সবুজের দুনিয়া। রূপকথার মতো সুন্দর! কেউ যেন বলেছিলেন, সফরসঙ্গী হবে মনে মতো। নইলে ঘুরে মজা নেই।

ভাল্লুকডাঙার মায়াবী রূপের মায়া ছেড়ে চললাম ছিয়াবাড়ি। অর্থাৎ ছায়াবাড়ির দিকে। এখানে পৌঁছে মালুম হয় এ এক অন্য ভূস্বর্গ! ঘন সবুজ অরণ্যের পাশে ছিয়াবাড়ি। এখানেও চারিদিকে শুধুই চা-বাগান। তারই মাঝে চলে গেছে দূরে বহুদূরে কালো ফিতের মতো রাস্তা। সেসব রাস্তা যেন আয়না! মুখ দেখা যাবে। বেলা পড়ে আসছে। শীত বাড়ছে। সৌন্দর্যের খনি ছিয়াবাড়ি। সৌন্দর্যের নেশায় বুঁদ হয়ে যেতে হয় আপনা হতেই! বেলাশেষের আলোয় স্বপ্ন ভিড় করে রূপকথার দেশে! কাছেই পাহাড়ি বাঁশের নজরমিনার। ওপরে উঠে দেখলে ভীষণ দৃষ্টিনন্দন লাগে চারিপাশ। আর পাহাড়-ছোঁয়া বাতাসে আবিষ্ট করে শরীর-মন! উতলা নির্ঝর সবুজ বাতাসে শোনা যায় ঝরনার শব্দ। সে-ঝরনা চা-বাগানের বাতাসে সৃষ্টি!

হোটেলে ফিরে খেয়েদেয়ে লম্বা ঘুম। পরদিন যাওয়া মাই পোখরি। ইলমের চা-বাগানকে বিদায় জানিয়ে রওনা হলাম মাই পোখরি। এই রাস্তা নেপাল দিয়ে সান্দাকফু যাওয়ার পথ। মাই পোখরি হল হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডারের আঁতুড়ঘর। এ-সফরে পাহাড়ের সঙ্গে আছে চা-বাগান। আছে পাইন আর কিউয়ি। আর পোখরি তো আছেই। পোখরির অর্থ সাদাবাংলায় পুকুর। তবে পুকুর না-বলে, দিঘি বললে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে মাই পোখরিকে। লেক বা হ্রদ বললেও অত্যুক্তি হবে না।

আরণ্যক সৌন্দর্য এখানে মনের ডাক্তার। মন ভালো করে দেয়। যাওয়ার সময় চোখে পড়ে পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা পথ। টুকরোটাকরা ভাসা ভাসা নেপালি গ্রাম্যবাড়ি! যতই এগিয়ে যাওয়া যায়, ততই সৌন্দর্য দৃশ্যমান হয়। পরতে পরতে খোলে রূপ। সুন্দর এখানে বড়োই রহস্যময়! স্বর্গীয় সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক শান্তি আর স্বপ্নের বেড়ানো এই তিনটি একসঙ্গে চাইলে মাই পোখরি হল আদর্শ।

মাই পোখরির বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না এর ভিতরের পরিবেশ-প্রকৃতি কেমন! টিকিট নিলে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি মেলে। মন ভরে যায় ভিতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই। পোখরির চারপাশে হেঁটে বেড়ানোর চমৎকার পথ। সে-পথের সঙ্গে জড়িয়ে কতশত গাছগাছালি! অবাক হয়ে দেখতে হয় বিশাল বিশাল পাতাওয়ালা পাহাড়ি ফার্ন। সম্ভ্রম জাগানো নির্জনতায় শুধুই পাখির ডাক। কতরকমের হিমালয়ান বার্ড। মাই পোখরির রূপ-সৌন্দর্য অবর্ণনীয়! নইলে পঞ্চপাণ্ডব মোহিত হয়েছিলেন এখানকার রূপে! এমনই কিংবদন্তি চালু মাই পোখরি ঘিরে। জায়গাটি তাঁদের ভালো লাগে। তাই বিশ্রাম নিয়েছিলেন বেশ কয়েক দিন। স্থানীয়দের কাছে পঞ্চপাণ্ডবের মাই পোখরি আগমনের কাহিনি শোনা যায়।

অবসরেরই জায়গা মাই পোখরি। এখানে পোখরির জলে মুখ দেখে আকাশ আর গাছগাছালি। তাই পোখরির জল সবুজ। গাছগাছালি আবৃত মাই পোখরির শান্ত-সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে যেতে হয় আপন খেয়ালেই! আর মায়াবী আদরে ঘোর লাগে! জংলি লতাপাতার মনোহরণ ঘ্রাণে হৃদয় ছুঁয়ে যায়! মাই পোখরির রূপ-লাবণ্য কখন যে বশ করেছে বুঝতেই পারিনি। সম্বিত ফেরে নাম না-জানা রঙিন ডানার পাখির সুমিষ্ট ডাকে।

পাশেই এক নেপালি দিদির দোকান। গরম গরম চা আর স্ন্যাক্স অপূর্ব। এবার আর এক পোখরির দিকে যাত্রা শ্রী আন্টু। ব্যাগপত্তর সব গাড়িতেই ছিল। তাই চা-স্ন্যাক্স খেয়ে চল পানসি বেলঘরিয়া বলে সটান গাড়িতে। পথে পড়ল কাঁকন। না, ইনি আমাদের কোনও পরিচিত মহিলা নন। কাঁকন এক নদীর নাম। এক অরণ্যের ভিতর দিয়ে এসে অন্য আর এক অরণ্যের মধ্যে হারিয়ে গেছে। স্থানীয় একজনের কাছে শুনলাম, এই-ই আর এক নদীর সঙ্গে মিলেছে অরণ্যের অন্দরে।

নদীর পাড়েই একটি চা-কফির দোকান। সেখানে অবশ্য মোমো, থুকপা ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। এখানকার চায়ের অপূর্ব স্বাদ আর গন্ধ। দার্জিলিং চায়ের মতো। মনে হয়, দার্জিলিং চায়ের চুমুক দিচ্ছি। চায়ের দোকান থেকে দেখা যায় নদীর দুই প্রান্ত। নদীর দুপ্রান্তেই গভীর জঙ্গল। অরণ্যস্পর্শ বাতাস ভেসে আসে। শরীর মন ঠান্ডা করে দেয়। ভেসে আসে নদীর বয়ে যাওয়ার ছলাৎ ছল ছলাৎ ছল শব্দ।

অরণ্য বাতাসের শব্দে বাঁশির সুর আর নদীর বয়ে যাওয়ার জলধ্বনিতে কিশোরীর পায়ে নূপুর বাজে যেন! সে এক অপূর্ব পরিবেশ নদী-ধারে! আকাশ ঝাঁপানো রোদ্দুরে নদীর জলে গাছগাছালির ছায়া পড়ে আরও সবুজ হয়ে ওঠে। সে এক মায়াবী সৌন্দর্য উপভোগ করি কাঁকন নদীর সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কন্যম যাওয়ার আগেই একটা রাস্তা চলে গেছে নীচের দিকে। এটাই শ্রী আন্টু যাওয়ার পথ। চমৎকার রাস্তা। মনে মনে সপ্তপদীর সেই গান গুনগুনিয়ে উঠি এই পথ যদি না শেষ হয়। কিন্তু পথ তো শেষ হয় একসময়। এখানেও হল। গাড়ি এসে নোঙর করল পাহাড়ের খাঁজে এক হোমস্টের সামনে। বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে চারপাশে। পাহাড়ে পাহাড়ে মেঘ-কুয়াশা নেই। একেবারে সাফসুতরো। তাই কাঞ্চনজঙ্ঘা স্বাগত জানালো দূর থেকে। ঝকঝক করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

আলো ক্রমশ কমছে। হোমস্টের একজন বললেন, লেক থেকে ঘুরে আসুন, ভালো লাগবে। গোটা পঞ্চাশেক পা হাঁটতেই পৌঁছোলাম লেকের ধারে। পাহাড় আর চা-বাগানে ঘেরা শ্রী আন্টু পোখরি বা লেক। সবুজের ছায়া পড়ে লেকের জলও সবুজ। লেকের ধারে হোমস্টের সারি। সুন্দর সব কাঠের বাড়ি। মনে হচ্ছিল ইয়োরোপের কোনও দেশে এসে পড়েছি। মাই পোখরিতে প্রবেশের জন্য দশ টাকা লাগলেও এখানে লাগে না। তবে এখানে বোটিং করা যায় অর্থের বিনিময়ে। অনেকেই দেখলাম ভাসছেন বোটে। আমরা আর ভাসলাম না। লেকের চারপাশে দিলাম অলস ভ্রমণ।

লেকের একধারের চা-বাগানের ওপর উঠলেই করা যায় দার্জিলিং আর কার্শিযাং পাহাড়-দর্শন। বাগানের ফাঁকে একটি চায়ের দোকানও আছে। ইচ্ছে করলেই চা-পান করা যায়। কাঞ্চনজঙ্ঘা-ছোঁয়া বাতাসে বেশ ঠান্ডার আমেজ। মেঘ-কুয়াশা মাখা লেক আরও রহস্যময় হয়ে উঠছে ক্রমশ! ভালো লাগছে লেক-সঙ্গী করে চারধারে গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে। লেকের জলে সান্ধ মুহূর্তের রং লাগে। বোটিংয়ে ঝুপুরঝুপুর শব্দে জল কাটার আওয়াজ! জলে পড়ে থাকা আকাশের রং ভেঙে ভেঙে যায়, ঢেউ খেলে। অপূর্ব এক জাদুবাস্তবতা তৈরি হয় মুহূর্তে! চা-বাগানের অন্দরমহলে নীড়ে ফেরা পাখির ডাকে সম্বিত ফেরে। রূপে, বর্ণে, লাস্যে, গন্ধে ভরে ওঠে লেকের সান্ধ্য পরিবেশ।

লেক থেকে ফেরার পথে নির্মল বলে, একবার সানরাইজ পয়েন্ট থেকে ঘুরে এলে হয় না? ঘুরে না-আসার তো কারণ দেখি না। অতএব হোমস্টের পথে নয়, দিলাম পাহাড়ের ওপর দিকে হাঁটা। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমশ বাড়ছে। গভীর জঙ্গলের পথ। আর জঙ্গলে ঘুরঘুট্টি আঁধার নামে ঝুপ করে। দুএকটা দোকানের আলো পথিকদের পথ দেখালেও বাকি পথে চাঁদের আলোই একমাত্র ভরসা। স্থানীয় একজন বললেন, অন্ধকারে সানরাইজ পয়েন্টে না-যাওয়াই ভালো। ঘুরতে গেলে স্থানীয় মানুষদের কথা কানে নেওয়া উচিত। আবার পিছনে দিকে ফেরা। হোমস্টের দিকে।

দার্জিলিংয়ে ম্যালের থেকেও নাকি শ্রী আন্টুর ওপর থেকে আরও ভালো সূর্যোদয় দেখা যায়। সামান্য চড়াই ভেঙে পাহাড়ের ওপর উঠলে সূর্যোদয় দেখা যায়। অনেকেই রাত তিনটে-সাড়ে তিনটের সময় উঠে সূর্যোদয় দেখতে যান। আমারও যাব, ঠিক ছিল। কিন্তু প্রকৃতি বাদ সাধল। প্রচণ্ড বৃষ্টি সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দিল। তবে নিরাশ করেনি কাঞ্চনজঙ্ঘা। স্বমহিমায় উপস্থিত দর্শন দিতে।

শ্রী আন্টুর যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই চা-বাগানের সবুজ। শুনলাম শ্রী আন্টু হল এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো চা-বাগান। এখানকার চায়ের যেমন সুন্দর সুবাস তেমনই গলানো সোনার মতো লিকার! কেনাও যায়। এখানকার গ্রিন টিও স্বাদে-গন্ধে অপূর্ব। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখে রেখে চায়ের চুমুক শিঙাড়া সহযোগে, ইচ্ছে হলে রসগোল্লা-পান্তুয়া খাওয়া যেতে পারে। এই সুযোগ মিলল শ্রী আন্টুতে। আমাদের হোমস্টের পাশেই ছিল দুই বাঙালি হালুইকরের দোকান। দোকানের নামটিও ভারি সুন্দর মুসকান মিঠাই ফসল।

চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে শ্রী আন্টু উপভোগ করা, এক চরম প্রাপ্তি! এখানে মেঘেরা নেমে আসে মানুষের সঙ্গী হয়ে বন্ধুত্ব পাতাতে। মেঘের ডানায় ভর করে সোনালি চিল হয়ে উড়ে-ঘুরে বেড়ানো যায় সারা শ্রী আন্টু! শুধু দুচোখে লেগে থাকবে সৌন্দর্য, শুধুই সৌন্দর্য! দুচোখে লেগে থাকবে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি প্রান্তর। শ্রী আন্টুর রূপ-লাবণ্য আদিগন্ত, অন্তহীন!

প্রয়োজনীয় তথ্য: নেপালে ভারতীয় মোবাইল সিম চলবে না। তবে হোটেলে ওয়াইফাই আছে। শ্রী আন্টু যেহেতু সীমান্ত বরাবর তাই এখানে সিগন্যাল পাওয়া যায়।

 

 

Tags:
COMMENT