একটা ঘরে ফেরার গল্প (৬ পর্ব)

৬ পর্ব

তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে, অর্জুনের ‘প্ল্যাটফর্ম-সাইড-রেসিডেন্স’-এর কোনও হদিশ করতে পারল’ না নিখিল। প্ল্যাটফর্মের দোকানদার থেকে শুরু করে, রেলের বিভিন্ন কর্মচারীদের কাছে অর্জুনের খোঁজ করার পরে, সবার কাছ থেকে একই কথা জানতে পারল নিখিল, ‘অর্জুন সরকারি চাকরি করে। কলকাতায় ওর অফিস। সারাদিন সেখানকার কাজকর্ম সেরে, সন্ধ্যার পরে তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসে অর্জুন। ওখানেই রাতে ওর পোষ্যরা আসবে, ওদের অর্জুন স্যারের কাছে পড়াশোনা করতে। তারপরে পড়াশোনা শেষ হলে, পোষ্যদের খাইয়ে দাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে, ওই স্টেশন চত্বরেই যেদিন যেখানে মর্জি, সেখানে বিছানা পেতে রাত কাটিয়ে দেয় অর্জুন।”

পরদিন সকালে নিখিল অফিসে পৌঁছে, বড়োকর্তার ঘরে গিয়ে ঢুকল। গতকাল সন্ধ্যায় সংগ্রহ করা, অর্জুন স্যার সংক্রান্ত সবিশেষ তথ্য বড়োকর্তাকে জানাতে জানাতে চোখের কোণে আঙুল ছোঁয়াল নিখিল। ‘প্ল্যাটফর্ম-সাইড-রেসিডেন্স বলে কোথাও কোনও ঘরবাড়ির অস্তিত্ব নেই স্যার। তবে আপনার ফাইলে যা তথ্য রয়েছে, তার কোনওটাই অসত্য নয়। কোনও অনাথ ছেলে হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে জীবন কাটিয়ে, মাস্টার্স ডিগ্রি করে, সরকারি অফিসের অফিসার হতে পারেন, তা আমাদের অর্জুন-স্যারকে না দেখলে কোনওদিন বিশ্বাসই করতে পারতাম না। শুধু তাই নয়; সারাদিন এই অফিসে এইভাবে নিজেকে উজাড় করে পরিশ্রম করার পরে, রাতে আবার ওই হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ফিরে গিয়ে, বহু অনাথ বাচ্চাদের নিয়ে পড়াতে বসান। তারপরে তাদের রাতের খাবার খাইয়ে, ওদের সাথেই প্ল্যাটফর্মে রাত কাটিয়ে, পরদিন আবার যে-কেউ এইভাবে অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে পারে; তা অর্জুন স্যারকে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না। অর্জুন স্যার আমাদের ভগবান!” দু’-হাত কপালে ঠেকাতে ঠেকাতে অম্বরীশ চ্যাটার্জীর ঘর থেকে বেরিয়ে এল নিখিল।

ওদিকে পরপর পাঁচদিন অফিস কামাই হওয়ার পরে, নিখিল যেদিন অর্জুনের খোঁজে হাওড়া স্টেশনে এসেছিল, সেদিনই সকালে শ্রাবণীকে সঙ্গে নিয়ে, এস আই জয়ন্ত ঘোষের সাথে অর্জুন গিয়েছিল হাসপাতালেই। সাঞ্ঝাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি করিয়ে, সন্ধ্যার পরে যথারীতি হাওড়া স্টেশনের তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে, সাঞ্ঝাকে নিয়ে ফিরে এল অর্জুন। হাওড়া স্টেশন চত্বরে পা রাখতেই, রেল পুলিশের লোকজন, প্ল্যাটফর্মের স্টলমালিকরা থেকে শুরু করে, তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ওর পোষ্যরা সকলেই এসে অর্জুনকে জানাল, ‘আজ তোমার অফিস থেকে তোমার খোঁজে একজন লোক এসেছিলেন। তোমার বাড়ি, ঘরদোর সম্বন্ধে খোঁজ করছিলেন তিনি।’

একথা শোনার পরে অর্জুনের কাছে সাঞ্ঝা জানতে চাইল, ‘আপনার ঘর এখান থেকে কতদূর?”

সাঞ্ঝার কথায় মুচকি হেসে অর্জুন জানাল, ‘এই তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম লাগোয়া গোডাউনের পাঁচিল ঘেঁষেই আমাদের সবার ঘরবাড়ি। আমাদের সবার মানে, আমাদের এই ক’জন অনাথের।’

—কিন্তু সবাই যে বলছে, আপনি অফিসে চাকরি করেন! তাহলে কাছাকাছি কোথাও আপনার বাড়িঘর আছে নিশ্চয়ই।

—সে ছিল একসময়। রাঁচি স্টেশনের দক্ষিণদিকের রেল কোয়ার্টারে থাকতাম আমরা। আমরা মানে মা-বাবা, দাদু ও ঠাকুমা। আমার বাবা ছিলেন একজন ডাক্তার। দিল্লির একটা নামকরা হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে রাঁচি আসতেন। হঠাৎ করে কী একটা গবেষণার কাজে আমেরিকায় চলে গেলেন তিনি।

—তারপর… অর্জুন কথা বলতে বলতে একটু থামতেই, ফিরে জানতে চাইল সাঞ্ঝা।

—তারপর আর কী! আমার মা ছিলেন রাঁচির একটা ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা। মা যে স্কুলে পড়াতেন, আমিও সেই স্কুলেই পড়তাম। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, মা নেই। বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গিয়েছেন। যাওয়ার আগে দাদুকে একটা চিঠি লিখে গিয়েছিলেন। এর পরে আমার সমস্ত দায়িত্ব গিয়ে পড়ল দাদুর উপরে। দাদু আমাকে রোজ স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতেন।

অর্জুন বলতে লাগল, ‘স্কুলে গেলেই সহপাঠী থেকে শুরু করে শিক্ষক শিক্ষিকারা সবাই আমার কাছে আমার মা-বাবা’র সম্বন্ধে জানতে চাইত। দিনের পর দিন সেটা আমার কাছে ভীষণ অসহনীয় লাগতে লাগল। একদিন স্কুল থেকে আমিও পালালাম!’

ক্রমশ…

একটা ঘরে ফেরার গল্প (৫ পর্ব)

জঙ্গল থেকে ঘাস-পাতা সংগ্রহ করে, ওই ঘরের মেঝেতে পেতে তার উপরে শোয়ার ব্যবস্থা করে নিতে হয়। গ্রামের প্রান্তের ওই স্থান চারিদিক থেকে জঙ্গল দিয়ে ঘেরা। সারারাত ভয়ে-যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকতে হয়, একেকটা দশ-এগারো বছরের শিশুকন্যাকে। ওই পাঁচ-ছ’টা দিন ওদেরকে এতই অস্পৃশ্য মনে করে সবাই যে, পরিবারের কোনও লোক, কোনও খোঁজ নিতেও আসে না তাদের। ওই জঙ্গলঘেঁষা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই ঘরের ধারেকাছে কোথাও কোনও জলের সংস্থানও নেই। নিজেকে ধুয়ে মুছে সাফসুতরো করার কোনও উপায় পর্যন্ত নেই। ওদের গ্রামের মেয়েরা অনেকে ওই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবাণু সংক্রমণেই মারা যায় সেখানে।

ওর মা-ঠাকুমাকেও ছোটো থেকে দেখেছে সাঞ্ঝা— প্রতিমাসে ওই পাঁচ-ছ’টা দিন বাড়ি ছেড়ে, ছোটো বাচ্চাদের ঘরে ফেলে রেখে, গ্রামের প্রান্তের ওই ঘরে দিন কাটাতে চলে যেতে। বছর তিনেক আগে সাঞ্ঝা’র মাকে এইরকমই একরাতে ভাল্লুকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর থেকে মায়ের সাথে আর কোনওদিন দেখা হয়নি সাঞ্ঝার।

সাঞ্ঝার বাবা ঝরিয়া কয়লাখনিতে কাজ করে। মা মারা যাওয়ার পরে বাবা আর কোনওদিন বাড়িতে ফেরেনি। দাদু-ঠাকুমার কাছে মানুষ হচ্ছিল সাঞ্ঝা। পড়াশোনা করার জন্য ওদের তুটকি গ্রাম থেকে বিশ কিলোমিটার দূরের মাঞ্চুগঞ্জের স্কুলে বছরের পর বছর আসা যাওয়া করে, দশ ক্লাস পাশ করে, এগারো ক্লাস পেরিয়ে বারো ক্লাসে উঠেছে সাঞ্ঝা। তাই সাঞ্ঝা ভাবে, অন্যায় অবিচারে ভরা এই সামাজিক কু-প্রথাকে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে আর পড়াশোনা করে আমার লাভটা কী! এই গ্রাম ছেড়ে, জেলা ছেড়ে, রাজ্য ছেড়ে পালাতে না পারলে, আমার অবস্থাও একদিন আমার মায়ের মতনই হবে।

পাঁচদিনের প্রথম দিনটা এইসব ভাবতে ভাবতে অতিবাহিত হয়ে যায়। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই গাউকোর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সাঞ্ঝা। বন-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দশ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে, সাঞ্ঝা এসে পৌঁছোয় গোধিয়ার সতেরো মাইল বাসরাস্তার উপরে। একটা কয়লা বোঝাই লরিকে হাত দেখিয়ে দাঁড় করায় সাঞ্ঝা। লরি থেকে একটা লোক নেমে এসে, ও কোথায় যেতে চায়, জানতে চাইলে তাকে ওই অঞ্চল ছেড়ে ওর পালানোর ইচ্ছার কথা, কারণ সহ সবিশেষে জানানোর পরেই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত সাঞ্জা জ্ঞান হারায়। মাঝরাতে সাঞ্ঝা নিজেকে আবিষ্কার করে, একটা চলন্ত ট্রেনের টয়লেটের মেঝেতে পড়ে আছে। তারপর সাঞ্ঝা আর কিছু জানাতে পারে না অর্জুনকে!

পরপর ক’দিন এই ভাবে হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আর হাসপাতালে যাতায়াতের ফলে, অফিসমুখো আর হতে পারেনি অর্জুন। আজ প্রায় বছর চারেক হল, ডালহৌসি পাড়ার কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটের কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসের এক দায়িত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে অর্জুন। ঝড় হোক, জল হোক, হাজার দুর্যোগেও অর্জুনের গরহাজিরা কারও চোখে পড়েনি কোনওদিন। এহেন অর্জুন বিনা কোনও সংবাদে, এইভাবে যে কোথাও উধাও হয়ে যেতে পারে, তা বুঝে উঠতে পারেন না তার অফিস কর্তা অম্বরীশ চ্যাটার্জী।

গত চার-পাঁচদিন ধরে অর্জুনকে যতবারই মোবাইল ফোনে ধরার চেষ্টা করেছেন উনি, ততবারই হয় ‘নো আনসার’, নয় তো জানতে পেরেছেন অর্জুনের ফোনটা রয়েছে ‘পরিষেবা সীমার বাইরে’। অর্জুনের চাকরির নিয়োগপত্র ও জয়েনিং লেটার সম্বলিত ফাইলটা বের করে বারকয়েক চোখ বোলালেন অম্বরীশ। সব জায়গাতেই ওর স্থায়ী ঠিকানা লেখা রয়েছে, ‘প্ল্যাটফর্ম-সাইড রেসিডেন্স, প্ল্যাটফর্ম নম্বর তেইশ, হাওড়া স্টেশন’। নামের জায়গায় লেখা শুধু ‘অর্জুন’; পদবির কোনও উল্লেখ নেই কোথাও। মা- বাবার নামের পাশে লেখা, ‘নট-অ্যাপ্লিকেবল’; বন্ধনীর মধ্যে লেখা ‘অরফ্যান’। শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে লেখা রয়েছে, “ইতিহাসে এমএ’।

অম্বরীশবাবু ফাইল থেকে অর্জুনের নাম ঠিকানা একটা কাগজে লিখে, তা অফিস পিওন নিখিলের হাতে দিয়ে, ওকে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে, একবার অর্জুনের খোঁজে যেতে বললেন। নিখিল যথারীতি বিকেল বিকেল অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। লঞ্চে নদী পেরিয়ে সোজা হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছোল সে।

ক্রমশ…

 

একটা ঘরে ফেরার গল্প (৪ পর্ব)

৪ পর্ব

আরও ঘণ্টা-দুয়েক মাথার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পরে, অর্জুনরা দেখল, মেয়েটা চোখ খুলে এদিক ওদিক তাকিয়ে কী যেন খুঁজছে। কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, ঘাড় ঝুঁকিয়ে, খোট্টা ভাষায় অর্জুন মেয়েটার কাছে জানতে চাইল, “তোমার নাম কী?” —সাঞ্ঝা, সাঞ্ঝা ওঁরাও!

—ঘর কোথায় তোমার?

—ভুটকি গ্রাম; তহসিল মাণ্ডু; জিলা রামগড়।

—এখানে এসেছ কেন? ট্রেনেই বা চড়েছিলে কেন?

অর্জুনের প্রশ্নের আর কোনও উত্তর দিতে পারল না সাঞ্ঝা। আবার চোখ বুজল সে। এস আই জয়ন্ত ঘোষ এবার রোগীর বেডের পাশের বসার টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অর্জুনকে বলল, “এবার আমাকে ফিরতে হবে অর্জুন। আমার ডিউটি আওয়ার শেষ হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। ফিরে রিপোর্ট করতে হবে অফিসে। তবে এ তো মনে হচ্ছে, তোমার ঝাড়খণ্ডেরই লোক। যেসব জায়গার নাম বলছে ও, তার কিছু কি চিনতে পারলে তুমি?”

এস আই সাহেবের প্রশ্নের জবাবে অর্জুন জানাল, ‘হ্যাঁ, ভুটকি হচ্ছে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রামগড় জেলার উত্তর প্রান্তের একটা প্রত্যন্ত গ্রাম। রাঁচি থেকে পঁচাশি কিলোমিটার, আর রামগড় সদর শহর থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরের এই গ্রাম ‘ভুটকি’। এর সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর হচ্ছে মাণ্ডু। তাও প্রায় বিশ-পঁচিশ কিলোমিটার দূরে। সবচেয়ে নিকটবর্তী বাস রাস্তা হচ্ছে একশো নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে অবস্থিত গোধিয়া সতেরো মাইল; ভুটকি থেকে যার দূরত্ব প্রায় দশ কিলোমিটার। ভুটকির উত্তর এবং পশ্চিম দিক হাজারিবাগের জঙ্গল দিয়ে ঘেরা। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা— সেই প্রত্যন্ত ভুটকি থেকে মেয়েটা রাঁচি এল কী করে! আর সেই সুদূর রাঁচি থেকে এই হাওড়া স্টেশনেই বা ও এল কী উদ্দেশ্যে!

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে অর্জুন আবার জানাল, আপনি এখন ফিরে যান ঘোষদা। আমি আরও একটু থেকে দেখি; যদি কিছু জানতে পারি ওর সম্বন্ধে। তবে ফিরে গিয়ে আপনি যদি একটা কাজ করে দেন, তাহলে খুব ভালো হয়। হাওড়া স্টেশনে ফিরে, আপনার কাজকর্ম সেরে, একটু তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে আমার পোষ্যগুলোকে বলবেন, হ্যাজাকটা জ্বেলে নিয়ে ওরা যেন পড়তে বসে যায়। সামনেই ওদের পরীক্ষা। কাল ঝড়-বৃষ্টির দরুন পড়াশোনাটা হয়নি ঠিকমতো। আজকে যেন ওরা পড়াশোনাটা শুরু করে দেয়। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ফিরে গিয়ে জানতে চাইব—কে কী পড়ল! আর বিল্টুকে একটু আলাদা করে ডেকে বলে দেবেন, কোনও কারণে আমার ফিরতে যদি একটু দেরি হয়, তাহলে ও যেন সবাইকে ভাতের হোটেলে নিয়ে গিয়ে রাতের খাবারটা খেয়ে নেয়।”

সন্ধ্যার পরে সাঞ্ঝা চোখ মেললে, ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অর্জুন আবার জানতে চাইল, ‘তুমি এখানে এসেছ কেন? তোমাকে এখানে এই হাওড়া স্টেশনে কে নিয়ে এসেছে?”

—কেউ না, আমি একাই এসেছি! কিন্তু আমি এখন কোথায়? অর্জুনের কাছে চোখ বুজেই জানতে চায় সাঞ্ঝা।

—তুমি রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেস ট্রেনে করে হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছেছিলে। সেখান থেকে তোমাকে হাওড়া জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। তুমি ভুটকি থেকে রাঁচিতেই বা এসেছিলে কেন? আবার ট্রেনে করে হাওড়াতেই বা এলে কেন?

অর্জুনের প্রশ্নে নিজেকে আর সামাল দিতে পারে না সাঞ্ঝা। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে দু’-হাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে, নিজের বুকফাটা যন্ত্রণার কথা সব উজাড় করে দেয় সে। ওর ভুটকি গ্রামের কথা, পরিবারের কথা, মা-বাবার কথা, মনের দরজা খুলে, সব বাইরে বের করে আনে সাঞ্ঝা।

সাঞ্ঝার বাড়ি ঝাড়খণ্ডের রামগড় জেলার তুটকি গ্রামে। তার পুরো নাম সাঞ্ঝা ওঁরাও। ছোটোবেলা থেকেই সে পড়াশোনায় খুব ভালো। স্কুলের এগারো ক্লাস পাশ করে এখন সে বারো ক্লাসে পড়ে। ওদের গ্রামের ছাউপদি প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই ওর ঘর ছাড়া। এটা শুধু ওর গ্রামের প্রথা নয়; এটা গোটা গ্রামীণ ঝাড়খণ্ডের দুঃসহ এক প্রথা। এই প্রথার শিকার হয়ে, সেই দশ-এগারো বছর বয়স থেকে প্রতিমাসে ঋতুস্রাবকালীন পাঁচ-ছয়দিন ওর গ্রামের বাড়ি-ঘর ছেড়ে, গ্রামের বাইরে একটা চালা ঘরের মধ্যে গিয়ে থাকতে হয় ওকে। এ যন্ত্রণা শুধু সাঞ্ঝার নয়। ওখানকার আপামর সব মহিলাদের এই প্রথা মেনে চলতে হয়। সেই ঘরের না আছে কোনও দরজা, না আছে কোনও জানলা।

ক্রমশ…

 

একটা ঘরে ফেরার গল্প (৩ পর্ব)

৩ পর্ব

আজ সকালে বেড-রোল গুটিয়ে তেরো নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন টয়লেটের বিপরীত দেয়ালে তালাবন্ধ ঢাউস কাঠের বাক্সটা খুলে বিছানাপত্র ঢুকিয়ে, টয়লেটের দিকে তাকাতেই অর্জুন বুঝতে পারল, তখনও পর্যন্ত টয়লেট একরকম ফাঁকাই রয়েছে বলা চলে। তার মানে ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাতটা বাজলে কি হবে, এখনও পর্যন্ত কোনও ট্রেন স্টেশনে ঢুকতে পারেনি। প্রাতঃকৃত্য-স্নানাদি সেরে, বাইরে বেরোতেই অর্জুনের চোখে পড়ল — বারো নম্বর প্ল্যাটফর্মে রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেস এসে দাঁড়িয়ে আছে। জামা-প্যান্ট-জুতো গলিয়ে, পিঠব্যাগটা কাঁধে নিয়ে, ধীর পায়ে অর্জুন চোদ্দো নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন এস্ক্যালেটরের দিকে পা বাড়াল। তার পুষ্যিগুলোকে ঘুম থেকে উঠিয়ে, রোজকার মতন টিফিন হাতে ধরিয়ে দিয়ে, স্কুলমুখো রওনা করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

সারারাত ধরে দুর্যোগ-ক্লিষ্ট, অনিশ্চিত যাত্রার শেষে, ক্লান্ত আচ্ছন্ন শরীরে মালপত্র টানাটানি করে প্যাসেঞ্জাররা সব ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্ম পার করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তার মধ্যে অর্জুন খেয়াল করল, জিআরপি’র লোকজন ধরাধরি করে কাউকে যেন ওই ট্রেনের সাধারণ কামরা থেকে নামিয়ে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে, প্যাসেঞ্জারদের মধ্যে অনেকে চলার পথে সেদিকে অগ্রসর হয়ে, উকিঝুঁকিও মারছে। অর্জুনও কৌতূহল দমন করতে না পেরে সেদিকেই পা বাড়াল।

ভিড় ঠেলে কাছাকাছি পৌঁছোতেই, এবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে— একটা মেয়ে পাশ ফিরে অচৈতন্য অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। তার জামা-প্যান্ট রক্তে ভেজা; যা দেখে ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ মন্তব্য করছে, ‘চল চল, পাগলি-টাগলি হবে’। আবার কেউ বলছে, “না না, রেপ কেস! চল, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে ঝামেলা বাড়ানো।’ অর্জুন কাছে গিয়ে, জিআরপি’র একজন এসআই-কে দেখে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে এর?”

—কী যে হয়েছে, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। সারারাত সাধারণ কামরার টয়লেটের মধ্যে অচৈতন্য অবস্থায় পড়েছিল। প্যাসেঞ্জাররা নাকি রাত থেকেই ওকে এইরকম অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছে ওই টয়লেটের মধ্যে। ঝামেলা এড়াতে কেউ আর কোনও সাড়াশব্দ করেনি। অনেকে বলছে, রেপ-কেস হতে পারে। কিন্তু জ্ঞান না ফিরলে, কিছুই জানা যাচ্ছে না— জিআরপি’র এসআই জয়ন্ত ঘোষ মেয়েটির রক্তে ভেজা জামা-প্যান্টের দিকে ইঙ্গিত করে, অর্জুনের প্রশ্নের উত্তর দিলেন।

এই স্টেশন চত্বরে রেল পুলিশের সব লোকজনই অর্জুনকে খুব ভালো করে চেনে। অর্জুন সঙ্গে সঙ্গে তাই এসআই-এর উদ্দেশ্যে বলল, ‘অবস্থা কিন্তু খুব একটা ভালো ঠেকছে না। এক্ষুনি একে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।’ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই, পাশেই বিল্টুকে দেখতে পেল অর্জুন। বিল্টুর হাতে ওর দলবলের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করার জন্য দু’শো টাকা দিয়ে বলল, “তুই সবার টিফিনের বন্দোবস্ত করে, সকলকে স্কুলে পাঠিয়ে দিবি ঠিকমতো। আমি একে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি। তুই চট করে কুলিদের থেকে একটা হ্যান্ড ব্যারো নিয়ে আয়।”

এরপরে এসআই জয়ন্ত ঘোষ আর অর্জুন দু’জনে মিলে মেয়েটাকে হাওড়া জেলা হাসপাতালে নিয়ে এল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেয়েটার অবস্থা দেখে, ওকে সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করে নিয়ে, স্যালাইন, ইঞ্জেকশন প্রভৃতি প্রক্রিয়া চালু করে দিল। মেয়েটার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় জয়ন্ত ঘোষের সাথে অর্জুন ওয়ার্ডের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। দুপুরের পরে, ক্ষণিকের জন্য মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে ডাক্তার জানালেন, ‘মেয়েটি শারীরিক ভাবে অসম্ভব রকমের দুর্বল। মনে হয় চার-পাঁচদিন ধরে পেটে কিছু পড়েনি। ক্ষীণ স্বরে কিছু হয়তো বলছে, যদিও তার বিন্দু-বিসর্গ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সামান্য সময়ের জন্য জ্ঞান ফিরলেও, আবার জ্ঞান হারাচ্ছে। দেখুন, আবার জ্ঞান ফিরলে, ওর কাছ থেকে যদি কোনও তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন! পরীক্ষায় ধর্ষণ সংক্রান্ত কোনও তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। তবে মেয়েটি ঋতুকালীন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ভালো করে জ্ঞান না ফিরলে, বেশি জোর জবরদস্তি করে কিছু জানার চেষ্টা করা উচিত নয়।’

ক্রমশ…

 

 

একটা ঘরে ফেরার গল্প (২-পর্ব)

২ পর্ব

পড়শিদের চিৎকার আর আলোচনা শুনে শ্রাবণী জানতে পেরেছিল, ওর জ্ঞাতিরা তার মা-বাবাকে মেরে ওদের জায়গা জমি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। দিন দু’য়েক বাদে গাঁয়েরই এক পিসে ওকে বুঝিয়েছিল, এভাবে পথে পথে কেঁদে বেড়ালে, না আর বাপ-মাকে খুঁজে পাবি; না জোটাতে পারবি পেটের ভাত। তার চেয়ে আমার সাথে চল, কলকাতার একটা অনাথ আশ্রমে ভর্তি করিয়ে দেব’খন। সেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই যেমন একটা পাবি; দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের সঙ্গে দু’অক্ষর লেখাপড়াও শিখতে পারবি। পথে পথে ভিক্ষে করে আর বেড়াতে হবে না তোকে।

কিন্তু হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার পরে, সেই পিসেকে আর খুঁজে পায়নি শ্রাবণী। পরে জিআরপি’র এক পুলিশ অফিসার কাকুর কাছ থেকে শ্রাবণী জেনেছিল, ওটা তোর পিসে না ছাই! ওটা শিশু পাচার চক্রের একটা দালাল। তোকে বেচে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়ে, তোকে ফেলে রেখে এখান থেকে পিঠটান দিয়েছে।

হাওড়া স্টেশন থেকে বেরিয়ে, পূর্বপ্রান্তের রাস্তার ওপারে একটা ভাতের হোটেলে নিয়ে গিয়ে, সেইদিন দুপুরে মাছ-ভাত খাইয়ে, রেল-পুলিশের অফিসার শ্রাবণীকে ওই ভাতের হোটেলে রেখে দিয়ে, চলে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, আপাতত তুই এখানেই থাক, টুকটাক ফাই-ফরমায়েশ খেটে দিবি। দু’বেলা দু’মুঠো ভাত যেমন পেয়ে যাবি, তেমনই মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইও হয়ে গেল তোর। কিন্তু হোটেল মালিক কথায় কথায় যেমন ধমক-ধামক আর তার সাথে চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকুনি দিত, তা মোটেও পছন্দ হতো না শ্রাবণীর।

একদিন ভোর হওয়ার আগে হোটেল থেকে পালিয়ে, প্রথম মেদিনীপুর লোকাল ধরে, সোজা খড়গপুর স্টেশনে গিয়ে নেমে পড়েছিল সে। সেখানে কিছুদিন ট্রেনে ট্রেনে ভিক্ষে করে বেশ ভালোই দিন কেটে যাচ্ছিল তার। হঠাৎ করে একদিন রেল পুলিশের তাড়া খেয়ে, বছর দুয়েক বাদে আবার হাওড়া স্টেশনে ফিরে আসে সে। তারপর থেকে রোজ সারাদিন ধরে এ ট্রেন ও ট্রেন ভিক্ষে করে বেড়ানোর শেষে, রাতে ফিরে আসত এই তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে শুয়ে, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ত শ্রাবণী।

আর রোজ সন্ধ্যায় অর্জুনের পাশে বসে, কোলে চেপে, সবচেয়ে ছোটো যে মেয়েটা স্লেট-পেন্সিল নিয়ে, সবে অক্ষরজ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত; তার নাম শান্তা। শান্তার জন্ম এই তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মেই। সেও এক প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির রাতে। জন্ম দেওয়ার পরে, ওকে ফেলে রেখে ওর মা-টা যে কোথায় চলে গিয়েছিল, তা কে জানে! মা-কে ছাড়া অতটুকু শিশু এতটুকু টু-শব্দটি পর্যন্ত করেনি কোনওদিন। ছোটো থেকেই সে এতই শান্ত ছিল যে, অর্জুনই ওর নাম দিয়েছিল— শান্তা!

এদের সঙ্গে অর্জুন দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হলেও, এদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ করে, এই তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বাসিন্দা বানাতে সক্ষম হয়েছে সে; তাও প্রায় বছর তিনেক হয়ে গেল। এদের বেশির ভাগই আগে প্ল্যাটফর্মে বসে, ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে ভিক্ষে করে বেড়াত। সুযোগ পেলে যাত্রীদের মালপত্র থেকে হাতসাফাই করে, দু’-চার টাকা কামিয়ে নিতেও সিদ্ধহস্ত ছিল এরা।

অর্জুন বুঝেছিল, এদের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পেট চালানোর একটা বন্দোবস্ত করে দিতে পারলে আর নিয়মিত ভাবে পড়াশোনার জগতে ব্যস্ত করে রাখতে পারলে, তবেই এদের এই অসৎ উপার্জনের থেকে বিরত রেখে, একটা সুস্থ জীবনের আলো দেখানো সম্ভব। তাই সকাল হতেই কোনওদিন লুচি-তরকারি, কোনওদিন কেক, কোনওদিন কলা-পাউরুটি ধরিয়ে দিয়ে, সকলকে আজকাল টিকিয়াপাড়ার রেল লাইনের ধারের স্কুলে পাঠিয়ে দেয় অর্জুন। সেখানে প্রাপ্ত মিড-ডে মিলের সুবাদে দুপুরের খাওয়াটাও জুটে যায় রোজ। রাতে তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন গোডাউনের পাঁচিলের ধারে বসে ঘন্টা দুয়েকের পড়াশোনার পরে, একুশজনের এই দলটা চলে যায় হাওড়া স্টেশনের বাইরে নদীর ধারের ভাতের হোটেলে নৈশভোজ সারতে। তারপর সেখান থেকে ফিরে এসে, ওই গোডাউনের পাঁচিলের ধারেই সবাইকে শুইয়ে দেওয়ার পরে, রাতের এই ক’ঘন্টার জন্য অর্জুনের সারাদিনের সব ব্যস্ততার অবসান।

ক্রমশ…

 

স্বপ্নের শেষ দৃশ্য (প্রথম পর্ব)

বিয়ে বাড়ির শামিয়ানা। হ্যালোজেন আর টুনিবাল্বের আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক যেন দিনের সূর্যকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে। শামিয়ানার ঠিক দোরগোড়ায় বর্শা হাতে দুই সান্ত্রি দুর্গ পাহারা দেওয়ার কায়দায় দণ্ডায়মান। তারা পূর্ব শর্ত অনুযায়ী নিয়মমাফিক কাজ করে চলেছে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই দু’জনে একসঙ্গে বর্শা দুটো সরিয়ে নিয়ে নিমন্ত্রিতদের ভেতরে প্রবেশ করার পথ করে দিচ্ছে। ওদের দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন কলের পুতুল।

চোখ ধাঁধানো বাতিটা হাতের তালুর সাহায্যে আড়াল করে সন্তোষবাবু ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছিলেন। শামিয়ানার কাছাকাছি পৌঁছতেই হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখা অর্পণের সঙ্গে। বহুদিন পরে দেখা দু’জনার। মুখোমুখি হতেই একে অন্যের দিকে হতবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সন্তোষবাবু আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে বলে ওঠেন— আরে অর্পণ যে! কী খবর? কোথায় থাকো আজকাল? তোমাকে আজকাল কোথাও দেখাই যায় না! এখানে তোমার সাথে যে আমার দেখা হবে তা ভাবতেই পারিনি।

একটু নীরবতা পালনের পর তিনি জানতে চাইলেন— তারপর বলো তুমি কন্যাপক্ষ না বরপক্ষ?

অর্পণ হেসে জবাবদিহি করে বলে— নিঃসন্দেহে আমি কন্যাপক্ষ। আমার পাড়ার মেয়ে। বউভাতের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছি।

সন্তোষবাবু রসিকতা করে বলেন— তুমি হলে কন্যাপক্ষ আর আমি হলাম বরপক্ষ। সুতরাং বুঝতেই পারছ আমি তোমার চেয়ে উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি। তুমি যখন কন্যাপক্ষ তাহলে বাইরে না দাঁড়িয়ে চলো ভেতরে ঢোকা যাক। আজকের দিনে তুমি আমাদের অতিথি। ভীষণ ঠান্ডা বাইরে। এখানে একাকী ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থেকে অন্যমনস্ক হয়ে কী দেখছিলে এতক্ষণ ধরে?

কথাটা মিথ্যে নয়। অর্পণ অনেকক্ষণ যাবৎ অবাক বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে কী যেন নিরীক্ষণ করছিল। দু’চোখ ভরে যা কিছু দেখছিল তাতেই ঘোর লেগে যাচ্ছিল তার। বারংবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল। কেবলই মনে হচ্ছিল ঠিক একইরকম পরিবেশে সে এর আগে অন্য কোথাও উপস্থিত ছিল। সেদিনের পরিবেশটা তার কাছে বহু পরিচিত বলে মনে হচ্ছিল। সে অবাক হচ্ছিল এই ভেবে যে, হঠাৎ কীভাবে সে জাতিস্মর হয়ে উঠল? কিন্তু জাতিস্মরেরা তো পূর্বজন্মের স্মৃতি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। এতদিন পরে মানস পটে কি তাহলে পূর্বজন্মের কথা ভেসে উঠছে? সেই মুহূর্তে তার আর অন্য কিছু মনে পড়ছিল না। মনে মনে ভাবে তাহলে কি স্বপ্নে কখনও দেখেছিল এই দৃশ্য! একসময় নিজেকেই সে সান্ত্বনা দিয়ে বলে— বোধহয় তাই হবে! স্বপ্নেই দেখে থাকবে হয়তো।

সন্তোষবাবু তাকে পুনর্বার তাড়া দিয়ে বলেন— কী দেখছ তখন থেকে? আমি তো দেখার মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। চলো ভেতরে চলো। দিল্লি শহরে এরকম লাখ টাকার প্যান্ডেল তুমি অনেক দেখেছ এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এখানে না দাঁড়িয়ে ভেতরে গিয়ে দাঁড়াই চলো।

অর্পণ প্রত্যুত্তরে জিজ্ঞাসা করে— আমি কী দেখছি? দেখছি আমার স্বপ্নে দেখা এক চলমান দৃশ্যপটের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। অর্পণ আগের মতোই অবাক দৃষ্টিতে প্যান্ডেলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে— আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, এখানে দাঁড়িয়ে আমি কিন্তু একমাত্র আপনার কথাই চিন্তা করছিলাম। আমার মন বলছিল আপনি আসবেন।

(ক্রমশ…)

 

ভুলের মাশুল (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

নেগেটিভিটিতে ভরপুর জীবন তারক সিং-এর। ভালো চিন্তা কিছু নেই, সর্বক্ষণ দুঃখী ভাব। তার শরীরের কলকবজা বিকলের কাহিনি, প্রায় প্রত্যহ এদের শুনতে হয়। কেষ্ট দাস ঠিক তার উলটো। সর্বসময় প্রাণচঞ্চল তেজি ঘোড়া। একেবারে টগবগ করে ফুটছে। তবে মুখে কোনও লাগাম নেই। ‘অমিতসাব, পাক্কা দো’দিন মেরা টয়লেট নেহি হুয়া।’ বললেন তারক সিং। অমিতবাবু কিছু বললেন না, তিনি নিজেই বেশ ক’দিন ধরে নড়বড়ে। মুখ খুললেন কেষ্ট দাস।

—কোনটা বন্ধ, হিসি না হাগু?

—নেহি, ও তো কর রাহা, লেকিন হা…

—পিছনে বাতি দিন, সেরেফ বাতি।

—দূর মশাই, কী যে বলেন! হেসে ফেলেছেন অমিত সেন।

—কেন, লজ্জার কী আছে দাদা! ছেলেবেলায় আমরা সবাই তো…, হো হো করে হাসছেন দু’জনে। তারক সিং-ও গাঁদাল পাতা গেলা মুখ করে হাসতে বাধ্য হলেন। এইসব করে যখন অমিতবাবু ফ্ল্যাটে ফিরলেন নীচের পাম্পের ঘরের সামনে বেশ কয়েকজন আবাসিকের জটলা। আষাঢ়ে মেঘের ইঙ্গিত পেলেন অমিতবাবু। চারতলার গঙ্গাগোবিন্দবাবু, তিনতলার ভিনেশ জোশি, দোতালার অটল সাঁপুই, ডাঃ নিতিশ মিত্র— সবাই আছেন। কেমন যেন ভিলেন ভিলেন গন্ধ খুঁজছে সবাই তাঁর শরীর থেকে।

অটল সাঁপুই কিছুদিন আগে ছানি কাটিয়ে এসেছেন। চোখের দৃষ্টি বেড়ে গেছে, তিনি কাছে এসে খুব একেবারে গোয়েন্দা কায়দায় মাপতে লাগলেন অমিতবাবুকে। অমিতবাবু বুঝতে পারলেন না, কী খুঁজছেন রিভলবার না রক্তমাখা ছোরা! আসরে প্রথম এগিয়ে এলেন ভিনেশজি।

—আপনি কী করলেন মিঃ সেন? ওয়াটার পাম্প একদম খারাপ করিয়ে দিলেন। অমিতবাবু কিছু বুঝতে পারলেন না, শুধু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

গঙ্গাগোবিন্দ মণ্ডল সংক্ষেপে যা বললেন তার সারমর্ম হল, ‘সকালে অমিতবাবু পাম্প চালিয়ে চলে গেসলেন। আবাসিকরা কেউ তা জানতেন না। দীর্ঘক্ষণ চলায় পাম্পের মোটর পুড়ে গেছে। সারাই করতে অনেক টাকার ধাক্কা।’

নিতিশ মিত্র প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন, “তিনি এই বাবাদ এক কানাকড়িও দেবেন না।’ অমিতবাবুর মনে হল অন্য সকলে নির্বাক থেকে নিতিশবাবুর মতেই মত দিলেন। আর এখানে দাঁড়ালেন না তিনি। তিনতলায় তাঁর নিজের ফ্ল্যাটের বেল বাজালেন। কাজের লোক বুলি দরজা খুলল। এখানেও সন্দেহের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। এক গেলাস জল খেয়ে খবরের কাগজটা হাতে নিলেন। হঠাৎ হাত থেকে কে যেন টেনে নিল কাগজটা। স্ত্রী, বিমলা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতে চেক বই।

স্ত্রীর দিকে মুখ তুলে তাকালেন তিনি। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। থমথমে মুখ। ভয় পেলেন অমিতবাবু, কিছু না বলাই শ্রেয় মনে করলেন। মুখ খুললেন বিমলা। পাম্পটা ঠিক করতে প্রায় বারো হাজার টাকা লাগবে। আমি কল মিস্ত্রী রাজু-কে খবর দিয়েছি। ও একটু বাদে এসে চেক নিয়ে যাবে। কোনওরকম ভূমিকা না করে চেকবইটা সামনে রেখে চলে গেল বিমলা।

আমিতবাবু বুঝতে পারলেন এই বাড়ির বারোটা ফ্ল্যাটেই তিনি এখন খলনায়ক! শুধু জানতে পারলেন না, খবরটা চেন্নাই-তে ছেলে অত্রি অবধি পৌঁছেছে কিনা! যাই হোক, নিজের ভুলের মাশুল চোকাতে বারো হাজার টাকার একটা চেক লিখে টেবিলের উপর কলম চাপা দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। বিমলাদেবী দেখলেন কিন্তু বাধা দিলেন না। লোকটার মনেপ্রাণে আজ একটু মুক্ত হাওয়ার দরকার।

 

জোড়া শালিক (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

একবার সুশীলা এবং সুনীল ব্যাংক থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরছে। সুনীলের বাইকের পিছনে সুশীলা বসল। হঠাৎ করে ব্যাংকের দরজার বাইরে পেয়ারা গাছেতে জোড়া শালিকের একটি ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য শালিকটাও কাঁই কাঁই করে উঠল। সুনীল তখন সবে বাইক স্টার্ট দিয়েছে। গাছটা ওদের ঠিক ডান পাশে। ভালো করে দেখার জন্য সুশীলা ‘রুকিয়ে জি’ বলে লাফিয়ে নেমে পড়ল বাইক থেকে। কান হেলমেটে ঢাকা থাকাতে সুনীল কিছুই শুনতে পায়নি। বাইক ব্যাংকের পরিসর থেকে বেরিয়ে বাড়ির রাস্তা ধরল।

জোড়া শালিকে মাথা ঠোকা শেষ হলে সুশীলা সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখল সুনীল ও বাইক দুটোই ধারে কাছে নেই। এদিকে অনেকটা যাওয়ার পর সুনীল অনুভব করল পিছনটা বেশ হালকা লাগছে। পিছনে তাকিয়ে দেখে বউ নেই। দুশ্চিন্তায় বাইক ঘোরাল ব্যাংকের দিকে। ব্যাংকে পৌঁছে অবাক, সুশীলা সেখানে নেই! সুনীলের সঙ্গে আসবে বলে সুশীলা ফোনটাও আনেনি। কী করবে ভাবছে, এমন সময়, গেটের বাইরে বসে থাকা মুচিটা বলল, ‘সাব কিসিকো ঢুঁঢ রহা হ্যায় ক্যায়া?’

সুনীল বলল, ‘মেরি পত্নি কুছ দের পহলে এহি থি, কহা চল দি পতা নহি, ফোন ভি নহি হ্যায় উনকি পাস।’

—এক মেডামজি থোড়া পরিশান দিখ রহি থি। ও তো পয়দল চল দিয়ে।

সুনীল আর্তস্বরে বলল, “কিধার চল দিয়ে, দেখা আপনে?’

—জি সাহাব বাঁয়ে তরফ গয়ি, জবাব দিল মুচি।

এবার প্রমাদ গুনল সুনীল, উলটো দিকে হাঁটা দিয়েছে সুশীলা। বাইক ঘোরাল ডান দিকে। কিছুটা এগোতেই দেখা পেল সুশীলার। ও হেঁটেই বাড়ি যাবে, কিছুতেই সুনীলের বাইকে চড়বে না। অনেকবার সরি বলার পরেও মানতে নারাজ। অগত্যা সুনীল বলল, ‘মগর হামারা ঘর দুসরা তরফ হ্যায়, রাস্তাপে খো যাওগি।’ এবার ভয় পেয়ে গেল সুশীলা, ফিরে এসে বাইকে বসল।

এহেন সুশীলাদেবীর ঝোলা বারান্দার সামনে কবিতাদেবীর বারান্দা। কবিতাদেবী এবং ওনার স্বামী দুবেজি ধার্মিক প্রকৃতির। দুবেজি সকালবেলায় স্নান করে সূর্য প্রণাম করেন। এরকম একদিন, দুবেজি যখন সূর্য প্রণাম সারছেন, সেই সময় এক জোড়া শালিক কচর কচর করতে করতে দুবেজির বারান্দার মাথার উপর কার্নিশে এসে বসল। জোড়া শালিকের কচকচানি শুনে সুশীলা দৌড়ে এসে দরজা খুলে জোড়া শালিক সকাল সকাল দেখে আনন্দে আত্মহারা। ভাবাবেগে পরের পর ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল।

ভগবান বন্দনায় মত্ত দুবেজি পরপর চুমু ছুড়ে দেওয়ার আওয়াজ শুনে চোখ খুলে দেখেন, সুশীলা দেবী চোখ বুজে ক্রমাগত চুমু ছুড়ে দিচ্ছেন তার দিকে। বয়সে অনেকটা ছোটো সুশীলা ওনার থেকে। দুবেজির স্ত্রী রীতিমতো দাপুটে। ভগবানবন্দনা অসম্পূর্ণ রেখে বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে ভিতরে চলে গেলেন দুবেজি! সংবিৎ ফিরে এল সুশীলার, এবার খেয়াল হল তির ভুল জায়গায় বিঁধেছে!

চুমুর আওতায় শালিক ছাড়া দুবেজিও ছিলেন। শালিক-চুম্মা দুবেজি-চুম্মাতে পরিণত হয়েছে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম। দুবেজিও চাচা নিজের প্রাণ বাঁচা, ঝুল বারান্দায় আসাই বন্ধ করে দিলেন। সুশীলা অনুশোচনায় দগ্ধ। এ কি কাণ্ড হল! ছেলে বড়ো হয়ে গেছে, পাঁচকান হলে আর রক্ষে নেই। বাধ্য হয়ে স্বামী সুনীলকে বলল কিছু একটা করতে।

সুনীল সাফ জানাল, ‘হামসে কুঁছো না হতোই। ই তোহার লাফরা, হম না পরবু।’

এমত অবস্থায় একদিন নীচে মন্দিরে যেতে গিয়ে সামনে পেলেন দুবেজি পত্নি কবিতাজিকে। হিম্মত করে বলেই ফেললেন সমস্ত ঘটনা। সব শুনে কবিতাজি বললেন, ‘ছোড়িয়ে আপ ময়না কো দিয়ে, ক্যায়া দুবেজি কো দিয়ে — ম্যায় ক্যায়া জানু। ঔরতকো সমাহালকে রহনা চাহিয়ে। হমলোগ হ্যায় সজ্জন ব্রাহ্মণ।’ বলে গটগট করে চলে গেলেন কবিতা।

সুশীলার মাথায় হাত— এবার বোধহয় পাড়ায় ঢিঢি পড়তে আর খুব বেশি দেরি হবে না!

 

জোড়া শালিক (পর্ব-২)

পর্ব ২

সুশীলা দেখতে সুন্দরী, তার উপর মাঞ্জা দিয়ে গেছিল। বাড়ি ফিরে সুনীল, শালাকে ফোন করে বলল, ‘অব সে ডগডর কে পাস অপনি পাগলেট দিদিকো তুমহি লেকে জানা, আজ বহুৎ বেইজ্জত হুয়া মেরা।’

বলা বাহুল্য ডাক্তারের ওষুধ বেশিদিন চলল না এবং চরিত্রের পরিবর্তনও এল না। এই অসুবিধার জন্য সুনীল কোনও লম্বা দূরত্বের ট্রেনজার্নি সুশীলাকে নিয়ে করে না। কারণ সুশীলা ট্রেনের টয়লেটে কিছুতেই যাবে না। একবার ভাগ্নির বিয়েতে গুয়াহাটি নিয়ে গেছিল। গুয়াহাটি পৌঁছোতে বিকেল হয়ে গেল। সমস্যা দেখে, সুনীল ফিরতি পথে ফ্লাইটে এল।

সুশীলার এই আচরণে সবচেয়ে দুঃখী সুশীলার শ্বাশুড়ি মা। ভদ্রমহিলা যৌথ পরিবারে সংসার করেছেন, ভাসুর, দেওর ও জায়েদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতেন। ওনারা এখন বাড়ির কাছাকাছি সবাই থাকেন। এছাড়া সুশীলার তিন ননদ। তারাও কাছাকাছি থাকেন। এরা সবাই সুশীলার ছোঁয়াছুঁয়ির ও সেই নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত হয়ে সহজে এই বাড়িতে পা রাখেন না। এই নিয়ে বাড়িতে কম অশান্তি হয়নি। কিন্তু সুশীলা নিজেকে একটুও বদলায়নি।

নিজের এই চারিত্রিক অবস্থা নিয়ে সুশীলা কখনও মনে মনে নিজেই বিব্রত বোধ করে। বুঝে পায় না কী করবে! একেক সময় মনে করে কিছুতেই এসব নিয়ে ভাববে না। কিন্তু সেরকম কিছু দেখলে মনের মধ্যে খচখচ হতেই থাকে। নিজের এই বিব্রত বোধ কাউকে বললে একমাত্র রেখা ছাড়া সবাই বিস্তর জ্ঞান দেয়।

কাজের মেয়ে রেখা সুশীলাকে খুব তেলিয়ে চলে। রেখাই একমাত্র সুশীলাকে বোঝে, এরকমটাই সুশীলা মনে করে। তার জন্য মাঝে মাঝে দুশো চারশো টাকা রেখাকে ধারও দেয়। সেগুলো পরে ধার থেকে দান-এ পরিবর্তিত হয়ে যায়। টাকা ফেরত কখনওই বেচারি রেখা দিতে পারে না। তবুও টাকা নেওয়ার সময় ধার বলেই সুশীলার থেকে নেয়।

একদিন সুশীলা যখন ওর মনের দুঃখের কথা রেখাকে বলে, রেখা ওকে আশ্বস্ত করে, বলে ও এক গুনিনকে জানে যার অব্যর্থ ঝাড়ফুঁকে এসব নিমেষে ঠিক হয়ে যায়। সেইমতো বাড়ির লোককে লুকিয়ে সুশীলা রেখার সঙ্গে গুনিনের ডেরায় পৌঁছোয়। গুনিন গঙ্গার পাড়ে এক পোড়ো বাড়িতে ভেড়া বানিয়েছে। বাড়ির ভিতর ঢুকেই সুশীলার গা ছমছম করতে থাকে। নিজেকেই নিজে দোষ দেয় এই ভেবে যে, এরকম জায়গায় কাজের লোকের কথায় এই ভাবে আসাটা ঠিক হয়নি।

সুশীলার অবস্থা দেখে রেখা ওকে অভয় দেয়। সুশীলাকে নিয়ে ভিতরে ঢোকে। গুনিন তখন এরকমই আরেক রোগীর রোগ সারাতে ব্যস্ত। সমানে একটা ময়ূরপঙ্খি ঝাড়ু দিয়ে সপাং সপাং করে পিঠে মারছে, আর চলছে উটপটাং মন্ত্র উচ্চারণ। মার খাওয়া রোগী ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে গোঙিয়ে চলেছে। সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর ভয়াবহ পরিবেশ।

সুশীলা এক ঝটকায় রেখার হাত ছাড়িয়ে পিছন ফিরে দৌড় লাগাল। থামল এসে গলি থেকে বেরিয়ে মেন রোডে। পিছনে পিছনে ‘এ ভাবি, এ ভাবি’ বলে চীৎকার করতে করতে রেখাও দৌড়োতে দৌড়োতে এসে পৌঁছেছে। একটা খালি অটো থামিয়ে তাতে চেপে বসল সুশীলা। রেখা তখনও পিছনে ডেকে চলেছে। অ্যাপার্টমেন্টের ভিতরে ঢুকে শান্তি পেল সুশীলা। এরপর রেখার চাকরিটা ওই বাড়িতে আর একদিনের জন্যও টেকেনি।

জোড়া শালিকে খুব আস্থা সুশীলার। জোড়া শালিক দেখলে দিন ওর খুব ভালো যায়। এক শালিক দেখলে নাকি খুব খারাপ যায়। নিদেনপক্ষে শাশুড়ির বকা তো খেতেই হয়। এর একটা নিদানও বের করেছে সে। যেদিন এক শালিক দেখে আর জোড়া শালিক দেখা হয় না, সেদিন কপালে তর্জনি দিয়ে ‘জ’ আঁকে। তাতে নাকি কিছুটা রেহাই হয়। তবে সকাল সকাল ভুল করে একটা শালিক দেখলে ছাদে গিয়ে দ্বিতীয়টার দর্শন না করে খান্ত হয় না সে।

ক্রমশ…

 

জোড়া শালিক (পর্ব-১)

আমাদের পাটনার আবাসনের ফ্ল্যাটগুলোর বেশ কিছু ব্যালকনির অবস্থান এরকম, একটা ব্যালকনিতে দাঁড়ালে অন্য ব্লকের ব্যালকনির ঠিক মুখোমুখি দাঁড়ানো যায়। এর সুফল অনেক, যেমন আমার স্ত্রী-কে এঘর ওঘর ঘুরে না পেলে আমি সোজা ব্যালকনিতে পৌঁছে যাই। দেখি সামনের ফ্ল্যাটের পল্লবীর মায়ের সঙ্গে গল্পে মশগুল। পল্লবীর বাবা চাকরিসূত্রে পাটনার বাইরে কর্মরত। সামনাসামনি ব্যালকনি হওয়ার কুফলও আছে! আজকের গল্প সেই কুফল কে নিয়ে।

আমার পাশের ফ্ল্যাটের গৃহিণী হলেন সুশীলা শর্মা। তিনি ভালোরকম খুঁতখুঁতে ও বাতিকগ্রস্ত ভদ্রমহিলা। বিড়াল রাস্তা কেটে বেরিয়ে গেলে, বরকে ধমকে বাইক থামিয়ে দেন। বেরনোর সময় হাঁচি পড়লে, তখনকার মতো যাত্রা বন্ধ। সৌন্দর্য নিয়ে প্রশংসা করলে বলেন – নজর মত লাগাইয়ে জি। রাস্তায় ভুলবশত স্বামীর বাইক কোনও বিষ্ঠার ওপর দিয়ে গেলে বাইক, স্বামী ও নিজেকে স্নান না করিয়ে ছাড়েন না।

একবার ব্যালকনিতে গিয়ে দেখেন পিঁপড়ের সারি রেলিং-এ শুকোতে দেওয়া বালিশের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তারা আসছে পাশের একটা নির্দিষ্ট পাইপ বেয়ে। ব্যালকনির পাশেই বাথরুম, পাইপগুলো বাথরুম থেকেই বেরিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বালিশগুলো পত্রপাঠ বিদায়। ওনার এই অদ্ভুত আচরণে স্বামী সুনীল বেচারা বিরক্ত এবং পরিশ্রান্ত। কোনও ভাবে সুনীলকে কোনও পাইপের তলা দিয়ে আসতে দেখলে ধুন্দুমার লেগে যায় শর্মা পরিবারে। বেচারিকে বাড়িতে ঢুকে সোজা বাথরুমে স্নান করতে হয়। শাস্তির বহর এখানেই শেষ নয়, এর থেকেও বড়ো শাস্তি পেতে হয়।

শীতের দিনে মাঝ রাত্তিরে আদিম খেলার ইচ্ছা জাগলে, সম্ভোগের পর বেচারা সুনীলকে ৫ ডিগ্রি টেম্পেরেচারেও পুরোদস্তুর স্নান করতে হতো। এহেন অত্যাচারের ফলে প্রায় বারো মাসই পাশের ফ্ল্যাটে সুনীলের ‘হ্যাঁচ্চো” “হ্যাঁচ্চো’ লেগেই থাকত। সেই হাঁচিও আবার আমার জন্য বিশেষ বিশেষ সময়েতেই বরাদ্দ থাকত। আমি বাড়ির থেকে বেরোতে গেলে, ঘুম থেকে উঠে মাটিতে পা দেওয়ার আগে, ভাতের থালায় প্রথম গ্রাসটা মুখে দেওয়ার প্রাক্ মুহূর্তে ইত্যাদি ইত্যাদি।

সুশীলার এই পাইপ নিয়ে শুচিবাই অনেকেই জেনে গেছেন। কেউ কেউ ভালোবেসে নাম দিয়েছেন পাইপওয়ালি ভৌজাই। এক অদ্ভুত যুক্তিতে বলির পাঁঠা হয়েছিল বাড়ির দ্বিতীয় বাথরুমের ওয়েস্টার্ন স্টাইলের কমোডটা। সেটিকে সমূলে উৎপাটিত করে সিমেন্ট বালি দিয়ে একটা স্মৃতি সৌধ করে রাখা হয়েছে। যুক্তিটা ছিল কমোড মানে ছোঁয়াছুঁয়িতে পুরো শরীর অশুচি। বাড়ির অন্য লোকরাও তিতিবিরক্ত হয়ে ওটাকে সাবেকি দেশি প্যানেতে বদলাননি। সুনীল তো বিরক্ত হয়ে যৌবনেই আলাদা বিছানায় শোওয়ার ব্যবস্থা করে নিল।

ছেলে ঈশান মায়ের এই ব্যবহারে ভীষণ ক্ষিপ্ত। কোনও বন্ধুকে বাড়িতে আনে না। আসলেই প্রশ্ন— “ঈশানওয়া তোরা দোস্তলোগ নীচলকা পাইপ নহি না ছুল হ্যায়?’ কী অপমান! কী অপমান! আমরাও কোনও দরকারে দরজায় দাঁড়িয়েই কথা সেরে নিতাম, নিতান্তই নিরুপায় না হলে ঘরে ঢুকতাম না।

একবার হোলিতে ধুন্দুমার। ফ্ল্যাটের ছাদে বিকেলবেলায় সবাই সবাইকে আবির লাগাচ্ছে। আমরা সবাই সুশীলা ভাবিকে এড়িয়েই যাই। সেবার নতুন ভাড়াটে এসেছেন মনোজজি। সুশীলা ভাবি দেখতে মন্দ ছিলেন না। বেচারা মনোজজি একমুঠো আবির নিয়ে সুশীলা ভাবির গায়ে দিয়ে বললেন— ‘মেরি ইতনি সুন্দর ভাবিকো কোই ধ্যান হি নহি দে রহা হ্যায়।’

আবির লাগানোর পর সুশীলা ভাবির মনোজজির স্ত্রীকে সোজা সাপটা প্রশ্ন— ‘বহনজি, মনোজজি উধার ওয়ালা পাইপ নহি না ছুঁয়া।’ লেগে গেল ধুন্দুমার। ছোঁয়াছুঁয়ির রোগ সুশীলার কিছুতেই যায় না। রোজ বাড়িতে অশান্তি, ভাইয়েরা এসে বোঝায়, মা এসে বকা দিলেন— কোনও পরিবর্তন নেই। অগত্যা সবাই মিলে অনেক কষ্টে রাজি করাল মনোবৈজ্ঞানিক ডাক্তার দেখানোর, নিয়ে যাবে সুনীল। বউয়ের নির্যাতনে দিশাহারা সুনীল বেচারা সাদামাটা থাকে। বউ, সংসার এবং অফিস সামলাতে গিয়ে অনেক সময় দাড়ি কাটার সময় পায় না।

কর্তা-গিন্নি পৌঁছোলেন ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তারের পসার ভালো, লাইনে অপেক্ষা করতে হল। পেশেন্টদের নম্বর দেওয়া হয়েছে। সময় আসলে নম্বর ধরে ডাকা হচ্ছে। ওদের নম্বর আসতেই ওরা ডাক্তারের ঘরে ঢুকতেই সুশীলাকে আটকে দিয়ে সুনীলের হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল— ‘রুকিয়ে মেডাম, পেশেন্টকো পহলে জানে দিজিয়ে।’

ক্রমশ…

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব