বিয়ে বাড়ির শামিয়ানা। হ্যালোজেন আর টুনিবাল্বের আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক যেন দিনের সূর্যকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে। শামিয়ানার ঠিক দোরগোড়ায় বর্শা হাতে দুই সান্ত্রি দুর্গ পাহারা দেওয়ার কায়দায় দণ্ডায়মান। তারা পূর্ব শর্ত অনুযায়ী নিয়মমাফিক কাজ করে চলেছে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই দু’জনে একসঙ্গে বর্শা দুটো সরিয়ে নিয়ে নিমন্ত্রিতদের ভেতরে প্রবেশ করার পথ করে দিচ্ছে। ওদের দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন কলের পুতুল।

চোখ ধাঁধানো বাতিটা হাতের তালুর সাহায্যে আড়াল করে সন্তোষবাবু ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছিলেন। শামিয়ানার কাছাকাছি পৌঁছতেই হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখা অর্পণের সঙ্গে। বহুদিন পরে দেখা দু’জনার। মুখোমুখি হতেই একে অন্যের দিকে হতবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সন্তোষবাবু আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে বলে ওঠেন— আরে অর্পণ যে! কী খবর? কোথায় থাকো আজকাল? তোমাকে আজকাল কোথাও দেখাই যায় না! এখানে তোমার সাথে যে আমার দেখা হবে তা ভাবতেই পারিনি।

একটু নীরবতা পালনের পর তিনি জানতে চাইলেন— তারপর বলো তুমি কন্যাপক্ষ না বরপক্ষ?

অর্পণ হেসে জবাবদিহি করে বলে— নিঃসন্দেহে আমি কন্যাপক্ষ। আমার পাড়ার মেয়ে। বউভাতের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছি।

সন্তোষবাবু রসিকতা করে বলেন— তুমি হলে কন্যাপক্ষ আর আমি হলাম বরপক্ষ। সুতরাং বুঝতেই পারছ আমি তোমার চেয়ে উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি। তুমি যখন কন্যাপক্ষ তাহলে বাইরে না দাঁড়িয়ে চলো ভেতরে ঢোকা যাক। আজকের দিনে তুমি আমাদের অতিথি। ভীষণ ঠান্ডা বাইরে। এখানে একাকী ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থেকে অন্যমনস্ক হয়ে কী দেখছিলে এতক্ষণ ধরে?

কথাটা মিথ্যে নয়। অর্পণ অনেকক্ষণ যাবৎ অবাক বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে কী যেন নিরীক্ষণ করছিল। দু’চোখ ভরে যা কিছু দেখছিল তাতেই ঘোর লেগে যাচ্ছিল তার। বারংবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল। কেবলই মনে হচ্ছিল ঠিক একইরকম পরিবেশে সে এর আগে অন্য কোথাও উপস্থিত ছিল। সেদিনের পরিবেশটা তার কাছে বহু পরিচিত বলে মনে হচ্ছিল। সে অবাক হচ্ছিল এই ভেবে যে, হঠাৎ কীভাবে সে জাতিস্মর হয়ে উঠল? কিন্তু জাতিস্মরেরা তো পূর্বজন্মের স্মৃতি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। এতদিন পরে মানস পটে কি তাহলে পূর্বজন্মের কথা ভেসে উঠছে? সেই মুহূর্তে তার আর অন্য কিছু মনে পড়ছিল না। মনে মনে ভাবে তাহলে কি স্বপ্নে কখনও দেখেছিল এই দৃশ্য! একসময় নিজেকেই সে সান্ত্বনা দিয়ে বলে— বোধহয় তাই হবে! স্বপ্নেই দেখে থাকবে হয়তো।

সন্তোষবাবু তাকে পুনর্বার তাড়া দিয়ে বলেন— কী দেখছ তখন থেকে? আমি তো দেখার মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। চলো ভেতরে চলো। দিল্লি শহরে এরকম লাখ টাকার প্যান্ডেল তুমি অনেক দেখেছ এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এখানে না দাঁড়িয়ে ভেতরে গিয়ে দাঁড়াই চলো।

অর্পণ প্রত্যুত্তরে জিজ্ঞাসা করে— আমি কী দেখছি? দেখছি আমার স্বপ্নে দেখা এক চলমান দৃশ্যপটের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। অর্পণ আগের মতোই অবাক দৃষ্টিতে প্যান্ডেলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে— আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, এখানে দাঁড়িয়ে আমি কিন্তু একমাত্র আপনার কথাই চিন্তা করছিলাম। আমার মন বলছিল আপনি আসবেন।

(ক্রমশ…)

 

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...