অলকানন্দা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে বলল, ‘টুঙ্কা, আজ খেলতে যাবে না। প্রচুর রিভিশন আছে, সামনেই টেস্ট।’ টুঙ্কা বলল, ‘অনেকটা রিভিশন হয়ে গেছে মা, বাকিটা রাতে করব। রবীন্দ্রজয়ন্তীর রিহার্সাল আছে তো, তাই টাপুর লুকিয়ে এসে পর্দার তলা দিয়ে বলে গেছে।’ এটুকু বলেই টুঙ্কা বাবার ইশারায় নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল। অলকানন্দা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে সৌমেন-কে দেখে বলল, ‘আশকারা দিয়ে মেয়ের বারোটা বাজাও, তারপর দেখব সামলাও কী করে?’
টাপুর আর টুপুর, সেনগুপ্ত বাড়ির যমজ দুই মেয়ে। টাপুর চার মিনিটের ছোটো টুপুরের থেকে। দুই বোনের চরিত্রের গঠনগত দিক সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন, টাপুর খুবই ছটফটে, দুরন্ত। এত দুষ্টুমি করেও টাপুর অঙ্কে প্রচণ্ড ভালো। আমার আবার সব সমস্যা অঙ্ক নিয়ে। তাইতো টাপুরের সঙ্গে গলায় গলায় ভাব।
টুপুর তুলনায় বাধ্য। সব সময় বই মুখে করে থাকা শান্ত, চাপা, ঠোঁট টিপে থাকা মেয়ে। টুপুর দুর্দান্ত ছবি আঁকে, ফ্রেম ডিজাইনের কনসেপ্ট একদম অন্যরকম। ছোটো থেকেই সবাই জানি টুপুর ইন্টিরিয়র ডিজাইনার হবে। এরা দু’জনেই প্রিয়, কিন্তু টাপুর হল গিয়ে আমার ক্রাইম পার্টনার, একটু বেশি কাছের। প্রায় একইরকম দেখতে যমজ দুই বোনেকে যাতে কেউ গুলিয়ে না ফেলে, তাই সেন- কাকি সব সময় টাপুরের চুলটা বয়েজ কাট করে রাখে।
আমার জন্মদিনে পাড়ার বন্ধুদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে। কলকাতা থেকে জেঠু পিসিরা বিশাল কেক আর বেশ কয়েকটা গল্পের বই নিয়ে হাজির। সকাল থেকে মা রান্নার মাসি-কে নিয়ে খুব ব্যস্ত, আর বাবা ঘনঘন বাজার যাচ্ছে। টাপুর-টুপুরের আজ সারাদিনের নেমন্তন্ন আমাদের বাড়িতে। কেক কাটা, বেলুন ফাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে মজা, হুল্লোড় করে আনন্দে জন্মদিন কেটে গেল। দশটা গল্পের বই পেয়েছি, তার মধ্যে আছে খুব পছন্দের লীলা মজুমদারের ‘দিন দুপুরে’ বইটা। আমি গুছিয়ে রেখেছি আমার বইয়ের তাকে। পরদিন একটু বেলার দিকে গল্পের বইগুলো নিয়ে বসলাম, ওমা দেখি একটা বই কম। পছন্দের ‘দিন দুপুরে’-টাই নেই।
আমি কান্নাকাটি জুড়ে দিতে বাবা এসে শান্ত করতে বসল। মা রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে ছুটে এসে বলল ‘আরও ধিঙ্গিপনা করো, আনন্দের চোটে নিজেই কোথায় ফেলেছ দ্যাখো।’
আমি আরও জোরে কেঁদে জানালাম, ‘ওটা টাপুর দিয়েছে, কী হবে? আমার খুব লজ্জা করবে বইটা হারিয়ে গেছে বলতে।’ বাবা বলল, ‘দরকার হলে আমি কিনে দেব। কিন্তু তুমি ভালো করে খুঁজে দ্যাখো।’
পরীক্ষার পর এক রবিবারে আমি টাপুরদের বাড়ি খেলতে যাচ্ছি। মা তখন বলে দিল, ‘বইয়ের ব্যাপারে কাউকে কিচ্ছু বলবে না কিন্তু।’
টাপুরদের ছাদে দারুণ খেলার আসর বসেছে। পিয়া, ডেম্পো, রানাদা সবাই এসেছে। ক্যারামের এক্সট্রা স্ট্রাইকার আনতে আমি নীচে ওদের ঘরে ঢুকে খাটের নীচ থেকে ক্যারামের গুটি রাখার টাবটা বার করতে গিয়ে দেখলাম, বুকশেলফ থেকে একটা বই মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তুলে রাখতে গিয়ে দেখি ‘দিন দুপুরে’ বইটা। প্রথম পাতার নীচের দিকে হাতে লেখাটা কালো কালিতে কে দাগিয়ে রেখেছে। আমি তো ভয়ে কাঁপতে লাগলাম! এটা তো আমার সেই বইটা, এখানে কী করে এল!
কোনওরকমে টাবটা টেনে স্ট্রাইকার খুঁজতে গিয়ে দেখি, টাবের মধ্যে আমার সেই বিনাকাগুলো। বিনাকা পেস্টের সঙ্গে প্রতিবার একটা করে জীব-জন্তু, পাখি থাকত। আমি আর মা অনেক বিনাকা জমিয়েছিলাম। ভালো করে নজর করে দেখলাম, এখানে সেই ক’টা বিনাকাই আছে, যেগুলো আমাদের শোকেসে আর নেই। সারা বাড়ি, বাইরের বাগানে তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি। খুব বকেছিল মা-বাবা। ভেবেছিল, আমি মা-কে না বলে বন্ধুদের দিয়ে দিয়েছি। এখন দেখছি বিনাকাগুলো ওদের টাবে পড়ে আছে। আমি প্রচণ্ড ভয় পেলেও, একটা বিনাকা জামার পকেটে করে লুকিয়ে বাড়ি চলে এলাম।
মা-কে চুপিচুপি বললাম, ‘দিনে দুপুরে’ বইটা তো টাপুরদের বাড়িতে রয়েছে। পকেটে লুকিয়ে নিয়ে আসা জিরাফ বিনাকাটা দেখিয়ে বললাম, দ্যাখো। তখন কত বকেছিলে আমায়! বাকি সব বিনাকাগুলো ওই টাবে কী অযত্নে পড়ে আছে। মা বলল, টুঙ্কা একদম বারণ করে দিচ্ছি, ঘুণাক্ষরেও কোনও বন্ধু বা অন্য কাউকে কিচ্ছু বলবে না প্রমিস করো। বাবা আর একটা নতুন ‘দিনে দুপুরে’ গল্পের বই কিনে দিয়ে লিখে দিল— আদরের টুঙ্কা-কে বাবা।
অসংখ্য আনন্দ, মজা, ধাপ্পা, আব্বুলিশের স্মৃতি সঞ্চয় করে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি টপকে আমি কলকাতার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ভর্তি হলাম সাইকোলজি নিয়ে। ছোটোবেলার বন্ধুরা ছড়িয়ে ছিটিযে দূরে চলে গেলেও আমার আর টাপুরের যোগাযোগটা রয়ে গেল। টাপুর যাদবপুরে ম্যাথেমেটিক্স অনার্স নিয়ে ভর্তি হল। ওর বিদেশে গিয়ে রিসার্চ করার ইচ্ছে। টুপুর কলকাতা আসেনি। ও ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়বে, তাই এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রিপারেশন নিচ্ছে। সেকেন্ড ইয়ারে বাড়ি গিয়ে শুনলাম, টুপুরকে নিয়ে বাড়িতে সমস্যা হচ্ছে। পাড়ায় হাওয়াতে কিছু কথা ভাসছে। কিন্তু সত্যিটা কেউ জানে না। সেন কাকু আর কাকি টুপুর-কে নিয়ে বারবার ডাক্তারের কাছে ভিজিট করছে।
মনটা খারাপ! আমার মাথায় তখন সেমেস্টারের গন্ধমাদন, টাপুরেরও তাই। সেমেস্টারের শেষে টাপুরকে ফোনে পাকড়াও করে বললাম, “চল একদিন দু’জনে ডে-আউট করি।’ প্রথমে টাপুর এড়াতে চাইলেও কী ভেবে শেষে রাজি হল। আমরা একটা সিনেমা দেখে রেস্তোরাঁয় বসলাম। টাপুর যেন ঠিক সহজ হতে পারছে না। বললাম, ‘টাপুর, আমার সাবজেক্ট সাইকোলজি। তাই তুই যাই লুকোস না কেন, আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবি না। আমি তোর ছোট্টবেলার বন্ধু, তোদের খারাপ হোক চাইব না। টুপুরের কী হয়েছে? আমি তোর থেকে সত্যিটা শুনতে চাইছি।’
টাপুর কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, “টুপুর একটা বিশেষ রোগের স্বীকার। ছোটোবেলায় বোঝা যায়নি, কিন্তু মাঝে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, ওকে নিয়ে কোথাও যাওয়া যেত না। গেলেই গণ্ডগোল হতো। তারপর থেকে টুপুর নিজেই কেমন গুটিয়ে গেছে। কোথাও যেতে চায় না, দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে।”
—এটা আমার সাবজেক্ট টাপুর। সাধারণের কাছে এর গুরুত্ব যত কম, আমার কাছে তত বেশি। প্রতিপদে মানুষ ভারসাম্য হারাচ্ছে। মেন্টাল ডিজঅর্ডার? ম্যাসিভ ডিপ্রেশন? এর মধ্যে কোনটা ?
টাপুর হাঁ করে তাকিয়ে বলে, ‘স্ট্রেঞ্জ, ভেরি স্ট্রেঞ্জ। তুই জানলি কেমন করে টুঙ্কা? এটা আমরা বাড়ির চারজন ছাড়া কোনও আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত জানে না। অন্য রোগ জানে। জানিস তো শিক্ষিত লোকেরাও ডিপ্রেশনকে পাগল ছাড়া আর কিছু ভাবে না?’
—তোর মনে আছে টাপুর, একবার আমার জন্মদিনে তুই লীলা মজুমদারের লেখা ‘দিন দুপুরে’ বইটা গিফট করেছিলি। সেই রাতেই বইটা হারিয়ে যায়। আমি খুব কেঁদেছিলাম তোর দেওয়া বলে! যদিও বাবা আমায় কিনে দিয়েছিল। তাও দুঃখ যায়নি। একদিন তোদের বাড়ি গিয়ে তোদের বুক শেলফে বইটা পাই। এছাড়াও আমাদের অনেকগুলো জমানো বিনাকা কী করে বাড়ি থেকে হারিয়ে গেছিল কেউ জানি না৷ ওগুলোও আমি তোদের খাটের তলার টাবে পেয়েছিলাম। বাড়িতে এসে বলায়, মা আমায় দিয়ে প্রমিস করিয়ে নিয়েছিল; তাই তোকে বলতে গিয়েও বলতে পারিনি।’
টাপুর বলল, “টুপুর পেন্টালুন্সের স্টোরে গিয়ে ধরা পড়েছে। ভাগ্যিস বাবা ছিল, তাই পুলিশ কেস হয়নি। ও যা যা শপ লিফটিং করেছিল, সব পে করে বাবা বাড়ি নিয়ে আসে। তার পরেই সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মিত্রের সঙ্গে কনসাল্ট করে ওর ট্রিটমেন্ট শুরু হয়। এখন অনেক বেটার আছে। জাস্ট নাও টুপুর কলেজেও যাচ্ছে।’
(ক্রমশ…)





