নীতি আয়োগের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন যে, নারীশক্তি ব্যবহারের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির একটি নীতি তৈরি করা উচিত। কিন্তু তাঁর নিজের দল দিনরাত ‘হিন্দু-হিন্দু’ আর ‘পূজা-পূজা’ করতে থাকে। শুধু তাই নয়, মহিলাদের মাথায় করে কলসি বহন করতে, ঘন্টার পর ঘন্টা মন্দিরে গিয়ে পূজায় বসে থাকতে কিংবা সারা সপ্তাহ ধর্মীয় বক্তৃতা এবং উপবাসে থাকতে উৎসাহিত করছেন ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতারা। আরও যদি নতুন মন্দির নির্মিত হয়, তাহলে বেশিরভাগই দেখা যাবে মহিলা ভক্ত এবং তারা মন্দিরের পুরোহিতের হাতে অর্থ ও অন্নবস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের খুশি রাখতে চাইবেন। এভাবেই ভক্তদের দানে মন্দিরের ‘প্রণামী’ বাক্স ভরবে এবং আখের গুছিয়ে নেবেন পুরোহিতরা।

ভারত বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ, কিন্তু যে দেশে প্রতিটি ব্যক্তির গড় আয় মাত্র ২,৫০০ ডলার, যা একজন আমেরিকানের তুলনায় ৩০ গুন কম এবং যেখানে ৮৪ কোটিরও বেশি মানুষ সরকারের থেকে বিনামূল্যে ৫ কেজি খাদ্যশস্য নিতে বাধ্য হয়, সেখানে নারীশক্তির কতটা মূল্যায়ণ হয়েছে, তা আন্দাজ করে নিতে পারেন যে-কেউ। এখনও যেখানে প্রতিটি মহিলাকে ঘরে-বাইরে কাজ করার পরও স্বামী এবং শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করতে বাধ্য করা হয়, তাকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করতে বাধ্য করা হয়, সেইসব মহিলাদের মর্যাদা বজায় থাকে কি? এখনও এদেশে মহিলাদের মগজ ধোলাই করা হয়! তাদের বোঝানো হয় যে, সংসারে সুখশান্তি আসতে পারে একমাত্র পূজাপাঠের মাধ্যমেই।

ভারতীয় নারীরা তাই আজও দ্বিগুন বোঝা বহন করে চলেছেন। এখনও এখানে মহিলারা সাংসারিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পাননি। এখনও তাই তাদের নানারকম অত্যাচার সহ্য করতে হয়। কারখানা ও অফিসে কর্মরত বেশিরভাগ নারীর উপার্জন তাদের স্বামী, বাবা কিংবা ভাইয়ের হাতে চলে যায়। কারখানা ও অফিসে কাজ করার সত্ত্বেও, তাদেরও গৃহস্থালির কাজ একই ভাবে করতে হয়, যেমন আগে কম শিক্ষিত নারীরা করতেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, মহিলারা কাজে যান শুধু নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি কিংবা উন্নতির জন্য নয়— বরং বলা যায়, তারা উপার্জন করেন সংসারের জন্য, পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য এবং সর্বোপরি তার শিক্ষার জন্য যে টাকা খরচ হয়েছে, সেই টাকা তার মা-বাবাকে ফেরত দেওয়ার জন্য।

ভাবতে অবাক লাগে যে, উচ্চ শিক্ষিত এবং কর্মজীবী হওয়া সত্ত্বেও, আজও মেয়েদের বিয়ে দিতে হয় মোটা টাকা কিংবা গাড়িবাড়ি পণ হিসাবে দিয়ে। বিবাহবিচ্ছেদের প্রতিটি মামলায় তাই বিয়েতে দেওয়া পণের টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করতে দেখা যায় মহিলাদের। তাই মনে প্রশ্ন জাগে, দেশ যদি এতই উন্নত হয়ে থাকে, তাহলে আজও কেন মেয়েরা ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়? দুর্বৃত্তরা তাদের উত্ত্যক্ত করতে পারে কিংবা তারা ধর্ষণের শিকার হতে পারেন—কেন আজও এমন ভয় পায় মেয়েরা? সন্ত্রাসবাদীরা আজও কেন মেয়েদের ধর্ষণের হুমকি দিতে সাহস পায়? যারা হুমকি দেয়, তাদের অনেককেই পুলিশ কেন গ্রেপ্তার করে না? আজও সরকার কেন মেয়েদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না? বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য সরকার মহিলাদের নিরাপদ এবং আরামদায়ক পরিবহণের ব্যবস্থা করতে পারছে না কেন? সরকার কি শুধু গর্ব করতে জানে আর নিজেদের ঢাক পেটাতে জানে? পুরোটাই কি শুধু ভোটের জন্য, নৈতিকতা কি তাহলে লোকদেখানো? সরকার কি তাহলে চায় নারীরা পিছিয়ে থাকুক আর দাসত্ব করে পুণ্যার্জন করুক? নেতাদের ভণ্ডামো আর ধর্মগ্রন্থগুলিকে তাহলে কি সংবিধানের মতো মান্যতা দিয়ে চলতে হবে?

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...