রূপম আর কোয়েল। আজকের দিনের ছেলেমেয়ে,  দু’জনেই পড়ে ক্লাস টুয়েলভ-এ। সামনেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চূড়ান্ত পরীক্ষা। দু’জনই লেখাপড়া করে মন দিয়ে, খেলাধূলাও করে– কিন্তু উভয়েই উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট। এই আকর্ষণই চায় তাদের ব্যস্ত শেডিউলের মধ্য থেকে কিছুটা সময় বের করে নিয়ে, একসঙ্গে কাটাতে। কোয়েলের পছন্দমতো রূপম একটা দিনে নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে। কোয়েলকে বলে ওই সময়ে মিলেনিয়াম পার্কে আসতে। কোয়েল আসে– এই ওদের ডেটিং-এর প্রথম দিন।

নীল আর প্রীতি একই অফিসে চাকরি করে, দুজনেই রয়েছে কলকাতার একটি আইটিফার্মে। মাইনে ভালো, কাজের চাপও ভালো। সেই কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে দুটি পছন্দের মানুষ একে অপরের কাছে আসার সময় পায় না। নীল ভাবে প্রীতিকে নিয়ে একদিন কোথাও বের হলে কেমন হয়? প্রীতি ভাবে নীলকে নিভৃতে পেতে কেমন লাগে? যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। দু’জনে কিছুটা সময় কেএফসি-তে কাটাবে ঠিক করল। একটু গল্প একটু খাওয়া সবই হবে। সেদিন কেএফসি-তে বসেই ওরা ঠিক করে নেক্সট কবে কোথায় মিট করবে।

রূপার বিয়েটা ভেঙে যাওয়ার পর দীর্ঘ একটা ব্রেক-আপ প্যাচ-এর পর, দেখা হয় শেখরের সঙ্গে এক ঘরোয়া পার্টিতে। শেখরও ডিভোর্সি। পার্টির ফাঁকে চারচোখ এক হয়। কিন্তু দুটি মন এক হয় না। পার্টির দিন শেখরই এগিয়ে এসে বলেছিল ‘চলুন বেড়িয়ে আসি একদিন।’ সেই একদিন তারা নিভৃতে কথা বলল। বিচ্ছেদ কেউই চায়নি, তবু বিচ্ছেদ হল। নতুন জীবনের কথা কেউ ভাবতে পারেনি, তবু নতুন একজনের সঙ্গে দেখা হল। তারা ভাবল আপাত ধূসর জীবনে রঙের ছোঁয়া এলে কী ক্ষতি। না, দুজনেই স্বীকার করে কোনও ক্ষতি নেই। ভাবে নলবনের ঝিলের ধারে পরে একদিন আবার দেখা করবে। জীবনটা হঠাৎ রূপার কাছে হালকা বুদবুদের মতো হয়ে যায়। যেন সে কত প্রাণবায়ু পেল। হ্যাঁ বাঁচবার, জীবনটা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখা যায় এবার।

উপরের তিনটে কাপলের দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় প্রথমটি হল ক্যাডবেরি কাপল, যাদের মধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছোবার তাগিদ ক্ষেত্রবিশেষে প্রবল না-ও হতে পারে। এরা ডেটিং-এর বিষয়ে একেবারেই তাজা প্রাণ। দ্বিতীয় কাপলটি ম্যাচিওরড ডিসিশন টেকার– যাদের কাছে ডেটিং-এর প্রয়োজনীয়তা আবশ্যিক। আর তৃতীয়টি হল ব্রেক-আপ কাপল। এরাও সিরিয়াস এবং রোম্যান্টিকতায় পরিপূর্ণও বটে।

আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবর্তন এনে ফেলেছে। কারণ ডেটিং আগেও ছিল। কয়েকদশক আগেও ছেলেমেয়েরা ডেটিং করেছে। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র রোম্যান্টিক জুটিদের ডেটিং। প্রেম, বিবাহরই প্রথম ধাপ। যা অনিবার্য। একসময় ছেলেটি মেয়েটির পূর্ণ দায়িত্ব নিত ডেটিং-এর দিন। আর এখন?

ঘরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন নেই

পুরোনো দিনের রেওয়াজই ছিল এই যে, ডেটিং শেষ হবে মেয়েটির বাড়ির দরজার সামনে। যদি সেটা শহরের প্রত্যন্ত প্রান্তে হয় তবুও। কিন্তু এখনকার দিনে কাপলরা পরস্পরের থেকে বিদায় নেয় রেস্তোরাঁ বা মালটিপ্লেক্স-এর দরজায়। যে যার নিজের মতো বাড়ি ফেরে। আজকাল বান্ধবীকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার রীতি উঠে গেছে। তা আজ আনুগত্যের প্রশ্ন তোলে না। আজকাল এটা ভাবা বাড়াবাড়ি যে, মেয়েটি একা-একা তার বাড়ি পৌঁছোতে পারবে না। কোয়েলের মতে বেশি রাত হয়ে গেলে বা রাস্তাঘাটে হঠাৎ কোনও ঝামেলা হলে রূপম ওকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। রোজ বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমাকে রূপমের দিকটাও ভাবতে হবে, ওকেও তো ওর বাড়িতে পৌঁছোতে হবে। আমাকে পৌঁছে দিয়ে আবার একা একা সারারাস্তা যাওয়া রূপমের কাছে সত্যিই কষ্টকর’ কোয়েলের সংযোজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি না পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক হয়, মেয়েরা একা-একা বাড়ি ফিরতেই বেশি পছন্দ করে। এর আর এক অর্থও হল তারা স্বাধীনতা চায়।

বিল সেও মেটাক

নীল কখনও আশ্চর্য হয় না, যদি প্রীতি বেড়াতে যাওয়ার দিনগুলিতে তার মতো খরচ করে কিংবা রেস্তরাঁর বিল বা ট্যাক্সির ভাড়া মেটায়। আগেকার দিনে উলটো ছিল, মেয়েটিই ছেলেটির উপর আর্থিক খরচের বিষয়ে নির্ভরশীল ছিল। আজ ভূমিকা পুরো পালটে গেছে। এই বদলানো ভূমিকায় মেয়েরা খুশি। কারণ তারাও তাদের নিজের ইচ্ছানুসারে খরচ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে এভাবেই উভয়ে উভয়ের স্বাধীনতা আর ব্যক্তি শ্রদ্ধার সীমারেখাও নির্ধারিত করে।

শান্ত থাকুন

দু’জন-দু’জনকে একটু বেশি সময় দেওয়ার জন্য কয়েকদিন কোনও জায়গা থেকে বেড়িয়ে আসাও হালফিল সময়ের ট্রেন্ড। একথা কোয়েলকে রূপম বললে, কোয়েল অত্যন্ত রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। রূপমও তার রাগ প্রকাশ করে। কিন্তু নীল যখন প্রীতিকে দুটো দিন দীঘায় বেড়িয়ে আসার কথা বলেছিল, ওরা কেউই রাগ করেনি। প্রীতি ভালোমনেই মেনে নিয়েছিল কিন্তু সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছিল নীলকে। উভয়ের ভ্রমণ অত্যন্ত সুখপ্রদ হয়। বাইরে বেড়ানো প্রসঙ্গে বান্ধবী যদি কখনও রাগ করে, বয়ফ্রেন্ড যেন সেটাকে ইস্যু করে অযথা বিবাদে না জড়ান। নাহলে সম্পর্কটাই নষ্ট হতে পারে।

প্রেমিকের আত্মীয়স্বজন বাচ্চাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

বিয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে, বিয়ে বেশিদিন টিকছে না– এটা এই সময়ের একটা সমস্যা নিশ্চিত। কিন্তু এমন একটি অধ্যায় এসেছে জীবনে বলেই, যে তা নিয়ে লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে রাখতে হবে তেমন নয়। ব্যাপারটা স্পোর্টিংলি মেনে নেওয়া ভালো। যেমন মেনে নিয়েছে রূপা-শেখর। শেখরের কোনও ছেলেমেয়ে নেই। কিন্তু রূপার প্রথমপক্ষের একটি ছেলে আছে। শেখর কিন্তু রূপার ছেলেকে অত্যন্ত স্নেহ-আদরের চোখে দেখে। এযুগে ব্রোকেন ম্যারজ-এর শিকার হওয়া সন্তানরাও চায়, মা’র দ্বিতীয় বিয়ের আগে তার বয়ফ্রেন্ড যেন তাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করে নেয়। এর ফলে নতুন সম্পর্কও মজবুত হয়।

ডেটিং সাম্প্রতিক অতীতেও ছিল, এখনও আছে। কিন্তু পালটে গেছে ডেটিং-এর ধরন-ধারা, রকমসকম। এই পরিবর্তন অবশ্যই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে। ছেলেমেয়েদের স্বাধীনতার সীমানা আজ প্রসারিত। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে বলা যায়, ডেটিং মানে শরীরি চাহিদা মেটানোর অজুহাত নয়। ডেটিং মানে তার বাইরে অনেক কিছু। পারস্পরিক বোঝাপড়ার পারফেক্ট স্পেস হল ডেটিং। সিনেমা দেখা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া–  এসব থেকেই দুজন-দুজনের রুচির কাছাকাছি আসে। অনেকসময় পড়াশোনা বা কাজের সমস্যার আলোচনাও হতে পারে। সুস্থ ও রুচিকর হলে ডেটিং অবশ্যই অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক বিধিনিষেধের সীমা অতিক্রম করলে ডেটিং কিন্তু উভয়ের পক্ষেই হানিকর। এসব কথা চিন্তার মধ্যে রেখেই ডেটিং শুরু করা উচিত– তাহলেই এটি সঠিক পরিণতি পাবে।

Tags:
COMMENT