কোনওরকমে স্ত্রীকে দুটো খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজে খাবার টেবিলে গিয়ে বসল সুধাকর। খাবার মুখে তুলতে গিয়ে নজর চলে গেল দেয়ালে টাঙানো শ্রীরামকৃষ্ণের ডানহাত তোলা কল্পতরু ছবিটার দিকে। হাতটা কেঁপে উঠল, হাত থেকে খসে পড়ল রুটির টুকরো। আকুল নয়নে বিড়বিড়িয়ে উঠল, “এতই যদি দয়া তোমার, তাহলে কেন ওকে এত কষ্ট দিচ্ছ ঠাকুর? কেন তিলতিল করে নিভিয়ে দিচ্ছ ওর প্রাণের বাতি, কেড়ে নিচ্ছ ওকে আমার থেকে?”
কোনওরকমে দুটো মুখে দিয়ে শুতে গেল সুধাকর। দেখল চন্দ্রা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে করে টেবিলে রেখে দিল যাতে ইনকামিং কলের আওয়াজে ওর ঘুম না ভেঙে যায়। তারপর বিছানায় শুয়ে ডান হাতটা কপালে রেখে চোখ দুটো বোজার চেষ্টা করল। গোটাদিনের ক্লান্তিতে শরীরটা ভেঙে আসছিল, কিন্তু চোখে ঘুম এল না। বুক ফেটে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এক অজানা ব্যথায় গুলগুল করে উঠল বুকের ভিতরটা।
এমন দিনে যে সবথেকে বেশি আনন্দ-উচ্ছল হয়ে উঠত, আজ তার মনেই নেই দিনটার কথা। নিরাসক্তের মতো মিষ্টির টুকরোটুকু খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা হল সুধাকরের, মনটা অভিমানে ভেঙে পড়ল— কী এমন পাপ করেছিলাম আমরা যে এই শাস্তি দিলে দয়াময় ? কেন এভাবে কেড়ে নিলে বুকের ধনকে? কেন তার দেহটুকু পর্যন্ত দেখতে দিলে না? এ তোমার কেমন বিচার প্রভু?
হঠাৎ চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল মোবাইলের আলো জ্বলতে দেখে। বিরক্ত হল সুধাকর, এই রাতে কে আবার জ্বালায়? আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে দেখে সুবোধ ডাক্তারের ফোন। ফোনটা নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে ভেসে এল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর একটা দারুণ খবর আছে সুধা। বল কী খাওয়াবি? অবাক হল সুধাকর!
—তুই তো দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলি না? ওখান থেকে এই রাতেরবেলা আবার কী দারুণ খবর দিবি?
—আছে বন্ধু আছে, জবর খবর আছে। শুনলে তোদের একেবারে মাথা ঘুরে যাবে।
—আর সাসপেন্স বাড়াস না তো, তাড়াতাড়ি বল কী বলবি?
—তোদের সূর্যশেখর মরেনি, বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। আকাশ থেকে পড়ল সুধাকর!
—কী সব উলটোপালটা বকছিস বল তো? রাত দুপুরে গাঁজা টেনেছিস নাকি?
—না রে, সত্যি বলছি। আজ বিকেলে হোটেলে ফেরার পথে রাস্তায় ওকে দেখে আমিও চমকে উঠেছিলাম। ঠিক তোর সূর্যর মতো দেখতে। তারপর কথায় কথায় জানতে পারলাম ওর মা-বাবা নেই, এক নেপালি পরিবারে মানুষ। তবে বাংলা ভালোই বলতে পারে। ওরা নাকি ওকে বছর কুড়ি আগে খুঁজে পেয়েছিল এক পাহাড়ি ঝোরার ধারে। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গিয়েছিল, তাই আগেকার কথা কিছু মনে ছিল না। তারপর চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর তারাই ওকে বড়ো করেছে। আমি ওকে বলেছি তোদের কথা। ওর নেপালি মা-বাবার সঙ্গেও কথা বলেছি। ও রাজি হয়েছে আমার সঙ্গে কলকাতা যেতে।
কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছিল না সুধাকরের। মনটা ছটফট করে উঠল ছেলেটিকে একবার দেখার জন্যে। বলল, ‘কখন নিয়ে আসবি ওকে?”
—কাল সকালেই। আমি তো ট্রেন থেকেই বলছি।
—ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আয়।
–আচ্ছা, বউদি কী করছে? ওকে কিছু বলিস না এখন, একেবারে পৌঁছে সারপ্রাইজ দেব।
—আচ্ছা ঠিক আছে, বলে সুধাকর ফোনটা টেবিলে রেখে আস্তে আস্তে গিয়ে ঢুকল বিছানায়। আলতো করে স্ত্রীর কপালে হাতটা বুলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। মনের মধ্যে ভিড় করে এল ছেলের ছোটোবেলার স্মৃতিগুলো। কল্পনায় ভেসে ভাবতে লাগল ছেলেকে ফিরে পেয়ে চন্দ্রার হাসিমুখের ছবি।
সারাটা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না সুধাকর। মনটা এক অদ্ভুৎ আনন্দে ভরে গিয়েছিল— এবার হয়তো তার চন্দ্রা ধীরে ধীরে সেরে উঠবে। আবার তাদের জীবন ভরে উঠবে হাসিগানে। সকাল সকাল উঠে শৌচকর্ম সেরে বসে রইল বিছানার পাশে। চন্দ্রার চোখ খুলতে একটু বেলা হল। তাকে আস্তে আস্তে তুলে বসিয়ে নিয়ে গেল বাথরুমে। হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসতেই বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘বোসো, আমি চা করে আনছি।’
খানিক পরে চা করে নিয়ে এসে দু’জনে খেতে বসল। দুটো বিস্কুট দিতে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অনেক সাধ্যসাধনা করে একটা বিস্কুট নিয়ে মুখে দিয়ে তাকিয়ে রইল দেয়ালে টাঙানো ছেলের ছোটোবেলার ছবিটার দিকে। সুধাকর অন্য কথা বলে মন ভোলাবার চেষ্টা করেও সফল হল না। শেষে কী জানি কী মনে করে বলেই ফেলল, ‘আচ্ছা আজ যদি ছেলে তোমার সামনে এসে দাঁড়ায়, চিনতে পারবে তাকে?’
চমকে উঠল চন্দ্রাবলী। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল, “এরকম নিষ্ঠুর ঠাট্টা কোরো না তো আমার সঙ্গে!” অনেক কষ্টে তাকে শান্ত করে বলল, “দেখো, আসতেও তো পারে। ঈশ্বরের বিচিত্র দুনিয়ায় কত কিছু ঘটে। এটাও যে হবে না। তার ঠিক কী?”
—এই পোড়া কপালে কিছুই হবে না। আমিই তাকে খেয়েছি। হাত ফসকে তাকে ফেলে দিয়েছি খাদে। সে রাগ করেছে, আর আমার কাছে আসবে না। বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল।
হঠাৎ বাইরে থেকে কলিং বেলের শব্দ শুনে সুধাকর চমকে উঠল। ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেখে সুবোধ ডাক্তার, সঙ্গে একটা বছর চব্বিশ-পঁচিশের ছেলে। মুখের আদল খানিকটা তাদের সূর্যের মতো।
ডাক্তার বলল, ‘এই তোদের সূর্য, এর কথাই কাল তোকে বলেছিলাম।’
( ক্রমশ…)





