কেন যাই তার কাছে বারবার? হয়তো নতুন কিছু পাই। সাঁঝবেলা কিংবা ভোর! আর সেই ভোর-সকালের সন্ধিক্ষণে সূর্যোদয় অথবা গোধূলিবেলার সূর্যাস্ত, যা আলোর ভৈরবী অথবা পূরবী সংগীত হয়ে থেকে যায়। আসলে নিত্যদিনের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণাগুলো বুকের মধ্যে চেপে নকশি কাঁথার মাঠের আলপনা না এঁকে, নিজের সব ইচ্ছে, স্বপ্ন, ভালোলাগাগুলো মেঘে ঢাকা তারার মতো সুপ্ত করে না রেখে বরং কোনও ধানসিঁড়ি নদীর তীরে অথবা কোনও হাঁসুলি বাঁকে কিংবা কোনও তিস্তা পাড়ে গিয়ে সেগুলো পাখা মেলে উড়িয়ে দিয়ে আসি।

মধ্যবিত্ত গড়পড়তা বাঙালি প্রতিদিন টিকে থাকার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হওয়ার যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়ে তার অন্তরমহলে বসতকরা একজন জর্জ ম্যালোরির “Because it’s there”-এর উদাত্ত আহ্বান শুনে শংকরের মতো মাঝে মাঝে ‘চাঁদের পাহাড়’ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। আর ফিরে আসে রবিমামার বর্ণচ্ছটায় সজ্জিত হয়ে কাঞ্চনকন্যা তিস্তা অথবা হিমালয় কন্যা বিপাশা, বিয়াস, লিডার, অলকানন্দা, মন্দাকিনীদের সঙ্গে দেখা করে। অবশেষে তার মনের গহিনে থেকে যায় চতুর্দিকঘেরা ঘন সবুজ অরণ্য, নিকষ অন্ধকার আর নৈঃশব্দের উদযাপনের মহাজাগতিক মোহময়ী মায়া।

নিত্যদিনের ডেবিট-ক্রেডিট-এর হিসাব-নিকাশ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠে কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে দু-একদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়ার সেরা ঠিকানা ডুয়ার্স, যেখানে গেলে মনের শান্তি আর প্রাণের আরাম দুই-ই মেলে। ডুয়ার্স মানেই তুষারমৌলি হিমালয়ের পাদদেশে রূপের অনন্তসম্ভার নিয়ে মেলে ধরা এক সবুজকন্যা, যার কাছে রয়েছে খরস্রোতা বা জলতরঙ্গের মিঠে সুরে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী নদী আর ঝরনা, যারা কখনও একাকী, কখনও বা যৌথ ভাবে তৈরি করে নতুন নতুন সিম্ফনি। জানা-অজানা পাখিদের কলকাকলিতে এখানে যেমন ঘুম ভেঙেছে, তেমনই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় দূরের ঘন জঙ্গল থেকে ভেসে আসা হায়না কিংবা অন্য কোনও বন্যপ্রাণীর গর্জন শুনে শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেছে হিমেল স্রোত।

তবুও ডুয়ার্সের হাতছানি উপেক্ষা করা বড়োই কঠিন। তাই বারবার এদের টানেই চলে যাই কুয়াশা-মেঘ-রোদ্দুরের চাদরে মুড়ি দিয়ে বসে থাকা নতুন নতুন ডুয়ার্স-কন্যাদের কাছে। এরা সবাই হয়তো সৌন্দর্যের দিক থেকে চোখধাঁধানো রূপসি নয়। কিন্তু একান্ত নিরিবিলিতে থাকার জন্য এক নিরাপদ ঠিকানা, যেখানে গেলে পাওয়া যায় অনাবিল শান্তি আর নির্জনতা। যা ইদানীং ভ্রমণ মানচিত্রে থাকা জনবহুল পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। এমনই এক মুখচোরা কন্যা চামুর্চির কথা শুনে মনের পাখা মেলে দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম তার সন্ধানে।

ভারত-ভুটান সীমান্তে অবস্থিত নদী আর পাহাড়ঘেরা একটি ছোট্ট আদুরে গ্রাম চামুর্চি। জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের বানারহাট ডুয়ার্সের এক গুরুত্বপূর্ণ শহর, যার একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে হাতিনালা নদী আর শহরের বুক চিরে নাগরিক সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে চলে গেছে কালো পিচের ১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক। এখান থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে আছে পাহাড়ি সবুজ হ্যামলেট চামুর্চি। নদী, পাহাড়, চা-বাগান এবং তার পাশে নয়নাভিরাম ডুয়ার্সের এই সবুজ কন্যাটির দিকে এখনও সেভাবে পর্যটকদের নজর পড়েনি বলে অন্যান্য জায়গার মতো পর্যটকদের ভিড়ের চাপে এখনও পর্যন্ত তার নাভিশ্বাস ওঠেনি। গ্রামটি ছোটো হলেও এর ব্যাপ্তি অনেকটা এলাকা জুড়ে।

সকালবেলা গরুমারা অভয়ারণ্যের জিপ সাফারি করে আমরা এই জায়গায় দিন-সফরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। ততক্ষণে মিঠে রোদ্দুর আর কুয়াশাভেজা হিমেল হাওয়া সঙ্গী হয়েছে। পথের মাঝে একটু চা আর জলখাবার খাওয়ার বিরতি। এবার বানারহাট পেরিয়ে হাতিনালা মোড় থেকে কিছুটা ঘুরে যেতেই শুরু হল একের পর এক ঢেউখেলানো সবুজের সাম্রাজ্য। সবুজ রঙের যে এত বিভাজন হতে পারে, সেটা বোধহয় ডুয়ার্স ভ্রমণ না করলে আর কোথাও গিয়ে বোঝা যায় না। এখানে প্রায় ২৩টির উপর চা-বাগান রয়েছে। ডুয়ার্সের চা-বাগান মানেই চিরপরিচিত সেই দৃশ্য— সকালবেলায় একদল চা-শ্রমিক দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ ইতিমধ্যেই শুরু করেছেন একটি পাতা দুটি কুড়ি তোলা।

চারিদিকে ঢেউখেলানো চা-বাগানের সবুজ শামিয়ানা। বর্ষায় সদ্যস্নাত গাছগুলো যেন আরও সতেজ হয়ে নতুন রং তুলে ধরেছে। নিত্যদিনের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর মহিলা শ্রমিকরা যথারীতি ব্যস্ত গাছের পরিচর্যায়। পিঠের টুকরির মধ্যে একে একে জড়ো হয় “একটি কুঁড়ি দুটি পাতা’। তাদের রংবেরঙের পোশাক ফুল গাছের সঙ্গে মানানসই, কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় বিষণ্ন মুখ। জীবনের সমস্ত সুখ, বেঁচে থাকার আনন্দ, আকাঙ্ক্ষা কেড়ে নিয়েছে। সেটা একমাত্র তাদের মুখের দিকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তবেই জানা যায়। এত অজস্রবার এ পথে যাতয়াত, তবুও সবুজ চা-বাগান দেখলে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিয়ে ছবি তোলা যেন একপ্রকার বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি তুলে আবার গাড়িতে করে পথ চলা।

পাহাড়ে মরশুমি ফুলের বান ডেকেছে। সারা রাস্তায় যেন ফুলের জলসা বসেছে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য। তাদের রূপের বাহারে আর রঙের ছটায় চোখে লাগে নেশা, তা সে বসতবাড়িতে সযত্নে লালন করাই হোক কিংবা পথের ধারে অযত্নে জঙ্গলে বেড়ে ওঠাতেই হোক৷ এক সময় শেষ হয় সবুজের এই অন্তহীন সাম্রাজ্য। যেহেতু কাছেই ভুটান সীমান্ত, গাড়ি যত এগোতে থাকে ততই চোখে পড়তে থাকে একটা মিশ্র ধরনের সংস্কৃতি। দেখতে দেখতে চলে আসি চামুর্চি বাজারে। হঠাৎ করেই যেন এই বাজারের হই- হট্টগোল, চেঁচামেচি, ধুলোবালিময় রাস্তা, দোকানপাট, গাড়ির হর্ন একটু বিসদৃশ লাগে।

একসময় পথের বাঁক পেরোতেই দূর থেকে দেখা যায় সবুজ পাহাড়। ওটাই ভুটান পাহাড়। প্রথম দর্শনেই যাকে দেখে মুগ্ধ হতে হয়। এই পাহাড় থেকে নেমে আসা ডায়না নদীর থেকে বিভক্ত হওয়া কৃতি-সুকৃতির সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ধূপগুড়ি ব্লক পঞ্চায়েত সমিতির নির্মিত ইকো রিসর্ট। তবে এখানে যেতে গেলে ডায়না নদী পেরিয়ে যেতে হয়। এর সরু একটা রুপোলি রেখা জয়ন্তী নদীর কথা মনে করিয়ে দেয়। ডায়না রিভার বেড, বছরের অন্যান্য সময় শুষ্ক থাকলেও বর্ষাকালে জলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন এপারে গাড়ি রেখে ওপারে যেতে হয়। রিসর্টে বলা থাকলে সেখান থেকেই গাড়ি পাঠিয়ে দেয় তারা।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...