এক

চিনতে কততি হবে না। মাস তিনেক আমি সামলে নেবানে। তিন মাস বেশ লম্বা টাইম। তদ্দিনে মরা বাপ-মাকেই লোকে ভুলি যায়। আর পুলিশ তো পরের দিনই দেকতি পায় না, চোখ উলটি দেয়। না হলি এত এত মরা মর্গ জুড়ে পড়ি থাকে! বড়োবাবু ছমাস পর্যন্ত রাকেন, তারপর একসাথে জড়ো করি জ্বালায় দেন।

বিশে এক লপ্তে অনেকখানি কথা বলে ফেলে হেলেপড়া বটতলায় বসে আবার একখানা বিড়ি ধরাতে চেয়ে হাত পাতল। দুপুর বেশ খরখরে। সকালে দুটো বডি বেরিয়েছে। পার্টি তাগড়াই ছিল। নেবার কালে পাঁচশো করে দিয়েছে। কিন্তু আজ আর একটা দুটো পাঁচশোর পাতি হলে ভালো হয়। আজ রাতে ঝুমরোর ডাক আছে। সেই চেতলার ব্রিজের তলায় হনুমান মন্দিরের পাশের বস্তিতে যেতে হবে। সে কবে থেকে একখান ট্যাঁকে গোঁজা ফোনের কথা কচ্ছে কিন্তু কিছুতেই জুত করতে পারছে না বিশে। তার মনে হচ্ছে, হয়ে যাবেনে আজ। আর নেপাদা শুধুমুধু তো কথা খসাচ্ছে না। সে-ও খানিক অ্যাডভ্যান্স দেবেনে মনে হয়। হাজার দুয়েক হলি আর দেখতি হবে না। আজই ঝাক্কাস একখান ফোন হাতে দাঁড়ালে ওই শাপলার নালের মতো সুন্দরী তারে বুকে টানে নিতি বেশি ভাববে নানে।

বিশে, তুই বলছিস যখন, কাজটায় এগোই। কী বলিস?

সত্যি সত্যি ভাবনা মিলে যাচ্ছে বিশের। নেপাদার হাতে নতুন দু’হাজার টাকার পাতি। ছোঁ দিয়ে তুলে নিতে নিতে বলল, তুমি চিনতে কোরো নাকো। তোমাকে এখানে আমি ঠিক নুইক্কে রাখব। তোমার বাপটা থানায় ডাইরি করবে আনে। ব্যস, কাম ফতে!

পুলিশের কাছে মিসিং ডায়েরি করার পর তো আমার কাম ফতে হবে রে বিশে ! পুলিশ হাত ধুয়ে মার পেছনে পড়ে যাবে৷আমার মোবাইল ট্র্যাক করবে৷শ্মশানঘাটের চুল্লির ভেতর থেকেও টেনে নিয়ে চলে আসবে৷

কী ছেরাদ্দর কতা কইছ ন্যাপাদা! পুলিশের খেইয়ে দেইয়ে কাজ নেই যে জোয়ান মদ্দ ছেলে হারায়ে গেলি খুঁজতি যাবেনে! মেয়েমানুষ হলি খানিক কতা ছেল। তাও তো নয়।

নে বিড়িটা ধরা বিশে। কামধেনু বিড়ি। একটু কড়া হবে। ধরা ধরা।

দু’জনের খোসগল্প আর বিড়ির ধোঁয়ায় বটগাছতলায় একখান মেঘ উঠল। মেঘের উপরে বৃষ্টি নেই। শুধু দুপুরই দুপুর। ন্যাপাদা বলল, বিশে, সেই কোন ল্যাংটোবেলা থেকে তুই আমার বন্ধু। তোকে না বলে কোনও কাজই আমি যে কেন করতে পারি না!

কাঁটাপুকুর মর্গের এগারো বছরের স্থায়ী চাকুরে ডোম বিশে বাগদি বড়োলোক বন্ধুর এই প্রশংসায় না ভিজে পারে না। সে চোখ পিটপিট করতে করতে বন্ধুর চোখে চোখ রেখে তাকে মাপে। মনের ভেতর ভালোলাগা লালা ঝরায় তখন।

এই যে দ্যাখ একটা সাদামাটা খুন করব, তাও তোকে বলছি। তোর কাছ থেকে সায় না পেলে মনে জোর হয় না রে বিশে।

আজ যেন ন্যাপাদা বিশেষ আবেগময় হয়ে আছে। সব কথা গলগল করে কইতে লেগেছে চা-র দোকানের কাঠের লম্বা বেঞ্চে বসে। তাদের বেঞ্চে অন্য কোনও লোক নেই। তাছাড়া ভরদুপুরে এমনিতেই এই চত্বরে মানুষজন কম। ন্যাপাদা কথা চালায়।

বিয়ে করার আগে তোর সাথে শলা করেছি, তোর মনে আছে? আবার সেই বিয়েকরা বউ মালতিকে সালটাতে যাবার আগেও তোর শলা নিলাম। তোর বুদ্ধির উপর আমার বেশ ভরসা রে বিশে। তুই বললি বলেই তো পাতাখোর ছিদাম গুঁইকে দিয়ে আমি মালতির পেট চিরে মাতলায় ফেলেছিলাম। পেট চিরে লাশ জলে ফেললে যে ভাসে না, তা জানতাম নাকি!

বিড়িটা হেবি কড়া ন্যাপাদা। মগজে গিয়ে ঘাই মারতিছে। তবে কতিছি কি, এবারে আর তোমারে বিপদের ধারে-কাছেও যেতি দেব নানে। বুক দে আগলে রাখব আনে।

হ্যাঁ রে সত্যি! সেবার প্রায় ফেঁসে গেছিলাম আর কী! আমার মোবাইল-এ মালতির কল ছিল। ভাগ্যিস লাশ পাওয়া যায়নি। তিন দিন থানায় রেখে খানিকটা ঠুসেছিল। কিন্তু এক বাপের ব্যাটা আমি। মুখ খোলাতে পারেনি। কোর্টে নব্বই দিনের মধ্যে চার্জশিটই জমা দিতে পারল না। তবে তাতে হাবুলদা-র হাত দিয়ে থানাকে হাজার দশেক খাওয়াতেও হয়েছিল।

গুরু শোনো। ঝ্যাকোন তোমার ইস্তিরিকে মারতি গিছিলে বড্ড তাড়াহুড়ো ছেল। এবার সময় নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে করতি হবে। আরে খুন করা একটা আর্ট। তা শিখতি হয়, জানতি হয়। এ লাইনে যে যত বড়ো শিল্পী তার তত দর।

ন্যাপাদা বিশেকে বলতে দেয়। সে যেন ভাজামাছ উলটে খেতে জানে না এমন ভঙ্গি করে বিশের মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে। ন্যাপাদা জানে বিশে একটু বকতে পারলে খুশি। তা তার খুশিতে বাগড়া দেবার দরকার কী! তাছাড়া এবার বিশের সাহায্য খুবই দরকার ন্যাপাদার। খুনের আগে পরে লুকিয়ে রাখা, বাবাকে দিয়ে মিসিং ডায়ারি করানো, নতুন সিম ভরা মোবাইলে অনেক অনেক কাজ। এসবের জন্য একদম কাছের একটা লোক দরকার। আর তা ডোম বিশে হলে সোনায় যে সোহাগা তা জমি, বাড়ির দালাল ন্যাপাদা বেশ ভালোই জানে।

বিশে বিড়ির শেষটুকুতে ফুস ফুস করে জোরালো দুটো টান দিয়ে বলতে থাকে। ধরো তুমি নিজেই নিজেরে সুপারি দেচ্ছ। তুমিই মালিক, তুমিই কর্মচারী। দু-দু’খান কাজ করতি হবে তোমারে। খুব যত্নের কাজ। ওই যে যেরাম ক্যারামবোর্ডের এদিক থেকে পোঙা ঘষটে গিয়ে একবার সাদা গুটি আবার উলটো দিকে ফিরে আসি কালো গুটিরে প্যাঁদাতে হয়, ত্যামোন। কাউকেই ছাড়ি দেয়া যাবে না।

ন্যাপাদা চায়ের দোকানির দিকে ফিরে আঙুল দিয়ে আরও দুটো চায়ের অর্ডার দিয়ে রংচটা ময়ালামাখা প্লাস্টিকের টেবিলের উপর কনুই-এর ভর রেখে হাতের তালুতে মুখ মেলে বেশ জাঁদরেল একটা মনোযোগী পোজ দিল। বিশে বলে চলেছে তার কথা।

হ্যাঁ, এক নম্বর কাজ হল গে, খুনের বরাত দেবার সময় সব ইনফর্মেশন আর মোটিভ যত্ন করি খুনিরে বলি দেয়া। আর খুনের পরে নিজেরে বোকা পাঁঠার মতো সাজ্যে রাখা। মানে তুমি যে গোবেচারা ভালোমানুষের পো, তা যেন জনে জনে কতি থাকে।

ন্যাপাদার বিড়িও ফুরিয়ে এসেছিল। সে হাতের নিভে যাওয়া বিড়ির টুকরো রাস্তার ধারের কালো নিকাশি খানার ভেতর টিপ করে ছুড়ে ফেলে দিতে সক্ষম হয়ে, বেশ একটা হিরো হিরো ভাব খায়। জিন্সের পকেট থেকে ধবধবে সাদা ভাঁজ করা রুমাল বের করে পুরু ঠোঁটের উপর বিড়ির কশা দাগ মুছে দিতে বার দুয়েক ঘষে। বিশের ঢ্যামনা মার্কা মুখের উপর সে রুমাল ঝেড়ে আবার ভাঁজ করে প্যান্টের হিপ পকেটে রেখে দিতে দিতে নিজের গুরুত্ব বোঝায়।

ঠিক বলেছিস বিশে। এই কাজটা এক্কেবারে নিখুঁত করে করতে চাই। শালা ঘাটের মড়া বাবাটারে খচ্চা করে দিতে পারলে ওই ভাঙাচোরা চুন-সুড়কি, কড়ি-বরগার বন-বাদাড় নিকেশ করে একখান স্বর্গের ইন্দ্র-বাড়ি বানাতে পারব। তাই পা মেপে মেপে এবার কাজ করছি। বউ মালতিদের সম্পত্তি হাতাবার সময় একটু কাঁচা ছিলাম। এখন বুদ্ধি আমার বেশ পেকে গেছে রে!

বিশে গামছা দিয়ে পিঠের মাছি সরাতে সরাতে বলে, হ্যাঁ, বলো দিনি কিরাম ভাবিছ বরাত দেবার জন্যি! এট্টুস শোনাও। ফাঁকফোকর থাকলি আমি ভরে দেবানে।

ভাবা-টাবার জায়গায় আর নেই রে! এখন কত তাড়াতাড়ি কাজটা নামানো যায় তাই দেখার। তুই-ই বল আমার পাঁচ-সাত কোটি টাকা আটকে আছে এখানে! তিন বিঘের এই জমিটাতে কম করে পাঁচটা টাওয়ারের কমপ্লেক্স উঠে পড়বে। এক একটা টাওয়ার থেকে কম করে এক-দেড় কোটি নাফা আসবেই। তো বাপ শালাটাকে আর কদ্দিন বাঁচিয়ে রেখে আমি নিজেকে ঠকাব, অ্যাঁ! সে তো ওই ভাঙা বাড়িতেই ডবকা শালিকে নিয়ে নিজে মস্তি মারছে। এদিকে ছেলেটা যে মাস ছয় হল বউ হারিয়ে বিবাগি হতে বসেছে, সে খেয়াল আছে তার!

ঠিক বলেছ ন্যাপাদা। ঝে খুন করাবে সে ঝ্যানো মনের ভেতর থে হইচই করি ডাক পায়। খুব জোরাল হতি হবে খুন করানোর মোটিভ। নরম-সরম হলি কাজ কমপ্লিট হবে না, সব কুবোকাত। তোমার দেখছি দু-দুখানা মোটিভ আছে। খুনের জন্যি একদম পাক্কা সওয়াল করিছ। পেছু হটার কোনও উপায় নেই।

ন্যাপাদা মেয়েছেলে দোকানির হাত থেকে চায়ের গেলাস নামিয়ে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে, বিশের দেয়া নম্বর নিজের পিঠে যোগ করে বেশ ভারি হয়ে ওঠে। কথায় সেই ওজন ধরা পড়ে। নে বিশে, চা ধর। বিস্কুট খাবি? বাপুজি কেকও খেতে পারিস। ঘুগনি মুড়িও আছে। যেটা খুশি।

বিশে বিড়িটা খেয়ে বেশ মেজাজে আছে। সে তা নষ্ট করতে চায় না। চা-এর সাথে অন্য কিছু না নিয়ে সে কথার সংযোগ রাখে। বলে, এবার হল গে দুই নম্বর কাজ। মানে ধরি নাও, তুমি খুনের বরাত পেয়ে গেছ। মানে খুনি হিসেবে ইদিক-উদিক, ঠিক-বিঠিক ভাবতি হবে। মানে কাজের আগে মনের ভেতরে নানা গলিপথ সড়কপথ ধরে ঘুরিফিরি রেকি করা আর কী! মানে কোনও ক্লু না রেখে, পুলিশকে ঘোল খাইয়ে কাজ হাসিল করার ছক কষা।

খুন তো আমি করে ফেলব রে বিশে। কিন্তু সমস্যাটা হল গে তারপর পুলিশ যেন দুয়ে দুয়ে চার না করে! মানে পরদিন খবরের কাগজে তিন নম্বর পাতার পাঁচ নম্বর কলমে হয়তো লেখা হল, সম্পত্তির লোভে বাবাকে খুন। আজকাল মিডিয়া এমন উসকে দেয় পুলিশকে যে কুচো চিংড়ির মতো পুলিশ লাফাতে থাকে।

ধইয্য ধরো গুরু। এইখানে তো আমি আমার খেল দেখাবানে। প্রথমে এক মাস হারায়ে যাও। লোকে জানবে তোমারে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর কাজ সালটে আরও এক মাস গোপনে থাকতি হবে। শেষকালে ভাদোর মাসের পর আশ্বিনে পুজোর সোরগোলের ভেতর সন্ন্যাসীরাজার মতো ফিরে এসে বাড়ির জমি-দলিল নিজের করি নিতি হবে। ব্যস! এই কয়’মাস আমি তোমাদের বাড়ি নজর রাখব আর তোমার নুক্কে থাকার দেকভাল করি দেব।

কিন্তু বিশে, তোর তো চাপ বেড়ে যাবে রে। একদিকে আমাকে লুকিয়ে রাখা আবার অন্য দিকে আমার বাবাকে দিয়ে থানায় মিসিং ডায়ারিটা করানো, খুব সহজ কাজ নয়। আমার বাবাটা যা একখান খচ্চর মাল! সে বলে বসতে পারে, হারিয়ে গেছে তো আপদ চুকেছে। আর থানা-পুলিস হ্যাপা করতে হবে না।

মেজাক ঠান্ডা রাকতি হবে ন্যাপাদা। বাড়ি নিয়ে অতশত ভেব না তো! মেশামেশাই-এর সাথে আমার যা সম্পক্ক, ঠিক সালটে নেব। দরকারে দুটো হুইস্কির বোতল পেন্নামি ঠুকে দেবানে! ও তুমি ভেবোনিকো। আর তুমি তো কঞ্জুষগিরি করতিছ না। মাল পটাপট ছাড়তিছ। এই তো দু’হাজার দিলে, আবার দেবে। আমি তার থে এট্টুস খরচাপাতি করতে পারব না! পারব পারব।

তুই পারলে আমিও পারব। কাচের গেলাসের শেষ নিংড়ে গলায় তিতকুটে লাল চা-টুকু চালান করে দিতে দিতে বিশের মুখের কাছে মুখ এনে ন্যাপাদা ফিসফিসায়।

দোকানি দু’একবার দুই পুরুষমানুষের ওরকম ঘন তাকান আর ফিসফিসানি নজর যে করেনি, তা নয়। ওরকম চোখে চোখে কথায় যে শরীর সিরসির করে, সে জানে। এ-পাড়ার চোলাই বেচা জোয়ান ছেলেটা, ওই যে হারান, মাঝে মাঝে একটু বেশি রাতের দিকে এসে অমনি করে। ছেলেটা ভালো। একফোঁটা চোলাই নিজে খায় না। খানিক টাকাকড়িও করেছে। চায়ের গেলাস নিতে এসে হাত ছুঁয়ে দিয়ে ফিসফিস করে। বলেও তো, ওই বুড়ো হার জিরজিরে লোকটা তোকে কী দেবে! কিছু দিতে পারবে না। চল পালাই।

কিন্তু দোকানি মনে মনে ওই ভালোলাগা কথাগুলোকে শুধু আওড়ায়। পালায় না। ওটুকু ভালোলাগা সে কৃপণের মতো সঞ্চয় করে রাখে। খরচ করে না। সে এখন সেরকম ফিসফিসানি যেন টের পাচ্ছে ওই দুই দামড়া লোকের কথায়। দোকানে অন্য খদ্দের আছে, অত সময় কোথায় কান পেতে শোনার! থাকগে, বলুক গে। তার মনে হয়, এ দুটোই বুঝি জমির দালালি নিয়ে কথাবার্তা কইছে। সব দালালেরা ওরকম করে।

ন্যাপাদা ছুকরি দোকানির দিকে এক ছুঁক তাকিয়ে বোঝে সে পাশে দাঁড়িয়ে কথা শুনছে। খানিকটা অস্বস্তি হয়। কথা থামিয়ে দুটো গেলাস-ই দোকানির হাতে ধরিয়ে জায়গা হালকা করাতে চায়। তারপর দোকানি চলে গেলে আবার কথা শুরু করে। হ্যাঁ, যা বলছিলাম রে। এক মাস তোর এখানে লুকিয়ে থেকে একদিন রাতের অন্ধকারে গিয়ে বাবাটাকে সালটে দেব। তারপর আবার এখানে ঢুকে পড়ব। মাসখানেক এখানে কাটিয়ে একদিন দূরে কোথাও ট্রেনে পকেটমারি-টারি করে ধরা পড়ব।

বিশে টেবিলে একটা নরম করে ঘুসি মেরে বলল, দারুণ! দারুণ ছক তোমার। তবে দেকে নিও ধরা দেবার সময় সিকেনে ঝ্যানো পুলিশ থাকে। নালে পাবলিকের ঝাড় খেয়ে সগ্গে গেলে আমার ফ্ল্যাটে থাকার স্বপ্নের প্যাট খসে পড়ে যাবেনে।

না না তুই চিন্তা করিস না। আমার কাছে তো মাল পাবে না। শুধু পকেটমারির অভিনয় করব। আর বিনা টিকিটের যাত্রী হব। দুটো কেসে সাকুল্যে মাসখানেকের জেল। একমাস জেল খাটব। তারপর ফিরে এসে পাল সাম্রাজ্যের আমিই অধিশ্বর। আর হ্যাঁ বলে রাখছি, লেখা-পড়া করেই দেব তোকে দু’কামরার একখান ফ্ল্যাট। সেখানে তুই নিয়ে আসতে পারবি চেতলার ওই মাগিটাকে।

বিশে অবাক হয়ে লজ্জা পেতেও ভুলে যায়। ন্যাপাদার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। সে জানল কী করে!

হ্যাঁ, আমি জানব না কেন রে!

হকচকিয়ে যাওয়া বিশের মুখের উপরে হাত নেড়ে তার ঘোর ভাঙাতে চায়। আর মুখের কথা সরে গেছে দেখে, ন্যাপাদা বিষয়টা নরম করতে গিয়ে আরও খানিক বলে, একটু রাতের বেলায় ইয়েছিয়ে করবি। মানে মস্তি-টস্তি করবি। তাই তো তোকে দু’হাজার টাকার নোটটা দিলাম রে! যা, একটু সিনেমা-টিনেমা দেখে ফুরফুরে হয়ে নে। পরশু থেকে তো আবার আমার দেখভাল করতে হবে! চাইলেও কোথাও যেতে পারবি না।

ও তুমি চিনতে কোরো না গুরু। তোমারে ভালো রাখার দায়িত্ব আমার। গদগদ স্বর বিশের। ধরা পড়ে যাওয়ার পর নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টাও যে এটা, তা বিশের অঙ্গভঙ্গি থেকেও বোঝা যায়।

আর হ্যাঁ বিশে, বাবার লাশ তো পুলিশ এই মর্গেই আনবে। তুই আমাকে একবার ট্রে নাম্বার জানিয়ে দিবি। ভেতরে বসেই পেন্নাম-টেন্নাম ঠুকে শ্রাদ্ধ-শান্তি করে নেব।

তা গুরু, খালাস করার ভাবনাটা ভাবিছ? মানে কীভাবে খুনটা করতি চাও! মানে কতিছিলাম ম্যালা ফ্যাচাং যেন না হয়। মানে খুনের আগে পরে তোমাদের বাড়ির কেউ যেন তোমারে দেখতি না পায়।

হ্যাঁ, আগে পাশের ঘরে বাপের শালিকে মারব মুখে বালিশ চেপে। তারপর বাপকে মাথায় এক সাবলের বাড়ি মেরে ভবের জ্বালা মিটিয়ে দেব। আর দুটোরই কাপড়-চোপর এমন এলোমেলো করে রাখব যে লোকে ঘরে ঢুকে ওদের দিকে তাকাতে লজ্জা পাবে।

বিশে একটু অবাক চোখে চেয়েছে। মানে নিজের বাবা আর মাসিকে ওরকম ন্যাংটোফ্যাংটো করে বাইরের লোককে দেখাবার দরকার কী, সে বুঝতে পারছে না।

ন্যাপাদা বিশের ভাবনা বুঝতে পেরে বলে,  খুনের মোটিভকে ঘুলিয়ে দিতে হবে না! লোকে চট করে যেন অন্য ভাবনায় চলে যায়। মানে ধর ওই সেক্সুয়াল ভাবনায় গেলে আর সেখান থেকে লোকে বের হতে পারে না। মানে ভাবনাটা শরীর দিয়ে ঘুরপাক খাবে। নানা গল্প বানাবে। বুড়ো বাপের চরিত্র নিয়ে কথা তুলবে। কেচ্ছায় কেচ্ছায় নানা রঙের মিলন হবে। খুনের কথা লোকে তেমন ভাববে না। সন্দেহের তির চোরা স্রোতের ভেতর ঘুরতে থাকবে। বুঝেছিস!

গুরু, তোমার এলেমের তুলনা নেই। গার কাপুড় হটায়ে পোগ্রাম একদম সড়সড়ে করে দিছ গো!

আরে এমনিতেই তো দুটোই নিয়ম করে, মানে আমার বাবা আর মাসি রোজ রাতে মালটাল খেয়ে ওইসব করে। ওদিনও শেষবারের মতো সেসব করবে। তারপর আমার কাজ সেরে, আলমারি ভেঙে কিছু গয়না আর টাকা হাতিয়ে দোতলার জানলার ভাঙা রডে শাড়ি আর ধুতির দড়ি ঝুলিয়ে নেমে আসব। শোন, চাইলে তোকে একখান বিছেহার দিয়ে দিতে পারি। তুই বরংচ আমার হয়ে তোর ওই চেতলার বস্তির ছেমড়িকে সেটা উপহার দিয়ে দিস। আর বাকিগুলো আমার থাকবে। এই কেসটা সালটে নিতে পারলে, ভাবছি আবার একটা বিয়ে করে ফেলব। একা একা কাটানোটা বেশ টাফ্ রে।

দুই

 প্রথম চোটেই ঘুম এসে গেছে। হলদেটে আলোয় ঘেরা চওড়া প্যাসেজ। মর্গের ভেতরটা সাদা টাইলস-এ বাঁধানো। তকতকে পরিষ্কার। কোথাও ময়লার ছিটেফোঁটা নেই। বিশেকে বলা ছিল ভালো করে ট্রে যেন পরিষ্কার করে। বরফ-টরফ ফেলে দিয়ে অগুরু-টগুরু দিয়ে যেন জায়গাটা ফুরফুরে রাখে। পই পই করে বলেছে, আরে মরা মানুষ না জ্যান্ত লোক শোবে। তার মতো ব্যবস্থা করবি।

এখানে ঢোকার আগে বিশের সাথে অনেকটা মাল টেনেছিল ন্যাপাদা। শুয়োরের মাংস আর পরোটাও সেঁটেছিল। বিশে বলছিল পেট ভরাট থাকলে মন চলবে না। মন না চললে ভয়-ভীতের সম্ভাবনা কম। আর মালের গুঁতোয় এক ঘুমে রাত কাবার হবে। ভোর ভোর আমি তোমাকে ট্রে থেকে নামিয়ে মর্গের টয়লেটে পাঠিয়ে দেব। সেখানে হাগা-মোতা স্নান সেরে, চা-টা খেয়ে আবার নিজের জায়গায় সেঁধিয়ে যাবে এ তল্লাটে কেউ আসার আগেই। দুপুরবেলায় ওখানে শুয়ে শুয়ে খাবে। এক ফাঁকে আমি খাবার পৌঁছে দিয়ে আসব। রাতের বেলায় সবাই চলে গেলে তোমাকে বের করে এনে আবার মদ আর খাওয়া-দাওয়ার মস্তি। সমস্যাটা প্রথম রাত নিয়ে জেগে উঠলে আবার ভয়-টয় পেও না।

ভয় পাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। পকেটে বিদেশি পয়েন্ট বত্রিশ বোরের পিস্তল সব সময় থাকে ন্যাপাদার। ভূত-ফুত ব্যাপারটাই ভূতুড়ে। সব মনের দুর্বলতা। আর ন্যাপাদা অমন দুবলা মন নিয়ে জন্মায়নি। এখনও মনে আছে পুরুলিয়ায় গিয়ে হোটেলে সেই মাগিটার ছ্যাঁচড়ামোর কথা। কলকাতা থেকে তিন দিনের কড়ারে নিয়ে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে টাকা টাকা করে খুব চিৎকার করেছিল সে মাগি। আর ধৈর্য রাখতে পারেনি ন্যাপাদা। গলা টিপে ধরে চ্যাঁচানি জন্মের মতো খতম করে দিয়েছিল। কিন্তু বিছানায় রাতের মস্তি কী করে হবে! কলকাতা থেকে গাড়ি ভাড়া করে গিয়ে শেষমেশ মস্তি হবে না! তখন ওই মরা মাগিটাকেই ন্যাংটো ফ্যাংটো করে সারা রাত ধরে যা করার করেছিল সে। তারপর সকাল বেলায় মরা মাল ট্রলি ব্যাগে পুরে হোটেল থেকে বেরিয়ে ধা। আসার পথে ড্রাইভারকে পানমশলা আনতে দূরে পাঠিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে জঙ্গলের ভেতর ট্রলিব্যাগের মায়া কাটিয়েছিল। মানে মাগিটাকে ব্যাগশুদ্ধ শান্তিস্বর্গে পাঠানো। তারপর পান পরাগে গা গরম করে নেয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করতে হয়নি।

এখানে কেউ এসে হুজ্জতি করলে দান ছেড়ে দেবে না ন্যাপাদা। মেরে দেবে। কিন্তু গলাটা চেনা চেনা লাগল যেন!

কী যেন একটা মিষ্টি গন্ধও নাকে এসে লাগছে। ন্যাপাদার এই গন্ধটা চেনা। চোখ বন্ধ করে বুক ভরে সেই মিষ্টি গন্ধটা নিচ্ছে সে। কী যে মন আকুল করা সে গন্ধ! ন্যাপাদা পাশ ফিরে মশারির ভেতর শুয়ে আছে যেন।

অনেক রাত। জানলা দিয়ে জ্যোত্স্না এসে এমন রামপুরহাটের বন বাংলোর ভেতরের দোতলা ঘরটাকে ভাসিয়ে নিচ্ছে! ন্যাপাদার মনে হল সে আকাশে উড়ছে। তার নতুন বউটিও তার সাথে হাওয়ায় ভাসছে। তারা দু’জনেই তো পোশাকবিহীন তখন। এক একটা শাল, পিয়াল, সোনাঝুরি, ইউক্যালিপটাসের মাথায় তারা সামান্য একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছে। আবার হাত ধরাধরি করে উড়ে যাচ্ছে। মহুয়াফুলের হলদেটে সাদা রং মালতির বড়ো করে বাঁধা খোঁপায় জোনাকির মতো গুঁজে দিতে ইচ্ছে করল।

মহুয়া গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে তারা গাছকে শুধোল, গাছ তোমার কাছ থেকে দুটো ফুল নিই? রাগ কোরো না।

নিতাইধন, কী গো রাগ করেছ!

হ্যাঁ এই গলাটা চেনা তো! আরে এই নাম তো সে ভুলে গেছে। এই পিতৃদত্ত নামে কে এমন করে ডাকে! কে! সে যে কী করে নিতাইধন থেকে ন্যাপাদা হয়েছে আজ আর তা মনে নেই। এমন ভালোবাসা মাখিয়ে তার হারিয়ে যাওয়া একান্ত নিজের নামটা কানে আসতে কেমন যেন আচ্ছন্নতার ঘোর। প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

নিতাইধন, রাগ কোরো না। কতদিন আমরা একসাথে উড়ি না। এসো উড়বে। নীল ঘুড়ি, লাল ঘুড়ি আকাশে একসাথে উড়ছে। ফিসফিস করে সোঁ সোঁ হাওয়ায় কথা কইছে। দেখোনি তুমি! আমাদের রামপুরহাটের হানিমুন মনে পড়ছে না! চলো নিতাইধন আমরা আবার উড়ি।

হ্যাঁ, তার গলা। সে। সে যে মালতি বউ। বড্ড সুরেলা ছিল তার দেহ। মাচার উপরে উঠে পুঁইডগা যেভাবে ডগমগায়, সে-ও তো তেমন করে বাইকের পেছনে বসে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে উড়ে যেত। নিতাইধনের পিঠে খিলখিল করে হাসত তার যৌবন।

ন্যাপাদা চোখ খুলতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। দেখতে তো হবে মালতিকে। এখানে কোথা থেকে এল! দুটো স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকে আছে বটে, কিন্তু তাতে ঠান্ডার প্রকোপ কম হলেও লাগছে। হাত দিয়ে চেনটা না খুললে মালতিকে ছোঁবে কী করে!

নিতাইধন, তোমার পিঠের নীচে আমার একটা প্রিয় জিনিস রয়েছে। একটু পাস করো না।

হ্যাঁ, ন্যাপাদার মনে হল, পিঠের নীচে কী যেন একটা খোঁচা খোঁচা লাগছে। সত্যি তো। ওটা নেবেই বা কী করে! তার এই ধুমসো শরীর সরিয়ে সে নেবে বা কী করে! ন্যাপাদা কাত হয়। চোখ খোলে না। বুকের উপরে থাকা স্লিপিং ব্যাগের চেন খুলে হাত বের করে। তারপর পিঠের নীচ থেকে গোলাকার একটা বস্তু বের করে চোখের সামনে মেলে দেখার চেষ্টা করে।

নিতাইধন, আমার হাতের আংটি ওটি। তুমি বিয়ে সময় হাতে পরিয়ে দিয়েছিলে। দাও দাও। ওটা আমার খুব প্রিয়। তোমার বন্ধুই তো, ওই যে বিশে পাগলা, সে-ই যত নষ্টের গোড়া। তড়িঘড়ি করে তোমার থাকার জায়গা করে দিতে আমাকে তাড়িয়েছে এখান থেকে। মর্গের পেছন দিকে আশ-শ্যাওড়ার নোংরা বনে পুটুলি করে আমাকে রেখে এসেছে। কাল সকালে হয়তো জ্বালিয়ে দেবে। কিন্তু আমার হাতের আঙুল থেকে আংটিটা খুলে পড়ে গেছে। দাও নিতাইধন, আমাকে দাও।

হু হু করে ঠান্ডা ঢুকছে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর। চেন খোলা বুকের। নিতাইধন ওরফে ন্যাপাদা আপ্রাণ চেষ্টা করছে চোখ খোলার। আংটিটা তো একবার দেখতে হবে। মালতিকে তো একবার দেখতে হবে। মালতির হাতে আংটি পরিয়ে সে আজ আবার একটু উড়বে। দুজনে মিলে উড়বে। আজ সেরকম গন্ধময় বাতাস। জ্যোত্স্না রাঙানো আবহ। আজ মাটির থেকে অনেকটা উপরে ওঠা চাই তাদের। যেমন জ্যোত্স্নার গায়ে কোনও মলিনতা নেই।

Tags:
COMMENT