মানুষের জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কেটে যায় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে। তাই অনেকের ব্যক্তিজীবন থাকে অবহেলিত। আর যারা ব্যক্তিগত যত্নের বিষয়ে সঠিক সময়ে ভাবেননি, তারা জীবন সায়াহ্নে এসে আক্ষেপ করেন। কিন্তু পরে ভেবে লাভ কী! মনুষ্য- জীবনকে সার্থক করে তুলতে হলে সঠিক সময়ে নিজের যত্ন নেওয়া আবশ্যক। কারণ, রোগভোগ কিংবা অসুখী মন নিয়ে গুমরে থাকার কোনও মানে হয় না। তার চেয়ে বরং নিজের জন্যও ভাবুন, সময় দিন নিজেকে। যত্ন নিন নিজের স্বাস্থ্যের এবং সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যের। সবার প্রথমে শরীরে গড়ে তুলুন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তারপর, মন ভালো রাখার কৌশল রপ্ত করুন। এই বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করার জন্য কলকাতা-র দু’জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং একজন মনোবিদের পরামর্শ তুলে ধরা হচ্ছে।

ডা. পার্থজিৎ দাস
(ডিরেক্টর- এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজি অ্যান্ড রিউম্যাটোলজি)

সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতে হলে, প্রথমে আপনার শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ঠিক রাখতে হবে, অর্থাৎ ইমিউনিটি পাওয়ার বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়াতে হবে। নয়তো, অটোইমিউন-এর সমস্যায় পড়তে পারেন। মনে রাখবেন, অটোইমিউন এমন একটি রোগ, যা শরীরের স্বাভাবিক কোষের উপর আঘাত হানে। বর্তমানে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি অটোইমিউন ডিজিজ-এর শিকার হচ্ছেন। আর এখন ধীরে ধীরে অটোইমিউন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এটি সম্ভবত হরমোনের পরিবর্তন, পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থ, খাদ্য, মানসিক চাপ, আঘাত, ব্যায়ামের অভাব, সংক্রমণ এবং অন্যান্য কারণে হতে পারে। রিউম্যাটিক ওষুধ ছাড়াও, জীবনধারার পরিবর্তনের ফলে স্বাভাবিক সুস্থতায় ফিরে আসা সম্ভব। এর জন্য যে-সব বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে, তা হল–

স্বাস্থ্যকর খাবার

পুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু আপনার ইমিউন সিস্টেমের ৮০ শতাংশ অস্ত্রের আস্তরণের মধ্যে রয়েছে, তাই প্রতিদিন আপনি কী খাচ্ছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি পুষ্টির ভারসাম্যই না থাকে, তাহলে অটোইমিউন রোগের শিকার হতে পারেন। সেইসঙ্গে, পর্যাপ্ত হাইড্রেশন বজায় রাখুন। আপনাকে প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক এবং প্রিবায়োটিক খাবার খেতে হবে। বিশেষকরে ফল এবং সবজি অর্থাৎ ডায়েটারি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া আবশ্যক। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাবার, কৃত্রিম রং-যুক্ত মিষ্টি, সাধারণ কার্বোহাইড্রেট এবং গ্লুটেন এড়িয়ে চলতে হবে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

যাদের ওজন বেশি বা স্থূল চেহারা, তাদের রোগের ঝুঁকি বেশি। মনে রাখবেন, পেটে চর্বি হলে কোষগুলি যৌগ তৈরি করে এবং নিঃসরণ করে, যা ক্ষতিকারক। তাই আপনি যদি স্থূল চেহারার হয়ে থাকেন, তাহলে শরীরের ওজন অন্তত দশ শতাংশ কমাতে হবে সুস্থ থাকার জন্য।

মানসিক চাপমুক্ত থাকুন

স্ট্রেস কর্টিসলের বৃদ্ধি ঘটায়, যা পরে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, স্ট্রেস অটোইমিউন রিউম্যাটিক রোগের উৎস হতে পারে। তাই, মানসিক চাপ কমাতে হবে। অতএব, জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখুন। বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলুন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন, যেমন— প্রাণায়াম, ধ্যান, যোগব্যায়াম ইত্যাদি। সেইসঙ্গে, এড়িয়ে চলুন ধূমপান এবং মদ্যপান।

পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন

অন্তত সাত-আট ঘণ্টা ঘুমোন প্রতি রাতে। যদি আপনি কম ঘুমোন, তাহলে আপনার ইমিউন সিস্টেম সুফল দেবে না। ঘুম শরীরের টিস্যুগুলিকে যথাযথ ভাবে নিরাময় করতে সাহায্য করে এবং অটোইমিউন রোগ আটকাতে সাহায্য করে, শরীরকে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার সমস্যা থেকেও মুক্তি দেয়। ঘুমোনোর সঠিক সময় রাত ৯-টা থেকে ভোর ৫-টা৷

উপযুক্ত ব্যায়াম করুন

দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে সুফল দেয় শারীরিক ব্যায়াম। নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম (যেমন— হাঁটা, জগিং, সাইকেল চালানো, সাঁতার প্রভৃতি) পেশীকে শক্তিশালী করে, টিস্যুকে সুস্থ রাখে, হাড় মজবুত করে এবং মানসিক চাপ কমায়।

ডা. এম এস পুরকাইত
(মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট- টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল)

সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন-যাপনের জন্য কিছু ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিদিন আমাদের শরীরকে কী সরবরাহ করছি, সেই বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। প্রতিদিন কিছু সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে প্রত্যেককে। স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকার জন্য কী কী করা উচিত, সেই বিষয়ে জেনে নিন বিশদে।

O প্রোটিন, ফাইবার এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার রাখতে হবে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায়। যেমন— প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া ফল, সবুজ শাক-সবজি প্রভৃতি। রান্নার মাধ্যমও হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর। যেমন— অলিভ অয়েল, ক্যানোলা তেল, সরষের তেল কিংবা সূর্যমুখী তেল অল্প পরিমাণ দিয়ে রান্না করতে হবে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় মাছ, চর্বিহীন মাংস এবং ডিম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন নির্দিষ্ট মাত্রায়। লবণ ও চিনি খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

O সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ দিন ২০ থেকে ৪০ মিনিট ধরে হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম করুন। সপ্তাহে ৫ দিন ১০,০০০ ধাপ হাঁটা আবশ্যক।

O প্রতিদিনের রুটিনে মেডিটেশন এবং যোগাসন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। হাত জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে সর্বদা। এর জন্য খাওয়ার আগে-পরে জীবাণুনাশক সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে কিংবা ভালো স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার রাখতে হবে। রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন। শুধুমাত্র পরিষ্কার এবং ফিল্টার করা জল পান করুন।

O শরীরে কোনওরকম অস্বস্তি অনুভব করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যত দ্রুত সম্ভব। মানসিক চাপমুক্ত থাকার জন্য নিজেকে নানারকম ভাবে ব্যস্ত রাখুন সর্বদা। হাতে কাজ না থাকলে ভালো বই পড়ুন কিংবা কমেডি ছবি দেখুন।

অপরূপা ওঝা
(ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট-মনোশিজ, টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ)

O মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে হলে, কিছু সময়ের জন্য মুঠোফোনের স্ক্রিন থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন এবং অফলাইন কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করুন।

O অনেক সময় আমরা শরীর এবং মনের উপর চাপ পড়লেও অক্লান্ত পরিশ্রম করি। কিন্তু দীর্ঘদিন শরীর এবং মনের উপর চাপ পড়লে এবং সেইসঙ্গে উপযুক্ত বিশ্রাম না হলে, রোগের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই, কর্মক্ষেত্রে আপনার ক্ষমতার বাইরে কাজের বোঝা চাপলে ‘না’ বলতে শিখুন। কারণ, সবকিছু মেনে নিলে তা ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয় দেয়।

O এমন জিনিস বা ক্রিয়াকলাপের জন্য সময় বের করুন, যা আপনাকে আনন্দ দেবে এবং আপনাকে মানসিক চাপমুক্ত রাখবে। এর জন্য গান, বাজনা, আঁকা, লেখা, ঘর সাজানো, বেড়ানো প্রভৃতি যে-কোনও শখ পূরণ করতে পারেন। অবসর সময়ে বই পড়াও একটা ভালো অভ্যাস হতে পারে।

O মুঠোফোনের মতো আপনার মনকেও রিচার্জ করুন। এর জন্য ভালো খাবার খান, ঘুরে বেড়ান, গান-বাজনা করুন, নাচুন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিন, পার্টি করুন, বাগানে গাছের যত্ন নিন কিংবা যে-কোনও ক্রিয়েটিভ কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। আর যদি কোনও কাজ না থাকে, তাহলে একটু বেশি সময় নিয়ে ঘুমোন।

O নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরে এন্ডোরফিন নিঃসরণ করে, যা মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে স্ট্রেস লেভেলও কমাতে পারে।

O যে-সব বিষয় মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে, সেইরকম বিষয় থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। যেমন, পরনিন্দা কিংবা অসাধু কোনও কাজ থেকে সর্বদা দূরে থাকুন। সবার সঙ্গে যতটা সম্ভব সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করুন।

O স্টাইলিশ জামাকাপড় পরুন, মন চাইলে সাজুন, শপিং করুন এবং অবসর সময়ে নিজের ত্বক এবং চুলের যত্ন নিন।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...