মঙ্গল: আজ্ঞে না মশাই। অতটা গুড় আধসের না। এটি হচ্ছে না। রাজা চোখের জলে নাকের জলে ভাসছে। তবু তার মধ্যেই খাজনা আদায় নিয়ে হিসেব নিকেশ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখছেন। নতুনপল্লির তিন প্রজার শাস্তির বিধান দিয়েছেন।
রবি: তাহলে দেখা যাচ্ছে কথাটা সত্যি। আদতে ভোলানাথ পাগল না।
মঙ্গল: তারই মধ্যে কান্নার বিরাম নেই। রাজা কেঁদে ভাসাচ্ছে। বড়োরানি রাজার মন ভালো করার অনেক চেষ্টাচরিত্র করলেন। অনেক বুদ্ধি খাটালেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। শেষমেশ বড়োরানি একদিন ছোটোরানিকে ডেকে বললেন…..
দৃশ্যান্তর
(রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল)
বড়োরানি: হ্যাঁরে, পূর্ণশশী, রাজা তো তোর গান শুনে তোকে পছন্দ করে এনেছে। তুই একবার রাজার কাছে যা না। গিয়ে কাছে বোস। একটু পিরিতের কথা বল টল। ছলাকলা কর। একটা গান শোনা। দ্যাখ যদি তাতে কাজ হয়।
পূর্ণশশী: না বাবা না। রাজার মুখটা ভাবলেই আমার প্যালপিটিশন শুরু হয়ে যায়। ও আমি পারব না।
বড়োরানি: পারবি না মানে! গান জানিস। ন্যাকামো করিস না লো। এই বেপদের সময়…
(পূর্ণশশীকে ঠেলে রাজার ঘরে ঢুকিয়ে দেয় বড়োরানি।
রাজা: তুমি আবার কী মনে করে?
পূর্ণশশী: ভাবছিলাম ক’দিন ধরে।
রাজা: কী ভাবছিলে পূর্ণশশী?
পূর্ণশশী: এই তোমার কাছে এসে একটু বসি। তুমি তো আমার গান খুব ভালোবাসো। গাইব? শুনবে একটা গান?
রাজা: গাইতে চাও গাও। কিন্তু, কিছুই ভালো লাগে না আমার। আজকাল তোমাদের দেখলেও কোনও এন্থ পাইনা। গাও, গাইতে চাও গাও।
পূর্ণশশী: গান শোনো, দেখো ঠিক মন ভালো হয়ে যাবে। (গান ধরে) তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ? (গান শুনে রাজা ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে। পূর্ণশশী ঘাবড়ে যায়।)
রাজা: (কান্নার স্বরে) আমি সুন্দর? তাই চেয়ে থাকো? ওসব বিদ্রুপ রাখো। এটা কি আমার চেয়ে থাকার মতো সুন্দর মুখ? উলুকনগরের রাজা আমার টাক নিয়ে ঠাট্টা করেছে। সে আমার ঘোরশত্রু। আর তুমি আমার ঘরশত্রু। যাও ভাগো এখান থেকে। (পূর্ণশশী হাতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়)। ওরে কে আছিস রাজবদ্যিকে ডাক। এখনই আসতে বল।
(রাজা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। রাজবদ্যির প্রবেশ)
রাজা: এই যে রাজবদ্যি, আমার চুল গজানোর ফর্মুলা কিছু হল? সারাজীবন কি আমি এই টাকের বোঝা বয়ে বেড়াব?
রাজবদ্যি: মহারাজ, বোঝা হলে তো বয়ে বেড়ানোর প্রশ্ন আসে। সেদিক দিয়ে আপনার বোঝা তো একেবারে হালকা হয়ে গেছে। রাজা: কী বাজে বকছ?
রাজবদ্যি: বলছিলাম মহারাজ, চুলে সুগন্ধি তেল মাখো, নিত্য নিত্য শ্যাম্পু করো, ভেজা চুলে তোয়ালে ঘসো, চুল শুকোও। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো। হ্যাপা কি কম? এখন এসব ঝামেলা থেকে আপনি কত মুক্ত ভাবুন তো? মাথায় একটা জুতসই মুকুট পরে নিন। টাক হাওয়া হয়ে যাবে।
রাজা: এসব বলে তুমি আমার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিচ্ছ? ফর্মুলার কথা কিছুই ভাবছ না?
রাজবদ্যি: না মহারাজ না। আমি ভাবছি। মাইরি, মা কালীর দিব্যি, স্বয়ং বিসমিল্লাহর দিব্যি আমি ভাবছি। বলছিলাম মহারাজ, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। মহামন্ত্রীকে বলে গোটা রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিন। যে বিজ্ঞানী টাকে ফর্মুলা বের করে দিতে পারবে, তাঁকে অনেক টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
রাজা: যা খুশি করো, ঢ্যাঁড়া পেটাও, গলা ফাটাও। মোট কথা আমার টাক হটাও।
রাজবদ্যি: হটে যাবে। টাক হটে যাবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস উপায় একটা হবেই হবে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। মহামন্ত্রীকে বলুন, পাইক পেয়াদাকে ফিল্ডে নামিয়ে দিতে।
(ঢ্যাঁড়া পেটানো হয়।)
পেয়াদা: শোনো শোনো সর্বজন শোনো। যে বিজ্ঞানী রাজার টাকে চুল গজানোর ফর্মুলা দিতে পারবেন, তাঁকে দশহাজার টাকা ও জমি পুরস্কার দেওয়া হবে।
দৃশ্যান্তর
(শম্ভু ও মালতীর সংসার)
মালতী: বলি এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে আছো যে। রুজিরোজগারে বেরোও। কুঁড়ের বাদশা। শুয়ে শুয়েই কাল কাটালে আর বুদ্ধি বুদ্ধি করে গলা ফাটালে। বলি অতই যদি বুদ্ধি, তাহলে খাওয়া জোটে না কেন? ঘরে যে জল পড়ে। ওনার কথা হল, খিদে পেলে পেটে কিল মারো। জল পড়লে পাশ ফিরে শোও। হ্যা, ছ্যা, ঘেন্না ধরে গেল জীবনে।
শম্ভু: (শুয়ে শুয়ে গান করে) ভালো কইরা ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর… লোকে বলে, ও বলে রে ঘরবাড়ি ভালো নাই আমার।
মালতী: (মুখ ঝামটা দেয়) থামো। ন্যাকামো কোরোনা। একে তাকে বেশ বুদ্ধি দাও। তা সেই বুদ্ধিটা কেন নিজের বেলায় খাটাচ্ছ না?
শম্ভু: খাটিয়েছি। বুদ্ধি খাটিয়েছি গিন্নি। এমন বুদ্ধি খাটিয়েছি যে, এবার রাজার হালে থাকব। তুমি রাজরানি হবে।
মালতী: তোমার ওই স্বপ্ন দেখেই জীবন কেটে গেল।
শম্ভু: শোনো না। স্বপ্ন না। রাজার লোক ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে গেল, রাজার টাকে চুল গজানোর ফর্মুলা চাই। আমার মাথায় একটা ফর্মুলা এসেছে।
মালতী: তুমি কি বিজ্ঞানী?
শম্ভু: বিজ্ঞানী সেজে যাব রাজপ্রাসাদে।
মালতী: তুমি কি পাগল হলে? ধরা পড়লে গর্দান যাবে।
শম্ভুঃ না না। ধরা পড়ব না। মোক্ষম ফর্মুলা। পুরস্কার নিয়েই ফিরব।
দৃশ্যান্তর
রাজপ্রাসাদ
রাজা: তুমি বলছ, তোমার ফর্মুলায় কাজ হবে?
শম্ভু: হবে মহারাজ, নিশ্চয়ই হবে। তবে মহারাজ, আপনার সঙ্গে আমার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে আমি আপনাকে ফর্মুলা বলব। আমি আমার ফর্মুলা আপনার শরীরে প্রয়োগ করব না। প্রয়োগ করব আপনার মগজে। মগজ থেকে যাবে ঘিলুতে। ঘিলু থেকে যাবে তালুতে। তারপরেই দেখবেন মহারাজ মাথার তালুতে গোছা গোছা চুল ঠেলে উঠবে।
রাজা: তাই নাকি? এ তো বিজ্ঞানী দেখছি ম্যাজিকের কথা কচ্ছে। ভেবে আমার ভারি আহ্লাদ হচ্ছে। বিজ্ঞানী: চলুন, কোন ঘরে বসবেন চলুন।
রাজা: আপনি আসুন আমার সঙ্গে। (দু’জনে রুদ্ধদ্বার ঘরে ঢুকে পড়ে)।
রবি, সোম ও মঙ্গল নেচে নেচে গায়।
গান—
আহা বাহা কী মজারে রাজার মাথায় চুল গজাবে
সমস্যা থাকবে না আর
মুখে হাসি ফুটবে রাজার
ঝরবে না রাজার আর চোখের জল
ফর্মুলা এসে গেছে ফলবেই ফল
ধানের চারার মতো রাজার মাথায় চুল গজাবে হাজার হাজার
(আচমকা রাজার অট্টহাসি শোনা যায়)
হাসতে হাসতে রাজা মঞ্চে প্রবেশ করে। হাসি শুনে রানিরা ছুটে আসে। তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। রাজা কাঁদছে না। উলটে অট্টহাসি হাসছে!
রাজা: ওরে কে আছিস, বিজ্ঞানীকে যথাযথ পুরস্কার দিয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে সসম্মানে বিদেয় কর।
(তিনরানি এককোণে দাঁড়িয়ে রাজার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে)
বড়োরানি: হ্যাঁরে, বিজ্ঞানী আবার রাজাকে কিছু খাইয়ে পাগল টাগল করে দিল না তো?
রাজা: কী গুজগুজ ফুসফুস করছ তোমরা রানি? আরে না না। পাগল হইনি আমি। বরং বলতে পারো পাগল হয়ে গেছিলাম। এখন পাগলামি ছুটে গেছে। আমি ভালো হয়ে গেছি। হা হা হা হা…..
বড়োরানি: তোমাকে তো আবার কিছু বলতে ভয় করে। কখন কী মুডে থাকো। অনেকদিন পরে তোমাকে হাসতে দেখে ভালো লাগছে।
রাজা: আমারও ভালো লাগছে।
বড়োরানি: কিন্তু অবাক লাগছে, বিজ্ঞানী কী এমন ফর্মুলা দিল। ওকে যে আগেই পুরস্কার দিয়ে দিলে, চুল গজাতে কি খুব দেরি হবে?
রাজা: আরে ধুর, ওই বুড়ো বজ্জাত বিজ্ঞানীর ফর্মুলা আমি নিয়েছি নাকি অ্যাঁ? বলি ওই বজ্জাত বিজ্ঞানী যে ফর্মুলা দিয়েছে, সেই ফর্মুলা নিলে তোমাদের তিনরানিকে নিয়ে আমায় গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। বুড়ো বিজ্ঞানী শয়তান বলে কিনা, গলায় গলায় ভাব টাক আর টাকাতে, টাকাকে ছাড়তে হবে টাকটাকে ঠেকাতে। বোঝো কথা বোঝো। সারাজীবন ধরে তিলতিল করে আমি যে টাকার পাহাড় তৈরি করেছি, তাকে কিনা ছাড়তে হবে। টাকার জন্যই যদি আমার এই টাক, তবে তো সেই টাক লক্ষ্মী। সেই লক্ষ্মী যুগযুগান্ত আমার মাথায় থাক। হারামজাদা বিজ্ঞানী বলে কিনা বিলি করে দিন টাকা, থাকবে না টাক। রাতারাতি রাজকোষ করে দিন ফাঁক।
বড়োরানি: তুমি কী বললে?
রাজা: আমি বলি, মরে যাব, থাক তবে থাক। আমি রাজা বলেই তো রাজকীয় টাক।
বড়োরানি: তাহলে ওকে যে তুমি পুরস্কার দিলে!
রাজা: পুরস্কার দিয়েছি কি ফর্মুলার জন্য নাকি? ওর সঙ্গে আমার একটা চুক্তি হয়েছে। ও আমাকে যে অস্বস্তিকর ফর্মুলাটা বাতলেছে, তা যেন ও পাঁচকান না করে। টাকা দিয়েছি সে জন্য। শুনলে প্রজারা কী বলবে? অ্যাঁ কী বলবে? বলবে, টাকার শোক সামলাতে গিয়ে রাজা চুলের শোক ভুলে গেল। আমি কি অত বোকা? হা হা হা হা… (রাজার অট্টহাসিতে রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠল।
(রবি, সোম ও মঙ্গল তিনজন ফের নাচের তালে তালে ঢুকে গাইতে লাগল)
গান—
রাজার চোখে জল, কে দেখেছে বল?
এই তো দেখ দিব্যি রাজা হাসতেছে কলকল….
(ধীরে ধীরে যবনিকা নেমে আসে)





