ্গে বিয়েতে নারাজ ছিল তবু সানন্দা।

একসঙ্গে রাস্তার বামপাশে সানন্দাকে রেখে হাঁটার সময়, অনেকটা বিশ্বাস নিয়ে মানব জানতে চাইত, কতদিন এভাবে চলবে? একগাল হেসে সানন্দা বলত, তোমার একটা কাজের অপেক্ষা। কাজ পেলেই ছুটে আগে আমার কাছে আসবে। আমি তোমার সঙ্গে বেরিয়ে যাব সেদিনই। তারপর তো আর কষ্ট নেই! সম্ভব হয়নি আর। মাত্রা পেরিয়ে গেল অবশেষে। তর্ক করলে বেধড়ক মারত পরিবারের সম্মান রক্ষণীয় ব্যক্তিরা। যোগাযোগটাও বন্ধ করে দেওয়া হয় পরিবার থেকে। তিনমাস পর চাকরিটা পেয়েই ছুটে এসেছিল জ্ঞানশূন্য হয়ে মানব। কিন্তু এসে খবর পেয়েছিল, সুইসাইড করেছে দু-সপ্তাহ আগে।

সুইসাইড নোটে লিখে গিয়েছিল, ওর সাধের বাড়ি কোথায় হবে? কেমন হবে… তাতে সদর দরজা কোনমুখী হবে… ঘরে কেমন পর্দা বসবে… সোফা সেট আসবে! বেডরুমে কী রং হবে ইত্যাদি সব। এক কথায় জলজ্যান্ত স্বপ্ন বুনেছিল ওর সাধের বাড়ির। বাড়ির লোকেরা বেশি কথা বলেনি। অচিরেই বিদায় করেছে মানবকে, অজ্ঞাত ব্যক্তির মতো।

মানব সেইভাবেই বাড়ি বানিয়েছে। দিনযাপনের মধ্যে দিয়েই, জীবন কাটছিল মানবের। দীর্ঘ চারটে বছরে নিঃসঙ্গতার চরম শিকার হয়ে গিয়েছিল মানব। তারপরই দিয়ার সঙ্গে পরিচয় ডাক্তারের চেম্বারে। প্রায় যেতে হতো, মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে। সেখানেই ওদের মধ্যে আলাপ পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। মানুষের জীবন একাকীত্বকে সবচেয়ে বেশি চায়। অথচ সবচেয়ে বেশি ভয়ও পায়। কেউ একজন বিশ্বাস দেখিয়ে হাত বাড়ালে, এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।

কথাগুলো নিজের মতো কীভাবে বলে দিল মানব দিয়াকে, জ্ঞানই ছিল না। যেন, যত বেশি বলছিল, তত বেশি বুকের ভিতরটা হালকা হচ্ছিল।

দিয়া ঢোক গেলে। সানন্দা জোঁকের মতো আঁকড়ে ধরেছে ওর প্রিয় ঘর, প্রেম, আর সংসারকে। এর থেকে নিস্তার নেই! কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছিল।

—দিয়া? যাবে একবার সেই তান্ত্রিকটার কাছে? যদি সত্যি ও অশরীরী হয়, সেটা আমাদের এখুনি কোনও ব্যবস্থা নিতে হবে। চুপচাপ বেরিয়ে চলে যায় দিয়া। গা ছমছম করে ওর। এই হয়তো পর্দার ফাঁকে মাছি উড়বে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকবে। রান্না ঘরে ঢুকে মুখে চোখে জল দেয়। আবার মাছির ভনভন শব্দ কানের কাছে। মানে সানন্দা পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। চোখে চোখ পড়লেই চিৎকার করে কাঁদবে।

—চা করবে না?

একি! এ তো মানব। তাহলে মাছির শব্দটা এল কেন?

—করছি।

মানব বেরিয়ে গেল নিস্তব্ধ ভাবে।

—মানব? কোথায় যাচ্ছ? ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?

মানব ছাদে ওঠে। বহুবছরের ভাঙা টবগুলোর দিকে ইশারা করে বলে, ‘ফুল লাগাও না কেন দিয়া ?” দিয়া কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। ফুল বিশেষ দিয়া পছন্দ করে না। তাই লাগায়নি কোনওদিন। এসবে ন্যাক নেই মানবেরও।

দিয়াকে নীচ থেকে ডাকে মানব। এতক্ষণে দিয়া বোঝে, ছাদে যে-মানব সে আসলে অশরীরী নয়, সশরীরী সানন্দা। সূর্যের আলোতে আর দেখতে পাওয়া যায়নি তারপর থেকে সানন্দাকে।

ওর মনের মতো ছাদ সাজায়নি মানব। দিয়া নিজের হাতে বাজার থেকে চারা এনে নানা রং-এর ফুলগাছ লাগিয়েছে। নিজের হাতে সার দিয়েছে। জল দিয়েছে। প্রতি সকালে এসে ছাদের দরজা খুলে দাঁড়ায় দিয়া। ফুলগাছগুলোতে ছড়িয়ে থাকে অজস্র মাছি। প্রজাপতি আসে না, আসে না মৌমাছিও। এতটুকু স্বপ্ন তো একটা অশরীরীর পূরণ করা যেতেই পারে। প্রত্যেকটা শরীরেই বিরাজ করছে একটা অশরীরী। দেহ ছাড়তে বাধ্য হলেও, মায়া ছাড়তে পারে না সবাই। এখন প্রশ্ন একটা জায়গাতেই এসে নাড়া দেয় দিয়াকে…

সানন্দার কথা বহুদিন আগে শুনেছিল একবার মানবের এক বন্ধুর মুখ থেকে। তাহলে কি অবচেতন মনের জিজ্ঞাসা থেকেই একটা ভ্রম সৃষ্টি হয়েছিল সানন্দা নামক অস্পষ্টতা নিয়ে? ডাক্তার তো তাই বলেছিল! মানসিক ভ্রম। নাকি সত্যি সানন্দা চেয়েছিল ওর শেষ ইচ্ছেটুকু দিয়ার হাতেই পূর্ণ হোক।

ভাবতে ভাবতেই একটা মাছি উড়ে এসে হাতে বসল দিয়ার! কোনও দুর্গন্ধ নেই, আর ভন ভনও করে না। শুধু নিঃশব্দে উড়ে আসে, আবার একই ভাবে উড়ে যায়…।

(সমাপ্ত)

সে এবং একটি ফানুস (পর্ব-০৪)

গান মাঝপথে থামিয়ে কথা চালানোর বাউল অভ্যাসে জীবনকৃষ্ণ বললেন, “বুঝলেন না বাবাজি, যে আগুনের জ্বালায় আপনি এই অজানা পথ পাড়ি দেছেন, আমিও চলতিছি। তেমনি করে আগুনের জ্বালায় সেথায় আরও বাউল-ফকিররা জড়ো হয়। এখানে তাঁর হেকমতিতে যে অনেক মানুষ নিজের অনেক না পাওয়া পেয়ে যায়।”

ননীগোপালের মেজাজ ফুরফুরে হয়েছে। খোলামেলা হয়েছে মন। সে বলল, ‘গোঁসাই, আমিও যে হারানিধির খোঁজে চলেছি সেখানে। শুনেছি ঘন কালো রাতে গৌরাঙ্গের খেলায় কত না বোষ্টম তার প্রাণের বোষ্টমীকে খুঁজে পায়। শুনেছি সেখানে এক ফানুস চলাচল করে। যে খোঁজে মনের মানুষ সেই শুধু ফানুস দেখতে পায়। ফানুস যে জায়গায় আকাশে দাঁড়ায়ে পড়ে, ঠিক সেখানেই মেলে তার পরম রতন।’ জীবনকৃষ্ণ হইহই করে ওঠেন।

—ঠিক শুনেছেন। তবে মনে হচ্ছে বাবাজির কোনও যাতনা আছে। যাতনা ধরে রাখতে নেই গো। তারে হাওয়ায় ভাসাতি হয়, নদীতে ভাসাতি হয়। বলতি হয়, যা যা দূর হ। নালে যে সারাজীবন বোঝা বইতে হয় গো। আরে দেখেন, আমি সেয়ানা পাগলের মতো কতিছি। আমিও তো বয়ে চলেছি। নাহলি সেথায় যাবই বা কেন! সেখানে যত বোষ্টম যায়, বাউল- ফকির যায় সক্কলেই তো বোঝা খালি করতে যায়। অমাবস্যায় চাঁদের উদয়।

ননীগোপাল এখানকার বারুণী উৎসবে আগে কখনও আসেনি। তার অল্প জানা। সে জানতে চায়। বলে, ‘বলেন তো গোঁসাই, আর এট্টুস বলেন। এখানকার মহিমা বলেন। অমাবস্যায় চাঁদের উদয় বলেন।”

—বাউল সাধনায় চাঁদ হল শুক্র। তার উদয়। সে তো যখন তখন যেখানে সেখানে উদয় হতি পারে। কিন্তু সাধকের কাছে যখন তখনের কোনও মূল্য নেই। গুরু ধরবার জন্য চাই যোগ। বাবাজি বাউলের কাছে বড়ো বস্তু হল গুরু। গুরু মানে নারী। —এ কী কচ্ছেন! এমন কথা তো আগে শুনি নাই।

—বাবাজি, দীনদয়ালের ঘরের করণকৌশল আর সহজিয়াদের থেকে খানিক আলাদা। সেখানে সব গুপ্ত সাধনা। মাটির কার্য, নালের কার্য, করোয়া সাধন— কত কী আছে!

ননীগোপাল এত কথার মানুষ নয়। কিন্তু তার ভিতরের আগল যেন খুলে গেছে এই সময়। সে বলল, “কিন্তু গোঁসাই আমরাও তো সহজিয়া। পাটুলি স্রোত।’

—শুনুন বাবাজি, এই জগতে সত্য হল নারীদেহ। নারীর কাছ থেকে সংকেত নিয়ে তবে সাঁতার দিয়ে রত্ন সন্ধানে যেতি হয়। তার দশমীদ্বারে লুকোয়ে থাকে মহারত্ন। পদ্ধতি জেনে তলাতল পাতাল থেকে সে মহারত্ন উদ্ধার করতি হয়। আমাদের সাহেবধনীদের গাথক কুবির গোঁসাইয়ের গান শোনেননি! ওই যে….

জীবনকৃষ্ণের গুবগুবি আর দোতারায় আবার সুর উঠল। জীবনকৃষ্ণ গান ধরলেন, ‘ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন।/ তলাতল পাতালে খুঁজলে পাবি রে প্রেমরত্নধন।’

ননীগোপাল ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘এই গান তো শুনেছি। কিন্তু তার যে এত তল জানতে পারিনি।”

—বাবাজি, সেই রত্নধন খুঁজতেই তো দীনদয়ালের খেলায় এত পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের এই মধুকৃষ্ণা তিথির পুণ্য ওঠাতে এখানে আসা। সব সময় মনে রাখবেন আলগা স্রোতে ডুবে মরলে মানুষ জীবন নষ্ট হয়ে গেল। ডুব মারতে হবে অতলে। আর সেই ডুব মারার মহাযোগ হল অমাবস্যা। নারীদেহের বাঁকে মাসে মাসে বন্যা আসে। আসে ঋতুকাল। এই বাঁকানদীর বন্যায় মহাযোগে ভেসে আসে মহামীন অধরমানুষ। তাকে ধরতে জানতে হয়। তার সঙ্গে মিলনে অটল হতে হয়। তবেই তো গুরুপ্রাপ্তি। আজ এই মধুকৃষ্ণা তিথিতে দলে দলে ঋতুময় বোষ্টমীরা আসবে। তাদের সাথে মিলিত হবে সাধক বাউল।

পথের ধুলোয় রং লেগেছে কিছুকাল হল। মানে সন্ধ্যা নামছে। দুই বাউল-বৈরাগীর পা উঠছে, পড়ছে। পথ ফুরোচ্ছে না। খালি মুখে পথ চলার বেজায় দায়। জীবনকৃষ্ণ দায়িত্ব নিয়ে পথের নির্জনতা নষ্ট করে চলেছেন। একসময় বললেন, ‘বাবাজির গোপন কথা তো শোনা হল না। যদি মন চায় বাবাজি, কতি পারেন। বাবাজির কি বাঁকা নদীর পিছল ঘাটে নাওয়া হয়েছিল?”

ননীগোপাল তখন এক অলীক ভাবনার ঘোরে। তার চোখ আকাশের দিকে। সেখানে সন্ধ্যাতারা সহ আরও দু’একটি মিটিমিটি ফুটে গেছে। তার লক্ষ্য তো তারা দেখা নয়। সে দেখতে চায় একটি ফানুস। সেই ফানুস যদি তার চোখে পড়ে আর সে সেই ফানুসের নীচে গিয়ে দাঁড়াতে পারে তবে তো কৰ্ম্ম ফতে। তার হারিয়ে যাওয়া পরমকে ফিরে পাবে আজ।

—বাবাজি, আজ মধুকৃষ্ণা তিথি। যাকে বলে বসন্ত মুচমুচে এই তিথি। চৈত্র মাসের কৃষ্ণা তিথি। মানুষের মনের ভিতর বসন্ত উপচে ওঠে গো৷ যতই কাছাকাছি পৌঁছোবে তিথি ততই আপনার ভিতরে দীনদয়ালের খেলায় প্রেম ডগমগ করে উঠবে। এট্টুস পথশ্রম হচ্ছে বটে তবে সব পুষিয়ে দেবেন দীনদয়াল।

(ক্রমশ…)

আবেগী মন (পর্ব-০২)

ফাজিল হেসে বেরিয়ে গেল শুভ্রা। মানব চেয়ারে গা এলিয়ে কয়েক সেকেন্ড হাসিমুখে থাকার পর, শুভ্রার রেখে যাওয়া ফাইলটা নিয়ে কাজ করতে শুরু করে দিল।

আসলে শুভ্রা এবং মানবের এই সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা মাত্র দু’বছরের। এর আগে অফিসের অন্য ব্রাঞ্চ-এ ছিল শুভ্রা। কিন্তু পার্কস্ট্রিট-এর এই ব্রাঞ্চ-এ আসার পর থেকে কাজের সূত্রে প্রতিদিন দু’তিনবার মুখোমুখি হতে হয় মানবকে। আর কাজের ফাঁকেই দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা এবং টুকটাক রসিকতা চলতেই থাকে। এভাবেই কখন যেন মনের কোণে একে অন্যের প্রতি হালকা দুর্বলতা তৈরি হয়ে গেছে। এখন কাজের অবসরে মাঝেমধ্যে পরস্পরের মুখোমুখি হলে ভালোই লাগে উভয়ের। হয়তো এর পিছনে মানসিক খিদেও থাকতে পারে! কারণ মানবের বউ সুমিতার যেমন স্বামী ছাড়াও অন্য নিজস্ব জগৎ রয়েছে, ঠিক তেমনই শুভ্রার বর বিপ্লবও তেমন বউ-ভক্ত নয়। হয়তো দু’জনের লাইফ পার্টনার-এর প্রতি মানসিক দূরত্ব বেড়েছে এই কারণেই।

যাইহোক মানব এবং শুভ্রা দুজনে জমিয়ে লাঞ্চ করে এসেছে একটা বড়ো রেস্তোরাঁ থেকে। তাই দুজনের মেজাজ বেশ ফুরফুরে ছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু বাড়ি গিয়ে অপছন্দের আচার অনুষ্ঠান পালন করতে হবে ভেবে, মানবের থেকে বেশি মন খারাপ হয়ে গেল শুভ্রার। তাই বিষণ্ন মনে বাড়ি ফিরল দু’জনে।

মানব এবং শুভ্রা যে-যার বাড়ি পৌঁছোনোর পর দু’রকম ঘটনা ঘটল।

বাড়ি পৌঁছে মানব দেখল, প্রতিবেশী মেয়ে-বউদের সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে হইহই করছে সুমিতা। ঘরভর্তি এতজনকে দেখে খুব রাগ হল মানবের। কারণ সে চায় একটু নিরিবিলি পরিবেশ। নিজের পরিবারের সদস্যরা হইহুল্লোড় করলে তার খারাপ লাগে না কিন্তু তাই বলে পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে হুল্লোড় করে বাড়ি মাথায় তুলবে, এ যেন তার সহ্য হয় না। তাই বেডরুমে ঢুকে মন খারাপ করে শুয়ে পড়ল মানব। এরপর যখন বাড়ি খালি হল তখন মানবের মনখারাপ কাটাতে গিয়ে চোখের জল ঝরাতে হয়েছিল সুমিতাকে।

অন্যদিকে, উপোস আছে এমন ভান করে শুভ্রা বর এবং শাশুড়িকে নিয়ে দ্রুত সমস্ত নিয়মনিষ্ঠা পালন করে শিবের ব্রত শেষ করল। তারপর ওর পাঁচ বছরের মেয়েকে খাইয়ে ঘুম পাড়াল। নিজেও রাতের খাবার জমিয়ে খেলো বরের সঙ্গে বসে। শুভ্রার মধ্যে এমন পরিবর্তন দেখে বিপ্লব বেশ খুশি হল। সে বুঝতেই পারল না শুভ্রার অন্তরের আসল ইচ্ছেটা। শুভ্রা যে এইসব উপোস, ভক্তি ইত্যাদিকে সংস্কার নয়, কুসংস্কার হিসাবেই দ্যাখে, তা অনেকবার বর কিংবা শাশুড়িকে বুঝিয়েও যখন কাজ হয়নি তখন সে সবকিছু মেনে নেওয়ার অভিনয় করে গেল নীরবে। আর আপাত ভাবে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও, বিপ্লবের সঙ্গে শুভ্রার মনের দূরত্বটাও নীরবে বেড়ে চলল প্রতিদিন। শুভ্রার প্রতি মুহূর্তে মনে হতে লাগল, যাকে সে একসময় ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, সেই বিপ্লবই তার পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিল না, চাপিয়ে দিল তার নিজের সিদ্ধান্তকে। আর ঠিক তখনই তার আরও আপনজন মনে হতে থাকল মানবকে। অন্তত তার সঙ্গে মতের মিল আছে মানবের, মানব তাকে সঠিক ভাবে বোঝে, তার ইচ্ছেকে মর্যাদা দেয়— এটাই অনেক বড়ো পাওয়া হয়ে উঠল শুভ্রার কাছে।

মানবও যেন সুমিতার অতি সামাজিক হয়ে ওঠা, ধর্মকর্মের বাড়বাড়ন্ত আর সহ্য করতে পারছিল না। ধীরে ধীরে ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও দূরত্ব বাড়তে শুরু করল। মানবও তখন প্রকৃত বন্ধু, মনের মানুষ ভাবতে শুরু করল সহকর্মী শুভ্রাকে। আর তাই সময় যত এগোতে লাগল, মানবের সঙ্গে শুভ্রার ওঠাবসা, সময় কাটানো বাড়তে শুরু করল ততই। এভাবেই দিন, মাস পেরিয়ে এগিয়ে এল আরও এক শিবরাত্রির দিন। মানব এবং শুভ্রাও তাদের সম্পর্ককে আর নিছক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইল না। সংসারের মোহ কাটিয়ে এক অন্যরকম তৃপ্তির স্বাদ অনুভবের পরিকল্পনা করল।

পরিকল্পনা মাফিক ওরা দুই পরিবার শিবরাত্রির আগেই একদিন মিলিত হয়ে আলাপ পরিচয় করাল যে যার লাইফ পার্টনার-এর সঙ্গে। এর ফলে বেশ একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠল দুই পরিবারের মধ্যে। মানবের স্ত্রী সুমিতা এবং শুভ্রার বর বিপ্লব জানাল যে, মানব এবং শুভ্রার মধ্যে সহকর্মী হিসাবে ভালো সম্পর্ক আছে, তাই ওরা পারিবারিক আড্ডা জমাল।

যাইহোক প্রথম দিনের হইহুল্লোড় এবং ভুরিভোজের পর সবাই মিলে আবার গেট টুগেদারের পরিকল্পনা করল। শুভ্রা জানাল, “শোনো আগামী শিবরাত্রির দিন আমরা সবাই কারও একজনের বাড়িতে একসঙ্গে উৎসব পালন করব, খুব মজা হবে।’

শুভ্রার প্রস্তাব শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হল ওর বর বিপ্লব। কারণ বিপ্লব ভাবল, শুভ্রা খুব বদলে গেছে, আগের মতো আর ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বিরক্ত হচ্ছে না, পরিবর্তে নিজেই প্রস্তাব দিচ্ছে। তাই অত্যন্ত খুশি হয়ে বিপ্লব জানাল, ‘তাহলে আমাদের বাড়িতেই সবাই মিলে মজা করব।’

—না না, এবারটা আমাদের বাড়িতে হোক। পরের বার না হয় আপনাদের বাড়িতে হবে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাল মানবের স্ত্রী সুমিতা।

কার বাড়িতে সবাই মিলিত হবে শিবরাত্রির দিন, সেই নিয়ে দড়ি টানাটানি চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল, এবারটা বিপ্লব- শুভ্রার বাড়িতেই হবে হইহই। সেইসঙ্গে এ-ও ফাইনাল হল যে, মানবের স্ত্রী, সন্তান, মা, বাবা সবাই সকাল থেকে বিপ্লবদের বাড়িতে থাকবে। আর মানব, শুভ্রা এবং বিপ্লব যদি ছুটি না নিতে পারে, তাহলে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে হইহুল্লোড়ে যোগ দেবে। ওদের অনুপস্থিতিতে বিপ্লবের মা-বাবা ওদের ছোট্ট নাতনিকে নিয়ে সুমিতাদের সঙ্গ দেবেন এও জানাল বিপ্লব।

(ক্রমশ……)

আবেগী মন (পর্ব-০১)

কসবা অঞ্চলে মানবদের যেখানে বাড়ি, সেই পাড়াটা বেশ পুরোনো। কোনও বহুতল নেই, সকলেরই প্রায় নিজের বাড়ি। বেশ একটা পাড়া পাড়া কালচার। সবাই সবাইকে চেনে, উৎসব অনুষ্ঠানে হইহুল্লোড়ও করে একসঙ্গে। মানবের স্ত্রী সুমিতাও শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় নিজেকে বেশ মিলিয়ে, মিশিয়ে নিয়েছে। শিবরাত্রি থেকে শুরু করে দুর্গোৎসব— সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও পাড়ার বউ-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে উদযাপন করতে বেশি পছন্দ করে।

এবারও সুমিতা ঠিক করেছে, শিবরাত্রির দিন উপোস করে, পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে গিয়ে একসঙ্গে শিবের মাথায় জল ঢালবে। তাই সে খুব ভোরবেলা উঠে স্নান করে নেওয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছে মনে মনে।

মানবদের দোতলা বাড়িটার নীচতলায় থাকেন ওর মা-বাবা। মানব-সুমিতার পাঁচ বছরের ছেলে টুবাইও রাতে দাদু-ঠাকুমার সঙ্গে শোয়। আর তাই দোতলার শোওয়ার ঘরে মানব এবং সুমিতা পরস্পরকে অনেকটা সময় পায় একান্তে। কিন্তু শিবরাত্রির দিন ভোরবেলা মানব শারীরিক ভাবে সুমিতাতে চাইলেও, তার সে ইচ্ছে আর পূরণ হল না। কারণ নিজেকে মানবের বাহুমুক্ত করে, বিছানা থেকে নেমে গেল সুমিতা। মানব তা বুঝতে পেরে ঘুম জড়ানো গলায় বলল— এ্যাই কী হল? কোথায় যাচ্ছ? শোনো, একটু এসো এদিকে।

—উহুঁ, তোমার মতলব আমি বুঝে গেছি। আজ ওসব হবে না। আজ আমার উপোস।

সুমিতার প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর ‘ধ্যাত’ বলে পাশবালিশটা জড়িয়ে উলটো দিকে ঘুরে শুলো মানব। আর তা দেখে মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সুমিতা।

বছর সাতেক আগে মানবের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সুমিতার। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হলেও, বিয়ের আগে বার তিনেক দেখা করে, পরস্পরকে যাচাই করে নিয়েছিল তারা।

সুমিতার সঙ্গে মানবের বিয়ের সম্বন্ধটা এনেছিলেন মানবের বাবার বন্ধু আশুতোষ। গড়িয়াতে আশুতোষের যেখানে বাড়ি, তার ঠিক দুটো বাড়ি পরেই সুমিতাদের বাড়ি। মানবদের মতো ওদের বাড়িও দোতলা। সুমিতার বাবা ছিলেন কেন্দ্র সরকারি কর্মচারি, মা স্কুল শিক্ষিকা। কিন্তু মানবের মা লেখাপড়া জানলেও, তিনি সাধারণ গৃহবধূ। অবশ্য মানবের বাবা ছিলেন আর্মি অফিসার।

মানব এবং সুমিতাও উচ্চ শিক্ষিত। দু’জনেরই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে। তবে সুমিতার বিষয় ছিল ইংরেজি আর মানবের হিসাবশাস্ত্র।

বিয়ের আগে সুমিতাও ওর মায়ের মতো স্কুল শিক্ষিকা ছিল এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের। কিন্তু বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি থেকে যাতায়াতের অসুবিধের জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতেই কোচিং সেন্টার খোলে। স্নাতক পর্যায়ের দশজন মেয়ে পড়ে ওর কাছে। আর মানব চাকরি করে এক বহুজাতিক সংস্থায়। মোটকথা সুমিতার বাপেরবাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি, দুই পরিবার-ই শিক্ষিত এবং স্বচ্ছল। কিন্তু এ সত্বেও সুমিতার এক অদ্ভূত শখ আছে। সে সবরকম উৎসব অনুষ্ঠানে সবাইকে নিয়ে হইহুল্লোড়ে মেতে থাকতে চায়। আর এই শখপূরণের জন্য সে যে-কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ্য করে নেয় এবং নিয়মনিষ্ঠা পালন করে হইহই করে।

সুমিতার এই চারিত্রিক বৈপরিত্য মানব বেশ এনজয় করত বিয়ের পর প্রথম দিকে কিন্তু এখন যেন হাঁফিয়ে ওঠে। খুব বাড়াবাড়ি মনে হয় ওর কাছে। এখন মনে মনে খুব রাগ হয় মানবের। সে চায় আরও বেশি সময় সুমিতাকে একান্তে কাছে পেতে। তার মনে হয়, যৌবনের মেয়াদ বড়ো কম, তাই সময়মতো পরিপূর্ণ আনন্দ উপভোগ করে নিতে চায় সে। কিন্তু সুমিতাকে সেকথা বোঝালেও বুঝতে চায় না। পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশী মেয়েবউদের নিয়েও বেশ সময় ব্যয় করে সুমিতা। আজ তাই ভোরবেলা সুমিতাকে শারীরিক ভাবে না পেয়ে, মেজাজটা বিগড়ে যায় মানবের। সে রেগেমেগে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরতে যাবে মানব, এমন সময় সুমিতা ছুটে এসে বলল, ‘শোনো আজ ননভেজ লাঞ্চ করবে না আর সন্ধেবেলা একটু তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করবে।’ সুমিতার কথা শোনার পর, কোনও উত্তর না দিয়ে গাড়ি চালিয়ে অফিসে চলে গেল মানব। অফিসে গিয়ে কাজের চাপে মানব সব ভুলে গেল। সকালের বিগড়ানো মেজাজটাও কোথায় যেন উড়ে গেল ডানা মেলে। কারণ মানব খুব কাজ পাগল। অফিসে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সুনামও আছে তার।

—আসব মানব? বলে অনুমতির অপেক্ষায় দরজার কাছে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে শুভ্রা। সে মানবেরই পদমর্যাদার এক সহকর্মী। শুভ্রার গলা শুনে হাতের ফাইল থেকে মুখ সরিয়ে তাকাল মানব এবং শুভ্রার সাজগোজ দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার আজ এত সেজেছো? ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি নাকি?

হাসতে হাসতে মানব শুভ্রাকে সামনের চেয়ারে বসতে ইশারা করল। শুভ্রা বসতে বসতে বলল, ‘তুমি বোধহয় ভুলে গেছ মানব যে, আজ শিবরাত্রি। বরের মঙ্গল কামনায় আজ মেয়েদের উপোস থাকতে হয়, সেজেগুজে শিবের মাথায় জল ঢালতে হয়। শুভ্রার কথা শুনে হো হো করে হাসল মানব তারপর বলল, ‘তুমি তো আজ অবাক করলে আমাকে। তোমাকে যতদিন দেখছি, তুমি তো ধর্মেকর্মে তেমন আস্থা রাখতে না! আজ হঠাৎ কী হল?’

—কেন তোমার বউ উপোস নেই?

—থাকবে না আবার, সকাল থেকে জল স্পর্শ করে না। সে যাইহোক কিন্তু তুমি…?

আমিও মানছি সবকিছু, ঝামেলা এড়াতে। প্রতি বছর এই দিনে শাশুড়ির গোমড়া মুখ দেখতে আর ভালো লাগে না। তাই…

—তোমার পতিদেব কোন পক্ষে?

—কোন পক্ষে আবার, ওর মায়ের পক্ষে।

—যাকগে উপোস থেকো না, শরীর খারাপ করবে। আজ আমার সঙ্গে লাঞ্চ করে নিও।

—আমাকে কেস খাওয়াতে চাইছ? আমার শাশুড়ি যদি জানতে পারে যে, আমি উপোস ভেঙেছি, তাহলে আর রক্ষে থাকবে না। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বেধে যাবে!

—আরে আমরা অফিসের বাইরের রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাব। কেউ জানতে পারবে না। ভয় নেই আমি তোমার শাশুড়িকে গিয়ে বলে আসব না।

মানবের কথা শুনে শুভ্রাও হো হো করে হাসতে শুরু করল। তারপর মানবের রুম থেকে বেরোনোর আগে বলল, ‘আমার ফাইলটা চেক করে আজ একটু ছেড়ে দিও, আর্জেন্ট আছে। আর হ্যাঁ, লাঞ্চ-এর ইনভিটেশনটা অ্যাকসেপ্ট করলাম।’

(ক্রমশ……)

এ কি সত্য!(শেষ পর্ব)

—অ্যাই শোনো! মেলা লেকচার মেরো না তো। আজকাল বড্ড বেশি আমাকে কন্ট্রোল করতে চাইছ।

–এ্যাই! ঠিক করে কথা বলো। শিক্ষিত মানুষের মুখে এসব মানায় না। আর মা আমাদের সম্বন্ধেই কী ভাববেন সেটা ভেবে দেখেছ? আগে বলো ভালোবাসা দুঃখের রক্তকে স্পর্শ করে, না দুঃখের রক্ত ভালোবাসাকে স্পর্শ করে? রিমা স্পষ্ট ভাবে বাবির চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

—ডিসগাস্টিং! এখন কবিত্ব ভালো লাগছে না রিমা। স্ন্যাক্স দাও। আই অ্যাম হাঙ্গরি। মাথা গরম করে দেওয়া ছাড়া কি তোমার আর কোনও কাজ থাকে না?

রিমা কথাটা শুনে বিড়বিড় করতে করতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কারণ সেও তার শাশুড়িমার মতন অশান্তি পছন্দ করে না। রিমা নীরব থাকে। নীরব থাকাটাই এ মুহূর্তের দস্তুর। শব্দহীনতা শ্রেষ্ঠ সম্মতি। ছেলে কফিরুমে জানলার দিকে বসে পড়ল চুপচাপ।

এই কফিরুমটার আবার গল্প আছে বেশ। টিনাদেবী যখন জমি কিনে বাড়ি তৈরি করছিলেন সেই সময় সব ঘর হয়ে যাবার পর রান্নাঘরের পাশের ব্যালকনিটা বিশাল লাগছিল। তাই দেখে টিনা তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, ‘বাবি যখন বড়ো হবে — হয়তো বিদেশে যাবে নয়তো, একটা বড়ো চাকরি করবে তখন একটা ঘরে বসে বাবি আর বাবির বউ চা খাবে অফিস থেকে এসে বা ভোরবেলা। ওনার স্বামী হেসে বলেছিলেন, আর আমি আর তুমি? বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে ওনার ফসা গালটা টিপে বুকের কাছে টেনে নিয়েছিলেন। অনেকদিন পর হঠাৎ করে একটা শিহরণ অনুভব করলেন টিনা।

টিনাদেবী একটা গল্প পড়ছিলেন প্রতিভা বসুর লেখা— জীবনের জলছবি। মনে মনে ভাবলেন তিনি যদি লিখতে পারতেন প্রতিভা বসুর মতো করে লিখে ফেলতেন নিজের জীবন কথা। নিজের এই সংসারের উত্তরণের কথা।

পরের দিন প্রমোটার এল দশটার সময়। চারিদিকে কেমন যেন থমথমে। মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে। বৃষ্টি হবো হবো করেও হচ্ছে না। বাবি অফিস গেছে এক ঘন্টা পরেই আসবে বলে গেছে। টিনাদেবী চুপচাপ কাগজে সাইন করবার জন্য হাত বাড়ালেন। একটা কথাও উচ্চারণ করলেন না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে এদিক ওদিক দেখতে থাকলেন।

রিমা দেখল কীভাবে অসহ্য-কে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। বুকের ভেতরটা যেন ছারখার হয়ে যাচ্ছিল টিনার। এই ওনার ছেলে ভাবতেও খুব খারাপ লাগছিল সেই মুহূর্তে। আর থাকতে না পেরে রিমা প্রমোটার-এর কাছে এসে বলল সোজাসুজি, ‘এ বাড়ি আমরা বিক্রি করব না। ভুল ডিসিশন নেওয়া হয়ে গেছিল। যখন করব, তখন আমরা ভেবে দেখব। এখন আপাতত স্থগিত থাক।”

নাতি নাতনি বাড়িতে কালো কোট পরা লোক দেখে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল। ওরা স্কুলে শুনেছে বন্ধুদের পেরেন্টসরা ঠাম্মা-দাদুর বাড়ি বিক্রি করে এখন ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকে। তাই ওরা ওদের বাড়ি আসতে খুব ভালোবাসে।

ওরা দুই ভাই-বোন এসে ঠাম্মির গা ঘেঁষে বসল। ঠাম্মি মুখ নীচু করে বসে আছেন। নাতনি ঠাম্মির কানে কানে বলল, “ঠাম্মি, কোনও চিন্তা নেই। আমরা এই বাড়ি ছেড়ে কিছুতেই যাব না, দেখো।”

প্রমোটার রিমাকে বললেন, ‘কী বলছেন আপনি? আমাকে তো মিঃ কল্পতরু রায় আজকেই সাইন করার কথা বলেছিলেন।

—বলেছিলেন, কিন্তু আমরা আজকেই এই সিদ্ধান্তে এসেছি। উনি এখুনি এসে পড়বেন। প্লিজ! কিছু মনে করবেন না, আপনার সময়ের অপচয় করিয়ে দিলাম। কিন্তু আমরা অপারগ। হাত দুটো জড়ো করে রিমা প্রমোটর-কে বিদায় জানাল। এত তাড়াতাড়ি ঘটনাটা ঘটে যাবে বুঝতে পারেনি রিমা ও টিনাদেবী।

—আমি জানি, বাবি আসলেই এক যুদ্ধ শুরু হবে। আমার মনের ভিতর তাই সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে অবিরাম। ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠছি আমি। সত্যিকারের বড়ো, ম্যাচিওরড। শাশুড়ি-বউয়ের কেমিক্যাল ইকোয়েশন যে এক, তা জানাতেই কি?

বাবি গাড়ি পার্কিং লটে রাখতে না রাখতেই প্রমোটরের গাড়ি পাশ দিয়ে চলে গেল। বাবি ঘরে ঢুকেই দেখে— মায়ের কাঁধে মাথা রেখে রিমা বসে আছে সোফা সেটে৷ দু’জনের চোখেই জল।

—সাইন করে দিয়েছ মা? গলাটা কেঁপে উঠল বাবি-র।

মায়ের দু’চোখে জল। রিমা মাথা তুলে লো ভেলোসিটিতে বলল, ‘না বাবি! ওনাকে ফিরে যেতে বলেছি।”

—ফিরে যেতে বলেছ? কিন্তু কেন? এই কথাটা বলতে এত দ্বিধা? আমি অনেক ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্তেই তো এসেছিলাম। তা তুমি সেই কাজটি নিজেই করেছ। একেই বলে বোধহয় অর্ধাঙ্গিনী! বাবি-র হাসি মুখ রিমার বুকের বোঝা অনেকখানি নামিয়ে দিল।

মা স্তম্ভিত। এই ছেলেই কি তাঁর ইচ্ছের গাছ নাকি? যে-ছেলেকে প্রথম হাঁটি হাঁটি পা করে চলতে শেখানো, কথা বলতে, লিখতে শেখানো, তারপর মহিরুহ বাবিতে পরিণত করা। সব সম্ভব হয়েছে মিষ্টি বউ, না… না… আমার মেয়ে আমার রিমা মা-র জন্য! চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে আবার টিপটপ সাজানো লিভিংরুমের সোফায় টিনাদেবী গা এলিয়ে দিলেন। রিমার রুচিবোধ আছে।

বাবি আর একটিও কথা না বাড়িয়ে মাথা নীচু করে শুধু মা’কে প্রণাম করল। ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে বাবি রিমাকে। তিরতির সুখ কাঁপছে রিমার অশ্রুভরা

দু-চোখে। ওই কাঁপন ছড়িয়ে গেল তারও বুকে। শিরায়। উপশিরায়। সুখমুক্তোয় স্বপ্নের মালা গাঁথছে মা আর রিমা। হ্যাঁ, সুখের স্বপ্ন। যে স্বপ্নগুলো নিয়ে মা, রিমারা বেঁচে থাকে আজীবন। শুধু একটু পারস্পরিক বোঝাপড়াই তো সাংসারিক সুখের চাবিকাঠি হয়।

—রিমা আর দাঁড়িয়ে থেকো না প্লিজ! যাও দেখি গরম গরম পকোড়া করো। কী বলো মা। আজ আমরা বাইরে খেতে যাব। কেমন?

এ কি সত্য! (পর্ব-০২)

শাশুড়িমার কাছেই শুনেছিল রিমা— এই বাড়িটা অনেক শখ করে দু’জনে মিলে করেছিলেন যাতে ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিরা হেসে খেলে বেড়াতে পারে। নানান দেশের নানা রকমের ফল-ফুলের গাছ সংগ্রহ করে সাজিয়েছিলেন মনের মতো করে। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িটায়, সময় পেলেই বলেন রিমাকে।

সেই বাড়ি যদি আজ বিক্রি করে দেয় বাবি, তাহলে শাশুড়িমা খুবই কষ্ট পাবেন। হয়তো বেশিদিন আর বাঁচবেন না! এই শাশুড়ি যে কতখানি তার মনের বল, তা বুঝিয়ে বলা যাবে না কাউকে। কিছুই বলবেন না নিজের মুখে, অনেক ভাগ্য করে এইরকম শাশুড়ি পেয়েছে রিমা। যবে থেকে বউ হয়ে এসেছে এ বাড়িতে, তবে থেকে দেখে আসছে কী অদ্ভুত এক মহিলা! ওনার সবকিছুই যেন রিমার পছন্দের মতো। রিমা যেটা ভাবে উনি ঠিক সেটাই বলেন। সবাই খুব হিংসা করে সেই জন্য।

আজকালকার দিনে শাশুড়ির কথামতো সংসার চলছে শুনলে বন্ধু-বান্ধবরা সব টিক্‌স-টিপ্পনি মারে। সবাই তো খালি শাশুড়িদের দোষই দেখে। সেখানে রিমা যদি তাদের বলে যে, “দ্যাখ, দোষ কখনও একতরফা হয় না। কষ্ট করে ছেলে মানুষ করেছেন, ওনাদের না হয় একটু দাবিদাওয়া থাকুক না। আমরা মডার্ন যুগের মেয়েরা একটু ওনাদের সেন্টিমেন্টকে সাপোর্ট করি, তাতে তো ক্ষতি কিছু নেই বরং দেখিস লাভ বেশি। আমাদেরও তো একদিন শাশুড়ি হতে হবে, ভেবে দেখেছিস সেটা?’

বন্ধুরা হেসে বলে— তুই পাগল নাকি? কী ভাবছিস আমরা ছেলে বউ-এর কাছে থাকব নাকি বার্ডেন হয়ে? তোর মতন না। রিমা নিজের শাশুড়িকে প্রাণের চেয়েও ভালোবেসে ফেলেছে। উনি যে ভালোবাসার মানুষ।

তাই এই বাড়ি ভেঙে দেবে শুনে অবধি মনে প্রাণে যেন বড্ড কষ্ট পাচ্ছে। এই কষ্ট-টা যেন নিজের অন্তর দিয়ে অনুভব করছে রিমা, আর দুচোখ জলে ভরে যাচ্ছে। রাতে সারা বাড়ি যখন নিস্তব্ধ, সেই সময় জলভরা দু’চোখ নিয়ে পায়ে পড়ার উপক্রম বাবি-র। কিন্তু গোঁয়ারগোবিন্দ ছেলের এক কথা….

—বাড়ি আমি বিক্রি করে দেবই। আমার এক কথা। আমার কাছে বেশি ঘ্যানর ঘ্যানর কোরো না তো, বুঝলে। আবার বলছি, তোমাদের ভালোর জন্যই করছি। আমার নিজের জন্য না। শুয়ে পড়ো।

—আমাদের ভালোর জন্য? না নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য? পরে যদি মা বাড়িটা আমার নাম-এ করে দেন। বুঝি না কিছুই বলো? রাতদিন তো শুনেছি— মা-কে সব সময় সাপোর্ট করো কেন? কোনও ফল হবে না। সব বুঝি বাব্বা, সব বুঝি। আমার নামে করে দিলেও সেটা কিন্তু তোমার-ই বাড়ি।

—ছিঃ ছিঃ বাবি, ছিঃ! তোমার মাকে ভালোবাসি বলে তোমার মুখে এই কথা শুনতে হবে, তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এমন যার মা, কোনও কিছুতেই মানা নেই, বারণ নেই। সেই মা-কেও? এই তো বিয়ের আগে যখনই দেখা হতো, শোনাতে তখন লম্বা লম্বা বাত। এখন মাঝে মাঝে তাই ওসব কথাই ভাবি। মানুষ কত পালটে যায়। বলতে, “আমার মা ছাড়া জীবনে আর কেউ নেই। সেই মা-কে ভালোবাসলেই আমাদের সংসার সুখের হবে। আমরা সুখী হব!’

—আমি অনেক মডার্ন ভাবে মানুষ হয়েছি বলেছিলাম তোমাকে। আর তুমি জানোও সে কথা ভালোভাবে। বাবা ইউরোপে কাজ করার দরুন বাবার সঙ্গে গরমের আর বড়োদিনের ছুটি ওখানেই কাটাতাম। শাশুড়ি নিয়ে ঘর করা আমার দ্বারা হবে না, আমি তা-ও বলেছিলাম তোমাকে। ভুলে গেছো? আমিই বলেছিলাম, তোমার মা তোমাদের বাড়ি থাকুন। আমরা কোনও ফ্ল্যাটে থাকি নিজের মতন করে। তখন বলেছিলে, ‘রিমা তা হয় না, আমি ছাড়া মায়ের আর কেউ নেই। মা কে খালি ভালোবেসো, এটাই আমার একমাত্র রিকোয়েস্ট। মা আমাদের কারুর কাছে কিছু আশা করেননি, আর আজও করবেন না।”

—তো ভালোবাসছি মা-কে। ভালোবাসা মানে এই নয় যে, খালি তাকে ওপর ওপর ভালোবাসা দেখানো। ভালোবাসা মানে হল তার সখ-শৌখিনতা, মন-শরীর সব দিকের নজর রাখা। সবাই বলে ছেলের বউরা আপনার হয় না। সত্যিই কি তাই? না ছেলেরা আপন থাকে না বিয়ের পর? আর আমাদের ভালোর জন্যেই তো উনি করেছেন। গরমের ছুটিতে যখন অন্য বাচ্চারা ফ্ল্যাটের চার দেয়ালে আটকা থাকে আর তোমার ছেলে-মেয়ে তখন টাটকা আম পেড়ে খাচ্ছে। জাম, করমচা পেড়ে খাচ্ছে। নিজেদের পুকুরে সাঁতার কাটছে। টাটকা মাছ খাচ্ছে। আম, জাম, পেয়ারা গাছের ডালে কাঠবেড়ালি আর কত নাম না জানা পাখিদের ব্যস্ত ছোটাছুটি দেখছে, শিখছে। একটুও বোঝো না, তাই না? আমিও তো কনভেন্টে পড়েছি কই নিজেকে তো বদলাই নি? সবাই বদলায় না, বদলায় আত্মবিশ্বাস আর চরিত্র। সব গল্প মনে হয়, তাই নয় কি? আদতে একটা উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য পূরণ হলে পেট ভরার মতো শান্তি, পেট খোলসা হওয়ার মতোও।

—সেদিন কাজের মাসি আমাকে ডেকে দেখাল রান্নাঘরের জানলা দিয়ে, ‘দেখুন বউদি, মা কেমন আপনমনে গাছগুলোয় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কী যেন বলছেন।’ মেয়েরা বা বউরা শুনেছি বদমাস হয়, এ তো উলটো ইকোয়েশন। মাসি গরিব মানুষ মাসিরও চোখে জল এসে গেছিল। না, এ বাড়ি আমি কিছুতেই বিক্রি করতে দেব না আমার প্রাণ থাকতে, এই আমি বলে দিলাম বাবি। তাতে তোমার সুবিধা না হয়, অন্য জায়গায় থাকতে পারো। আমি পারব না এই অন্যায় করতে।

(ক্র্মশ…)

সামান্য দেরিতে (শেষ পর্ব)

—ওখানে যাওয়ার কিছুদিন আগেই শোভনের স্কুলের ফিজ আর ওর বইখাতা কেনার জন্য দিদি আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। ওখানে গিয়ে দেখি শোভন একটা দামি মোবাইল কিনেছে। আমি অসন্তোষ প্রকাশ করলে দিদি বলে যে, ও একটা গানের প্রতিযোগিতায় মোবাইলটা ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে। সোমনাথদাও নতুন গাড়ি কিনেছে। যেখানে ছেলের ফিজ দেওয়ার ক্ষমতা নেই সেখানে গাড়ি কেনার কীসের দরকার? খুব রাগ হয়েছিল দেখে। বুঝে গিয়েছিলাম আয়েশের জীবন কাটাতে ওরা দুজন আমাদের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করছে। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, আর কেউ আমাকে বোকা বানাতে পারবে না।

—আগে একথা তুমি বলোনি কেন?

—আমি সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।

—মানে…?

—একতা কিছুদিন ধরে আমি লক্ষ করছি তুমি সৎসঙ্গে যাতায়াত আরম্ভ করেছ। আমি জানি ওইসব জায়গায় ধর্মকর্মের নামে মানুষকে নানা ভাবে ভয় পাওয়ানো হয়ে থাকে। মাঝেমধ্যেই দানের মাহাত্ম্য শুনিয়ে টাকা-পয়সা হাতানোর ফন্দি করা হয়। কষ্টের উপার্জিত অর্থ কি এরকম অপদার্থ ব্যক্তির পেছনে ওড়ানোটা ঠিক? সেটা নিজের বোনই হোক কিংবা কোনও সাধু মহারাজ?

প্রতীকের কথা শুনে লজ্জিত হয়ে অপরাধীর মতো একতা নিজের সাফাই দিতে গিয়ে বলল, “আমি দানের কথা এজন্য বলতাম কারণ আমি শুনেছিলাম এতে সংসারের ভালো হয়।”

—কীরকম ভালো? তোমার মনের মধ্যে আগে ভয় ঢুকিয়ে তারপর সেই ভয় মন থেকে দূর করার প্রচেষ্টাকেই তুমি ভালো বলছ?

একতা মন দিয়ে প্রতীকের কথাগুলো শুনছিল।

—সোনা-রুপো দান করলে পাপ মুছে যায়, টাকা-পয়সা বা অন্যান্য সামগ্রী দান করলে স্বর্গে যাওয়া যায়, গ্রহণ লাগলে দান করো যাতে ওর খারাপ প্রভাব থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়, পরিবারে কারও জন্ম হলে তার ভবিষ্যৎ সুখের জন্য, আর মৃত্যু হলে পরের জন্মে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দান করা উচিত— এসবই তো সৎসঙ্গে বলা হয়ে থাকে তাই না একতা? প্রতীক জিজ্ঞেস করলে একতা মাথা নেড়ে সায় দেয়।

—তুমি কি কাউকে দেখেছ, যে স্বর্গ দেখেছে? তোমার কি মনে হয় না, স্বর্গ-নরকের কথা মানুষকে ভয় পাওয়াবার জন্যই বলা হয়ে থাকে। পরের জন্মের চিন্তা করে সুখ পাওয়ার ইচ্ছেতে এই জন্মের কষ্টের উপার্জন বিলিয়ে দেওয়া আদৌ কি বুদ্ধিমানের কাজ? এইসব নানারকম ভয় দেখিয়ে মানুষের কাছে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ আজকাল বেশিরভাগ সৎসঙ্গগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই একতা, যদি দান করলে পাপ দূর হয়ে যেত, তাহলে এর মানে কি দাঁড়াল বুঝতে পারছ? এর মানে এটাই যে— যত খুশি খারাপ কাজ করতে থাকো আর পাপ থেকে বাঁচতে দান করে যাও। এটা কি তোমার ঠিক বলে মনে হয়? প্রতীক একতার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল।

—না, এই রাস্তা তো মানুষকে ভুল দিশায় নিয়ে যাবে। একতার কাছে সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছিল।

প্রতীক একতাকে আরও পরিষ্কার করে বোঝানোর জন্য বলতে লাগল, ‘যারা রোদ্দুর, ঠান্ডা উপেক্ষা করে রাস্তায় জিনিস বিক্রি করে, তাদের সঙ্গে আমরা অল্প টাকা নিয়েও দরদাম করি। গরিব রিকশাওয়ালার সঙ্গে টাকা নিয়ে ঝগড়া করি অথচ দানপূণ্যর ব্যাপারে কোনওরকম চিন্তা না করেই গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা বরবাদ করে দিই।”

রেস্তোরাঁতে শম্ভুনাথের চেহারা দেখে একতার মনের মধ্যে ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। প্রতীকের কথা বুঝতে পেরে একতা বলে উঠল, “বিলাসিতায় জীবন কাটাবার জন্য অন্যকে বোকা বানাতে ফাঁদ পাতে কিছু মানুষ। সক্ষম ব্যক্তি যদি পরিশ্রম না করে দান চায় তাহলে সেটা দেওয়া অন্যায়। এতে আমাদের জীবন নয় বরং দান যে নিচ্ছে তার জীবনই সুখের হবে। দান করতে হলে অনাথ আশ্রমে, গরিব শিশুদের কিংবা শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী মানুষকে দান করা উচিত। আর এবার থেকে আমি এটাই করব।’

প্রতীক হেসে ফেলল, “বাঃ তুমি তো খুব শিগগিরই ধরে ফেললে আমি কী বলতে চাইছি। আর তুমি যেটা বললে ঠিক সেই কারণেই দিদিদেরও আমি আর টাকা পাঠাব না। ওরা যখন কষ্টে ছিল আমি সবরকম ভাবে সাহায্য করেছি কিন্তু এখন ওরা আয়েশ করবে বলে টাকা চাইছে। ধর্মের নামে ভয় দেখিয়ে যেমন টাকা চাওয়া হয়, ঠিক তেমনি দিদিরাও আমাকে বোকা বানাচ্ছে। আমি সাহায্যের নামে অকর্মণ্য ব্যক্তিকে কখনওই মাথায় চড়াব না।”

—ভাবছি হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপের সৎসঙ্গের সব সদস্যদের বাবাজির আসল চেহারার ছবি তুলে পাঠিয়ে দিই। দেরি হলেও আমি সবকিছু আজ বুঝতে পেরেছি! প্রতীকের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে একতা তার মোবাইল ফোনে, শম্ভুনাথজির একখানা ছবি তুলে ফেলল। বাবাজির বান্ধবি তখন তাঁর বাহুলগ্না।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব