সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু যারা হিন্দুত্বের দৃঢ় সমর্থক, তারা এই শব্দটি অপসারণ করতে চায়, যাতে ভারতকে এক ভাবে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করা যায়। কিন্তু কী রকম হিন্দু রাষ্ট্র চান তারা? ভারতে কি হিন্দু ধর্মের উপর কিংবা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর কোন নিপীড়ন চলছে?

এই ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির কারণে কি হিন্দুরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়ে উঠেছে? এই ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির কারণে কি হিন্দুরা অনিরাপদ বোধ করছে? ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি মুছে ফেলার পর কি দেশে স্বর্ণবৃষ্টি হবে? দরিদ্র হিন্দুরা কি আরও বেশি টাকা পেতে শুরু করবে?

আসলে এরকম কিছুই ঘটবে না। ধর্মনিরপেক্ষ শব্দের সহজ অর্থ হল— সরকার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, খ্রিস্টান, পারসি কিংবা নাস্তিকদের প্রতি বৈষম্য করবে না। এই ধর্মের অনুসারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করা হবে না। তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি বাদ দিলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ৮০ শতাংশ হিন্দুর কী লাভ হবে?

এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো উদ্দেশ্য হল— প্রাচীন যুগকে ফিরিয়ে আনা। লক্ষ্য হল— এমন একটি যুগকে ফিরিয়ে আনা, যার ফলে আসলে হিন্দুদেরই অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে। আর এর কুফল ভোগ করতে হতে হবে মহিলাদের। তাই, মনে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ জারি থাকার কারণে, ৮০ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা এবং অর্ধেক হিন্দু নারী অনেক ধর্মীয় অবিচার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমতার কথা বলার কারণে, সতীনের সঙ্গে বাস করতে হয় না হিন্দু মহিলাদের। তারা সহ-স্ত্রী হওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তারা তাদের পিতা এবং স্বামীর সম্পত্তিরও অধিকারী হতে পারেন।

সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা বলবৎ রাখার কারণে, স্কুল-কলেজের দরজা সকলের জন্য খুলে গিয়েছে এবং সব ধর্মের মহিলারা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। সব ধর্মের মানুষ যেমন রাস্তায় হাঁটার মৌলিক অধিকার পেয়েছেন, মহিলারাও এই অধিকারের সুফল ভোগ করছেন। তারা যেমন খুশি পোশাক পরতে পারছেন, যেখানে খুশি যাওয়ার এবং প্রতিটি পাবলিক প্লেসে প্রবেশের অধিকার পেয়েছেন।

নারীদের পৃথক করা, অবমূল্যায়ন করা বা দুর্বল করে তোলার কুচক্র থেকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষা করেছে সংবিধান। সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আইনি ক্ষেত্রে, পুরুষ এবং মহিলা সমান, সধবা এবং বিধবা সমান, পুত্র এবং কন্যা সমান, কিন্তু পৌরাণিক ভাবধারার লোকেরা এটি পছন্দ করেন না। তারা ধর্মনিরপেক্ষতা এবং লিঙ্গ সমতার অধিকারের সমাপ্তি ঘটাতে চাইছে। পাকিস্তান, ইরান এবং আফগানিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা লিঙ্গ সমতা নেই। মহিলাদের হিজাব, বোরকা এবং পর্দার আড়ালে রাখা হয়। তাদের কাজে যেতে দেওয়া হয় না। তারা এখন পুরুষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে, ঠিক যেমনটি সংবিধান তৈরি হওয়ার আগে ভারতে ছিল। কট্টরপন্থীরা চান মহিলারা মন্দিরের সামনে কলস বহন করুক, ধর্মগুরুদের সেবা করুক এবং তাদের স্বামীদের ইশারায় চলুক। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা জারি থাকার ফলে, কুচক্রীদের কু-উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না।

যদি ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়, কোনও নির্দিষ্ট একটি ধর্মের হয়তো জয় হবে, সেই ধর্মের ভণ্ড গুরুদের হয়তো জয় হবে কিন্তু এর ফলে তৈরি হবে আরও বড়ো সমস্যা। বিশেষকরে মহিলারা বড়ো বিপদে পড়বেন, আমরা ফিরে যাব সেই আদিম যুগে এবং যা মোটেই কাম্য নয়। তাই, বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভেবে, বজায় রাখতে হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। নয়তো সমতাও বজায় থাকবে না।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...