পিয়ালি আজও ভুলতে পারে না কুড়ি একুশ বছর আগের সময়টা। প্রথম সন্তান দীপ্তার পর যখন দ্বিতীয় সন্তানও মেয়ে কোলে এল, তখন শাশুড়িমায়ের কথাগুলো আজও দুঃখ দেয় ওকে, ‘এতে এত আনন্দের কী আছে বউমা। জেনে রাখো ছেলেই হচ্ছে বংশের প্রদীপ, মেয়েরা তো মা-বাবার বোঝা ছাড়া কিছু নয়।’

অথচ আজ যদি শাশুড়ি বেঁচে থাকতেন, দেখতে পেতেন এই দুই মেয়ে মা-বাবাকে কত যত্নে আরামে রেখেছে। পিয়ালি এবং ওর স্বামী দেবাংশুর মনে কিন্তু কন্যাসন্তান নিয়ে এতটুকুও কোনও কালিমা কোনওদিনও ছিল না। বরং বলা যায় দুটি কন্যার মা-বাবা হিসেবে ওরা যথেষ্ট গর্ববোধ করেছে সারাটা জীবন।

২০-২১ বছর পরেও কিন্তু মানুষের মন থেকে কন্যাসন্তানের প্রতি বিতৃষ্ণার মনোভাব সম্পূর্ণ ভাবে মুছে যায়নি।

পরমার মাসিশাশুড়ি বাড়িরই একটি অনুষ্ঠানে সকলের সামনে পরমাকে উদাহরণস্বরূপ তুলে ধরেছিলেন, নিজের ছেলের বউয়ের দ্বিতীয় কন্যাসন্তান জন্মাবার দুঃখ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে। পরমা আধুনিকমনস্কা মেয়ে, দুটি মেয়ে একটি কোলে এবং অপরটি সবে ক্লাস ওয়ানে। অনুষ্ঠান বাড়িতে সকলের সামনে হঠাত্ই মাসিশাশুড়ি পরমাকে দেখিয়ে সকলকে বলে বসলেন, ‘আমার ছেলের বউটাও হয়েছে এরই মতো। ঘরে কোথায় নাতি আসবে তা না, আবার দ্বিতীয়টাও মেয়ে। কপাল খারাপ হলে যা হয়।’

সেদিনই পরমা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল একদিন এই মেয়েদের দেখিয়ে ওনাকে গর্ব করতে বাধ্য করবে সে। বর্তমান সময়ে উপযুক্ত করে মেয়েদের মানুষ করবে যাতে আজ যাদের মনে ওকে নিয়ে আপশোশ রয়েছে, কিছু বছর পর তারাই সেরার মুকুট তুলে ধরতে বাধ্য হবে তার দুই মেয়ের মাথায়। এইভাবেই সে মানুষ করবে তার নিজের রক্তমাংস দিয়ে গড়া দুই মেয়েকে।

পরমা নিজে অত্যন্ত মজবুত এবং পরিণতমনস্ক। সুতরাং তার মেয়েরাও তার মতো হবে এতে অবিশ্বাসের কোনও জায়গা নেই। কথায় আছে, এতটাই নিজেকে শক্ত করে গড়ে তোলো যে, তোমার ছেলে সেই মেয়েদের প্রতিই আকৃষ্ট হবে যারা কিনা তোমার মতো চিন্তাধারায় বিশ্বাসী।

সন্তান পালনের প্রথম শর্ত

ছেলে হোক কিংবা মেয়ে তার পালন-পোষণের প্রথম শর্তই হল সেই মানসিকতা থাকা দরকার যাতে সন্তানকে এতটাই উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যায়, যাতে ভবিষ্যতে তাকে যেন কারও উপর বা কোনও জিনিসের উপর নির্ভর করতে না হয়, সেটা আর্থিক হোক কিংবা সামাজিক। অনেক সময় মা-বাবা ভাবেন মেয়েকে যখন বিয়ে দিয়ে অন্য বাড়িতে পাঠাতেই হবে তখন তাকে বেশি পড়াশোনা করিয়ে আর্থিক ভাবে সামর্থ্য করে তোলার কী প্রযোজন? অথচ পুত্রসন্তানকে আর্থিকভাবে যোগ্য করে তুলতে বাড়ির অন্য কোনও কাজ তাকে শেখানোই হয় না, যার ফলে এই কাজের জন্য তাকে অন্যের উপর নির্ভর করতেই হয়। সন্তানের পালন-পোষণ লিঙ্গ নির্ভর না হয়ে বরং আত্মনির্ভর কীভাবে করা যাবে তার উপর জোর দেওয়া উচিত।

অধিকাংশ মা-বাবারাই বলে থাকেন, আমি আমার মেয়েকে ছেলের মতো মানুষ করেছি। আমি ওকে কোনও অংশে ছেলের থেকে কম মনে করি না। তার মানে ছেলেকেই তো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হল। ছেলে কি সত্যিই সম্পূর্ণ গুণসম্পন্ন যে মৌখিক কথোপকথনে তাকে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা চলে? কত ছেলেই তো বদগুণের অধিকারী হয়, তাহলে কীভাবে আমরা তাকে দৃষ্টান্ত ভাবি?

 

Tags:
COMMENT